জীবন সায়াহ্নের গল্প……The Straight Story (1999)
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

script

জীবন সায়াহ্নে আলভিন। আলভিন স্ট্রেইট, লাঠিতে ভর দিয়ে হাটে। দুর্বল হয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে, কোন কাজ কর্ম করারও সুযোগ নেই। ছেলে মেয়ে সবাই নিজের মত চলে গিয়েছে, এক মেয়ে থাকে সাথে। মেয়ের নাম রোজ, একটু পাগলাটে স্বভাবের আর কথা বলার সময় তোতলায়। ভারসাম্য হারিয়ে পরে গিয়ে দুটি লাঠির সাহায্যে হাটতে হবে এখন থেকে আলভিনের। মেয়ে জোড় করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়, যে কোন সময় কিছু একটা হয়ে যেতে পারে আলভিনের। সিগারেট নিষেধ করে দেয়, খাওয়া দাওয়া ঠিক মত করতে বলে ডাক্তার। কিন্তু আলভিন এত কিছু মানতে নারাজ, নিজের মতই চলতে থাকে। একদিন ঝড়ের রাতে টেলিফোন আসে, আলভিনের ভাই লাইল স্ট্রেইট স্ট্রোক করেছে। আলভিন কাঁদ কাঁদ হয়ে পরে, আপন ভাই তাঁর। চুপচাপ থাকে, মেয়ে চিন্তিত হয়। ভাইকে দেখতে যাবে, হটাত সিদ্ধান্ত নেয় আলভিন। কিন্তু সমস্যা হল তাঁর না আছে গাড়ি, না আছে লাইসেন্স, না সে গাড়ি চালানোর উপযুক্ত। জেদ চেপে বসে আছে একাই যাবে এবং নিজের মত করেই যাবে। অনেক দূরে থাকে ভাই, তিনশ মাইলেরও অধিক পথ।

55010623c52df.image

৭৩ বছর বয়সী আলভিন স্ট্রেইটের ভ্রমন কাহিনীর উপর ভিত্তি করে বানানো হয় বায়োগ্রাফি আর ড্রামা ঘরানার ‘দ্যা স্ট্রেইট স্টোরি’। ১৯৯৪ সালে আলভিন তাঁর এই অদ্ভুত ভ্রমন সম্পন্ন করে শুধুমাত্র ভাইকে এক নজর দেখার জন্য। অদ্ভুত ভ্রমন কেন বললাম তা মুভি দেখলেই জানতে পারবেন। পরিচালনায় ডেভিড লিঞ্চ, আলভিন চরিত্রে প্রয়াত রিচার্ড ফার্ন্সওয়ার্থ আর রোজ চরিত্রে সিসি স্পাসেক। ডেভিড লিঞ্চের কাজের সাথে অনেকেই পরিচিত। মূলহল্যান্ড ড্রাইভ, দি এলিফ্যান্ট ম্যান, ব্লু ভেলভেট তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। চারবারের অস্কার নমিনেশন পাওয়া ডেভিড লিঞ্চ কাজ করেন একদম নিখুঁত, ড্রামা-মিস্টারিকে অনেক উচ্চ পর্যায়ের ক্লাসিক রূপে রূপদান করার চেষ্টা করেন সবসময়। এই মুভিতেও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি। তাঁর অন্যতম সেরা কাজ বলে মনে করা হয় এই মুভিটিকে। আর সাথে জোট বেঁধেছিলেন আরেক সেরা সিনেমাটোগ্রাফার ফ্রেডি ফ্রান্সিস। অসাধারন কাজ লক্ষ্য করা যায় দ্যা স্ট্রেইট স্টোরিতে। ৩০ বছরের অধিক সময় স্টান্টম্যান হিসেবে কাজ করা প্রয়াত রিচার্ড ফার্ন্সওয়ার্থ অভিনয় জগতে এসেই সুনাম অর্জন করেন। অর্জনের খাতায় দুইবার অস্কার নমিনেশন ছাড়া রয়েছে অনেক কিছু। বাস্তবের আলভিন আর রিচার্ড ফার্ন্সওয়ার্থ এর একই বয়স ছিল। আর সিসি স্পাসেক নামটা একেবারেই অপরিচিত, অন্তত আমার কাছে। অথচ এই গুনি অভিনেত্রীর রয়েছে একটি অস্কার আর পাঁচটি অস্কার মনোনয়ন।

dvd_straight

মুভির শুরু থেকেই একটা শূন্যতা, বিষণ্ণতা আর থেমে যাওয়া ভাব চলে আসে। বিশাল উন্মুক্ত ভুট্টার ক্ষেত, আলভিনের বাসভূমি লরেন্সের নিরব, নিস্তব্ধ রূপ, কৃষি কাজ করে বেড়ানো বয়োবৃদ্ধ সব মানুষজন। আলভিন স্ট্রেইটের সাথে সবকিছুই যেন বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছে, দিন গুনতে গুনতে সময় কাটে, কখন ডাক আসে। দুই ভাই প্রায় পিঠা পিঠি ছিল, খুব মিল, খুব বন্ধুত্ব। কি এক কারণে দুই ভাইয়ে ঝগড়া হয়, তারপর প্রায় বছর দশেক কথা বলা বন্ধ। কিন্তু ভাইয়ের অসুস্থতার খবর শুনে আলভিন আর স্থির থাকতে পারেনা। ছুটে যায় ভাইয়ের কাছে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে। যাত্রাপথে অনেকের সাথে পরিচয় হয়, অজানা অচেনা সব মানুষ জন, তরুণ, মাঝবয়সী, কিছু আবার তারই মত বৃদ্ধ। তাঁদের সাথে কত অজানা কথা বিনিময় হয়, সাহায্য সহযোগিতা বিনিময় হয়। একজন জিজ্ঞাস করে বৃদ্ধ হওয়ার সবচেয়ে খারাপ দিক কি, আলভিন বলে সবচেয়ে খারাপ দিক হল তরুণ বয়স মনে করা। একরোখা, জেদি কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ আলভিন। নিজের মত করে নিজের খরচে ভ্রমন করবে বলে বেড়িয়েছে, এক পয়সাও কারো থেকে নেয়নি। কিন্তু সময়ের কাছে অসহায় হয়ে সাহায্য নিতে হয় অন্য থেকে, এ এক অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।

richard-farnsworth-as-alvin-straight-in-the-straight-story-19991

৭৯ বছর বয়সে অস্কারে মনোনয়ন পেয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী বয়সের মনোনয়নের রেকর্ডটা রিচার্ড ফার্ন্সওয়ার্থের দখলে। ভীষণ সরল অভিনয়, প্রাণবন্ত অভিনয়। সমালোচকদের মন জয় করে নিয়েছে পুরো দমে, ডেভিড লিঞ্চের সেরা কাজ, ফার্ন্সওয়ার্থের সেরা কাজ, স্পাসির সেরা কাজ বলে মত দিয়েছেন অনেকেই। এরকম ভ্রমন কাহিনীর উপর নির্মিত মুভি গুলোর মধ্যে সেরা কাজ হিসেবেও এটিকে আখ্যায়িত করেছেন অনেকে। রটেন টমাটুতে এখনো পর্যন্ত ৯৬% রেটিং আছে, আর রজার এবার্ট প্রশংসার সাথে ৪/৪ দিতে ভুল করেননি।

STRAIGHT STORY, Richard Farnsworth, 1999

ভীষণ রকম ধীর গতির, স্বল্প মাত্রার কথোপকথন নিশ্চিতভাবেই বিরক্তির উদ্রেক করবে। শূন্যতা আর বিষণ্ণতা ঘিরে ধরবে। আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তবুও দেখার অনুরোধ করব, কারণ আলভিনের ওই সময়টাতে আমাদের সবাইকে পৌঁছুতে হবে। অসম্ভব সুন্দর রকমের চিত্রায়ন, ক্রমানুসারে দেখানো ঘটনাবলী, নিখুত-সরল-প্রানবন্ত অভিনয় সাথে একদম মিলে যাওয়া ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর যথেষ্ট। ঘুরে আসতে পারেন আলভিন স্ট্রেইটের সাথে, ধীর গতিতে কিন্তু প্রবল ইচ্ছা শক্তির যোগান পাবেন। জীবনের কঠিনতম সময়ের মুখোমুখি হবেন, যখন কেউ পাশে থাকবেনা, সমবয়সীরা আস্তে আস্তে পরপারে চলে যেতে থাকবে, আপনি নিজেও পরপারে যাওয়ার দিন গুনতে থাকবেন। প্রিয়জনের মুখ শেষবারের মত দেখার ইচ্ছা হবে, দেখার সুযোগ হতেও পারে, নাও হতে পারে।

straight-story-deer

Error:

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন