Life is Beautiful– একজন সুখী মানুষ এবং একটা ট্যাংক জয়ের উপাখ্যান….

১৯৩৯ সালের এক রোদঝলমলে দিন। Guido Orefice তার বন্ধু Ferruccio এর সাথে গান গাইতে গাইতে ইটালির Arezzo শহরে যাচ্ছে। অনেকদিনের একঘেয়ে পরিবেশ থেকে মুক্তির আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গাড়ি চালাবার সময় হঠাৎ ফেররুচ্চিও আবিস্কার করল, তাদের গাড়ির ব্রেকটা গেছে। খেয়াল করা মাত্র আতংকে চিৎকার করতে করতে নিজের অজান্তেই ফেররুচ্চিও গাড়িটা রাস্তা থেকে নামিয়ে দিল পাশের মাঠে। মাঠের ভেতর দিয়ে ব্রেকফেল গাড়িটা চলে গেল পাশের বনে। ওদের চিৎকার কিন্তু চলছেই। তারপর তিনচারবার ধাক্কা খেয়ে বেরিয়ে এলো বনের অন্যপাশের রাস্তায়। গুইডো আতঙ্কিত হয়ে দেখল তাদের সামনের রাস্তায় প্রচুর মানুষ। গাড়িতে ব্রেক নাই, বাধ্য হয়েই মানুষগুলোকে বাচাবার জন্য সে রাস্তার দুইদিকে হাত নাড়তে লাগলো। এদিকে হয়েছে কি, ওদের গাড়িটা বন থেকে রাস্তায় নামার সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্টের গাড়ি বহরের মাঝে ঢুকে গেছে। আর ওই মানুষগুলো রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়েছিল প্রেসিডেন্টকে সম্মান জানাবার জন্য। গুইডো দুইদিকে হাত নাড়ার ফলে মানুষগুলো ভাবল, ইনিই মনে হয় প্রেসিডেন্ট। সুতরাং জনতা ওদের এবং ওদের ব্রেকফেল গাড়িকে সম্মান জানানোর জন্য রাস্তা বন্ধ করে ফেলার পর প্রেসিডেন্টের গাড়ি এসে হাজির। ফলাফল দুই পক্ষই পরিনত হইল মাননীয় স্পিকারে..
0e43057ab0d0ab925f810400c9f470ad

এদিকে বহুকষ্টে গাড়িটা থামানোর পর ফেররুচ্চিও যখন ব্রেক ঠিক করতে বসল, তখন গুইডো তাকে সাহায্য করতে কাজের মধ্যে বাম হাত ঢুকানো ছাড়া আর কিছু করতে পারছিল না। কিছুক্ষন খুটখাট করে এক পর্যায়ে সে গেল পাশের বাড়ির টিউবওয়েলে হাত-পা ধুতে। স্বভাবসুলভ মিশুকতায় সেই বাড়ির পিচ্চি মেয়েটার সাথে ভাব জমিয়ে ফেলল সে। নিজেকে পরিচয় দিল প্রিন্স গুইডো বলে , তারপর পিচ্চি মাইয়ারে কইল, এখন তাকে যেতে হবে, তার সাথে প্রিন্সেসের জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ত আছে। কথাখান শেষও হয় নাই, হঠাৎ কইরাই আকাশ থেকে থুক্কু বাড়ির দোতলার জানলা থেকে একজন প্রিন্সেসের মতো সুন্দরীতমা পা ফস্কে তার সামনে এসে পড়ল । সে দক্ষ হাতে বা কাঁধে প্রিন্সেসকে মাটিতে ল্যান্ড করতে সাহায্য করল।(ব্যাপারখান এমনই আকস্মিক ছিল, আমি দুই সেকেন্ড স্পিকার হইয়া গেছিলাম 😉 ) জানা গেল বিছা মারতে কামান দাগতে গিয়েই তার এইরূপ পতন। তারপর গুইডোর উচ্ছাস প্রকাশ এভাবে..

images (2)

Guido: What kind of place is this? It’s beautiful: Pigeons fly, women fall from the sky! 😀 I’m moving here!

_282461_life_is_beautiful300

যথারীতি তাদের দুজনে ধন্যবাদ আদানপ্রদান এবং পরবর্তী সাক্ষাতের ইচ্ছা পোষণপর্ব চলল কিছুক্ষন। এভাবেই তাদের পরিচয়। ডোরা খুব অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত ঘরের এক মেয়ে, এদিকে গুইডো শহরে এসেছে একটা উন্নত জীবনযাপনের আশায়। কিন্তু তাদের প্রথম পরিচয়ে তারা একে অপরকে চিনল প্রিন্স এবং প্রিন্সেস হিসেবে। গুইডোর চমৎকার প্রত্যুতপন্নমতিতায় এবং উপস্থিত বুদ্ধিতে তার আশেপাশের মানুষগুলো কখনই দুঃখে থাকতে পারে না, কষ্ট কিংবা যন্ত্রণা সবসময় তাদের ১০০ হাত দূর দিয়ে চলে। এভাবে যখন একটা চমৎকার হাসিখুশিমাখা জীবনের চলছবি আঁকা হয়ে যায় দর্শকের চোখে, ঠিক সেই মুহূর্তেই এতক্ষন ধরে উপেক্ষা করে আসা এক নির্মম বাস্তব এসে ওলটপালট করে দিয়ে যায় সবকিছু। দর্শক হঠাৎ বিস্ময়ে আবিস্কার করেন সালটা ১৯৪৫, ২য় বিশ্বযুদ্ধ নামের এক অকল্পনীয় ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের শেষ অধ্যায় চলছে তখন…

কিন্তু গুইডো পরিবর্তিত হয়নি। তাকে আর তার নিরীহ বাচ্চাটাকে যখন শুধুমাত্র ইহুদি হবার দায়ে জার্মান সৈন্যরা সেই অভিশপ্ত concentration ক্যাম্পে নিয়ে এল, তখন হঠাৎ করেই সে বুঝতে পারল, সে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অংশের সামনে দাঁড়িয়ে। যে অংশটা এতটাই ভয়াবহ যে, তার বাচ্চাটার কথা তোঁ দূরে থাক, তার জন্যই এই ভয়াবহতা কল্পনা করা দুঃসাধ্য। জীবনের প্রতিটা ধাপকে চিরকালই এক চমৎকার দক্ষতায় অসম্ভব সুন্দর করে নেয়া গুইডো তার বাচ্চাটাকে এই অকল্পনীয় দুঃস্বপ্ন থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অবলম্বন করল খুব অসম্ভব এক পথ। না, সে নাৎসি বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেনি, কিন্তু তার প্রিয়জনকে এই নারকীয় দুঃস্বপ্ন থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চিরশাশ্বত হাসিমুখে সে এমন এক খেলায় মত্ত হল, যে খেলা একই সাথে বিস্ময়ে হতবাক করল, অদ্ভুত আনন্দ দিল এবং সবশেষে বোধহয় স্রস্টাকেও কাঁদিয়ে গেল… নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ আর বর্বরতা, অকল্পনীয় নির্মমতা এবং ভূলুণ্ঠিত মানবতার মাঝে দাঁড়িয়ে গুইডো গেয়ে গেল জীবনের জয়গান…

life-is-beautiful-gudios-child-300x300

Roberto Benigni এবং Vincenzo Cerami এর রচনায় এবং Roberto Benigni এর পরিচালনায় Life Is Beautiful (ইতালীয়: La vita è bella) নামের এই কমেডি-ড্রামা-রোমান্স মুভিটা মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। Guido Orefice চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন Roberto Benigni নিজেই, তার স্ত্রী Dora চরিত্রে ছিলেন Nicoletta Braschi এবং সন্তান Joshua চরিত্রে ছিলেন Giorgio Cantarini। এই মুভিতে অসাধারণ অভিনয় করে সেরা অভিনেতা হিসেবে ৭১তম অস্কার পুরষ্কার জিতে নেন Roberto Benigni। শুধু তাই নয়, তার অনবদ্য পরিচালনা এই মুভিকে পাইয়ে দেয় ফরেন ল্যাঙগুয়েজ ক্যাটাগরি এবং অরিজিনাল ড্রামাটিক স্কোর ক্যাটাগরিতেও অস্কার জেতে এই মাস্টারপিস মুভিটি। আইএমডিবি রেটিংয়ে ১০ য়ের ভেতর ৮.৬ রেটিং, রটেন টোম্যাটোতে ৮০% পজেটিভ রেটিং এবং ৯৭% দর্শকের ভোট পেয়ে এই মুভিটা রয়েছে পৃথিবীর দর্শকনন্দিত মুভিগুলোর লিস্টে এক অন্যতম অবস্থানে। মুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত ইটালির সবচেয়ে ব্যবসাসফল এই মুভিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি ভাষার সর্বাধিক ব্যবসাসফল মুভিগুলোর মধ্যে রয়েছে ২য় স্থানে..

lifeisbeautiful2

এটা যে শুধু দর্শকদের ভালবাসার বৃষ্টিতে ভিজেছে তাই নয়, সমালোচকদের প্রশংসার তোড়েও ভেসে গেছে এই মুভিটি। বিখ্যাত মুভি ক্রিটিক রজার এবারট এই মুভিকে চারের ভেতর সাড়ে তিন দিয়েছেন। তার রিভিউতে তিনি একটা মজার ঘটনা উল্লেখ করেছিলেন। এই মুভিটা করার পর পরিচালক Benigniকে নাকি ইটালির ক্ষমতাসীন ডানপন্থি দল থেকে হুমকি দেয়া হয়েছিল। তিনি নাকি এখানে ২য় বিশ্বযুদ্ধকালিন ইটালির ইতিহাস বিকৃত করেছেন। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাসের কিছু বামপন্থি সমালোচকও নাকি এই মুভিতে ব্যবহৃত রসিকতাগুলো ভালভাবে নিতে পারেননি। শোনা যাক রজারের নিজের জবানিতেই ..

download

At this year’s Toronto Film Festival, Benigni told me that the movie has stirred up venomous opposition from the right wing in Italy. At Cannes, it offended some left-wing critics with its use of humor in connection with the Holocaust. What may be most offensive to both wings is its sidestepping of politics in favor of simple human ingenuity. The film finds the right notes to negotiate its delicate subject matter. And Benigni isn’t really making comedy out of the Holocaust, anyway. He is showing how Guido uses the only gift at his command to protect his son. If he had a gun, he would shoot at the Fascists. If he had an army, he would destroy them. He is a clown, and comedy is his weapon.

images (1)

life is beautiful

একজন দর্শককে এই চলচ্চিত্র ঠিক কতটা অকল্পনীয় গভীরতায় নাড়া দিয়ে যেতে পারে, সেটা বোধহয় আমার পরিবারকে না দেখলে বোঝানো যাবে না। আমার পিতামাতা আগের আমলের মানুষ, ইংলিশ কিংবা ভিনদেশি চলচ্চিত্র সেভাবে দেখার সময় বা সুযোগ কোনটাই হয়ে উঠেনি। আমি তাদের যখন জানালাম এটা ২য় বিশ্বযুদ্ধের উপর করা একটা চলচ্চিত্র, তারা বেশ আগ্রহ নিয়েই দেখতে বসেছিলেন। এতো চমৎকার একটা সুচনার পর যখন ২য় বিশ্বযুদ্ধের সেই বিভীষিকা শুরু হল, ধীরে ধীরে ঘরের পরিবেশটা পাল্টে যেতে লাগলো। আর গুইডো যখন নিজের সবচেয়ে প্রিয়জনদের বাঁচাবার জন্য হাসিমুখে সেই অভাবিত সৃজনশীল এবং একইসাথে যন্ত্রণাদায়ক খেলাটা শুরু করল, তখন কেন যেন সবাই কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল। আমাদের অতি অবাক নিস্পন্দ দৃষ্টির সামনে গুইডো তৈরি করে গেল এক ভাষাহীন যন্ত্রণার উপাখ্যান। কিন্তু শেষ দৃশ্যে যখন বাচ্চাটা বাঁধভাঙ্গা উচ্ছাসে তার মাকে বলে উঠল..

download (2)

life_is_beautiful_tank

Giosué Orefice: We won!
Dora: Yes, we won! Its true.
Giosué Orefice: We got a thousand points and we won the game! Daddy and me came in first and now we won the real tank! We won! We won!

life_is_beautiful_ending

তখন হঠাৎ উপলব্ধি করলাম, ঝাপসা চোখে আমি আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। সবচেয়ে বিব্রতকর হল যখন রুমে থাকা সবাই উপলব্ধি করল, কারোর চোখ আর শুকনো নেই….

download (1)

আমি জানি না পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম আর কোন চলচ্চিত্র আছে কিনা, যা একই সাথে দর্শককে হৃদয়ের খুব গভীরে এক অসহ্য এক বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। দর্শক বুঝতে পারে না, জীবনের এই অচিন্তনীয় মাধুর্য কি তাকে নিখাদ মুগ্ধতায় নাকি বিষাদের মেঘে চেয়ে ফেলল? তারপর অবাক হয়ে সে বুঝতে পারে, আসলে মুগ্ধতা কিংবা বিষাদের চেয়েও প্রবলভাবে যে অনুভূতিটা তাকে ঘিরে ফেলেছে , সেটা হল অপরাধবোধ। দিনশেষে গুইডো এক অচিন্তনীয় অপরাধবোধে বিদ্ধ করে যায় আমাদের। নিদারুণ পরিহাস করে যায় আমাদের বিলুপ্তপ্রায় বিবেককে..
images

(Visited 228 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৯ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    শিরোনামে “উপাখ্যান” লেখা দেখেই বুঝছিলাম এটা ডন লিখছে। বেশির ভাগ রিভিউতে এই শব্দগুলো বারবার দেখলে ভাল লাগে নাই।
    যাইহোক এখানে উপস্থাপনা অনেক ভাল হইসে। মুভিটাও আমার অনেক বেশি পছন্দের।

  2. মিজানুর রহমান মিজানুর রহমান says:

    মুভিটাও আমার অনেক বেশি পছন্দের। ei riview ta oscar a pathano uchit :request

  3. Sev Darcy says:

    দেখতে হবে। যথারীতি সুন্দর রিভিউ।

  4. বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সফল এবং অসাধারণ এই মুভি নিয়ে বাঙলায় এর আগে আর কেউ রিভিউ লিখেছিলেন কিনা আমার জানা নেই তবে ডন-এর লিখা অন্যতম সেরা এই রিভিউ নিয়ে আর কিছুই বলার নেই!!
    এমন মুভি পাগল লোক দেশে আছে-থাকতে ডনকে দেখার আগে আমার ধারণার বাইরে ছিল! অবিরত এই লোক মুভি নিয়ে লিখে যাচ্ছে! অসাধারণ…

    Roberto Benigni-কে :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:
    আর প্রিয় ডনকে- :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: আর পোস্টে :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    যারা মুভিটি দেখেন নি তারা পোস্টটি পড়ার পর এই ট্রেইলরটি দেখুন, তারপর আফসোস করুণ কেন এতদিন দেখেন নাই… 😉 তারপর দ্রুতই মুভিটি সংগ্রহ করে দেখে ফেলুনঃ

  5. অ্যান্থনি এডওয়ার্ড স্টার্ক says:

    কমেন্ট করার লিগা লগিন করছিলাম। এখন ডিসিশন চেঞ্জাইছি। কমেন্টামু না। :nerd

  6. অনিক চৌধুরী says:

    দারুণ মুভি আর সাবলীল দুর্দান্ত রিভিউ।

  7. শাহবাজ হোসেন says:

    অসাধারণ মুভি এবং দারুণ রিভিউ

  8. মেগামাইন্ড says:

    ভাল লিখেছেন

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন