জীবনের রঙের খোঁজে Dear Zindagi (2016)
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

জীবন মানে কি? জীবনের কোন না কোন একটা সময়এই প্রশ্নটার সম্মূখীন হয়েছেন কিংবা হবেন। এমন কি আমার ও আপনার কাছে একই প্রশ্ন আপনার কাছে কি মনে হয়- জীবন মানে কি? জীবন সম্পর্কে একেক জনের চিন্তা-ভাবনা, অভিব্যক্তি একেক রকম। আমার জন্যও ব্যতিক্রম কিছুনা। আমার কাছে জীবনের মানেটা কিছুটা এইরকম-

“জীবন মানে যুদ্ধ, যদি তুমি লড়তে পারো। জীবন মানে সংগ্রাম, যদি তুমি করতে পারো। জীবন মানে খেলা, যদি তুমি খেলতে পারো। জীবন মানে স্বপ্ন, যদি তুমি গড়তে পারো। জীবন মানে কষ্ট, যদি তুমি সইতে না পারো। জীবন মানে স্তব্ধতা, যদি তুমি বলতে না পারো। জীবন মানে হারিয়ে যাওয়া, যদি তুমি ধরে রাখতে না পারো। জীবন মানে ভালোবাসা, যদি তুমি বাসতে পারো। জীবন মানে জীবন, যদি তুমি বুঝতে পারো।”

তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়- জীবন মানে কি?

আমরা প্রায় সবাই মন এবং শরীরকে দুইটি আলাদা ব্যাপার ভাবতে অভ্যস্ত হলেও, এরা যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সে বিষয়ে একেবারে নিঃসন্দেহ। আবার শারীরিক অসুবিধার কারণে মন খারাপ হওয়াও আমাদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার। অতএব, মনের কারণে যে শারীরিক অসুবিধা হতে পারে তাতে আর কি সন্দেহ! সমস্যা হয় তখনি, যখন কেউ বলে এই যে আমার এত শারীরিক কষ্ট, যার জন্য এক দুর্বিষহ জীবন আমি ভোগ করছি, তার কারণ আসলে মানসিক! শুনতেই মনে হয় যেন সব ইচ্ছে করেই করছি, সবাই ব্যাপারটা গুরুত্বহীন ভাবছে, কিংবা আমাকে ভণ্ড ভাবছে।আসলে বিষয়টা সেরকম নয়। চিকিৎসা শাস্ত্রে এর আলাদা একটা নাম আছে। ইংরেজিতে বললে, Somatic Symptom Disorder আক্ষরিক অনুবাদ না করে সহজভাবে বলা চলে শারীরিক অসুবিধা সম্পর্কিত অসুস্থতা।এক্ষেত্রে, এক বা একাধিক উপসর্গ থাকতে পারে। এসব উপসর্গের অন্য কোনো রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা না থাকা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এসবের কারণে রোগীর অত্যন্ত অসুবিধা বোধ করা, এমনকি বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজেও ক্রমাগত ক্ষতি হওয়া। মোটকথা, রোগীর কষ্টটাই আসল। তার মানে মনের কষ্ট হলেও ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।

এমন ডিপ্রেশন বা মনঃকষ্টে ভোগা কায়রা নামের একজন ট্যালেন্টেড সিনেম্যাটোগ্রাফারের জীবনে ঘটে যাওয়া অতীত ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে শুরু হয় “ডিয়ার জিন্দেগি” সিনেমা। ভালোবাসার মানুষকে কাছে না পাওয়া, জীবনের বড় সুযোগকে নিজের হাতে দূরে সরিয়ে দেওয়া এবং নিজের কথা গুলো কাউকে শেয়ার করতে না পেরে নিজের ভিতরে প্রতিদিন মৃত্যুবরন করছে সে। হঠাৎ একদিন দেখা মিলে সাইকোলজিস্ট জাহাঙ্গীর খানের যার একটি কথা তাকে খুব বেশি আকৃষ্ট করে। কথাটি এমন অনেকটা –

‘আমরা মনে করি জীবনের গুরুত্বপূর্ন সব জিনিস পাওয়ার জন্য কঠিন রাস্তা দিয়ে যেতে হবে,কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।কিন্তু কেন! সহজ রাস্তা ও তো খুজে বের করা যায়,বিশেষ করে যখন আমরা ঐ কঠিন রাস্তার জন্য আমরা প্রস্তুত নই’

কায়রা জাহাঙ্গীর খানের কাছে ট্রিটমেন্ট নেওয়া শুরু করে। সে বলে তার রিলেশনের কথা, ডিপ্রেশনের কথা, তার জীবনে বড় না হয়ে উঠতে পারার কথা। জাহাংগীর খান তাকে একটি দারুন উদাহরণ দেয়। তিনি বলেন –

“তুমি দোকানে যখন চেয়ার কিনতে যাও তখন কি একটা চেয়ার দেখেই কিনে নিয়ে চলে আসো? তুমি একটার পর একটা চেয়ার দেখো। বসে দেখে, নেড়েচেড়ে দেখো, হাতে নিয়ে দেখো তারপর পছন্দ হলে সেটি কিনো। একটা সমান্য চেয়ার কেনার জন্য যখন এতোগুলো চেয়ার দেখো তাহলে জীবনে কাউকে সেটেল করতে চাইলে কেন একজনের পিছনে থাক? একজন হয়নি তো আর একজন দেখ, একসময় আসল মানুষটিকে পেয়ে যাবে। “

কায়রার জীবনে পরিবর্তন শুরু হয়। সে ঘুমাতে পারে শান্তিতে, আস্তে আস্তে ফিরে আসে তার স্বাভাবিক জীবনে। তারপরো কোথায় একটা কিছু রয়েছে, যা খুবই ক্ষুদ্র কিন্তু খুবই বড় একটি ব্যাপার। শৈশবের ঘটে আসা ঘটনা যা তাকে আজীবন পোড়াচ্ছে, তার উচ্ছ্বলতাকে নষ্ট করে দিয়েছে। কি সে ঘটনা? জানতে হলে দেখতে হবে ডিয়ার জিন্দেগী।

dear-zindagi-srk-alia-820

ডিয়ার জিন্দেগী শুধু একটি সিনেমা বা মুভি নয়, জীবন সম্পর্কে একটি দিকদর্শন বলা যায়। মা-বাবা থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষকে বার্তা দেওয়ার মত একটি সিনেমা ডিয়ার জিন্দেগী। আধুনিকতায় আমরা যা গা ভাসিয়ে দিয়েছি, কিন্তু ভালো থাকতে পারছি না। ভাবছি এটা করলে হয়তো ভালো লাগবে এটা করলে হয়তো শান্তি মিলতে পারে। কিন্তু সেই শান্তির পরশ আমরা কেউ পাচ্ছি না। সাধারনের মাঝে প্রচলিত ধারনা আছে যে মানসিক সমস্যা শারীরিক সমস্যার তুলনায় কম দেখা দেয় আবার এমনও ভাবতে দেখা যায় যে আমার মানসিক সমস্যা হবেনা কারন মানসিক সমস্যা হবার কোন কারন নেই। কিন্তু পরিসংখ্যান বলে যেসারা পৃথিবিতে প্রতি ১০ জনে ০১ জন নিউরোসিস বা হাল্কা মাত্রার মানসিক রোগ ও প্রতি ১০০ জনে ১ জন সাই কোসিস বা বড় মাপের মানসিক রোগে ভুগে থাকেন। ডিয়ার জিন্দেগি সেই সব মানুষের কথা বলেছে যারা ডিপ্রেশনে থেকেও তাদের কেউ কারণগুলো খুজে পায় না। পারে না কাউকে তার সবটা বলতে, নিজের মাঝে কথাগুলো রেখে প্রতিনিয়তি নিজের মনের মৃত্যু ঘটাচ্ছে। হয়তো আমাদের পাশে জাহাঙ্গীর খানের মত কেউ নেই যাকে আমরা নিজেদের কথা বলতে পারি না, বা থাকলেও আমরা তার কাছে যাই না পাছে লোকে কিছু বলে তাই।

ডিয়ার জিন্দেগি সিনেমাতে বুঝিয়ে দিয়েছে ছেলে মেয়েদের বিকাশের পিছনে তার বাবা মার ভূমিকা কতখানি। চাকরি বা জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের আশায় আমরা যারা ছেলে মেয়েকে দাদা-দাদী, নানা-নানী বা কোন ডে-কেয়ার সেন্টারে রেখে লালন পালন করি তাতে তাদের কতটুকু লাভ হয়? বাবা-মা কি একবার ও চিন্তা করে দেখেছে তার এতো টাকা বা স্বচ্ছল জীবনের থেকে কয়েকঘন্টা বা কয়েকটা মুহূর্ত সন্তানদের কাটানো, সন্তানের জন্য বেশি কার্যকর। মা বাবার পরিচর্যা না পেলে কোন বাচ্চারই মানসিক বিকাশ ঠিক ভাবে হয়না।যার ফলে সে বড় হয় নিজের মধ্যে সবকিছু চেপে রেখে।অনুভূতি প্রকাশ করার সাহস বা ইচ্ছা কোনটাই আর থাকেনা।সিনেমায় দেখানো এ সমস্যা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। কায়রা হয়তো জাহাংগীর খান এর মত সাইকোলজিস্ট পেয়েছে, তবে এমন অনেক কায়রা আছে যারা প্রতিনিয়ত নিজের ভিতরে কেঁদে মরছে।

হোপ প্রডাকশন্স এবং ধর্ম প্রডাকশন্সের সঙ্গে শাহরুখের রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্টের ফিল্ম ‘ডিয়ার জিন্দেগি’। ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ খ্যাত গৌরি শিন্দের পরিচালনায় এতে অভিনয় করেছেন শাহরুখ খান, আলিয়া ভাট, কুনাল কাপুর, আদিত্য রায় কাপুর, আলি জাফর, অঙ্গদ বেদি এবং ইরা দুবে। প্রথমদিকে মুভিটা একটু খাপছাড়া মনে হতে পারে অনেকের, কিন্তু ধীরে ধীরে যখন প্লট গভীরে যাবে তখন আপনি গৌরি সিন্ধের পরিচালনা অনুভব করতে পারবেন। হয়তো মনে হতে পারে ইংলিশ ভিংলিশ এর মত এতো সূক্ষ্ম কাজ হয়নি, কিন্তু এটাও বোঝা উচিত ডিয়ার জিন্দেগি আরো বেশি গভীর প্লট নিয়ে করা। মানুষের মনের অবস্থা খুব জটিল বিষয় যা খুব সহজে তিনি উপস্থাপন করতে পারেছেন।

অভিনয়ে আলিয়া ভাট কায়রা চরিত্রটি পুরো নিজের মত করে ফুটিয়ে তুলেছেন। আলিয়া ভাট প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। ভেবেছিলাম শাহরুখ খানের ছায়াতে হয়তো ঢেকে যাবে আলিয়া। কিন্তু আলিয়া ছিল সিনেমার প্রাণ, নিজেকে যেভাবে এগিয়ে নিয়েছে সেখানে শাহরুখ খানের দূর্দান্ত সাপোর্টিং রোল ফিকে হয়ে গিয়েছি কিছু কিছু সময়ে।

সিনেমার মিউজিক আর ক্লাইমেক্স ছিল অসাধারণ।  অমিত ত্রিভেদি একজন আন্ডাররেটেড মিউজিক ডিরেক্টর হলেও প্রত্যেক সিচুয়েশনকে ফিট করেছে গানগুলো। মিউজিকের সময় মনে হয়েছে হয়তো আমি নিজেই সমুদ্রের পাড়ে বসে ফায়ার ক্যাম্প করে গান শুনছি। আলী জাফরের গাওয়া Tu Hi Hai গানটি বেশ লেগেছে সিচুয়েশনের সাথে। সিনেমা ভালো কি খারাপ সেটা অনেকে যাচাই বাছাই করে, তবে কিছু কিছু সিনেমা আছে যা যাচাই বাছাই করা লাগে না। কিছু কিছু সিনেমা আছে যা দেখা উচিত, হয়তো ডিয়ার জিন্দেগি দেখার সময় আপনি নিজের সমস্যা খুজে পেতে পারেন, হয়তো ভাবতে পারেন এ আপনার ই কাহিনী।  তরুন প্রজন্ম এবং ফ্যামিলির জন্য মাস্ট- ওয়াচ একটি মুভি। যারা ডায়গল বেজড ড্রামা পছন্দ করেন তাদের কাছে দারুন উপভোগ্য লাগবে সিনেমাটি।

সবশেষে, প্রত্যেক বাবা মার উচিত এমন কিছু করা যেন, তার সন্তানেরা আজীবন মনে রাখতে পারে। এমন কিছু যা আপনি আপনার সন্তানকে বলতে পারেন, যা মনে করে ভাবতে পারেন আপনার শৈশব কতটা বৈচিত্রময় ছিল। সেটা হতে পারে –

“সমুদ্রের ঢেউ এর সাথে কাবাডি খেলা”

srk-alia-dear-zindagi

Dear Zindagi (2016)
Dear Zindagi poster Rating: N/A/10 (N/A votes)
Director: Gauri Shinde
Writer: Gauri Shinde
Stars: Shah Rukh Khan, Alia Bhatt, Angad Bedi, Kunal Kapoor
Runtime: N/A
Rated: UNRATED
Genre: Drama, Romance
Released: 25 Nov 2016
Plot: Kaira is a budding cinematographer in search of a perfect life. Her encounter with Jug, an unconventional thinker, helps her gain a new perspective on life. She discovers that happiness is all about finding comfort in life's imperfections.

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন