‘The Sea Inside’ সমুদ্র প্রাণ এক মানুষের আত্মহত্যার অধিকার স্থাপনের গল্প…

5

চলচ্চিত্রঃ The Sea Inside

পরিচালকঃ আলেজান্দ্রো আমেনাবারকাহিনী ও চিত্রনাট্যঃ আলেজান্দ্রো আমেনাবার ও মাতিও জিল

বছরঃ ২০০৪, দৈর্ঘ্যঃ ১২৫ মিনিট, ভাষাঃ স্প্যানিশ/ কাতালান,

মূল/কেন্দ্রীয় চরিত্রেঃ হ্যাভিয়ের বারদেম, সময়ের অন্যতম শক্তিমান অভিনেতা।

রিলিজ ডেটঃ ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৪, আইএমডিবি রেটিং– ৮.০, রটেন টমেটোঃ ৮৪%,

পুরস্কারঃ অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব সহ সারাবিশ্বে ৬১ টি পুরষ্কার এবং আরও ৩০ টি মনোনয়ন।

বাজেটঃ ১০ মিলিয়ন ইউরো, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড বক্স অফিসঃ ৩৮.৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার

1

কাহিনী সংক্ষেপঃ

The Sea Inside এর কাহিনী একটি বাস্তব জীবনের গল্প। রামেন সাম্পেদ্রো কামেন একজন স্প্যানিশ মৎস্যশিকারি এবং লেখক। তাঁর জন্ম ৫ জানুয়ারি ১৯৪৩ সালে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে ২৩ আগস্ট ১৯৬৮ সালে তিনি সমুদ্রে ডাইভিং করার সময় মর্মান্তিক একটি  দুর্ঘটনায় Quadriplegia-ই আক্রান্ত হয়ে পঙ্গু হন। ২৯ বছর তিনি আত্মহত্যার অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করেন এবং ৫৪ বছর বয়সে পটাসিয়াম সায়ানাইড পান করে ১২ জানুয়ারি ১৯৯৮ মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তাঁর আত্মহত্যার অধিকার স্থাপন নিয়ে ইউরোপিয় ইউনিয়নের উচ্চতর আদালতে পর্যন্ত যান, যেহেতু প্যারালাইজড থাকায় তিনি কারও সাহায্য ছাড়া আত্মহত্যা করতে সমর্থ ছিলেন না তাই তাঁকে ‘ডিম্যান্ড ফর সুইসাইড’ আন্দোলনটি করতে হয়। এই আন্দোলনটি করতে গিয়ে তাঁর সাথে আইনজীবীর প্রেমময় সম্পর্ক আর মিডিয়ার বদৌলতে আরেক নারীর সাথে সম্পর্কের ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব এমন হৃদয়স্পর্শী করুণ জীবনকাহিনীকে করেছে আরও বেশী হৃদয়গ্রাহী এবং জীবনধর্মী।

তাঁর এই ব্যতিক্রমী অধিকারের আন্দোলন যেমন তাঁকে টিভি টকশো থেকে শুরু করে তাবৎ মিডিয়ায় দিয়েছে ব্যাপক খ্যাতি তেমনি তাঁর মৃত্যুর পর ‘Live and Let Die’ এবং ‘A Suicide Tape on TV Inflames the Issue in Spain’ নামে দুটি আর্টিকেল প্রকাশ করে যথাক্রমে  টাইম ম্যাগাজিন এবং  নিউইয়র্ক টাইমস । তাঁর এই অধিকারের গল্প শুধু খামাখেয়ালি বা বাতিকগ্রস্ত কোন ইস্যু ছিল না। কীভাবে তাঁর অসুস্থতার পর তাঁর জীবনের করুণ এবং তিক্তকর পরিবর্তন ঘটে তার জন্য চলচ্চিত্রটির একটি উক্তিই যথেষ্ট When you can’t escape and you depend on others, you learn to cry by smiling’. জীবন মৃত্যুর এই মহাকাব্যিক এবং বাস্তবধর্মী মূল্যবোধই চলচ্চিত্রটির মূল শক্তি।

 

0

 জীবন মৃত্যু সংগ্রামের এই মহান ব্যাক্তি তাঁর জীবদ্দশায় লিখেন “Letters from Hell” বা ‘Cartas desde el infierno’ নামের একটি অসাধারণ জীবনদর্শনভিত্তিক গ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি তাঁর জীবনের উপলব্ধি থেকে লিখেন কিছু কবিতা, প্রবন্ধ এবং তাঁর নিজের কথা। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ৩/৪ বন্ধুকে পুলিশ আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং প্রমানের অভাবে তাদের পরে কর্তৃপক্ষ ছেড়ে দেয়। মৃত্যুর ৭ বছর পর যখন সব মিটমাট হয়ে যায় তখন রামেনা মানেরিও নামের এক বন্ধু এক টিভি সাক্ষাৎকারে স্বীকার করে রামেনকে সায়ানাইড পানে সাহায্য করার কথাটি এবং তিনি বলেন তাঁর প্রতি ভালোবাসায় তিনি এই কাজ করেছেন।

3

চলচ্চিত্র-শিল্প বা Cinematography:

একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে গল্প যতই শক্তিশালী হোক না কেন পরিচালকের চিত্রায়ন এবং চলচ্চিত্র শিল্পের ব্যাকরণগত শিল্পের যথার্থ প্রয়োগ এমন শক্তিশালী শিল্পকে করে আরও মন্ত্রমুগ্ধকর এবং  ছন্দোময়। এই গল্পে সাবলীল ভাবেই আসছে তাঁর বৃদ্ধ বাবা, ভাই, ভাইয়ের ছেলে এবং ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে তাঁর দৈনন্দিন জীবনের সকল দ্বন্দ্বপূর্ণ ছোট ছোট চিত্রকল্পে। অন্যদিকে তাঁর বন্ধু জুলিয়া এবং রোসার সাথে রোম্যান্টিক সম্পর্কের খণ্ডচিত্রগুলো ছিল বাস্তবধর্মী এবং অসাধারণ। কিছু চমৎকার চিত্রায়ন সবারই চোখে লেগে থাকার কথা বিশেষ করে যখন সমুদ্র অন্তঃপ্রান এই রামেন সাম্পেদ্র ডাইভ দিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন সেই দৃশ্য সবসময় আমাকে একটি ছোট্ট দুর্ঘটনা কীভাবে একটি জীবনকে মৃত্যু থেকেও করুণ আর বেদনাদায়ক করে দেয় তা মনে করিয়ে দেয় আবার যখন এই রোম্যান্টিক মন বিছানায় শুয়ে সমুদ্রকূলে বিচরণের স্বপ্নে বিভোর তখন যে কাল্পনিক চিত্রকল্পটি ফুটে উঠে তা জীবনের আনন্দ আর প্রকৃতির অপার প্রেমকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

এই অসুস্থ স্বাধীন চেতা সমুদ্রের ঢেউয়ের পাগল মন যখন বিছানায় বন্দী এবং জীবনের সকল কাজেই অন্যের উপর নির্ভরশীল তখন তাঁর মনোদৈহিক আচরণ এবং স্বপ্নগুলোর নষ্ট হয়ে যাওয়া সবকিছু এই অসাধারণ জীবনটিকে আরও অনবদ্য করে তোলে। এটি কোন সাধারণ গল্প নয় এটি কেবলই জীবনের গল্প নয় এটি একই সাথে মৃত্যুর গল্প, ব্যক্তিস্বাধীনতার চূড়ান্ত পর্যায়ের অধিকার স্থাপনের গল্প।

4

গল্পের চিত্রায়ন বা চলচ্চিত্রায়ন নিয়ে কিছুই বলার নেই। শুধু বলি- মৃত্যু নিয়ে এত জীবন্ত চলচ্চিত্র বিশ্ব খুব একটা দেখেনি এর আগে। আমি পড়েছিলাম, লিও তলস্তয়ের ‘ইভান ইলিচের মৃত্যু’ এই ছোট গল্পটি যেমন মৃত্যুকে জীবন্ত করে তোলে ঠিক এই চলচ্চিত্রটি দেখে তেমন একটি জীবন্ত মৃত্যুর স্বাদ পাবে দর্শকেরা। যারা জীবনকে বুঝতে চান, জীবনের মুভি দেখতে চান তাদের জন্য এর থেকে চমৎকার চলচ্চিত্রের হদিস কেউ দিতে পারবে না। মাঝে মাঝে আপনার মনে হবে এত সুন্দর জীবনের গল্প আর কেউ মৃত্যুর মাধ্যমে উপস্থাপন করতে পারবে না।

সবশেষে যদি অভিনয়ের কথায় আসি তবে এইটাই বারদেমের সেরা অভিনয়, এত বেশী জীবন-সম্পর্কিত সুঅভিনয় বর্তমান চলচ্চিত্রে খুব একটা দেখা যায় না।

2

 

রিমেকঃ ২০১০ সালে বলিউডে গুজারিশ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রটি অভিনয় করেন ঋত্বিক রোশন আর নির্মাণ করে সঞ্জয় লীলা বানসালি। একই সালে এই মুভি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিউ জিল্যান্ডের ‘বডি ১২৫’ নামের একটি ব্যান্ড ‘A Sea Inside’ টাইটেলে একটি গান রচনা করে।

উপলব্ধিঃ “মানুষ কেবল বাঁচতে চায় না, স্বপ্নও দেখতে চায়। আর তাই যখন কেউ স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা রাখে না তখন সে বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে।”

(Visited 86 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ২২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. নির্ঝর রুথ says:

    ভালো লেগেছে রিভিউ+++++++
    মুভিটা দেখি নি। কিন্তু এমন রিভিউ পড়ার পর আর না দেখে থাকা সম্ভব নয় 😀

    • তারিক লিংকন says:

      তাড়াতাড়ি দেখে ফেলেন… আশাকরি নিরাশ করবে না হ্যাভিয়ের বারদেম ও আলেজান্দ্রো আমেনাবার…

  2. অ্যান্থনি এডওয়ার্ড স্টার্ক says:

    ব্যাপক পরিশ্রম হইছে নিশ্চয় এইরকম একটা চখাম পোস্ট লিখতে। ধন্যবাদ। রিভ্যুতে এক হালি প্লাস। + + + +

  3. ভালো লেগে গেল বেশিই লেখাটা!

    • তারিক লিংকন says:

      ধন্যবাদ… আর মুভিটা দেখলে আশাকরি আরও অনেক বেশী ভাল লাগবে!!
      এমন অনবদ্য একখান মুভি আমার মত দর্শকের কাছে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা কড়া সম্ভব না…
      আশা করি দেখলেই বুঝতে পারবেন…

  4. খুব খুব পছন্দের মুভি। আর তারিক ভাই, লিখেছেন তো ফাটাফাটি। অস্থির হইছে লিখা।

    • তারিক লিংকন says:

      অফুরন্ত ধইন্যা নতুন ব্লগার ভাই… এমন একটা ছবি কারো দেখার পর প্রিয় না হয়ে পারে না…
      ভাল থাকবেন!! শুভ হোক মুভি দেখা দেখি…

  5. রীতিমত লিয়া says:

    উপস্থাপনা অনেক সুন্দর।

  6. তানিয়া says:

    তথ্য বহুল রিভিউ, ভালো লেগেছে

  7. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    এক কথায় রিভিউ অনেক ভাল হয়েছে। সামনে আরো লেখা চাচ্ছি… 🙂

  8. এত জলদি লেখাটা শেষ করে দেবার জন্য মাইনাস নেন ভাইয়া :/ মুগ্ধতায় যখন চোখ কপালে তুলছি ঠিক তখনই ঠাশ করে কিবোর্ড থেকে আঙ্গুল সরিয়ে নিলেন !

    কনটেস্ট এ পার্টিসিপেট করার জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা 🙂

    • ডন মাইকেল করলিয়নে says:

      সহমত আদ্রে… 🙁 আমারও বিশাল হতাশ লাগছিল 🙂 🙂 … এমনে কেন শেষ হইল রিভিউখান???

    • তারিক লিংকন says:

      প্রিয় আদ্রে ধন্যবাদ আর শুভেচ্ছা নিবেন, আসলে আমি ছবির গল্প নিয়ে বেশী আলোচনা করতে চাইনি ইচ্ছাকৃতভাবেই কেননা তাতে আগ্রহ কমে যেতে পারে দর্শকের বা মুভিটি দেখার সময় সাবলীলভাবে উপভোগ করতে পারবে না। তাই আগ্রহের চুড়ায় তুলে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমার ধারনা ছিল পাঠকদের বেশীরভাগই রিভিউটি পড়ার পর মুভিটি দেখবে…

      আপনাকেও অফুরন্ত ধন্যবাদ। আর অশেষ ধন্যবাদ ডন ভাইকে, তার অবিরাম উৎসাহ আর ক্রমাগত দাবীতেই এই রিভিউ কন্টেস্টে অংশগ্রহণ…
      পুরষ্কার পাওয়া মূল ৯টি ছবির প্রায় একমাস পরেও অংশগ্রহণ করে (মূলত কন্টেস্ট শেষ হওয়ার ঘণ্টা দুই আগে ২৩ অক্টোবর পোস্টটি পাব্লিশ হয়েছিল!) আমি নিশ্চিন্ত হতে ছেয়েছিলাম প্রিয় ছোট ভাই ডনের অনুরোধ রাখতে পেরেছিলাম বলে।

      কিন্তু রিভিউটি শেষমেশ বিশেষ সম্মাননা পুরষ্কার ধারনার বাইরে ছিল… সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ!! ভাল থাকবেন প্রিয় মুভি লাভারসরা……

  9. তহিদ তহিদ says:

    +++ খুবই সুন্দর রিভিউ

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন