দুর্দমনীয় এক ফিওনা …… Queen of Katwe (2016)
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

144-queen-of-katwe

নির্মাণ শৈলী বিচার করতে গেলে পুরোপুরি সফল বলা যাবেনা। কিছু ক্ষেত্রে নিম্নমানের অপরিণত অভিনয়, মোটামুটি মানের স্ক্রিনপ্লে, দুর্বল মাপের চিত্রায়ন আর কি হবে, না হবে তা আগে থেকেই বুঝা যাচ্ছিল ভালো করেই। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি বেশ বিরক্ত লাগছিল, উগান্ডার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করলে আরও অনেক সমৃদ্ধ হতে পারত। ঘটনা যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, আদতে এমন আহামরি কিছু না। নিছক বিনোদন উপযোগী একেবারেই না, দেখে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার মতও নয়। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এমনই মনে হবে যে কারো।

উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা-র ছোট এলাকা কাতউই। সেখানে এক বস্তিতে ১০ বছরের ফিওনা তাঁর পরিবার নিয়ে থাকতো। একদিন ঘটনাক্রমে পরিচয় হয় শিক্ষক রবার্ট কাটেন্দে-র সাথে। কাটেন্দে একাধারে ফুটবল আর দাবা খেলায় পারদর্শী ছিল আর সবাইকে শেখাতেও আগ্রহী ছিল বিশেষ করে গরীব ছেলে মেয়েদের। কেন জানি দাবা খেলার প্রতি আসক্ত হয়ে পরে ফিওনা, শিখে নেয় তাড়াতাড়ি। এই দাবাই তাঁর জীবনের মোড় পাল্টে দেয়, দেয় উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি। আর তা অবশ্যই কাটেন্দের তত্ত্বাবধায়নে। আশা জাগানিয়া ঘটনা, সত্য ঘটনা।

ফিওনা মুতেসি-কে নিয়ে ESPN ম্যাগাজিনে প্রকাশিত লিখার সূত্র ধরেই এই মুভি নির্মিত হয়। ভারতীয় Mira Nair এর পরিচালনায়, Walt Disney Pictures আর ESPN Films এর প্রযোজনায় তৈরি হয় ‘Queen of Katwe’। ফিওনা চরিত্রে নবাগতা Madina Nalwanga, কাটেন্দে চরিত্রে David Oyelowo আর ফিওনার মা হ্যারিয়েট চরিত্রে Lupita Nyong’o, যাকে চিনেছি ‘টুয়েলভ ইয়ার্স এ স্লেইভ’ থেকে। সাথে একগাদা শিশুশিল্পী, সবই নতুন মুখ।

hero_Queen-of-Katwe-TIFF-2016

হত-দরিদ্র ফিওনার পরিবার, কোনরকম খেয়ে পরে জীবন কাটে। বস্তির ভাঙ্গা বাড়িতে থাকে, সবাই মিলে ভুট্টা বিক্রি করে দু-চার পয়সা অর্জন করে। বাবা মারা গিয়েছে অনেক আগেই, মায়ের হাতে সংসার। এমনই কত শত কাহিনী আছে, না জানা, অদেখা। কিন্তু ফিওনাকে দেখে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়, সৃষ্টিকর্তা আমাদের কত আরামে রেখেছেন।

মুভিকে বিভিন্ন বছরের ক্রমান্বয়ে দেখানো হয় ভেঙ্গে ভেঙ্গে। ২০১১ তে ফিওনাকে দাবা খেলায় অংশ নিতে দেখা যায়, তারপরই ২০০৭ এ চলে যায় দৃশ্য। বর্ণিল উগান্ডা, ব্যস্ত সবাই, ভীষণ অগোছালো, কর্দমাক্ত রাস্তা, আরও কত কি। ফিওনা তাকিয়ে থাকে স্কুলগামী ছেলে মেয়েদের দিকে, একটু পর মাথায় টুকরি নিয়ে কাজে চলে যায়। বড় বোন নাইট তাঁর  ছেলেবন্ধু থিও-র গল্প বলে, মা খেপে যায়। থিও কে দেখলে গালমন্দ করে ভীষণ। ক্রীড়া শিক্ষক কাটেন্দে কে দেখা যায় ফুটবল শিখাচ্ছে। পাশে বসে থাকা ছেলেদের জিজ্ঞেস করে তোমরা খেলছনা কেন? ছেলেরা বলে খেলে হাত পা ভাংলে ডাক্তার দেখানোর পয়সা নেই। তখন কাটেন্দে দাবার প্রসঙ্গ আনে। নিজের জীবনের কাহিনী বলে, দেখা যায় সে শহরের ছেলেদের হারিয়ে বাজির টাকায় টিউশন এর খরচ চালাচ্ছে। ছেলেরা আগ্রহী হয়, শহুরে ছেলেদের হারিয়ে দিতে পারবে এই ভেবেই রোমাঞ্চিত হয়। সবাই কাটেন্দের কাছে দাবা শিখতে চলে যায়, ফিওনার ভাই ব্রায়ানও যায়। ব্রায়ান কে লুকিয়ে অনুসরন করে ফিওনা বের করে ফেলে সবাইকে। সেও খেলতে চায়, কিন্তু সবাই ছি ছি করে তাঁকে দেখে, তাঁর গায়ে গন্ধ। কাটেন্দে ফিওনাকে গ্রহন করে, গ্লোরিয়াকে বলে ফিওনাকে দাবার চাল কীভাবে দিতে হয় শিখিয়ে দিতে। গ্লোরিয়া একটু শিখিয়ে তাঁকে তাড়িয়ে দেয়। এত কিছুর পরেও কেন জানি দমে না ফিওনা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে আবার খেলতে চলে আসে। শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা, দাবাকে ঘিরে।

queen-of-katwe-scene

এখন দেখি ভালো লাগা কেন, কেন দেখবেন মুভিটি। মুভিতে দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস কারী মানুষদের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা এক কথায় মর্মস্পর্শী। তাঁদের জীবন সংগ্রাম, জীবিকা অর্জনের নানান পন্থা, সুখ দুঃখ। একদম বাস্তব চিত্র, এমনই হয়ে থাকে, সরাসরি উপস্থাপন একদম। কাটেন্দের জীবন সংগ্রামের কাহিনী, ফিওনাদের কাহিনী, বখে যাওয়া তরুণ সমাজ, সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের কাহিনী আরও কত কি।

গরীব ফিওনা গ্লাস ভর্তি পায়েস পেয়ে এত্ত খুশি হয়, দেখা যায় গ্লাসের পাশে লেগে থাকা উচ্ছিষ্টও খেয়ে নিচ্ছে খুশি মনে। ফিওনার বিধবা মায়ের প্রতি আশ পাশের লোকেদের লোলুপ দৃষ্টি দেখা যায় বিভিন্ন দৃশ্যে। বস্তির ছেলে মেয়েরা যখন শহরে যায়, অবাক হয়ে সব দেখে, খাওয়ার টেবিলে কাড়াকাড়ি শুরু করে দেয়, তখন বুঝা যায় দুনিয়াতে শ্রেণী বিভেদ কতটা। রাতে দেখা যায় সবাই খাটে না শুয়ে মেঝেতে একসাথে জড়সড় হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে, ভয়ে অথবা অভ্যাসের কারণে। ফিওনার সাথে খেলতে বসা শহুরে ছেলেটিকে দেখা যায় হাত মুছে নিচ্ছে ফিওনার সাথে হ্যান্ডশেইক করার পর। ব্রায়ান দুর্ঘটনায় পড়লে টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেনা, হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসে। বাড়িওয়ালা ঘর থেকে বের করে দেয় ভাড়া বাকি বলে, মা খেলতে দিতে চায়না, কি হবে খেলে যেখানে খাওয়া জুটেনা। তবুও ফিওনার স্বপ্ন থেমে থাকেনা, চেষ্টা করে যায়।

ভালো লাগার কিছু কথোপকথন উল্লেখ না করলেই নয়। দাবা খেলার সৌন্দর্য উঠে আসে গ্লোরিয়ার কণ্ঠে- “In chess, the small one can become the big one. That’s why I like it!”

ফিওনা যখন বড় বড় প্রাইজ জিতে আসতে থাকে, একদিন মা বলে-‘Ah I see you got another. Oh.. I wish we could eat these prizes’

কোন এক কারণে ফিওনার নামে কাটেন্দে কে বিচার দিতে যায় মা, এক পর্যায়ে বলে- ‘When I was a girl, I was told stories, of a village by the lake that never runs short of maize. Where there is no fighting. I never found that place, Mr. Katende.’

তখনি ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা যায় ফিওনা কাটেন্দে কে বলছে- ‘That girl from Egypt flies to Russia to see her coach. She has her own computer to practice with. She has biscuits. She has clothings. কাটেন্দে জিজ্ঞাসা করে-‘Why does this suddenly bother you now?’ ফিওনা জবাব দেয়- ‘Because I won that girl. Coach, I won her!’

নিজের দুর্দশার কথা বলে কাটেন্দে-কে জানায় সে কীভাবে খেলবে এই অবস্থায়- ‘Very soon, men will start coming after me. Where is my safe square, Coach?’

গরীব মা নিজের সন্তানকে পরিপাটি স্কুল ড্রেসে দেখে কি যে খুশি হয়, বলে- ‘Are you my daughter?’

AppleMark

ছেলেমেয়েদের শহরে যাওয়ার দৃশ্যগুলা ছিল দেখার মত, শহরের স্কুলের জাঁকজমক দেখে তাঁদের গান বন্ধ হয়ে যায়, মাঠ দেখে হা করে দাড়িয়ে থাকে। খেলতে বসলে একজনের হেঁচকি উঠে যায় ভয়ে, আরেকজন লজ্জায় হাঁসতে থাকে শুধু। সুদানে যখন খেলতে যায়, তখন সুইমিং পুলের পাশে বসে খাওয়ার সময় একজন বলে যে -দ্যাখ আমরা গ্রামে কি খাইতাম আর এখন কি খাইতাসি, চরম আত্মতৃপ্তির ভাব তুলে। আরেকজন বলে কেচাপের কথা, তাঁর মনে হয় এইটা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার, তাঁর পুকুর সমান কেচাপ চায়। এরকম অনেক দৃশ্য খুঁজে পাবেন মুভিটিতে।

বাস্তবতা প্রাধান্য পেয়েছে বলা যায়, কল্পনায় ডুবে যাওয়া নয়। মূল চরিত্র ফিওনার ঘটনা বাদ দিলে মুভির অন্যতম আকর্ষণ কাটেন্দে আর মা হ্যারিয়েট। এতিম হয়েও কাটেন্দে নিজেকে তুলে এনেছে অন্য উচ্চতায়, আর তা ছড়িয়ে দিতে চায় সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মাঝে, ক্রীড়ার মাধ্যমে। উপরমহলকে খুব সুন্দর করেই মানিয়ে ফেলে তাঁদের খেলার সুযোগ করে দিতে, নিজে টাকার বিনিময়ে ফুটবল খেলে ওই টাকা ফি হিসেবে জমা দেয়, যাতে ছেলেমেয়েরা খেলার সুযোগ পায়। ভালো একটা চাকরী হয়, কিন্তু ছেলেমেয়েদের ছেড়ে যেতে হবে বলে সেটাতে না করে দেয়। অন্যদিকে মা হ্যারিয়েট যেন সংগ্রামী মায়েদের এক মূর্ত প্রতীক। কত কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের খাওয়া জোগাড় করে, তাঁদের চিন্তা করে দ্বিতীয়বার বিয়ে পর্যন্ত করেনি। বখে যাওয়া মেয়ে নাইট কে অনেক কিছুর পরও ঠিকই গ্রহন করে নেয় আবার। একদিকে দারিদ্রের কষাঘাত, আরেকদিকে মেয়ের ভবিষ্যৎ, ঠিকই শেষ পর্যন্ত মেয়ের ভালটাই মেনে নেয়। একবার দেখা যায় এক ব্যবসায়ী তাঁকে অনেক টাকার প্রলোভন দেখায়, তাঁকে সঙ্গ দেয়ার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু হ্যারিয়েট রাজী হয়না।

23QUEEN-master768

হেরে না যাওয়ার গল্প, আশা জিইয়ে রাখার গল্প, বাস্তব গল্প। ভেঙ্গে না পড়া, একদিক হয়নি তো আরেকদিক হওয়ার গল্প। গায়ে জোড় না থাকার কারণে ফুটবল খেলতে পারনা তো কি হয়েছে, মাথার জোড় তো আছে, দাবা খেল। ইচ্ছা শক্তি ধরে রাখ, কোন না কোন উপায় হবেই। থেমে থাকা নয়, এগিয়ে যাওয়া, এগিয়ে যেতে চাওয়া।

দেখার অনুরোধ রইল। আর হ্যাঁ, শেষ করে উঠে যাবেন না, দারুণ পোষ্ট ক্রেডিট আছে, সাথে গান।

লিঙ্কঃ আইএমডিবি, পঁচা টমাটু, টরেন্ট, সাউন্ডট্র্যাক ডেমো

Queen of Katwe (2016)
Queen of Katwe poster Rating: 7.3/10 (3,448 votes)
Director: Mira Nair
Writer: William Wheeler (screenplay), Tim Crothers (based on the ESPN Magazine article and book by)
Stars: Madina Nalwanga, David Oyelowo, Lupita Nyong'o, Martin Kabanza
Runtime: 124 min
Rated: PG
Genre: Biography, Drama, Sport
Released: 30 Sep 2016
Plot: A Ugandan girl sees her world rapidly change after being introduced to the game of chess.

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন