ডার্ক(নেটফ্লিক্স): আসলেই কি বোঝা দুঃসাধ্য?
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

 

 

২০১৭ এর শেষের দিকে এসে নেটফ্লিক্স তার অন্যতম সেরা একটা সিরিজ উপহার দিলো। আর শীতের রাতে মিস্ট্রি+থ্রিলার+ফিলোসফিকাল সাইফাই এর মত বড় ট্রিট আর কিছুই হতে পারেনা। জার্মানীর ছোট শহর উইনডেনে একটা ছেলে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া দিয়ে রহস্য শুরু। প্রথমদিকে ১/২ এপিসোড টিপিকাল ইউরোপিয়ান ক্রাইম ড্রামা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সিনেমাটোগ্রাফী আর ডায়লগ মনোযোগ হারাতে দেয়না। বিভিন্ন দৃশ্যে হলুদ রঙকে ফোকাস করার মধ্যেও কোন সিগনিফিকেন্স থাকতে পারে ( ইয়োনাসের হলুদ জ্যাকেট, স্কুলবিল্ডিং এর হলুদ দরজা-জানালা, রহস্যে ঘেরা বনের গাছগুলো হলুদ ফুল দিয়ে ছাওয়া)। মেইন ক্যারেক্টারের একজন আবার হ্যানিবালের মত দেখতে(!), আর ম্যাডস, মিকেল নামের সাথে লিংকড; সবার আগে ম্যাডস মিকেলসনের নামই মনে আসে!!

 

 

“The question is not w̶̶h̶̶e̶̶r̶̶e̶, w̶h̶o̶ or h̶o̶w̶, but when.” ট্রেলারের এই লাইনটা দেখেই আমরা টাইম ট্র‍্যাভেলের আভাস পাই। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক চেহারার এই সিরিজের মধ্যে খুঁজে পেতে পারেন Stranger things ( নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নিয়ে রহস্য, বনের মধ্যে অন্য জগতের পোর্টাল, সরকারের টপসিক্রেট কিছু ধামাচাপা দেবার চেষ্টা, 80’s nostalgia), কিংবা Lost (Purgatory আর টাইম লুপ), Back to the future এর অ্যাডভেঞ্চার, Predestination এর প্যারাডক্স। এমনকি GOT টাইপ ফুপু-ভাতিজার সম্পর্কও বাদ যায়নি!

 

 

সিরিজটা একটা ৯ ঘন্টার পাজল, আর পাজলের কিছু অংশ এখনো মিসিং। তাই সিজন ২ না আসা পর্যন্ত তর সইছেনা!

 

 

 

 

 

 

*****************spoilers********************

 

 

আমি ঘটনাগুলোকে কয়েকটা ক্যারেকটার দিয়ে মনে রাখার চেষ্টা করেছি। এতগুলো অপরিচিত মুখ, ভিন্ন ভিন্ন টাইমলাইন, আবার ননলিনিয়ার( কিংবা হয়ত লিনিয়ার!) ন্যারেটিভ; এতকিছু মিলিয়ে ঘটনার ট্র‍্যাক রাখা বেশ দুঃসাধ্য।

 

 

ঘটনা ঘটে চারটা সালে ১৯৫৩-১৯৮৬-২০১৯-২০৫২

 

 

Ulrich :

ট্রন্টে- জানার ছেলে উলরিখ। স্কুলে পড়ার সময় ১৯৮৬ সালে তার ভাই ম্যাডস বনের মধ্যে নিখোঁজ হয়। ক্যাথারিনার সাথে উলরিখের প্রেম, আর হ্যানা আবার উলরিখের উপর ক্রাশ। তাই জেলাস হ্যানা উলরিখকে Atonement স্টাইলে ফাঁসিয়ে দেয় শেরিফ এগনের কাছে, এগন আবার আগে থেকেই উলরিখকে দেখতে পারতনা। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে এসে উলরিখ হয় শহরের শেরিফ, আর ক্যাথারিনার সাথে সুখের সংসার এবং তিন সন্তান (ম্যাগনাস, মার্থা, মিকেল) থাকা সত্ত্বেও সে হ্যানার সাথেই পরকীয়া করে। ৪ নভেম্বর মিকেল বনের মধ্যে নিখোঁজ হবার পরে সে তদন্ত করে বনের মধ্যে গুহার (তেজস্ক্রিয় বলে জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ) সাথে তার ভাই এবং ছেলে হারানোর মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পায়। পরবর্তীতে সে তার ভাইয়ের লাশ খুঁজে পায়, যদিও প্রথমে চিনতে পারেনি। এলাকার নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট অফিসে জোর করে খোঁজাখুঁজি করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ম্যাডসের কেস ফাইল ঘেঁটে আধপাগল বুড়ো হেলগের ( It’ll happen again! ) সাথে রহস্যের সাথে সম্পর্ক খুঁজে পায়। তাকে তাড়া করে বনের গুহাতে ঢুকে পড়ে আরেকবার, আর চলে যায় ১৯৫৩ সালে। সেখানে তার সাথে দেখা হয় তার বাবা ছোট্ট ট্রন্টে আর দাদী অ্যাগনেসের। ১৯৫৩ সালে বিজ্ঞানী ট্যানহসকে গিয়ে ট্যানহসেরই লেখা বই উপহার দিয়ে আসে, সেই সাথে তার কাছে ফেলে রেখে যায় তার ২০১৯ সালের স্মার্টফোন। যেটা পরবর্তীতে টাইম মেশিন বানানোর কাজে লাগে। হেলগে যে খুনী, এই ব্যাপারে মোটামুটি শিওর ছিলো সে। তাই হেলগের কেবিনের সামনেই ছোট হেলগেকে ইট দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। হেলগে মরে গেলে হয়ত টাইমলাইন চেঞ্জ হত, কিন্তু সে মরেনা, আর সন্দেহজনক আচরণের কারণে উলরিখ গ্রেফতার হয়। কেননা দুইটা বাচ্চার লাশের(ওয়ার্মহোল দিয়ে চলে আসা এরিক ও ইয়াসিন) পাশাপাশি হেলগেও নিখোঁজ। ভাগ্যের পরিহাসে সে হাতে পড়ে তরুণ শেরিফ এগনের ( যে তাকে দেখতে পারতনা ১৯৮৬ সালে)। টাইমলুপ বন্ধ হয়ে যাবার কারণে সে আটকা পড়ে আছে ১৯৫৩ সালের জেলে। হেলগে কে মাথায় বাড়ি দিয়ে মারার চেষ্টা করতে গিয়েই উলরিখ প্রকারান্তরে তাকে খুনী বানিয়ে দিয়েছে, খুব সম্ভবত টাইম মেশিন বানিয়ে হেলগে তার জীবনের ট্রমা দূর করতে চাইছে।

 

 

Jonas:

হ্যানা-মাইকেলের সন্তান। সিরিজ শুরু হয় মাইকেলের আত্মহত্যা দিয়ে, যার কারণে ইয়োনাস দুই মাস হাসপাতালে কাটায়। স্কুলে ফিরে এসে দেখে তার গার্লফ্রেন্ড মার্থা (উলরিখের মেয়ে) চলে গেছে তার বেস্টফ্রেন্ড বার্তোশের কাছে। সে বনের মধ্যে ড্রাগ খুঁজতে যায় মার্থারা তিন ভাইবোন আর বার্তোশের সাথে। ঘটনাক্রমে সে আর মিকেল আলাদা হয়ে যায়। তার কিছুপরেই মিকেল হারিয়ে যায় আর ইয়োনাস তার বাবাকে কালিমাখা অবস্থায় দেখতে পায়। শহরে আসে এক আগন্তুক, যে কিনা ইয়োনাসের কাছে ৩৩ বছরের পুরানো একটা চিঠি পাঠায়। সেটা পড়ে ইয়োনাস বুঝতে পারে, মিকেল গুহার টাইম পোর্টাল দিয়ে ১৯৮৬ সালে হয়ে গেছে মাইকেল আর হ্যানাকে বিয়ে করে জন্ম দিয়েছে ইয়োনাসের। ইয়োনাস তখন ১৯৮৬ সালে গিয়ে মিকেলকে খুঁজে পায়, মিকেল-হ্যানার প্রথম পরিচয়ও দেখে। তাকে ফিরিয়ে আনার চিন্তা করলেও আগন্তুক তাকে বাধা দেয় কেননা তার কোন অস্তিত্ব থাকবেনা তাহলে। কিন্তু পরে সে মনে করে, মিকেলকে ফিরিয়ে আনলেই সবকিছুর সমাধান হবে। আবার সেই উদ্দেশ্যে ১৯৮৬ সালে গেলে হেলগে এবং নোয়া তাকে কিডন্যাপ করে ১৯৮৬ সালের নীল রুমে আটকে রাখে। আগন্তুক নিজের পরিচয় দেয় ২০৫২ সালের ইয়োনাস হিসেবে। ২০৫২ সালের ইয়োনাস তার চিঠি পুড়ায়নি, এবং যেভাবে যা ঘটছে তাই মেনে নিয়েছে। কিন্তু এই টাইমলাইন ২০৫২-ইয়োনাসের পছন্দ না হওয়ায় সে চলে এসেছে ১৯৮৬তে, যখন কিনা চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয়তায় ওয়ার্মহোল প্রথমবারের জন্য খুলে গিয়েছিলো।

 

 

দুঃখের বিষয়, ২০৫২-ইয়োনাস আসলে টাইম পোর্টাল বন্ধ করার জন্য সিজিয়াম চুরি করে মেশিনটা চালু করার ফলেই মূলত ১৯৮৬ এর পোর্টালটা সৃষ্টি হয়েছিলো। সুতরাং এটা একটা প্যারাডক্স। যতবার ইয়োনাস পোর্টাল বন্ধ করতে যাবে, ততবার এটা চালু হবে।

২০১৯-ইয়োনাস শেষে চলে যায় ২০৫২ এর অ্যাপোক্যালিপ্টিক পৃথিবীতে, অন্যদের এক্সপ্রেশনে মনে হয় যেখানে সে আগেও সেখানে গিয়েছে। খুব সম্ভবত এটা নতুন আরেকটা লুপ।

 

 

Noah:

 

সিরিজের মেইন ভিলেন এবং সব কলকাঠি নাড়ার মূল। উলরিখের বাবা ট্রন্টে, কিন্তু ট্রন্টের বাবা একজন প্রিস্ট যে কিনা নাস্তিকও হতে পারে। তাই ধরে নেয়া যায় যে, নোয়াই ট্রন্টের বাবা। দুঃখের জীবনে পরিবর্তন আসবে, এই আশায় সম্ভবত হেলগে নোয়ার হয়ে খুনগুলো করে টাইমমেশিন বানাতে সাহায্য করে। মাথায় বাড়ি লেগে শিশু হেলগে যখন ১৯৫৩ সালে কেবিনে ছিলো, তখন ওয়ার্মহোল খুলে যায়, আর ইয়োনাসের সাথে আংগুল মেলানোয় সে চলে আসে ১৯৮৬তে আর সম্ভবত তখনই নোয়ার সাথে তার পরিচয় হয়।

নোয়ার পিঠের ট্যাটুর সাথে এমারেল্ড ট্যাবলেটের মিল পাওয়া যায়, যার সাথে যোগ আছে গুহার দরজায় লেখা কথাটার (sic mundus creatus est যার মানে and thus the world was created)। এটা একধরনের অকাল্ট বিশ্বাসীদের ধর্ম, নোয়া তাদের অনুসারী হতে পারে। নোয়ার পক্ষে অ্যান্টিক্রিস্ট/ শয়তান হওয়াও সম্ভব। এদিকে নোয়ার ট্যাটুর সাথে ২০৫২-ইয়োনাসের পিঠের ক্ষতেরও মিল আছে, আবার নোয়া যে জার্নালটা বার্তোশকে দেয়, সেটা ২০৫২-ইয়োনাসেরই। এদের মধ্যে সম্পর্ক পরিষ্কার না।

 

 

নোয়া কোনভাবে ১৯৫৩ এর পোর্টাল ব্যবহার করে ১৯৮৬ কিংবা ২০১৯ সালে বিভিন্নজনের কাছে দেখা দেয়। হেলগেকে দিয়ে ম্যাডস, এরিক, ইয়াসিনকে কিডন্যাপ করে তাদেরকে মেরে ফেলে নিজের টাইমমেশিন বানানোর চেষ্টা করতে গিয়ে (সম্ভবত)। কেননা সে ৩৩ বছরের লুপের বাইরে কোথাও যেতে চায়। নীল রুমটা আসলে কেবিনের মধ্যে, যার নিচে দিয়ে গুহার সুড়ঙ্গ গেছে, আর ছেলেগুলোকে মেশিনের এনার্জি হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে।

 

 

নোয়া বার্তোশ হতে পারে নাও হতে পারে। তাদের চোখের রঙ ভিন্ন, আবার নোয়া ছোটবেলায় যুদ্ধফেরত এক লোকের কথা বলে(২০৫২-ইয়োনাস?) যেটার সাথে বার্তোশের সম্পর্ক নেই। নোয়ার সাথে ডিল করা যে বার্তোশের জন্য “Deal with the devil” এর মতই, যেই হিন্টস দেয়া আছে এপিসোড ৪ এর “Faust” গল্পের রেফারেন্স দিয়ে, যেখানে নলেজের বিনিময়ে একজন লোক তার আত্মাকে শয়তানের কাছে বেচে দেয়।

 

 

Claudia:

 

১৯৫৩ এর ক্লডিয়া একজন ট্যালেন্ট, ১৯৮৬ সালে প্রথম সিইও হিসেবে প্ল্যান্টে যোগ দেয়া সেটারই ফলাফল। হেলগের বাবার কাছে থেকে বিভিন্ন হিসাব বুঝে নেয় আর গরমিল খুঁজে পায়। তার মেয়ে রেজিনাকে সাহায্য করায় অবৈধ পাসপোর্টওয়ালা আলেক্সান্ডারকে প্ল্যান্টে চাকরি দেয়, প্ল্যান্টের বর্জ্য গুহার মধ্যে অবৈধভাবে সিলগালাও করে দেয় তাকে দিয়ে। গুহার মধ্যে হারানো কুকুর খুঁজে পেয়ে আর হেলগের কাছে থেকে “A journey through time” বইটা পেয়ে টাইম- ট্রাভেলের ব্যাপারটা বের করে। রেজিনা- আলেক্সান্ডারের সন্তান বার্তোশের সাথে তার প্রথম দেখা হয় ২০১৯ সালে। কিন্তু ২০১৯-ক্লডিয়া খুব সম্ভবত একাধিকবার বিভিন্ন সময়ে টাইমট্র‍্যাভেল করেছে, ট্যানহসের টাইমমেশিন সম্ভবত সেই আবিষ্কার করেছে তার ফিজিক্সের জ্ঞান দিয়ে। ১৯৫৩ সালে ট্যানহসকে টাইমমেশিনের নীলনকশা দিয়েও আসে সে। তার কাছে আছে লুপের ঘটনা লেখা নোয়া/২০৫২ ইয়োনাসের জার্নাল, যার কয়েক পাতা বাদ দিয়ে সে ট্রন্টেকে দিয়ে যায়। ২০৫২ সালে ক্লডিয়ার কেবিনেই সবার ফটোগ্রাফ লাল সুতা দিয়ে লিংক করে দেয়া। সবার শেষে ক্লডিয়াকে ২০৫২ সালে দেখা যায়, বাতাসে রেডিও অ্যাকটিভ বর্জ্য।

 

 

এখনো প্রশ্ন র‍য়ে গেছে অনেক। যেমন-

১. শার্লোট (উলরিখের কলিগ) সব রহস্য সমাধান করে ফেলেছে, কিন্তু টাইমলুপ ভাঙার ক্ষেত্রে কিছু কি করতে পারবে? নোয়া কিভাবে তাকে চেনে?
২. মাইকেল কেন আত্মহত্যা করল? মিকেল যখন ওয়ার্মহোল দিয়ে গেলো, তখন নোয়া বা হেগলে কই ছিলো? মিকেল ওয়ার্মহোল দিয়ে গেলই বা কিভাবে?
৩. ক্লডিয়াকে হেলগে বইটা কেন দিলো? এটা কি নোয়ার চাল? ক্লডিয়া আর ২০৫২-ইয়োনাস বাদে “শ্যাডো”র অন্য সদস্য কারা?
৪. আলেক্সান্ডার কি লুপের কথা কিছু জানে? ১৯৮৬ সালের ঘটনা খোলাসা করা হয়নি।
৫. কেন ফ্রান্সেস্কা কিংবা অন্য মেয়েদের কে কিডন্যাপ না করে ছেলেদেরকে কিডন্যাপ করা হয়েছে?
৬. আগন্তুক কি আসলেই ইয়োনাস-২০৫২?
৭. বৃষ্টির মধ্যে সবাই ছাতা ছাড়া কেন ঘুরছে 😓

এই পোস্টটিতে ২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. মোস্তফা জামাল রাকিব

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন