বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার ‘আকিরা কুরোসাওয়া’ ও তাঁর মাস্টারপিস ‘রশোমন’



আকিরা কুরোসাওয়া; জন্ম-২৩ মার্চ, ১৯১০ আর মৃত্যু-৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৮

আকিরা কুরোসাওয়াঃ 
চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অন্যতম হিসেবে পরিগণিত আকিরা কুরোসাওয়া। দুনিয়াব্যাপী তাক লাগানো ও সাড়া জাগানো এই জাপানি চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, সম্পাদক, চিত্রনাট্যকার ১৯১০ সালের ২৩ মার্চ টোকিও’র ওমোরি এলাকার ওইমাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সুদীর্ঘ ৫৭ বছরব্যাপী ক্যারিয়ারে ৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ বা পরিচালনা করেছেন। তার প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ১৯৪৩ সালের সানশিরো সুগাতা এবং শেষ চলচ্চিত্র ছিল ১৯৯৩ সালের মাদাদাইয়ো। তার দুটি চলচ্চিত্র সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে একাডেমি পুরস্কার লাভ করে, চলচ্চিত্রদ্বয় হলঃ ক)রশোমন খ) দারসু উজালা । তিনি একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার, লেজিওঁ দনর সহ বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আসলে তিনি এতগুলো পুরষ্কারে নন্দিত হয়েছে যে তালিকা দিয়ে শেষ করা যাবে না। অস্কার সহ বিশ্বের চলচ্চিত্র সংক্রান্ত সকল প্রতিষ্ঠানই তাকে আজীবন সম্মাননা দিয়েছেন। এইখানে বলে রাখা ভাল কুরোসাওয়ার বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রই হচ্ছে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের উপন্যাসের অবলম্বনে। দ্যা টেম্পেস্ট, কিং লিয়ার এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।। তাছাড়াও আকিরা কুরোশাওয়া বিশ্বের অনেক মহান সাহিত্যিকের নাটক ও উপন্যাস নিয়ে কাজ করেছেন যার মধ্যে ফিওদর দস্তয়ভস্কি ও ম্যাক্সিম গোর্কি অন্যতম।

তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাবৎ দুনিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী চলচ্চিত্রকার ফেদ্রিকো ফেলিনি বলেছিলান “the greatest living example of all that an author of the cinema should be”। তাছাড়াও বর্তমান বিশ্বের চলচ্চিত্রকারদের উপর তাঁর কি বিশাল প্রভাব তা জানতে আপনাকে বর্তমান দিনের চলচ্চিত্রকারদের একটা লিস্ট দেখলেই বুঝতে পারবেন লিস্টটি এমন Robert Altman, Francis Ford Coppola, Steven Spielberg, Martin Scorsese,George Lucas,and John Milius।। আর আমাদের সবে ধন নীলমণি সত্যজিৎ রায় তাঁর সম্পর্কে কি বলেছেন দেখেন ১৯৫২ সালে রশোমন চলচ্চিত্রটি দেখার পর; “The effect of the film on me [upon first seeing it in Calcutta in 1952] was electric. I saw it three times on consecutive days, and wondered each time if there was another film anywhere which gave such sustained and dazzling proof of a director’s command over every aspect of film making.”। [তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া]।

এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি কর্তৃক নির্বাচিত সর্বকালের সেরা পরিচালকদের মধ্যে আকিরা কুরোশাওয়ার অবস্থান ষষ্ঠ। শ্রেষ্ঠ ৫০ জন চলচ্চিত্রকারের মধ্যে তিনি একমাত্র এশীয় ও আমেরিকানদের বাইরে তাঁর অবস্থান সবার ওপরে।

মহান এই শিল্পী ১৯৯৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জাপানের টোকিওতে মৃত্যুবরণ করেন।

রশোমনঃ

রশোমন মুক্তি পাই ১৯৫০ সালে, মূল সিনেমার নাম ছিলঃ “Rashômon”,
সময় / ব্যাপ্তিঃ ৮৮ মিনিট,
দেশ ও ভাশাঃ জাপান ও জাপানী,
কাহিনী ও চিত্রনাট্যঃ রওনোশকে আকুতাগোয়া ও আকিরা কুরোসাওয়া,
আইএমডিবি অবস্থানঃ সর্বকালের সেরাদের মধ্যে ৯১
পুরষ্কারঃ
ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল,

মানিচিনি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল,

নিউইয়র্ক ক্রিটিক্স,

ন্যাশনাল ফিল্ম রিভিউ USA,

ব্লু রিব্বন ও

অস্কার।
মূল চরিত্রেঃ
Toshirô Mifune-Tajômaru
Machiko Kyô-Masako Kanazawa
Masayuki Mori-Takehiro Kanazawa
Takashi Shimura – Woodcutter
Minoru Chiaki-Priest
Kichijirô Ueda-Commoner


রশোমন এর একটি পোস্টার

গল্পের প্লট বর্ণনার আগে কাহিনী নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয়। এই চিত্রনাট্যটি আসলে দুটি গল্পের সমন্বয়ে। গল্পদ্বয়ের নাম রশোমন ও বাঁশঝাঁরে খুন, লিখক রওনোশকে আকুতাগোয়া, বাংলায় এই লিখকের একটা গল্প সমগ্র পাওয়া যায়। আমি মুভিটি দেখার পর উনার গল্পটি হাতে পায় চট্টগ্রামের বিশদ বাংলায়। এইখানে ‘রশোমন’ গল্পটি চলচ্চিত্রটির শুরুটা করে দেয় আর ‘বাঁশঝাঁরে খুন’ গল্পটি হচ্ছে চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনী ও প্লট।

একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে এক কাঠুরিয়া আর এক যাজক একটা গেটের পাশে আটকা পরেন। রশোমন একটি জাপানী শব্দ যার অর্থ হচ্ছে সদর দরজা বা গেট অথবা বিশালাকার তোরণ। সেরকম বিশালাকার একটা তোরণের নিচে আশ্রয় নেয়ার পর তাদের সাথে যোগ দেয় এক সাধারণ ব্যক্তি যে একটা ঝঁঝাটপূর্ণ বা গোলমেলে গল্পের অবতারনা করে। রশোমনের কাহিনী দ্বাদশ শতকের জাপানের পটভূমিতে। একদা একজন সামুরাই তার স্ত্রীকে নিয়ে গভীর বন অতিক্রম করার সময় ডাকাতের হাতে আক্রান্ত হয় এবং নিহত হয় সামুরাই। সামুরাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে নানা দ্বিধা-দন্দ তৈরি হয় ডাকাতের মধ্যে। সামুরাই, তার স্ত্রী ও ডাকাতের মধ্যে শুরু হয় নানা টানাপোড়েন। শেষ পর্যন্ত সামুরাই খুন হয়। এই ঘটনা দেখে ফেলে একজন কাঠুরে ও একজন যাজক। ডাকাতটিকে আদালতের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কাঠুরে, যাজক, ডাকাত, সামুরাইয়ের স্ত্রী এবং শেষ পর্যন্ত স্ত্রী নিজের ওপর সামুরাইয়ের ভর এনে তার বক্তব্যও পেশ করে। এই অংশই সবচে গুরুত্বপূর্ণ কারন এই চলচ্চিত্রটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় প্রত্যেকটা মানুষ মূল ঘটনাটিকে তাঁর নিজের পছন্দ বা সুবিধামত করে বর্ণনা করে। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির এমন বিরল সত্য চিত্রায়ন বিশ্ব চলচ্চিত্রেই বোধহয় এই প্রথম দেখল। তাই রাতারাতি দুনিয়াব্যাপী মানুষ বা চলচ্চিত্রের দর্শকেরা দারুণ এক ঝাঁকুনি খেল। কাঠুরে, যাজক, ডাকাত, সামুরাইয়ের স্ত্রী’র সাক্ষ্য আদালতে দেখলে যেকোন দর্শকের হৃদয়ে তা গভীর দাগ কেটে যেতে যথেষ্ট। কেননা প্রত্যেককের গল্প শোনার পর আর বোঝার উপায় থাকে না_মেয়েটিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানি করা হয় নাকি সে নিজে ডাকাতকে এই কাজে প্রলুব্ধ করে তার স্বামীকে হত্যার ব্যাপারে প্ররোচিত করেছিল। এইসব পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের মধ্য থেকে মূর্ত হয়ে উঠে সত্যের আপেক্ষিকতা।


রশোমনের আরেকটি বিখ্যাত পোস্টার

এমন সময় একটা বাচ্চার কান্না শুনতে পাই গেটের নিচে আশ্রয় নেয়া যাজক-কাঠুরিয়া আর সাধারণ ব্যক্তিটি। তারা দেখতে পাই একটা ঝুরির মধ্যে একটা বাচ্চা রাখা সে কাদতেছে। সাধারণ ব্যক্তিটি ঝুরি থেকে একটা মাদুলি আর একটা জাপানি পোশাক বের করে নিয়ে নেয় যা বাচ্চাটির জন্যে রাখা ছিল। কাঠুরিয়া তাকে নিজে লালন পালন করবে বলে নিতে চাই অপর দিকে যাজক তাঁর যাজকোচিত কথা বলতে থাকে। এক পর্যায়ে কাঠুরিয়া একটা ছুরি বের করে বাচ্চাটাকে সে নিজে রাখবে বলে। তখনই সাধারণ লোকটির প্রস্থান ঘটে সেই গেট থেকে যাওয়ার সময় সে বলতে থাকে ‘দুনিয়ার সকল মানুষই নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছু করে না’! এদিকে যাজক আবার মানুষের উপর বিশ্বাস আনতে ব্যাস্ত যখন কাঠুরিয়া বলে তাঁর অন্য ৬ সন্তানের সাথে সাথে এই বাচ্চাটিকেও সে মানুষ করে তুলতে চাই।
তারপর দেখা যায় তুমুল বর্ষণের বিনাশ ও কাঠুরিয়ার সিম্বোলিক প্রস্থান। এই একটা সিনেমা তাবৎ দুনিয়ার ফিল্মবোদ্ধাদের কালে কালে আলোড়িত ও প্রভাবিত করে গেছে। মাত্র তিনটা প্লটে কি অসাধারণ এক মানবতাবোধ গেট-বাঁশঝার আর আদালত প্রাঙ্গন। গোটা মানবতার কিছু ক্ষুদ্র মানসিকতার এক বিশাল উপাখ্যান হয়ে থাকবে বিশ্ব চলচ্চিত্রে।

[পোস্টটি পূর্বে ইস্টিশন ব্লগে প্রকাশিত]

(Visited 249 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. ধ্রুব নীল says:

    গ্রেট এক পরিচালক কে নিয়ে অসাধারন একটি লেখা । :pertamax

  2. মিজানুর রহমান মিজানুর রহমান says:

    অনেক পুরানো তাই সাহস পাচ্ছিলাম না কিন্তু রিভিও পড়ে ভালো লাগলো :thumbup

  3. আকরামুল হক অনন says:

    দারুন লিখেছেন ভাই । :2thumbup

  4. মুভিকাতুরে says:

    এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি কর্তৃক নির্বাচিত সর্বকালের সেরা ৫০ পরিচালকদের মধ্যে আকিরা কুরোশাওয়া ছাড়াও সত্যজিৎ রায় ঠাই পেয়েছেন।
    রিভিউ পড়ে ভাল লাগল।
    কুরোসাওয়ার ‘সেভেন সামুরাই’ নিয়েও কিছু লিখবার অনুরোধ এবং তা পড়বার আশায় রইলাম।
    (y)

  5. পান্থ পান্থ says:

    মাল্টিপল পয়েন্ট অফ ভিউ দিয়ে মুল প্রেক্ষাপটের ওপর বানানো প্রথম সিনেমা ছিল রাশোমন- দ্যাট অ্যালন প্রুভস হোয়াট অ্যা জিনিয়াস কুরোসাওয়া ওয়াজ। টু মি হি ইজ নট “ওয়ান অফ দ্য”,বাট “দ্য” বেস্ট ডিরেক্টর অফ দ্য ওয়ার্ল্ড।
    নাইস রাইটিং ব্রো :thumbup

  6. মুভিকাতুরে says:

    :thumbup: :thumbup:

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন