ফ্রান্স নিউ ওয়েব ফিল্মের অন্যতম জনক ‘ফ্রঁসোয়া ত্রুফো’ ও তাঁর মাস্টারপিস ‘দ্যা ৪০০ ব্লোজ’

 Francois-Truffaut-Quotes-1

প্রথমে বিখ্যাত ফরাসী চলচ্চিত্র পরিচালক ‘ফ্রঁসোয়া ত্রুফো’ সম্পর্কে একটু বলতেই হয়। তাঁর আসল নাম ফ্রঁসোয়া রোল্যান্ড ত্রুফো (François Roland Truffaut) জন্ম ৬ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৩২ এবং মৃত্যু ২১শে অক্টোবর, ১৯৮৪ একজন ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি ফ্রান্সের চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন ধারার সৃষ্টি করার পাশাপাশি বিশ্ব চলচ্চিত্রে বিশাল অবদান রাখেন। তাঁকে ফ্রান্স নিউ ওয়েব ফিল্মের অন্যতম জনক ধরা হয়। তার সবচে প্রভাবশালী চলচ্চিত্রই ‘ দ্যা ৪০০ ব্লোজ’ যার বাংলা ‘৪০০ টি থাপ্পড়; তার কাজেই তিনি দেশে এবং গোটা দুনিয়ার চলচ্চিত্র শিল্পে বিশেষ স্থান করে নেন। মাত্র ২৫ বছর দীর্ঘ চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে তিনি একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালনা, চিত্রনাট্য রচনা, প্রযোজনা এবং অভিনয়ের কাজ করেন, একই সাথে তিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ের প্রভাবশালী চলচ্চিত্রবোদ্ধা ও সমালোচক।


ফ্রঁসোয়া রোল্যান্ড ত্রুফো [৬ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৩২-২১শে অক্টোবর, ১৯৮৪]

 প্রায় ২৫টির মত চলচ্চিত্র ও দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মাঝে The 400 Blows, Fahrenheit 451, Stolen Kisses, Bed & Board, The Wild Child, Day for Night, The Story of Adele H, The Last Metro, The Woman Next Door অন্যতম। তিনি বিদেশী ছবি বিভাগে ৩ বার অস্কার পুরস্কারের মনোনয়ন পান। জার্মান নিউ ওয়েব ফিল্মমেকার ওয়ারনার হেরজ ত্রফোর জীবদ্দশায় বলেছিলেন “ফ্রঁসোয়া ত্রুফো’ জীবিত চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী”

Couv

আমার দেখা তাঁর ৭ টা চলচ্চিত্রের মাঝে তাঁর প্রথম ছবি ‘দ্যা ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ বা ‘দ্যা ৪০০ ব্লোজ’–ই সেরা। এক কথায় অনবদ্য ফিল্ম মেকিং আর অসাধারণ চিত্রায়ন এবং সাথে ছিল সে কালজয়ী কাহিনী। চলচ্চিত্র নির্মাণের মৌলিক ভাষার সবকটি ব্যাকরণই পাওয়া যায় ছবিটিতে। যদিও আর সবার মত আমার কাছেও সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্র ওরসোন ওয়েলসের ‘সিটিজেন কেইন’, তবুও বলব বিশ্ব চলচ্চিত্রের সমাঝদার সকলের কাছেই ‘দ্যা ৪০০ ব্লোজ’ ছবিটির নির্মাণশৈলী বিশেষ করে শেষ দৃশ্যটি এবং হৃদয়স্পর্শী কাহিনীর জন্য আজীবনের জন্যে গেঁথে যাবে।


jules

Jules and Jim (1962) 

কাহিনী সংক্ষেপঃ এন্টনিও ডোনিয়েল, এক ১২ বছরের ফরাসী বালক। ১৯৫০ সালের শুরুর দিকে সে ফ্রান্সে বড় হচ্ছিল তার সৎবাবার কাছে। স্কুল আর বাসা উভয় ক্ষেত্রেই সে চরম অবহেলার শিকার। ডোনিয়েলের কৈশোর ছিল দারুণ ডানপিঠে; স্কুল পালানো, পালিয়ে সিনেমা দেখা, বাড়ির জিনিস চুরে করে বিক্রি করায় উদ্যম। এমন উচ্ছলতার কাল হয়ে দাঁড়ায় একদিনের এক চুরির ঘটনা। একদা ডোনিয়েল তার সৎ-বাবার একটা টাইপরাইটার চুরি করে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পরে। তারপর তার সৎবাবা তাঁকে জেলে দেয়। জেলে তাঁকে পতিতা হতে শুরু করে সমাজের সকল শ্রেণীর অপরাধীদের সাথে থাকতে হত। ডোনিয়েল যেহেতু স্কুল এবং তার বাড়ী উভয় যায়গা থেকেই পালাতে ওস্তাদ ছিল তাই সর্বদাই জেলখানা থেকেও মুক্তি চাইত তার সরল স্বাধীনচেতা মন।

এদিকে আদালতের জবাবদিহিতার এক পর্যায়ে তার মা স্বীকার করে যে জুলিয়ান ডোনিয়েল ছিল তাঁর সৎ পিতা। ছেলের মন আরও বিষিয়ে উঠতে থাকে যখন সব সে জানতে পারে। এদিকে তাঁর মার অনুরোধে তাঁকে সমুদ্রের তীরবর্তী একটি পর্যবেক্ষণ জেলে রাখা হল। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা তাঁর অসুখি ও দুঃখী জীবনের মর্মকথা বুঝতে থাকে। অতঃপর তাঁকে খেলাধুলা সহ নানা আনন্দদায়ক কাজে তাঁকে সুস্থ করতে চাইল। একদিন ফুটবল খেলার ফাকে আন্টিনিও ডোনিয়েল নিরাপত্তা বেষ্টনীর নিজ দিয়ে জেলখানা থেকে পালিয়ে যায়। তাঁর গন্তব্য থাকে মহাসমদ্রের বিশালতার দিকে।

দ্যা ৪০০ ব্লোজ এর আরেকটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী শট এবং তার পোস্টার

এরপরই আসে সেই কালোত্তীর্ণ দৃশ্যটি। একটা ১২-১৩ বছরের বালক তাঁর আজন্ম চাহিদার সেই সমুদ্র তীরের দিকে দৌড়াচ্ছে যেখানে তাঁর দৃষ্টিতে ছিল সমাজের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর অফুরন্ত ক্ষোভ এবং সবকিছুরই নির্মম বহিঃপ্রকাশ তাঁর সেই অন্তিম ছুটে চলায়। কিন্তু দর্শকদেরকে অবাক করে সে থেমে পরে, কিছুক্ষন সমুদ্র স্রোতের সমান্তরালে হাঁটতে থাকে অতঃপর সে ঘুরে দাঁড়ায় এবং এগিয়ে আসতে থাকে এই জীর্ণ-শীর্ণ ভন্ড সমাজটির দিকে। তাঁর চাহনিতে এক অসামান্য আশাবাদের দৃষ্টি, মনে হয় যেন গোটা দুনিয়াকেই পাল্টে দিবে তাঁর নির্মোহ স্বাধীন স্বপ্নে। এইখানেই ফ্রিজ হয়ে যায় এবং এই মহাকাব্যিক চলচ্চিত্রটির অবসান ঘটে।

কিছু কথাঃ এই চলচ্চিত্রটি এতই শক্তিশালী যে, যেকোন সমঝদার দর্শক ফিল্মের সকল মৌলিক ভাষা খুঁজে পাবেন নির্মাণশৈলীতে; যেমন শেষ দৃশ্যটি আধুনিক চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী ভাষা ‘মন্তাজ‘-এর একটি অপূর্ব নিদর্শন। যেমনটি ঠিক আমরা ‘পথের পাঁচালী’-তে দুর্গার মৃত্যুর পরে অপুর ঢিলে ছুড়া ঢেউয়ের মিলিয়ে যাওয়ায় দেখতে পাই। তাছাড়া ‘মিজওণ সিন’ [Mise-en-scène] এরমত জটিল চলচ্চিত্রের ভাষাকে আমরা দেখি অতি সাবলীলভাবে কয়েকবার ফুটিয়ে তুলতে।

এছাড়াও চলচ্চিত্রটি তৎকালীন ফ্রান্সে শিশু অপরাধীদের প্রতি কেমন অবিচার করা হত তার একটি অনবদ্য শৈল্পিক দলিল হয়ে থাকবে আজীবন। ফ্রান্স নিও ওয়েব ফিল্ম -এর অন্যতম জনক ‘ফ্রঁসোয়া ত্রুফো’ তার প্রথম চলচ্চিত্রে এতটা আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারবেন তা তিনি নিজেও ভাবেন নি। ৪০০ টি থাপ্পড় শুধু ফ্রান্সের তৎকালীন সমাজের প্রতি চপেটাঘাত ছিলনা এইটা ছিল তাবৎ দুনিয়ার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পক্ষ থেকে সমাজের প্রতি চিরস্থায়ী  এবং তীব্র আঘাত।

মূল অভিনেতারা হচ্ছেন- 

জ্যা পিঁয়েরে ল্যাড- এন্টনিও ডোনিয়েল
অ্যালবারট রেমি- এন্টনিও ডোনিয়েলের সৎবাবা
ক্লারা মুরেরি – এন্টনিও ডোনিয়েলের মা
গ্যায় ডেকমব্লি- এন্টনিও ডোনিয়েলের স্কুল শিক্ষক
প্যাট্রিক অ্যাফ্যান – এন্টনিও ডোনিয়েলের সেরা বন্ধু

ফিল্মের নির্মাণ সাল- ১৯৫৯, মূল ভাষা ফ্রেন্সে “Les quatre cents coups” নামে মুক্তি পায়। আইএমডিবি’র সর্বকালের সেরা ২৫০ চলচ্চিত্রের ১৮১ তম অবস্থানে ৯৯ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি। যদিও বেশীরভাগ চলচ্চিত্রবোদ্ধারা এই মহান চলচ্চিত্রকে সর্বকালের সেরা ২০ এর মধ্যে রাখবেন। আকিরা কুরসাওয়া দ্যা ৪০০ ব্লোজ সম্পর্কে বলেছিলেন ‘আমার দেখা অন্যতম নান্দনিক চলচ্চিত্র এটি’, অন্যদিকে এম্পায়ার ম্যাগাজিন ২০১০ এ প্রকাশিত ‘বিশ্ব চলচ্চিত্রের ১০০ সেরা মুভির একটি তালিকা প্রকাশিত হয় যার ২৯ নম্বরেই ছিল এই কালজয়ী মুভিটি। আবার ব্রিটিশ ফিল্ম সোসাইটি ১৪ বছর বয়সে অবশ্য দেখতে হবে এমন চমৎকার মুভির ৫০ টির তালিকা প্রকাশ করে যার প্রথম সেরা দশ-এই স্থান করে নেয় এই অতুলনীয় মুভিটি। অন্যদিকে রোটেন টমেটোতে ৯৩% ফ্রেশ চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি রয়েছে কালোত্তীর্ণ এই চলচ্চিত্রটির।

ফ্রান্স নিউ ওয়েব ফিল্ম -এর মূল চেতনায় ছিল যেখানে প্রথা বিরোধিতা সেইখানে ‘ফ্রঁসোয়া ত্রুফো’র সকল চলচ্চিত্রেই মিলবে এমন সব অবিরাম চপেটাঘাত।। শিল্পের জন্ম যে শুধু নির্মল বিনোদন বা পুঁজিবাদী ব্যবসা নয় তা বুঝতে পাঠকদের হলিউডের বাইরের দিকে বেশী চোখ বুলাতে বলব। তবে এও বলছি হলিউডেও মাঝে মাঝে অসাধারণ কিছু ফিল্ম হয়। [পোস্টটি পূর্বে ইস্টিশন ব্লগে প্রকাশিত]

(Visited 200 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৯ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. দেখেছি মুভিটা। অসাধারন। এন্তনিও ড্যানিয়েল চরিত্রটা বিশ্ব চলচিত্রে একটা ক্লাসিক। 🙂

  2. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    একটা মুভিও দেখিনি। আর ইনাকে চিনিও না। কত কিছু জানার বাকি আর কতজনকে চেনার বাকি। ধন্যবাদ পোস্টের জন্য।

    • এমন কিছু ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের রিভিউ নিয়েই আপনাদের সামনে হাজির হওয়ার ইচ্ছা আপু…
      সবাইতো সমসাময়িক কালের চলচ্চিত্র নিয়ে পোস্ট দেয়!! সময় করে সংগ্রহ করে দেখে ফেলুন! ভাল লাগবে!!

  3. ধ্রুব নীল says:

    দেখতে হবে…… 🙂
    লেখা দারুন…… :rate

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন