Assassination (2015) – দক্ষিন কোরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের উপাখ্যান
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

Assassination , Choi Dong-hoon পরিচালিত ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সাউথ কোরিয়ান স্পাই মুভি। যার প্লট গড়ে উঠেছে ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপান কর্তৃক কোরিয়া শাসন ও কোরিয়ানদের স্বাধীনতাকামী আন্দোলন নিয়ে। মুভিটি নিয়ে কিছু বলার আগে কিছু তথ্য আমাদের জেনে রাখা ভালো। কেন জাপান ১৯১০ সালে কোরিয়া খুব সহজে শাসন করার সুযোগ পেল আর কেনই বা এই সিনেমার নাম Assassination হল।

জাপানের ইতিহাস দেখলে দেখতে পাবো সব কিছুতে এদের নাক গলানোর স্বভাব পূর্বে থেকে ছিল। কোরিয়ো উপদ্বীপে এটা জাপানের প্রথম আক্রমণ নয় । ষোড়শ শতকের শেষ দিকে জাপান বেশ কয়েকবার শাসন করার চেষ্টা করেছে কোরিয়াকে । তবে ১৫৯৮ সালের মধ্যেই জাপানের আক্রমণের পরিমান একেবারে নিস্তেজ হয়ে যায় । তার কারন কিছুটা কোরিয়ানদের অভিনব রণকৌশল আর চীনের মিং সম্রাটদের সরাসরি হস্তক্ষেপ । মিং রা বুঝতে পেরেছিলেন জাপানকে কোরিয়াতে পা রাখতে দিলে চীনের প্রান্তিক রাজ্যগুলোর অবস্থা নাজুক হবে । তিনশো বছর পরে আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো । জাপান, প্রাশিয়ান বাহিনি কর্তৃক প্রশিক্ষিত হয়ে আধুনিক যুদ্ধ কৌশল সম্বন্ধে সম্পুর্ণ ওয়াকিফহাল আর কোরিয়া তখনো মধ্যযুগে পড়ে আছে । ১৮৭৬ সালে জাপানীরা কোরিয়ার উপরে বৈষম্য মুলক গাংহোয়া চুক্তি চাপিয়ে দেয় । ১৮৮৪ সালে তারা চীনপন্থী কোরিয়ান সরকারকে উৎখাত করে গায়ের জোরে ।১৮৯২ সালে কোরিয়ার চাষীরা বিদ্রোহ করে অত্যাচারী জমিদার আর শাসকদের বিরুদ্ধে , বিদ্রোহীরা নিজেরদের বাহিনীকে বলতো ‘তোংশাক বাহিনী’। চীন আর জাপান (কোরিয়া তখন দুই শক্তির মধ্যে বলা যায় যৌথ ভাবে শাসিত হচ্ছিল ) এদের দমন করতে বাহিনী পাঠনোর উদ্যোগ নেয়ার আগেই তোংশাকদের বিদ্রোহ স্তমিত হবে আসে । ১৮৯৪ সালের ৮ ই জুন জাপানী নৌ-সেনারা প্রথম কোরিয়ান উপদ্বীপে সরাসরি অভিযান চালায়। দ্রোহ দমনের অজুহাতে কোরিয়াতে সৈন্য পাঠানো উদ্দেশ্য আসলে ছিল চীনের কর্তৃত্ব যেটুকু আছে সেটাকেও খর্ব করে ফেলা । বলা যায় তৎকালীন জাপানী নৌবাহিনীর প্রায় সমস্ত যুদ্ধজাহাজ এসে ঘাঁটি গাড়ে কোরিয়াতে । সেপ্টেম্বরের পনেরো তারিখে জাপানী বাহিনী (এখন উত্তর কোরিয়ার রাজধানী) পিয়ং ইয়ং এর গ্যারিসন থেকে চীনা বাহিনীকে পরাস্ত করে অবশিষ্ট বাহিনীকে বের করে দেয় । শুরু হয় কোরিয়ার উপর জাপানি আগ্রাসনের বীজ বপন। এ বীজে পানি ও সার প্রদান করে ১৯০৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে হওয়া জাপান-কোরিয়া চুক্তি। স্বাক্ষর করেন জাপান ও কোরিয়া উভয় দেশের সম্রাট। চুক্তি অনুযায়ী কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে, কোরিয়ার স্বাধীনতা বজায় থাকবে এবং জাপান সে বিষয়ে কোরিয়াকে সাহায্য করবে। এবার সার ও পানি পেয়ে সেই ছোট বীজ পরিনত হয় চারাগাছে ১৯০৭ সালে নতুন জাপান-কোরিয়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর। চুক্তি অনুযায়ী কোরিয়া জাপানের বিধিবিধান অনুযায়ী চলবে। কোরিয়া সরকার নতুন কোন সম্পর্ক স্থাপনের আগে অবশ্যেই জাপানের কাছ থেকে সম্মতি নিতে হবে এবং ১৯০৪ সালে করা সকল চুক্তি বাতিল করা হল। শুরু হয় কোরিয়ো উপদ্বীপে জাপানের আধিপত্য।

চারাগাছ মাথা চড়া দিয়ে উঠে এক সুবিশাল বটবৃক্ষ্যে পরিনত হয় ১৯১০ সালে। যখন জাপান কোরিয়া পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় এবং ১৯১০ সাল থেকে কোরিয়া জাপানের একটি উপনিবেশ হিসাবে ইতিহাসের পাতায় অবস্থান নেয়। ১৯০১০ সালে নতুন করে করা হয় আর একটি চুক্তি যা ইতিহাসের পাতায় “Japan–Korea Annexation Treaty” নামে সুপরিচিত। চুক্তি অনুযায়ীঃ

➔কোরিয়ার জনগন ও কোরিয়ার সরকার জাপানের সরকারের প্রতি আনুগত্য থাকবে।
➔কোরিয়ার শাসন পরিচালিত হবে কোরিয়ায় নিযুক্ত জাপানের গভর্নর জেনারেল দ্বারা।

Assassination সিনেমার শুরু এখান থেকেই।

big

————————————————————————–
মুভিঃ Assassination

সালঃ ২০১৫

দেশঃ সাউথ কোরিয়া

পরিচালকঃ Choi Dong-hoon

অভিনয়ঃ Jun Ji-hyun, Lee Jung-jae, Ha Jung-woo

ধরণঃ স্পাই থ্রিলার
————————————————————————–

১৯১১ সালে এক কোরিয়ান ব্যবসায়ী তার ভাগ্য ফেরানোর আশায় জাপানের গভর্নর জেনারেলের সাথে বৈঠক করছে। হঠাৎ সেখানে এক গেরিলা হামলা হয়। মরতে মরতে বেঁচে যায় সে আর জেনারেল। বাসায় এসে জানতে পারে তার স্ত্রী স্বাধীনতা কামীদের সাথে জড়িত। সে চায় জাপানি মুক্তি কোরিয়া, যেখান তার জমজ শিশু কন্যারা হেসে খেলে বড় হবে। কিন্তু পালিয়ে যাবার সময় ধরা পড়ে যায় সে। হত্যা করা হয় তাকে। সিনেমার দৃশ্য চলে যায় ১৯৩৩ সালে, তখন সমগ্র কোরিয়া জুড়ে ৩০ টির মত স্বাধীনতাকামী সংগঠন ছিল। তাদের সবার ইচ্ছা ছিল স্বাধীন কোরিয়ার। কারন সবাই স্বাধীনতা চায়, পরাধীনতার চাদরে কেউ ঢাকা থাকতে চায় না। পর্দায় দেখা মিলে ৩ জন স্বাধীনতাকামী যোদ্ধার, যারা কোরিয়ার স্বাধীনতার জন্য শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে চান। তাদের প্রধান লক্ষ্য গভর্নর জেনারেল ও দেশের মাঝে মানুষরুপী নর্দমার কীটকে গুপ্তহত্যা করে জাপান সরকারকে বাধ্য করা কোরিয়া থেকে চলে যাবার জন্য। শুরু হয় মিশন Assassination বা মিশন গুপ্তহত্যা। পারবে কি মিশন সফল করতে তারা? প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দেখতে হবে স্পাই থ্রিলার “Assassination”।

Assassination সিনেমাতে সে সময়ের বিশেষ কিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে। তখনকার সময়ে কোরিয়ানদের মানুষ বলে মনে করা হত না। ফুলের ন্যায় শিশুদের বিনা অপরাধে মেরে ফেলা হত। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরো ভয়াবহ। ইতিহাস বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের সেনা-ছাউনিতে ছিলেন ‘কমফর্ট উইমেন’ বা আরামদাত্রী হিসেবে। জাপান তার নিজের সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে অবধি আরামের কথা, মানে যৌনতার চাহিদার কথা খেয়াল রেখেছে। জাপান সবচেয়ে বেশি এই অত্যাচার চালিয়েছে কোরিয়ান মেয়েদের ওপরেই। কত মেয়ে কোরিয়া থেকে জাপানি সেনাদের যৌন ক্রীতদাসী হয়েছে, কোনও হিসেবই নেই— কুড়ি হাজার থেকে শুরু করে তিন-চার লাখও হতে পারে। ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ অবধি জাপান টানা কোরিয়াকে শাসন করেছে। আর তাই ওখান থেকেই সবচেয়ে বেশি মেয়ে আরামদাত্রী হিসেবে অত্যাচারিত হয়েছে ভয়ঙ্কর, মর্মান্তিক ভাবে। চটকে, পিষে, থেঁতলে গিয়েছে শরীর। একটা সময় পচা কমলালেবুর মতো থ্যাপ করে পড়ে গিয়ে ছেতরে গেছে। তার পর সত্যি পচে গিয়ে মরে গেছে। সেনা ব্যারাক বা ছাউনিতে সৈন্যরা স্থানীয় লোকদের দিয়ে কিছু খড় বিছিয়ে নিত সেই সব ট্রেঞ্চে। সেখানে সাপ্লাই হত বারো-তেরোর বছরের মেয়েরা। তাদের যোনি তখনও ঠিক মতো তৈরি হয়নি। কিন্তু তাতে যে ধর্ষণ আটকায় না। কিমিকো কানেদা-র, এক কোরিয়ান মহিলা মুক্তির পর বলেন-

❝আমার তখন কতই বা বয়স হবে, সতেরো-আঠারো। আমায় বলেছিল কাজ দেবে। তখন আমাদের চার দিকে বড্ড অভাব। রোজ ঠিক করে খেতেও পাই না। সেনাদের ছাউনিতে কাজ। ওদের জামাকাপড় কাচা, রান্না করে দেওয়া, সেলাই করা, ছাউনি পরিষ্কার রাখা। আমার মতো আরও অনেকে নাকি করতে যাচ্ছে। আমরাও গিয়েছিলাম। ওই সব কাজ করেওছিলাম। তবে আসল কাজ ছিল জাপানি সৈনিকদের কাছে ধর্ষিত হওয়া। কপাল ভাল থাকলে দিনে পাঁচ বার, আর খারাপ থাকলে দিনে কুড়ি বার। ওরা একেবারে ক্ষুধার্ত বন্য কুকুরের মতো হয়ে থাকত। সকাল থেকে হয়তো কুড়ি জন এসে পর পর ধর্ষণ করত। করেই যেত। কী যে কষ্ট হত, কী যে কষ্ট, বাপ রে! মনে পড়লে মনে হয় এখুনি আবার দম আটকে যাবে। আমার যোনি সব সময় ছেঁড়া ছেঁড়াই থাকত। হাঁটতে পারতাম না ঠিক করে। গা বমি দিত সারাক্ষণ। গর্ভপাত হয়েছে আমার দু-তিন বার। আর কুড়ির কোঠা পেরোতে না পেরোতে জরায়ু বাদ হয়ে গিয়েছে। আমি আর মা হতে পারিনি।❞

হয়তো এমন চিত্র Assassination সিনেমাতে ফুটিয়ে তুলে নি। কিন্তু সিনেমার শেষ যুদ্ধাপরাধ এর দায়ে আটক কোরিয়ান নাগরিকের ছাড়া পাবার মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রমানের অভাবে কত যুদ্ধাপরাধী আইনের ফাঁক দিয়ে বেড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু যারা প্রতক্ষ্যদর্শী তারা জানে কতটা অপরাধ সে করেছে, তাদের কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়া যায়না।

সিনেমার কাস্টিং নিয়ে না বললে আসলেই অপরাধ হয়ে যাবে। সিনেমার প্রাণ ছিল Jun-Ji-Hyon। কি অসাধারন অভিনয় আর দূর্দান্ত অভিনয়। বোনের বিয়ের পোশাকের দিকে তাকিয়ে তার চাঁপা কান্না কিংবা সিনেমার শেষ দৃশ্যে চোখে প্রতিশোধের আগুন সব দিকে নিজেকে যেন বার বার ছাপিয়ে গিয়েছেন তিনি। এছাড়া দ্য বার্লিন ফাইল, দ্য টেরর লাইভ কিংবা দ্যা ইয়োলো সী খ্যাত অভিনেতা Ha Jung-woo এর কথা না বললেই নয়। শান্ত চরিত্রে কখনো প্রেমিক, কখনো একজন চৌকস বুদ্ধি সম্পন্ন স্পাই কখনো বা প্রতিবাদের আগুনের ফুঠে উঠা এক রূপ, সব কিছু মিলিয়ে দারুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন Ha Jung-woo তার চরিত্রটিকে।

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর সিনেম্যাটোগ্রাফী দেখলে আপনার মনে হবে আপনি সেই ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ এর সময় চলে গিয়েছেন। পরিচালক Choi Dong-hoon এর পঞ্চম মুভি Assassination, বাকি মুভিগুলোর মতো এটিও ব্যবসাসফল । বর্তমানে দক্ষিন কোরিয়ার সবচেয়ে বেশি আয় করা মুভির ভিতরে ৭ম অবস্থানে আছে এ মুভি ।

সিনেমাটি দক্ষিন কোরিয়াতে নির্মিত হলেও সিনেমার সময়কালে দুই কোরিয়া অবিভক্ত ছিল। সমগ্র কোরিয়াবাসীর লক্ষ্য ছিল একটি সুখী সমৃদ্ধ কোরিয়া নির্মান করার। ১৯৪৫ সালে জাপান ২য় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হলে কোরিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু নিজেদের ও বিশ্বরাজনীতির স্বীকারের কারনে অবিভক্ত সংগ্রাম করেও নিজের জাতীয়তাকে এক রাখতে পারে নি কোরিয়া। উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিন কোরিয়া নামে দুভাগে বিভক্ত হয়ে এখন বিশ্বমানচিত্রে দাড়িয়ে আছে ৩৫ বছর জাপানী শোষনের স্বীকার দেশটি।

Assassination কোরিয়ার নবজাগরনের প্রতীকী এক সিনেমা। দেশপ্রেম ও স্বাধীনতাবোধে জাগ্রত কয়জন অকুতোভয় সৈনিকের এক মিশনের গল্প। প্রতিটি দেশের জন্মের পিছনে এমন বহু গল্প জড়িয়ে আছে। কোরিয়ানদের তথা বিশ্ববাসীর কাছে তৎকালীন কোরিয়ার উপর চলে আসা অত্যাচার ও স্বাধীনতার ইতিহাস তুলে ধরার এক ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা দেখিয়েছেন পরিচালক Choi Dong-hoon। আমাদের দেখা অন্যতম সেরা সাউথ কোরিয়ান সিনেমার মাঝে স্থান করে নিয়েছে Assassination(2015)।

ডাউনলোড লিংকঃ ক্লিক করুণ

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন