সরল কথায় গরল “Enemy(2013)” মুভি এক্সপ্ল্যানেশন
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

ডেনিস ভিল্লেনুভে এই নামটার শেষ নামটা ঠিক যেমন অদ্ভুত ধরণের, লোকটার কাজকর্ম ও তার থেকে বেশি অদ্ভুত ধরণের। এই ব্যক্তির সাথে আমার প্রথম পরিচয় Incendies​ মুভির মাধ্যমে। মুভি দেখার পর কয়েক মিনিট নিজের মাথা নিজে ধরে ছিলাম যেন মাথা ঘুরে না পড়ে যাই। এরপর একে একে দেখলাম প্রিজনার, এনিমি, নেক্সট ফ্লোর, স্ক্যারিও, কসমস এবং সর্বশেষ হালের অন্যতম জনপ্রিয় সাই-ফাই মুভি এরাইভ্যাল। এই মানুষটা আসলেই একটা অমানুষ, প্রতিটি মুভি একটি থেকে আর একটিকে ছাড়িয়েছে। যাই হোক ডেনিস ভিল্লেনুভের বিস্তারিত জীবনের অলি-গলি না হয় অন্যদিন জানব, আজক জানবো বর্তমান সমাজের তরুণ সমাজ বা বুড়ো বয়সের যাদের ভিমরতিতে ধরে তাদের সুপ্ত মনের কামনা বাসনা নিয়ে নির্মিত মুভি Enemy​ (2013) নিয়ে। আলোচনা দীর্ঘ করার জন্য সূচনা ছোট করে আলোচনাতে প্রবেশ করি চলুন…………………

“বাহির বলে দূরে থাকুক, ভিতর বলে আসুক না’ – হাবিবের এই গান শুনেনি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। আমারো মনে হয় ডেনিস ভায়া ও এই গানের গানে পাগল হয়ে ভিতরের আসা যাওয়া নিয়ে সাবকনসাস বা অবচেতন মনের সাথে বিবেকের লড়াই নিয়ে মুভিটি বানানোর রেসেপি নিয়েছেন। হ্যোয়াট এ নাইস ইন্সপিরেশন ডেনিস ভায়া, তালিয়া হপে তালিয়া। বুঝেননি তো? ওকে এখন আমরা জানবো Enemy সিনেমার ভাবসম্প্রসারণ। যদি মুভি দেখে না থাকেন তো স্পয়লার যুক্ত রচনা পড়তে আসবে না।

Enemy অন্য আট দশটি মুভির মত লিনিয়ান বা নন-লিনিয়ার মুভি নয়। বলা যায়, মুভি ন্যারেশনের সব ব্যাকরণ ভেঙ্গে দিয়ে Enemy এগিয়েছে আপন মহিমাতে। Enemy – তে আপনি যা দেখছেন আসলে ঠিকই দেখছেন তবে একই সাথে দেখছেন দুটি মুভি, যা ঘটে চলেছে সমান্তলার ভাবে। মানব মনের সাথে অবচেতন মনের লড়াই চলেছে একই ব্যক্তির মধ্যে। জ্বি হ্যা- একই ব্যক্তি।

মুভিতে দেখতে পান জ্যাক ইয়েনেলহাল ডাবল রোলে, কিন্তু এই ডাবল রোলের মধ্যে একটি তার কল্পনা, অন্যটি বাস্তব। তাহলে কোনটি কল্পনা এবং কোনটি বাস্তব। ফিল্ম এক্টর অ্যান্থনি হল কল্পনা এবং ইতিহাসের শিক্ষক অ্যাডাম বেল হিসাবে জ্যাক যে রোল প্লে করছে তা হলে বাস্তব।

মানুষের মনে সব সময় ভালো – খারাপ দুটি দিকই বসবাস করে। মানুষ চেষ্টা করে সব সময় ভালো হতে কিন্তু মানুষের মনের কু-প্রবৃতি তাকে সব সময় খারাপের দিকে ধাবিত করে দেয়। মুভির শুরুতে দেখতে পান জ্যাক একটি সেক্স ক্লাবে যায় যেখানে সে মাস্টারবেট রত নগ্ন মেয়েকে দেখতে পাওয়া যায় এবং একটি মাকড়শাকে পা দিয়ে পিষ্ট করার দৃশ্য দেখা যায়। লেখার একেবারে শেষদিকে মাকড়শা নিয়ে কথা বলব।

সিনেমার এর পরের দৃশ্যতে দেখা যায় অ্যাডাম বেল (শিক্ষক জ্যাক) ক্লাসে লেকচার দিচ্ছেন। এটা হল বাস্তব, আর এর আগের দৃশ্য ছিল কল্পনা। এখন বলবেন কিভাবে? ঠিক আছে আমরা চলে যায় মুভির মাঝের অংশে। ভিডিও ক্লিপের মধ্যে দিয়ে বেল জানতে পারে তার মত দেখতে একজন অভিনেতা আছে। সে খোজ নিয়ে সে অভিনেতার কর্মস্থলে যায় এবং সেখানের কর্মরত নিরাপত্তারক্ষী তাকে অ্যাক্টর অ্যান্থনি হিসাবে ভেবে বলে অনেক দিন হয়ে গেলো তার কোন দেখা যায়। বেল জিজ্ঞাসা করল কতদিন? উত্তর দেওয়া হল – ৬ মাস। খুব খেয়াল করে মাস টা মনে রাখুন, কারন অ্যাক্টর অ্যান্থনি এর স্ত্রী যখন বেলের সাথে দেখা করতে এলো তখন বেল তাকে জিজ্ঞাসা করল ‘সে কত মাসের অন্তঃসত্ত্বা? ‘ তখনো উত্তর এলো ৬ মাস।

ঠিক তখন অ্যান্থনির স্ত্রী অ্যান্থনিকে ফোন করে। দেখবেন ঠিক সে সময় বেল দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে পর্দার আড়ালে চলে যায়, এরপর ফোনের ওপাশ থেকে কথা বলে অ্যান্থনি। আসলে অ্যান্থনি এবং বেল দুজনে একই ব্যক্তি। অ্যান্থনি হল বেলের কল্পনা।

এবার আবার আপনারা প্রশ্ন করবেন, তাহলে বেলের সাথে যে মেয়ে থাকত, যাকে রোজ রাতে সংগমরত অবস্থায় দেখা যায় তাহলে সে কে? ভালো প্রশ্ন, উত্তর হল সে বেলের গার্ল ফ্রেন্ড কিন্তু এটাও কল্পনা। কিভাবে? আসুন আবার সিনেমাতে ফিরে আসা যাক……

সিনেমার এক পর্যায়ে এসে দেখবেন, অ্যাক্টর অ্যান্থনি ও শিক্ষক বেলের দেখা হয়, মূলত এখান থেকেই সিনেমার জট খোলা শুরু হয়। অ্যান্থনি বাববার জিজ্ঞাসা করতে থাকে “সে কি তার স্ত্রীর সাথে সংগম করেছে কি না?” বেল চুপ থাকে, কোন উত্তর দেয় না। আসলে গর্ভধারণকারী মেয়েটিই বেলের আসল স্ত্রী এবং দেখা যায় সিনেমার শেষ দিকে বেল তার কাছে ফিরে যায়। অ্যান্থনি ও বেলের গার্ল ফ্রেন্ডের কাছে ফিরে যায় সংগমে লিপ্ত হয় কিন্তু অ্যান্থনির হাতে রিং এর দাগ দেখতে পায়। যা দেখে সে বুঝতে পারে অ্যান্থনি তার সাথে প্রতারণা করেছে। অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। গাড়ির ভিতরে দুজনের বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে গাড়ি দূর্ঘটনার স্বীকার হয়ে দুজনেই মারা যায়। খেয়াল করবেন মারা যাচ্ছে ” অ্যান্থনি এবং বেলের সেই কল্পনার গার্লফ্রেন্ড” এবং ঠিক তখন বেল তার স্ত্রীর সাথে ভালোবাসার মুহূর্ত কাটাচ্ছে।

file_583383_enemy-movie-review-09102013-185137

এবার আসুন মূল সিনেমার দৃশ্য থেকে পুরো সিনেমা ব্যখ্যা করার চেষ্টা করি। মূলত শিক্ষকতাই হল বেলের পেশা, কিন্তু সে তার অতীত জীবনে অ্যান্থনি হিসাবে নিজেকে দেখতে চাইতো। অনেকে মেয়ে মানুষের সাথে তার উঠাবসা ছিল। খাটি বাংলা কথায় অতীতে বেল ছিল একজন ক্লাস প্লেবয়। অ্যান্থনি এর ড্রেস আপ ও কথার স্টাইলেই আপনি সে কথা বুঝবেন। কিন্তু সবাই ভালো হতে চায়, তার মা এর সাথে বেলের কথোপকথন শুনলেই আপনি আরো ক্লিয়ার হবেন। সব ছেড়ে যখন বেল ভালো হয়ে একা থাকতে চায় একা নতুন ফ্ল্যাটে তখন তার মা তাকে বলে –

Mother: Hello, darling, it’s your mother. Thank you for showing me your new apartment. I’m worried about you. I mean, how can you live like that? Anyway, would you call me back? Let’s get together again. I love you

৬ মাসের ব্যবধানে সে এক অন্যমানুষে পরিনত হয়, ন্যূড ক্লাব, মেয়ে মানুষের নেশা থেকে দূরে সরে থাকে। ইতোমধ্যে তার স্ত্রী ও অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যায়। ৬ মাসের ব্যখ্যা পাওয়া যায় এখানেই। কিন্তু তার অতীত তাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়, তাই সে মনের মধ্যে অ্যান্থনি নামে অন্য একটি চরিত্র সৃষ্টি করে যাকে দেখতে তার মতই মনে হবে।

সিনেমাতে দেখবেন বেল যখন ফোন করে তখন তার স্ত্রী বলে তুমি ঘরেই ফোন করেছ। রূপালী জগত, হোটেলের মেয়ে মানুষ ও অন্য মেয়ের সঙ্গ এসব থেকে মুক্তির জন্য বেল চায় তার পুরোনো সেই অ্যান্থনি চরিত্রকে চরিতরে মেরে ফেলতে। নিজের স্ত্রীর কাছে ফিরে আসে এবং পড়ে নিউজে জানতে পারে একটি দূর্ঘটনা ঘটছে। সে বুঝতে পারে তার খারাপ আত্মাটির মৃত্যু ঘটেছে এখন সে স্ত্রীর সাথে সুন্দর জীবন করতে পারবে।

কিন্তু সিনেমার শেষ দৃশ্যতে দেখা যায় একটি বিশালাকার মাকড়শা তার স্ত্রীর ঘরে এবং বেলের মুখে কিঞ্চিৎ হাসি দেখতে পাওয়া যায়। এবার ঠিক তার আগের দৃশ্যতে যাওয়া যাক, বেল অ্যান্থনির খোজে যখন যায় তখন নিরাপত্তা কর্মী তাকে একটি খাম দেয় সেটা বেল অ্যান্থনিকে দিয়ে দিলেও সিনেমার শেষ দৃশ্যতে দেখা যায় আবারো বেলের কাছে। সেটা খোলার পরে একটি চাবি বের হয়, এই চাবি হল সেই চাবি যেটা দিয়ে সিনেমার প্রথমে ন্যুড ক্লাবের দরজা খোলা হয়েছিল। বেলের মাঝে আবারো সেখানে যাবার ইচ্ছা দেখা যায়, তাই মাকড়শা দেখার পরও তার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠে। কারন মনের ভিতরে অ্যান্থনি ও মেয়ে মানুষের নেশা তাকে মাকশড়ার জালের মত করে আষ্টেপৃষ্ঠে চারদিকে জড়িয়ে রেখেছে। এজন্য সিনেমার শুরুতে দেখা যায় জুতা দিয়ে মাকড়শা হত্যা করার চেষ্টা করা হলেও তাকে মরা দেখানো হয় না। কারন মনের কালো প্রবৃত্তি এতো সহজে মারা যায় না, বারবার তা ফিরে আসে।

maxresdefault

মুভিতে বেল তার ক্লাসে বারবার একটি কথা বলে –

“This is a pattern that repeates itself “

মুভিতে এই লাইন দ্বারা বুঝানো হয়েছে, বেল এর এই মনের কাল দিকটা বারবার ফিরে আসবে, কারন মাকড়শার জালের মত সেও একটা জালে আবদ্ধ।

একবাক্যে Enemy মুভিটাকে যদি আমি বলতে চাই, তাহলে বলব-

” লিচু প্রকৃতির মানুষ আজীবন লিচুই থাকে “

– ধন্যবাদ

Error: No API key provided.

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন