জীবন থেকে নেয়া : ভাষা আন্দোলনের এক অনন্য খন্ডচিত্র।
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

691c0343820077.57fe440d92c8c
জহির রায়হান,নাম শুনলেই আমাদের মনে পড়ে একজন গল্পকার অথবা চলচ্চিত্র নির্মাতার কথা।কিন্তু অনেকেরই হয়তো অজানা যে সে একজন ভাষাসৈনিক ও ছিলেন,এমনকি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তাকে কারাবরণ ও করতে হয়েছিল। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি পরবর্তীতে ‘আরেক ফাগুন’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন।সব সময়েই তার ইচ্ছে ছিল ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি ছবির তৈরি করার। তবে অনেক চেষ্টার পরেও সে ধরণের ছবি করতে তৎকালীন সরকার তাকে কখনোই অনুমতি দেয়নি। কিন্তু এতে করে পরিচালক জহির রায়হান থেমে থাকেননি। এর মাঝে তিনি নির্মাণ করেন কাঁচের দেয়াল, সংগম, বাহানা, আনোয়ারা, টাকা আনা পাই ইত্যাদি ছবিগুলো। এ ছবিগুলো নির্মাণ করলেও তার ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি ছবি নির্মাণের স্বপ্ন ,স্বপ্নই থেকে যায় । ততদিনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে সরাসরি ভাষা আন্দোলনকে বড় পর্দায় দেখানো যাবে না। তাই তিনি একটি পারিবারিক গল্পের মধ্য দিয়ে তখনকার আমলের শাসন ব্যবস্থা আর ভাষা আন্দোলনের এক অনন্য খন্ডচিত্র তুলে ধরে বাংলা চলচিত্র ইতিহাসের অন্যতম সেরা ছবি উপহার দেন যা আমাদের মাঝে ” জীবন থেকে নেয়া ” নামে পরিচিত।

” জীবন থেকে নেয়া ” ছবির নামকরণের ইতিহাস খুবই মজাদার। সেই সময়ে জহির রায়হান এক ছবির জন্য আমজাদ হোসেনকে কাহিনী ও চিত্রনাট্যের জন্য ডাকলেন। জহির রায়হান তাকে জানালেন যে , তাকে এমন একটা গল্প লিখতে হবে যেখানে এক বোন আরেক বোনকে বিষ খাওয়াবে। প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও আমজাদ হোসেন চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন, কিন্তু তিনি যেভাবেই লেখেন না কেন চারপাশের পরিস্থিতির কারণে ধীরে ধীরে তা পারিবারিক গল্প থেকে রাজনৈতিক গল্প হয়ে যাচ্ছিলো। এক সময় জহির রায়হান বুঝতে পারেন এই গল্প দিয়েই তার ড্রিম প্রজেক্ট বানানো সম্ভব। এরপরে দুজনে চিত্রনাট্য শেষ করার পড়ে প্রথমে চলচ্চিত্রটির নাম রাখা হয় ‘ তিনজন মেয়ে ও এক পেয়ালা বিষ’। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জহির রায়হান এর নাম পাল্টে ‘জীবন থেকে নেয়া’ রাখেন।

ছবির কাহিনী আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও আসলে এ ছবি রূপক দিয়ে ভাষা আন্দোলন আর তখনকার শাসন ব্যবস্থার অবস্থা বোঝানোর এক অসাধারণ উপাখ্যান। ছবিতে দেখা যায় দজ্জাল টাইপের এক বড় বোনের কাছ থেকে বাঁচার জন্য দুই ভাই বিয়ে করে নতুন বৌ ঘরে আনে। শুরু হয় চাবির গোছা তথা সংসারের কতৃত্ব দখলের লড়াই। এখন এই চাবির লড়াই যে কোন পর্যায়ে চলে যেতে পারে তাই দেখানো হয়েছে জীবন থেকে নেয়া ছবিটিতে। ছবির সবচেয়ে দুর্দান্ত দিক এর চরিত্র গুলো। দজ্জাল বোনের চরিত্রে রওশন জামিল অনবদ্য ,অসাধারণ। তখনকার আমলের এক নাচের শিল্পী থেকে এক দজ্জাল চরিত্র তিনি ভয়ঙ্কর সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন , তার চরিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন শাসক চক্রকেও দারুণভাবে বোঝানো হয়েছে। আনোয়ার হোসেন ,রাজ্জাক ,খান আতাউর রহমান,সুচন্দা,রোজি সামাদ , শওকত আকবর ,বেবি জামান সহ বাকিরা তখনকার আমলের গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। সবগুলো চরিত্রই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো অভিনয় করেছে। এমনকি নবজাতকের নাম মুক্তি রাখা দিয়েও পরিচালক তার দূরদর্শিতার স্বাক্ষর দিয়েছেন।

download
তখনকার সময় বিবেচনায় ক্যামেরার কাজ ছিল অসাধারণ। পুরো বাড়ি বিমূর্ত প্লাকার্ডে ছেয়ে ফেলা ,মিছিলের দৃশ্য ,কোর্টরুমের দৃশ্য সবকিছুতেই জহির রায়হান মুন্সিয়ানার চাপ দেখিয়েছিলেন। “দেশ আর সংসার তো একই, একটা বৃহৎ অর্থে আরেকটা ক্ষুদ্র অর্থে ” -এর মতো দুর্দান্ত কিছু সংলাপ ছবিটিকে আরো বড় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।

hqdefault
ছবির গানগুলোর কথা না বললেই নয় । ছবির শুরুতে এর ট্যাগলাইন ” একটি দেশ ,একটি সংসার,একটি চাবির গোছা,একটি আন্দোলন ,একটি চলচ্চিত্র ” দেখানোর সময় ” ও আমার স্বপ্ন ঝরা ,আকুল করা জন্মভূমি ” , নির্যাতিত স্বামীর মুখে ” এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে ” , কারাগারের বন্দীদের ” কারার ঐ লৌহ কপাট ” কিংবা শহীদ মিনারে ” আমার সোনার বাংলা ” সবগুলোই পরিবেশের সাথে দারুণভাবে খাপ খেয়ে গেছে।

061
১৯৭০ সালের এপ্রিলে মুক্তি পাওয়ার পরে আরো একবার ঝড় বয়ে গিয়েছিলো এই মুভির উপর। তৎকালীন বেশিরভাগ সেন্সর বোর্ড এর সদস্য এই ছবির বিরোধিতা করে এর প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করলেও অবশেষে সেন্সর বোর্ড সদস্য আসকার আবু শাইখের হস্তক্ষেপে এ ছবি আবার আলোর মুখ দেখে এবং এখন এটি সর্বকালের অন্যতম সেরা বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

জাতির সূর্যসন্তান জহির রায়হান এর সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছিল জীবন থেকে নেয়া। বিগত কয়েক বছরে চলচ্চিত্র শিল্পের দুর্দশার কথা দেখলে জহির রায়হানের মত পরিচালকের অভাব আরো গভীরভাবে বোধ হয়। ভাষা আন্দোলনের এতো বছর পরেও এ বিষয়ে হাতেগোনা দুই একটি বাদে আর কোন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচিত্র নির্মাণ করা হয়নি। আশা করি নবীন পরিচালকেরা এ ছবি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এ ধরণের আরো ছবি নির্মান করবেন যাতে মানুষ আবারো দল মত নির্বিশেষে হলমুখী হয় আর আমরা আমাদের চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত যেন আবারো ফিরে পাই।

এক নজরে “জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০) ”
পরিচালনা ও প্রযোজনা – জহির রায়হান
কাহিনী ও চিত্রনাট্য: জহির রায়হান ও আমজাদ হোসেন
সঙ্গীত: খান আতাউর রহমান
চিত্রগ্রহণ: আফজাল চৌধুরী
অভিনয়ে: রাজ্জাক, সুচন্দা, আনোয়ার হোসেন,শওকত আকবর, রোজি সামাদ, খান আতাউর রহমান, রওশন জামিল, বেবি জামান প্রমুখ ;
আইএমডিবি – ৯.৩/১০

ইউটিউব লিংক – https://www.youtube.com/watch?v=3KwomNGsC6s

Jibon Thekey Neya (1970)
Jibon Thekey Neya poster Rating: 9.2/10 (1,149 votes)
Director: Zahir Raihan
Writer: Zahir Raihan (story), Amjad Hossain (dialogue), Zahir Raihan (screenplay)
Stars: Abdur Razzak, Suchanda, Shaukat Akbar, Rosy Samad
Runtime: 150 min
Rated: N/A
Genre: Drama, Family, War
Released: 10 Apr 1970
Plot: A political satire of Bangladesh under the rule of Pakistan metaphorically, where an autocratic woman in one family symbolizes the political dictatorship of Ayub Khan in East Pakistan.

এই পোস্টটিতে ৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন