“বাহুবালি”- মিথোলজিক্যাল চরিত্রের সমন্বয়ে ধুন্ধুমার বানিজ্যিক সিনেমা
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

সাল ২০১৩, সিনেমা তখন কেবল দেখা শুরু করেছি। এক বন্ধুর থেকে পেন ড্রাইভে করে কয়েকটি সিনেমা নিয়েছিলাম , সেখানে ছিলো মাগাধীয়া, এগা এবং ছত্রপতি। সিনেমা দেখার পর দারুণ ভাবে মন নাড়া দিয়েছিল। ভাষা বুঝি না কিন্তু এই সিনেমার কাহিনীগুলো এতো সুন্দর কেন? তখন বাংলার বাঘ এর মডেম চালাতাম। লিমিডেট নেট দিয়ে একটু একটু করে জানা শুরু করলাম সিনেমার অভিনেতা, অভিনেত্রী এবং পরিচালকের নাম। তিনটি সিনেমার পরিচালক এক জনই। এস এস রাজামৌলি, নামের ভিতরে যেন কেমন একটা বৈচিত্র রয়েছে। সে বৈচিত্র যেন আরো প্রবলভাবে ধরা দেয় সিনেমার কাহিনীতে। আরো গুগোল করে জানতে পারলাম পরবর্তী সিনেমার নাম “বাহুবালী”। এবার একটি ফ্যানমেড পোস্টার দেখলাম, যেহেতু গ্রুপে আমি খুব নতুন, তেমন জানতাম না পোস্টারটা আসলে গলাকাটা ছিল। তাই অনেকে হাসি ঠাট্টা করল। 300 এর পোস্টারে গলা কেটে প্রভাসের মাথা বসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস এবং অপেক্ষা দুটোতে ছিলাম কারন নাম টা যে এস এস রাজামৌলি। এক মাগাধীরা দিয়েই তিনি যেভাবে ইতিহাসের সাথে আধুনিকতার মিলন ঘটিয়েছেন সেখানে এমন অপেক্ষা করা যায়। সাথে ছিল ছত্রপতির সেই প্রভাস। ৬ ফিট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার এমন স্টাইলিশ নায়ক দেখে আমার একটি হিংসাই হয়েছিল, ধুর আমি এমন না কেন? আচ্ছা সে যাই হোক সিনেমার ভিতরে প্রবেশ করি।

প্রথমে এক পর্বে পুরো সিনেমা শেষ করার কথা থাকলেও সিনেমার দৈর্ঘ্য খুব বড় হয়ে যাবার জন্য সিনেমাটিকে দুই পর্বে রিলিজ দেওয়ার কথা জানানো হয়। প্রথম পর্ব ‘বাহুবালি – দ্য বিগিনিং” এবং দ্বিতীয় পর্ব “বাহুবালী – দ্য কনক্লুশন” নামে ২০১৫ ও ২০১৭ সালে মুক্তি প্রদান করা হয়। সিনেমার কাহিনী লিখেন রাজামৌলির পিতা, মূলত রাজামৌলির অধিকাংশ সিনেমার কাহিনী তার মাথা দিয়ে কলমে স্ক্রিপ্ট আকারে মুক্তি পায়।

Total-kamai-Bahubali-Movie-15th-Day-3rd-Weekend-Box-Office-Collection-Report

‘বাহুবালি – দ্য বিগিনিং” সিনেমার মূল প্লট টা খুব সুন্দর করে দেখানো হয়। দেখানো হয় মহেশমতি রাজ্যের সূচনা এবং শেষ করা হয় একটি দূর্দান্ত প্রশ্ন রেখে, “কাট্টাপ্পা বাহুবালীকে কেন হত্যা করে?” বলা যায় এই একটি প্রশ্নের উত্তরের জন্য পুরো ২ টি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে সিনেমা প্রেমীদের। একটা কথা দিয়ে কি করে সিনেমার বাজ মার্কেটিং করতে হয় তা শিখিয়ে দিয়েছেন রাজামৌলি। “বাহুবালী – দ্য কনক্লুশন” এ গিয়ে আমরা জানতে পারি কেন এতো আস্থাভাজন হয়েও কাট্টাপ্পা বাহুবালিকে হত্যা করেছিল। কিন্তু তার থেকে বড় জিনিস ছিল সিনেমাতে সেটা হল এটারটেইনমেন্ট। এক ফোঁটাও বোর হতে দেয়নি যতক্ষন সিনেমা চলেছিল। এতোদিন সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমাতে শুধু নায়কের এনট্রি দেখে দর্শকরা শিস বাজাত, হাত তালি দিতো। বাহুবলি তে তো নায়কের এন্ট্রি ছিলো সাথে ছিল নায়িকা দেভসেনার এন্ট্রি দৃশ্য। একজন নায়িকা কত গ্ল্যামারাস লাগতে পারে এই ধরনের যুদ্ধিভিত্তিক এন্ট্রি দৃশ্যতে তা দেভসেনা চরিত্রে আনুশকা শেঠীকে না দেখলে বিশ্বাস হত না। আজীবনের জন্য চোখে লেগে থাকা একটি দৃশ্য হয়ে থাকবে দর্শকদের মনে।

maxresdefault (1)

সিনেমার নির্মানের দিক বিবেচনা করলে দশ এর ভিতরে ৯ এর কাছাকাছি রেটিং দেওয়া যায় বাহুবালিকে। সিনেমার গ্রাফিক্স, ভিএফএক্স, সেট, দৃশ্যায়ন ভারতের রিজিওনাল সিনেমার হিসাবে বিচার করলে অনেক অনেক এগিয়ে থাকবে বাহুবলি। কেউ কেউ একে হলিউড মানের কাজ বলে আখ্যায়িত করছেন। সেদিক থেকে না দেখা গেলেও নির্মান ও ভিএফএক্সের কাজে অনেক এগিয়ে থাকবে বাহুবলি। মহেশমতি সম্রাজের স্ট্রাকচার, আকাশে প্রমোদোতরী ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া কিংবা সিনেমার প্রথম সেই জলপ্রপাত সবগুলো কাজ বেশ নিখুঁতভাবে করার চেষ্টা করেছে বাহুবালির ভি এফ এক্স টিম। এতো লো বাজেটে এই ধরনের কাজ আসলেই প্রশংসার যোগ্য। বাহুবালি ২ তে সিনেমার গান আগে রিলিজ না দিলেও গানগুলো ভালো ছিল, তবে বাহুবালি ১ এর গানগুলো আসলেই অসাধারণ ছিল। Pacha Bottasi কিংবা Dhivara গানগুলোর রিলিক্স কিংবা ভিজ্যুয়ালাইজেশন এক কথায় অপূর্ব। চাইলে গান দুটি শুনে ও দেখে নিতে পারেন নিচের লিংক থেকেঃ

Pacha Bottasi: click here

Dhivara: click here

অভিনয়ের দিকে যদি আলোকপাত করা যায়, তাহলে বলল সিনেমার পিছনে যদি সবার এতো ডেডিকেশন না থাকত তাহলে বাহুবালি ভারতীয় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারত না। প্রভাসের কথা আলাদা করে বলতে হবে। মিরচি, রেবেল, মিস্টার পারফেক্ট এর মত হিট সিনেমার পর তিনি বাহুবালিতে কাজ করেন। শুধুমাত্র এই সিনেমা করার জন্য আর কোন সিনেমাতে কাজ করেন নি। এতোটা ডেডিকেশন যখন সিনেমার প্রধান চরিত্রের থেকে পাওয়া যায় সিনেমা নিঃসন্দেহে ভালো হবে। প্রভাস মুলত অমরেন্দ্র বাহুবালি এবং মহেন্দ্র বাহুবালি দুইটি চরিত্রেই অভিনয় করেছেন। প্রতিটি চরিত্রের জন্য তিনি ভিন্ন ভিন্ন লুক এবং অভিনয় কৌশল নিয়েছিলেন। আপনি যদি ভালো করে লক্ষ্য করেন, দেখতে পাবেন মহেন্দ্র বাহুবালি কিন্তু অমরেন্দ্র বাহুবালির মত এতো বুদ্ধিসম্পন্ন ও যুদ্ধ কৌশনের রপ্ত ছিল না। দুইজনের চরিত্রের মাঝে বিস্তর ব্যবধান রেখেছিলেন পরিচালক এবং প্রভাস খুব সুন্দর করে তা ফুটিয়ে তুলেছে।

1494513424_baahubali-2

দেভসেনার চরিত্রের কথা যদি বলি তাহলে বলব আনুশকা শেঠি ছাড়া হয়তো এতো দারুণ করে এই চরিত্র অন্য কেউ এতো সুন্দর করে করতে পারত না। কোমল, অসহায় ও প্রতিবাদী এ তিনটি চরিত্রকে একই সাথে ফুটিয়ে তোলা অনেক কঠিন কাজ।

বাহুবালি চরিত্রের পর যদি দ্বিতীয় কোন শক্তিশালী চরিত্র থাকে তা হল কাট্টাপ্পা এবং রাজমাতা শিভগামী। রাজ্যের অন্তিম সময় রাজ্যকে বুদ্ধির সাথে রক্ষা করা, কিংবা বাহুবালিকে রাজা হিসাবে ঘোষণা করার সময় শিভগামী চরিত্রের দৃঢ়তা আপনাকে রামিয়া কৃষ্ণাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে। নিজের কথায় তিনি কতটা অটল তা কালকেরের সাথে কথোপকথন এর সময় আরো ফুটে উঠে-

ওকে বেঁচে থাকতে হবে, যদি ওর চোখ ও বের হয়ে আসে মুখমন্ডল থেকে তারপরো ওকে বেঁচে থাকতে হবে।

রাজামাতা চরিত্রে দৃঢ়তা, সাথে নিজ ছেলের প্রতি লুক্কায়িত ভালোবাসা এ চরিত্রটিকে ভিলেনের স্থান দিয়েছে অনেকের মনে।

Bahubali

রাজামার চরিত্র আসলে অবশ্যই তার সাথে কাট্টাপ্পার নাম অবশ্যই চলে আসবে। মহেশমতিকে অন্তিম মূহুর্তে বাঁচাতে রাজামাতাকে সাহায্যের মধ্যে দিয়েই কাট্টাপ্পা চরিত্রটি তার দায়িত্বের জানান দেয় দর্শকদের। বিশ্বাসের এক মূর্তপ্রতীকের অন্য নাম কাট্টাপ্পা। যাকে বীরের মর্যাদা দিয়ে অন্য রাজ্যের রাজা মুক্ত করতে চাইলেও মহেশমতির প্রতি দেওয়া প্রতিজ্ঞা জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে রক্ষা করতে সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কাট্টাপ্পা একই সাথে ভিলেন একই সাথে বাহুবালির ২য় প্রাণ। সত্যরাজ এই চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে গেছেন।

সিনেমার মূল ভিলেন হল বাল্লাদেভ। নিজের মনের মধ্যে কুটবুদ্ধি রেখে উপরে ভালোমানুষের মুখোশ পড়ে থাকা দূ মুখো সাপের নাম বাল্লাদেভ। বাল্লাদেভ চরিত্র কতটা খারাপ সেটা ফুটিয়ে তোলার জন্য পরিচালক বুনো ষাড়ের সাথে বাল্লার লড়াই দেখিয়েছেন। জানোয়ারের থেকে ভয়ংকর এক চরিত্রকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে রানা দুঙ্গাবতি। লীডার সিনেমার সেই রানা আর বাহুবালির এই বাল্লাদেভ কিন্তু এক মানুষ, চেহারা বা বডি দেখলে কি বোঝা যায়।

Bahubali-2-The-Conclusion-HD-Images-Pics-Wallpapers-Shooting-Stills

এবার একটু অন্যদিকে চিন্তা করা যাক। এইযে বাহুবালি সিনেমার এতো চরিত্র, মহেশমতি রাজ্য, সবই কি কল্পনা? না সব কল্পনা নয়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় এই মহেশমতি রাজ্যের অসিস্ত্ব ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে। ১৩ শতকের শেষদিক পর্যন্ত এই শহরের অস্তিত্ব ভারতীয় ইতিসাহবিদরা খুজে পান। মহেশমতি ছিল অভন্তি রাজ্যের এক অন্যতম শহর। বর্তমান মধ্যপ্রদেশের নার্মাদা নদীর পাশের শহরটি হল ইতিসাহের এবং রাজামৌলির বাহুবালির মহেশমতি।

বাহুবালি ছিলেন জৈন ধর্মের প্রবর্তক ‘ রিসাবা’ এর ছেলে। রিসাবার দুই ছেলে ছিল, একজন বাহুবালি আর একজন ভরাৎ। সিদ্ধি লাভের জন্য তিনি ভরাৎ কে বাবার রাজ্য ছেড়ে দিয়ে চলে যায় এবং এক বছর সাধনার জন্য নিমগ্ন হন। এক বছর পর নির্লোভ, কামহীনতা, সরলতার সিদ্ধিলাভ করেন এবং ধ্যান শেষ করেন। এক বছর ধ্যানে নিমগ্ন থাকার কারনে তার শরীর লতাপাতা উর্ধমুখী হবার অবলম্বনে পরিণত হয়। সমগ্র ভারতে বাহুবালির অনেকগুলো মুর্তি বা মন্দির রয়েছে (উইকি হিসাব মতে -৫ টি)। সেগুলোর ছবিতে দেখা যায় সিদ্ধি লাভের পর তার নগ্ন দেখ ও দেহ বেয়ে উর্ধমুখী লতানো পরগাছা। ইতিহাসবিদদের ধারনা অনুয়ায়ী রাজ্য ত্যাগ করার আগে বাহুবালি তার ভাই ভরাৎ এর সাথে ৩ ধরনের যুদ্ধে অবতীর্ন হতেন। যুদ্ধ গুলো ছিল – চক্ষু যুদ্ধ, জল যুদ্ধ এবং কুস্তি বা মল্ল যুদ্ধ। সকল যুদ্ধেই বাহুবালি জয় লাভ করতেন। যদিও তিনি ভাইকে রাজ্য দিয়ে সিদ্ধিলাভের জন্য পরে গৃহত্যাগ করেন। বাহুবালির মাঝে মহাভারতের অর্জুনের ছায়া পাওয়া যায়। মহাভারতের অর্জুনও ছিল বাহুবালির মতো অসাধারণ যোদ্ধা আবার তার হৃদয় ছিল সৎ ও কোমল।

অবন্তিকা চরিত্রের সাথে মিল পাওয়া যায় চিত্রাঙ্গদার। চিত্রাঙ্গদাও যুদ্ধের সময় যোদ্ধা ভূষণে ভূষিত হতেন, কিন্তু অর্জুনের সাথে দেখা হবার পর নিজের নারী সত্তার সন্ধান পায় চিত্রাঙ্গদা। দেভসেনার মাঝে পাওয়া যায় সীতাকে। বন্দী হয়েও যে দৃঢ়সংকল্প। রানা  চরিত্র অনেকটা দুর্যোধন আর রাবণের সংমিশ্রণে গড়া। দুর্যোধনের মতোই সে সিংহাসনলোভী আবার রাবণের মতোই শক্তিশালী, কপট। কাটাপ্পা বলা যায় মহাভারতের ভীষ্মের প্রতিরূপ। ভুল আর সঠিকের মাঝে দুলতে থাক এই চরিত্র নিজ দায়িত্ব ও কথার কাছে হার মেনেছে বারবার। হিন্দু পুরানে কালকেয়ারের কথাও বলা আছে। যে কিনা এক অসভ্য যোদ্ধা, যিনি ক্ষমতার জন্য কোন কিছুকে পরোয়া করত না।

রাজামৌলি কোন ইতিহাস থেকে সিনেমা তৈরী করেননি। তিনি শুধু কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রকে বাস্তবে নিজের মত রূপ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। আর এখানের রাজামৌলি সফল, এখানের বাহুবলি সফল। বাহুবালি কোন পারফেক্ট সিনেমা নয়, সাউথের নায়ক সুলভ অতিমানবীয় কিন্তু দৃশ্য এখানেই থাকবেই, তারপরও বাহুবালি একটি শিল্প। রাজামৌলির হাতের ছোঁয়াতে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক সিনেম্যাটিক শিল্প।

Baahubali: The Beginning (2015)
Baahubali: The Beginning poster Rating: N/A/10 (N/A votes)
Director: S.S. Rajamouli
Writer: Madhan Karky, Vijayendra Prasad
Stars: Prabhas, Tamannaah Bhatia, Nasser, Anushka Shetty
Runtime: N/A
Rated: N/A
Genre: Action, Adventure, History
Released: 10 Jul 2015
Plot: A dispute between two brothers.

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. অসংখ্য দূর্দান্ত রিভিউ এর জন্য।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন