Babam Ve Oglum, (My Father and My Son). একটি পারিবারিক সম্পর্কের গল্প।

My Father and My son (Babam Ve Oglum)

জনরাঃ ড্রামা

আইএমডিবি রেটিং: ৮.৭

আমার রেটিং: ৯.৫

মুক্তিকালঃ ১৮ই নভেম্বর ২০০৫ (তুরস্ক)

filmm-114354

মুভির নামটা একটু খেয়াল করেন “আমার বাবা ও আমার ছেলে”। নাম শুনেই বুঝতে বাকি নেই যে মুভিটার গল্প তিন জেনারেশনের তিন পুরুষকে কেন্দ্র করে। মুভিটাতে একটা কথা বলা হয়েছে যার ভাবগত সারমর্ম দাড় করালে এমনটা হয়, “এমন সকল গান রচনা হবে যা আপনি গাইতে পারবেন না, এমন এমন চলচ্চিত্র নির্মান হবে যা আপনি দেখে যেতে পারবেন না, এমন এমন বই বের হবে যা আপনি পড়ে যেতে পারবেন না। এগুলো করতে না পারার আফসোস আপনার কখনোই হবে না। কিন্তু আপনজনকে, সে যেই হোক না কেনো, মনের কথাটা খুলে বলতে না পারার আফসোস আপনি সারাজীবন আত্মার সাথে গেঁথে রাখতে বাধ্য”।

এই মুভিটির গল্প সেট করা হয়েছে ৭০ ও ৮০র দশকের এক সময়ে। “সাদিক” একজন বামপন্থী সাংবাদিক। এক গভীর রাতে সে তার প্রসবযন্ত্রনায় কাতর গর্ভবতী স্ত্রীকে হাসপাতালে নিতে নিতে স্ত্রী পথেই প্রসব করে দেয় “দেনিস” কে, আর প্রসবে কমপ্লিকেশন হওয়ায় স্ত্রী সেখানেই মারা যায়। দেনিস ভূমিষ্ঠ হওয়ার ২৪ ঘন্টা হতে না হতেই সাদিককে গ্রেফতার করা হয় তার বামপন্থী কর্মকান্ডের জন্য। প্রায় এক বছর পরে সাদিক জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তার একমাত্র সম্বল দেনিসকে নিয়ে শহরেই থাকতে থাকে। কিন্তু জীবিকার অভাবে ও লজ্জায় সাদিক চলে আসে গ্রামে দেনিসের দাদাবাড়ি তথা সাদিকের বাবার বাড়ি। সাদিক ও দেনিসকে দেখে বাড়ির সবাই খুশী কিন্তু একজন বাদে, সে আর কেউ নয় স্বয়ং কর্তাবাবু হুসেইন যে সাদিকের বাবা ও দেনিসের দাদা। হুসেইনের রাগ কার উপর? আর সেটাই বা কেনো? এ সকল প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে মুভিটি সংগ্রহ করে চটপট দেখে ফেলুন।

মুভিটা নিয়ে আসলে বলতে গেলে আলোচনা করার টপিকের শেষ নেই। প্রথমেই আসি মুভিটার গল্প নিয়ে, মুভিটির গল্প করেছেন কাগান ইরমাক। একটি সাধারন পারিবারিক দ্বন্দের ব্যাপারটাকে এতোটা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে না দেখলে তা বিশ্বাস করা অসম্ভব। কিন্তু এ গল্পে আছে বিশেষ কিছু, এখানে আছে দুজন ব্যর্থ বাবার গল্প, সাথে দুজন ভুক্তভোগী ছেলে সন্তানের গল্প এবং রক্তের সম্পর্কের গল্প। পুরো মুভিটা শুধু গল্পের জোড়েই আপনাকে ইমোশন্যাল এক রোলার কোস্টার রাইড দিয়ে দিবে। এক চোখ দিয়ে আপনি বেদনার অশ্রু ফেলবেন আর আরেক চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু বইবে। আর এ দুই অনুভূতির অশ্রু মিলে মিশে একাকার হয়ে জন্ম দিবে এক তৃতীয় অনুভূতির, যা আসলে লিখে বা বলে বুঝানো সম্ভব না, এটা ব্যাক্তি বিশেষে অনুভব করে বুঝে নিতে হয়। পারিবারিক সমস্যা, পারিবারিক বন্ধন, শিশুমনের নিস্পাপতা, এগুলোই আপনার চোখ ভিজিয়ে আনতে পর্যাপ্ত।

এছাড়া মুভিটার প্রত্যেকটা ভাঁজেই আছে সংলাপের প্যাচ। খুব সুন্দর করে সংলাপগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে দর্শকদের সামনে। আর খুব ভালোভাবেই সেসকল সংলাপের ভিতর দিয়ে ডিরেক্টর তার কাঙ্ক্ষিত ম্যাসেজসমুহ তার দর্শকদের নিকট পৌছে দেয়ার চেষ্টা করেছে। শিশুচরিত্র দেনিসের এমন কিছু সংলাপ ছিলো যা বড় বড় আক্কেলবান মানুষের বিবেককেও নড়িয়ে দিতে পারে। মুলত সাধারন কিছু কথার ফাঁকে অসাধারন কিছু সংলাপ দিয়েই পরিষ্কার করে মুভিতে কাস্ট করা চরিত্রসমুহর ওজন বুঝা গেছে।

babamveoglum2005dvdripxda6

মুভির প্রটাগনিস্ট লেভেলের চরিত্র বলতে আসলে তিনজন। সাদিক, তার ছেলে দেনিস ও বাবা হুসেইন। সাদিক চরিত্রটা হলো মধ্যবয়েসী এক ব্যাক্তির, নিজের বিশ্বাসকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া একটি মানুষ। একজন ভালো বাবা হওয়ার প্রচেষ্টায় সদা ব্যস্ত। এরপর আছে সাদিকের বাবা হুসেইন, ষাটোর্ধ এক মানুষ, কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষ বলে গায়ে বয়সের চাপ বিন্দুমাত্র দেখা যায়না। চেহারায় সবসময়ে একটা রাগ ও গুরুগম্ভীরতার ছাপ লক্ষণীয়, তা হবেই না কেনো? ঘরের প্রধান বলে কথা। আর সর্বশেষ, সাদিকের ছেলে ও হুসেইনের নাতি দেনিস, মুভির সবচেয়ে ছোট আকারের মানুষ হলেও আমার মতে মুভির সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন চরিত্র। এই চরিত্রটি সাদিক ও হুসেইনের চরিত্রের মাঝের সেমি কন্ডাক্টরের কাজ করে ইফ ইউ নো হোয়াট আই মিন। অসাধারন রকমের কিউট, নিষ্পাপ এই চরিত্রটির অভিনয় দেখে আপনি মুগ্ধ না হয়ে যাবেনই না। তার অভিনয় দেখে আপনার মুখা হা হয়ে যাবে, চোখে পানি আসবে, ঠোটে হাসি আসবে। এক কথায় অসাধারন এক পিচ্চি, আর এই পিচ্চিটার নাম এইজ তানমান।

195Babam_ve_oglum_caps_4

মুভিটার যে খালি গল্প আর শিল্পী ভালো তা না। এর টেকনিক্যাল কাজগুলাও ভালো। মুভিটার সাউন্ড স্কোর হলো এক কথায় হৃদয়স্পর্স্বী। বিভিন্ন শট ও সিকুয়েন্সের ইমোশন্যাল স্টেট বুঝাতে যে যেভাবে মিউজিকের ব্যবহার করেছে তা আসলেই প্রশংসনীয়। এছাড়া, মিউজিকের পাশে পাশে ক্যামেরার কাজও খুব উন্নতমানের হয়েছে। ক্লোজ শট, প্যান শট, হেড ওভার শটের সামঞ্জস্যে যেভাবে সুন্দর করে অমায়িকভাবে একেকটা শট নেয়া হয়েছে তা দেখার মতন। আর ওভাবে শটগুলো নেয়ার কারনেই কিছু কিছু সিনে প্রকাশ পাওয়া ইমোশনের মাত্রাটা যেনো একদম হৃদয় ছুয়ে গিয়েছিলো। মুভিটা অনেক ভালো করে বানানোর পরেও কিছু মেকিংগত ভুল চোখে পরেছে। যেমন …হাল্কা স্পয়লার…> সাদিক যখন তার স্ত্রীকে নিয়ে বাসা থেকে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেট লাগিয়ে দেয় ঠিক তখনই পিছন থেকে কে যেনো সিড়ির লাইট নিভিয়ে দেয়। আবার রাস্তায় যখন ট্যাক্সি ট্যাক্সি করে চিৎকার করতে থাকে সাদিক তখন তার ঠিক পিছনেই একটা হলুদ ট্যাক্সি পার্ক করা থাকে, সেটা সত্তেও সে বলে “গেলো কই সব”… <স্পয়লার সমাপ্ত। এছাড়া বলতে গেলে মুভিটার তেমন আর ভুল নজরে পরেনি হাল্কা দুই চারটা কন্টিনুয়েটি এরোর বাদে। নিষ্পাপ শিশুমনের বিস্তৃত কল্পনাশক্তিকে যেভাবে সাধারন ঘটনাকে রুপকথায় কনভার্ট করে দেখানো হয়েছে সেটাও প্রশংসনীয়। ২০০৬ সালে মুভিটির মিউজিক ডিরেক্টর ইভান্থিয়া রেবুতস্কা “ওয়ার্ল্ড সাউন্ডট্র্যাক অ্যাওয়ার্ড” পান। এছাড়া পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড এ বেস্ট ফিল্ম হিসেবে জয়লাভ করে ডিরেক্টোর কাগান ইরমাক।

মুভিটা খুবই বিনোদনদায়ক, এটাকে ফ্যামিলি ড্রামা বললেও বলতে পারেন। হাইলি রেকমেন্ডেড। মুগ্ধ হবেন তিন জেনারেশনের বাবা ও পুত্রের মিলনমেলা দেখে। তাদের আনন্দে হাসবেন, তাদের দুঃখে কাঁদবেন। মুভিটাতে আছে সুস্থমানের বিনোদন, সিনেমাশিল্পের যথাযথ চর্চা এবং ইমোশন, অনেক অনেক ইমোশন। একটি করে শব্দে মুভিটাকে এক্সপ্লেইন করতে বললে আমি বলবো, অসাধারন, এক্সেলেন্ট, হাততালির যোগ্য… মুভিটা সকল বয়সের সকল চলচ্চিত্রপ্রেমীদের দেখার জন্য রেকমেন্ড করছি।

ডাউনলোড লিঙ্কঃ http://goo.gl/0T8i7I

(Visited 242 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১৭ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. নির্ঝর রুথ says:

    এই প্রথম মনে হয় শাহরিয়ার ভ্রাতার কোনো আবেগী রিভিউ পড়লাম 😀
    খুব কৌতূহলোদ্দীপক লেখা।

  2. সামিয়া রুপন্তি says:

    আমিও দেখব। দাদা-বাবা-ছেলের টাইমলাইনে লেখা শীর্ষেন্দুর “দূরবীন” আমার খুব প্রিয়। রিভিউ পড়েও আমার কেন যেন সেই ফিলিংস টাই হচ্ছে।

  3. যদি আজকে নেই তাহলে আজকেই দেইখা ফেলবো। 😀

  4. শাতিল আফিন্দি says:

    শাহরিয়ার লিখসে এইটা? বিশ্বাস হইতেসে না, আবেগী হয়ে গেলো নাকি পোলাটা? 😛

  5. মাইকেল ফ্রান্সিস করলিয়নে says:

    “”মুভিটা খুবই বিনোদনদায়ক, এটাকে ফ্যামিলি ড্রামা বললেও বলতে পারেন। হাইলি রেকমেন্ডেড। মুগ্ধ হবেন তিন জেনারেশনের বাবা ও পুত্রের মিলনমেলা দেখে। তাদের আনন্দে হাসবেন, তাদের দুঃখে কাঁদবেন। মুভিটাতে আছে সুস্থমানের বিনোদন, সিনেমাশিল্পের যথাযথ চর্চা এবং ইমোশন, অনেক অনেক ইমোশন। একটি করে শব্দে মুভিটাকে এক্সপ্লেইন করতে বললে আমি বলবো, অসাধারন, এক্সেলেন্ট, হাততালির যোগ্য “”

    ইয়ে মানে, মুভি দেখার আগে এই কথাগুলো পইড়াই আমি আবেগে ভেসে যাচ্ছি… :2thumbup :hoax হাল্কু এভাবেও লিখতে পারে, জানতামই না… যাও, তুমার সম্মানে আমার দেড় মাসের মুভি নির্বাসন কাটায়ে কালকের মধ্যেই দেখে ফেলব… আস আপাতত দুঃখ কাটাতে একচুমুক হয়ে যাক… :beer: :beer:

  6. ভীষণ ভালো লাগার মুভি … খুব আবেগী ছিলাম দেখার পরে … এই মুভি নিয়ে লেখার জন্য ধন্যবাদ …

    মাস্টারদের রিভিউ পাচ্ছি … দেখতেই ভালো লাগছে :kr

  7. James Bond says:

    আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলাম ।। জয় হো :rate

  8. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    আমার আসলে এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না লিমু এই মুভি দেখে রিভিউ লিখছে! তাও এত আবেগি রিভিউ!! লেখা পড়ে ভাল্লাগলো। মুভিটা অনেক ভাল জেনেই ডাউনলোড করেছিলাম অনেক আগে, কিন্তু কেন যেন দেখা হচ্ছিল না। ভাবলাম আর সময় নষ্ট না করে আজ রাতেই দেখে ফেলি নইলে আবার দেরি হয়ে যাবে…

  9. হুসেইন এর শালির একটা ডায়লগ খুব মনে পড়ছে “যে চলে যেতে চায় তাকে ধরে রাখা যায় না”……
    আসলেই অসাধারণ একটি মুভি। আমি মুভি দেখে কান্না করি না নরমালি। এটা দেখে কান্না ধরে রাখতে পারি নি। রিভিউও সুন্দর হয়েছে। :2thumbup

  10. আইম্যান আইম্যান says:

    পুররা স্পিচলেস হয়ে গেছি আমি। মুভির কিছু অন্তর্নিহিত ব্যাপার এতটাই অসাধারন ছিল ভাষায় প্রকাশ করতে পারবনা। ডায়লগ গুলাও অতিমাত্রায় চমৎকার ছিল।এমনিতেই স্টোরি আর ডায়লগ এমন ছিল যে ইমোশন আটকাইতে পারছিলাম না তার মধ্যে যে ব্যাকগ্রাউণ্ড সাউন্ড ইউজ করছে চোখের পানি আটকানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছিল প্রায়। 🙁

  11. মেগামাইন্ড says:

    দেখতে হবে

  12. তাসনুভা ইরা says:

    চরিত্রসমুহর ওজন বোঝার জন্য দেখে ফেলতেই হবে…।।
    সুন্দর সুন্দর :cendol

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন