ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান (২০১৬): লেক্স লুথরের অভিসন্ধি

২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া বহুল প্রত্যাশিত Batman v Superman: Dawn of Justice কমিক্সপ্রেমীদের যতটা প্রশংসা কুড়িয়েছে, সমালোকদের কাছে সমালোচিত হয়েছে চেয়ে থেকে বেশি। ‘Save Martha’ দৃশ্যটি এখনো হাসির খোরাক অনেকের কাছে। প্রচুর সমালোচনার একটি হচ্ছে Jesse Eisenberg অভিনীত লেক্স লুথর চরিত্র নিয়ে। অধিকাংশ দর্শকের অভিযোগ ডিসি কমিক্সের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড এবং সুপারম্যানের অন্যতম প্রতিদ্বন্দী ‘লেক্স লুথর’ চরিত্রকে Batman v Superman মুভিতে উপস্থাপন করা হয়েছে জোকার এবং রিডলারের সংমিশ্রনে। Jesse Eisenberg এর চাঞ্চল্যতা এবং ছেলেমানুষী অনেকেই গ্রহন করতে পারেনি। Zack Snyder পরিচালিত এই মুভিতে উপস্থাপিত এবং বিতর্কিত এই লেক্স লুথরের অভিসন্ধি এবং তার মাস্টারমাইন্ডের গভীরতা নিয়েই আজকের আয়োজন।

 

 

প্রথমেই ডিসি কমিক্সের জনপ্রিয় চরিত্র লেক্স লুথরের সাথে পরিচিত হওয়া যাক। ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডে ভিন্ন অরিজিনের লেক্সকে দেখা গেলেও, কমন কিছু বৈশিষ্ট্য লেক্স লুথর চরিত্রে স্পষ্ট। আলেকজান্ডার জোসেফ ‘লেক্স’ লুথর একাধারে একজন শিল্পপতি, উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী, সফল উৎদোক্তা, বিলিয়নিয়ার এবং ক্ষমতাপাগল ব্যক্তি। কোন অতিমানবীয় ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও সুপারম্যানের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লেক্স সুপরিচিতি পেয়েছে শুধুমাত্র নিজের বুদ্ধি এবং আর্থিক জোড়ে। সুপারম্যানকে ঘৃণা করার পেছনে লেক্স লুথরের একটাই কারণ, এবং তা হলো হিংসা/ঈর্ষা। সুপারম্যান সম্পর্কে পৃথিবী অবগত হবার পর থেকে লেক্স লুথর সবার কাছ থেকে বিশেষত মেট্রোপলিসে খ্যাতি হারাতে থাকে। তার সকল পরিশ্রম, সাফল্য এবং দাতব্য কাজে অন্যরা আগ্রহ হারিয়ে মনোযোগ দেয় এক অনাহুত এলিয়েনের দিকে যে কিনা পৃথিবীর কেউ নয়। যে পৃথিবীর কেউ নয়, তাকে কিভাবে পৃথিবীর রক্ষাকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করা যায়! তাই লেক্স লুথর সুপারম্যানকে মানবজাতির জন্য মরীচিকা হিসেবে বিবেচনা করে এবং এই ভ্রম থেকে সবার ভুল ভাঙ্গাতে নিজেই দায়িত্ব নেয়। প্রতিবারই লেক্সের মাস্টারপ্লানের কাছে সুপারম্যান হোচট খেতে হয়। কারণ সুপারম্যান যতটা বাহ্যিক শক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশ, সেখানে লেক্সের বুদ্ধিমত্তার শক্তি তার চেয়ে বেশি। দুজনের দক্ষতা পরষ্পর বিপরীত হওয়ায় লেক্সদমনে সুপারম্যানকে প্রতিবারই বেগ পেতে হয়।

 

 

বলাই বাহুল্য, স্পয়লার্ট এলার্ট!

Batman v Superman: Dawn of Justice মুভিতে Jesse Eisenberg অভিনীত লেক্স লুথর আক্ষরিক অর্থেই প্রকৃত লেক্স লুথর ছিল না। মূলত চরিত্রটি ছিল Alexander Luthor Jr.। প্রকৃত লেক্স লুথরের ছেলে। এই জুনিয়র লেক্স লুথর উত্তরাধিকার সূত্রে লেক্সকর্প কোম্পানীর মালিক হন এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের উদ্দেশ্য সফল করে নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সুপারম্যান এবং জেনারেল জডের ধ্বংসলীলা দেখে গোটা বিশ্ববাসী স্তম্ভিত। একাংশ সুপারম্যানকে স্বয়ং ঈশ্বর মনে করতে থাকে, অপরদিকে লেক্স লুথরের মতো কিছু মানুষ তাকে বিশ্বাস করতে পারে না। মুভিটি যারা দেখেছেন, লক্ষ্য করবেন মিডিয়ার টকশোগুলোকে প্রচুর স্ক্রীন্ টাইম দেয়া হয়েছে, এগুলো মূলত সুপারম্যানকেন্দ্রিক পৃথিবীবাসীর দ্বিধাদ্বন্দের বহিঃপ্রকাশ। পরিচালকের মতে, স্বয়ং মিডিয়াকে একটি চরিত্র হিসেবে দাড় করাতে চেয়েছেন তিনি। সত্যিকার অর্থেই যদি বর্তমান বিশ্বে হঠাৎ সুপারম্যানের মতো একটি অসম্ভব শক্তিশালী এলিয়েন পৃথিবীতে হাজির হয়, তাকে ঘিরে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে। যেখানে ভালো অথবা খারাপ যেকোন কর্মকান্ডের উদ্দেশ্যকে সহজেই রাজনৈতিক বেড়াজালে জড়িলে ফেলা যায়, সেখানে একটি অজানা গ্রহের অধিবাসীকে ঘিরে সাধারণ নাগরিক থেকে বিশ্বনেতাদের মাঝেও তর্ক-বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিশ্বনেতাদের মতে, কখনোই ঈশ্বরসদৃশ ক্ষমতা সম্পন্ন কাউকে জবাবদিহিতার উর্দ্ধে রাখা যায় না, যতই সে নিজেকে পৃথিবীর একজন বলে দাবি করুক। এবং চলমান এই সংশয়কে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে সুপারম্যানকে False God হিসেবে প্রমান করতে আটঘাট বেধে মাঠে নামে জুনিয়র লেক্স।

 

 

কিন্তু সুপারম্যানকে ভন্ড প্রমানে লেক্স লুথর কেন মরীয়া হয়ে ওঠে, এটাও অনেকের প্রশ্ন। অবশ্য উত্তরটা মুভিতে স্পষ্টভাবে দেয়া আছে। ছোটবেলায় জুনিয়র লেক্স মানসিক এবং শারিরীকভাবে নির্যাতিত হয়েছে নিজের বাবার কাছে, যা একটি শিশুর স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের জন্য কল্পনাতীত। প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হয়ে জুনিয়র লেক্স ঈশ্বরের কাছে নিজেকে রক্ষার আর্তি জানায়, কিন্তু ঈশ্বর তার প্রার্থনায় সাড়া দেননি। জুনিয়র লেক্সের এই বিষাদময় অভিজ্ঞতা তার চিন্তা চেতনায় পরিবর্তন আনে। অন্যায়ের প্রতি ঈশ্বরের নির্লিপ্ততার ব্যাখ্যা নিজের মতো গুছিয়ে নেয় লেক্স।  “I figured out way back, if God is all-powerful, He cannot be all good. And if He is all good, then He cannot be all-powerful. And neither can you (Superman) be.” অর্থাৎ যদি ঈশ্বর আদর্শ হন, তবে তিনি সর্বশক্তিমান নন। এবং ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হন, তবে তিনি আদতে আদর্শিক নন, বরং পক্ষপাতদুষ্ট।

 

 

যখন সুপারম্যান বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থিত হয় ত্রানকর্তারূপে, ঈশ্বরের সমকক্ষ হিসেবে পরিচিত হতে থাকে অনেকের কাছে, লেক্স লুথরের মেটাফোর/উপমা দোটানায় ঝুলে পড়ে। কারন, আপাতদৃষ্টিতে সুপারম্যান আদর্শিক এবং (বিশ্ববাসীর চোখে) সর্বশক্তিমান। সকলের ভ্রান্তি দূর করতে লেক্স সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে। দুই বছর ধরে ব্যাটমেনকে প্রভাবিত এবং ক্ষিপ্ত করে তোলে সুপারম্যানের প্রতি। অন্যদিকে ব্যাটমেনের হিংস্রতা এবং নিষ্ঠুরতা স্বভাবতই সুপারম্যান অপছন্দ করে। জুনিয়র লেক্স সুপারম্যানের পালক মা ‘মার্থা’কে অপহরণ করে তাকে বাধ্য করে ব্যাটমেনের সাথে যুদ্ধ করতে। হিসাবটা সহজ। যদি ব্যাটম্যান সুপারম্যানকে হত্যা করতে পারে, তবে সুপারম্যান প্রকৃতপক্ষে সর্বশক্তিমান নয়, কারণ ঈশ্বর জন্মমৃত্যুর উর্দ্ধে। আবার যদি সুপারম্যান ব্যাটমেনকে হত্যা করে লেক্সের কথামতো, তবে সে আদর্শিক ঈশ্বর নন। কারন ঈশ্বর কারো প্ররোচনায় অন্যকে হত্যা করে না। তাহলে ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান যুদ্ধে যেই জিতুক না কেন, জয়টা মূলত লেক্সেরই হচ্ছে। ভিন্ন লেয়ারে হলেও এই মাস্টারপ্লান কোন অংশেই কমিক্সের চিরাচরিত লেক্স লুথরের দুষ্টবুদ্ধির চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না।

 

 

এবং শেষ পর্যন্ত জয়টা জুনিয়র লেক্সেরই হয়। প্রথম পরিকল্পনা (BvS) ভেস্তে গেলেও দ্বিতীয় পরিকল্পনা (Doomsday) সফল হয়। লেক্স বিশ্ববাসীর কাছে প্রমান করে সুপারম্যান ভন্ড, জন্মমৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ। কিন্তু জুনিয়র লেক্সের পরিকল্পনা সফল হলেও তার ফলাফল বিপরীত ছিল। সুপারম্যান নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে ডুমসডের ধ্বংসলীলা থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। এই আত্বত্যাগ সুপারম্যানকে আরো মানবিক করে তোলে। পৃথিবীবাসী সুপারম্যানকে ঈশ্বর নয় বরং বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবেই  আপন করে নেয়। যারা সুপারম্যানকে নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিল, তারাও তাদের সংশয় ভুলে যায়।

 

 

ক্রমশ অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া ব্যাটম্যান নিজের হতাশা কাটিয়ে মানবজাতির ওপর আস্থা ফিরে পায়। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন গলিতে বাবা-মা হারানো Bruce Wayne সান্তনা পায়, কারন সে এক বিপদাপন্ন মাকে তার সন্তানের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছে, যা ছোটবেলায় সে নিজে ফিরে পায়নি। সেই অন্ধকার গলির বিভৎস স্মৃতি আর দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে না, বরং ফিরে আসে অনুপ্রেরণা হয়ে। মনে করিয়ে দেয় কেন সে তার যুদ্ধ শুরু করেছিল ২৫ বছর বয়সে। প্রিয় মানুষদের দীর্ঘ বিশ বছরের বিশ্বাসঘাতকতা ম্লান হয়ে আসে একজন অচেনা অতিথির নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগে। সুপারম্যানের মৃত্যুতে শোকার্ত পৃথিবীবাসীর দিকে তাকিয়ে Wonder Woman তার ভুল বুঝতে পারে। একটি দোষগুণে পরিপূর্ণ জাতিকে রক্ষায় ব্যাটমেনের আহবানে Wonder Woman সাড়া দেয়। এভাবে সুপারম্যানের আত্বত্যাগে ব্যাটম্যান ওয়ান্ডার ওম্যানসহ গোটা বিশ্ববাসী একটি আদর্শ খুজে পায় ঠিক যেমন জন্মদাতা পিতা Jor-El বলেছিল, “You will give the people of Earth an ideal to strive towards. They will race behind you, they will stumble, they will fall. But in time, they will join you in the Sun, Kal. In time, you will help them accomplish wonders.”

 

Batman v Superman: Dawn of Justice (2016)
Batman v Superman: Dawn of Justice poster Rating: N/A/10 (N/A votes)
Director: Zack Snyder
Writer: David S. Goyer (story), Zack Snyder (story), Jerry Siegel (Superman created by), Joe Shuster (Superman created by), Bob Kane (Batman created by), Chris Terrio, Bill Finger (Batman created by), David S. Goyer (screenplay)
Stars: Jason Momoa, Gal Gadot, Henry Cavill, Amy Adams
Runtime: N/A
Rated: N/A
Genre: Action, Adventure, Fantasy
Released: 25 Mar 2016
Plot: The plot is unknown.

(Visited 242 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন