রোমান পোলানস্কি’র “অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজি”

১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহন করা চলচ্চিত্র নির্মাতা রোমান পোলানস্কির জীবন নানা অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। ১৯৬২ সালে নাইফ ইন দ্যা ওয়াটার নামে একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মানের আগে তিনি বেশ কিছু শর্ট ফিল্ম নির্মান করেন। নাইফ ইন দ্যা ওয়াটার সিনেমা তাকে বিশ্ব পরিচিতি এনে দেয়। সিনেমটি বিদেশী ভাষার সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে মনোনীত হয়েছিল। এর পর তিনি বেশ কিছু সফল সিনেমা নির্মান করেন যার প্রায় সবকটিই সাইকোলজিক্যাল বিষয় নিয়ে। ১৯৬৫ সালে তিনি বানান তার সাইকোলজিক্যাল হরর মাস্টারপিস “রিপালশন”। রিপালশন অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজির প্রথম ছবি। আর এই অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজিই আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। যে তিনটা ছবি নিয়ে এই অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজি সেগুলো হলো রিপালশন, রোজমেরিস বেবি ও দ্য টেনান্ট। প্রথমেই বলে নেই, অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজি নামটা পোলানস্কির নিজের দেয়া না। ভক্ত-অনুরাগীরা ভালোবেসে এই নামট দিয়েছেন। কারণ সিনেমা তিনটির কাহিনী একটা জায়গায় মিলে যায়, সবগুলো সিনেমার কাহিনী আবর্তিত হয়েছে অ্যাপার্টমেন্ট ঘিরে।

Repulsion​ (1965)

রোমান পোলানস্কি’ র কাল্ট ক্লাসিক ফিল্ম Repulsion​ (1965) এ একজন মানষিক বিকারগ্রস্থ মানুষের আত্মিক ও মনের চিত্র সুন্দর করে অংকিত করেছেন। মুভিটির নামকরণের দিকে যদি সব কিছু দূরে রেখে বিশ্লেষন করা হয় তাহলে দেখতে পাব যে, ভয়, হিংস্রতা এবং রহস্য এই তিনটি দিক সুনিপুন ভাবে মিশিয়ে নাম করণ করা হয়েছে “Repulsion”, যাকে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “বিকর্ষণ।“ এমন নামকরণের সার্থকতা নিয়ে পরে আলোচনা করছি। মূল গল্পে প্রবেশের আগে বলে রাখি রোমান পোলানস্কির এই মুভিকে অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজির প্রথম ফিল্ম বলা হয়ে থাকে। কারণ পুরো ফিল্মের কাহিনী আবর্তিত হয়ে একটি ফ্লাটকে কেন্দ্র করে।

repulsion-poster-for-1965-comptontekli-film-with-catherine-deneuve-aw9mfn

মুভির শুরুতেই অস্বাভাবিক এবং অস্বস্তি গ্রাস করে নিবে যখন পর্দায় দেখা যাবে একটি বড় চোখ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ধীরে ধীরে ক্যামেরা কাছ থেকে দূরে সরে যাবে, পর্দায় তখন আবির্ভাব হবে এই চোখের অধিকারিণী একজন ফ্রেঞ্চ বিউটিশিয়ান। নাম ক্যারোল, বসবাস করে বোনের সাথে লন্ডনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে। বিউটিশিয়ান হলেও মূলত ক্যারোলের কাজ হল ম্যানিকিউর করা। যদিও তার নিজের একটি বদ অভ্যাস রয়েছে নিজের নখ নিজের দাঁত দিয়ে কাটতে থাকা। ক্যারল সুন্দরী, লাজুক, অর্ন্তমুখী, মিতভাষী। তার মোহনীয় রূপে অনেক পুরুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে থাকে। তাকে একবার চুম্বনের নেশায় রাস্তায় অপেক্ষা সময় কাটিয়ে দেয় অনেকে। কিন্তু এসব দিক থেকে ক্যারোল একেবারে নির্লিপ্ত। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তার কোন মনঃসংযোগ নেই, নেই কোন অনুভূতি। মুভিতে সময় যত যেতে থাকে তত আমরা বুঝতে থাকে ক্যারোল কোন স্বাভাবিক মানুষ নয়। বুঝতে পারি ক্যারল পরিষ্কারভাবে একটি স্নায়ুবৈকল্য একজন মহিলা। কিন্তু তার এই সমস্যা তার আপন বোন বুঝতে পারে না। সে তার প্রেমিকার সাথে রাতের অভিসারে মিলিত হলে, তাদের প্রানোচ্ছ্বল ক্যারোলকে আরো বিরক্ত করে তোলে। প্রতি রাতে বোনের বিবাহিত প্রেমিক ও বোনের অভিসারের শব্দ তার নিকট ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ছুটি কাটানোর জন্য বোন ও তার প্রেমিক তাকে একা রেখে চলে যায় প্যারিস। এরপর শুরু হয় মুভির আসল উত্তেজনা। ক্যারোলের মানষিক বিকারের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে একে একে। প্রতিরাতে ঠিক যখন তার বোন মিলিত হল অভিসারে সেই সময়ে ঘড়ির কাটার টিক টিক শব্দের সাথে তার পাশে এসে কেউ শুয়ে পড়ে। জোড় করে মিলিত হয় অভিসারে। আসলেই কি কেউ আসছে? নাকি লুকিয়ে আছে কোন অন্য ঘটনা? জানতে চাইলে চোখ রাখুন মনিটরে।

রোমান পোলানস্কি আমার দেখা অন্যতম সেরা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের নির্মান কারিগর। মুভির জন্য তিনি একটি বড়, বেশ পুরানো দেখতে একটি অ্যাপার্টমেন্ট এ শুটিং করেন যেন থ্রিলারের আবহওয়া পুরোপুরি সৃষ্টি হয়। এছাড়া ক্যারলের বিকারগ্রস্ততা বুঝানোর জন্য সাধারণ কিছু ঘটনাই বেছে নেন পোলানস্কি। ঘড়ির টিকটিক, পানির টুপটুপ, দরজা ঠকঠকআওয়াজ, নিচের রাস্তায় কেউ একজন হেঁটে যাচ্ছে, কারো ফিসফাস। পাশের ঘর থেকে বিছানার ক্যাঁচক্যাঁচ শোনা যায়, বড় বোনের অভিসারের আওয়াজ ভেসে আসে। ক্যারোল বালিশ দিয়ে কানচাপা দেয়। তার অসহ্য লাগে, অসহনীয় ঠেকে সবকিছু। প্রতিদিনকার এই শব্দগুলো যেন ক্যারোলকে বিরক্ত করতে থাকে। সব দিক থেকেই রিপালশন একটি মাস্টারপিস কাল্ট ক্লাসিক থ্রিলার। সব ধরণের সাধারণ এবং জৈবিক চাহিদার প্রতি ক্যারোলের অনিহার কারণেই ফিল্মের নাম রাখা হয় “রিপালশন।“ অনিহার কারণ জানতে পারবেন সব শেষে, একটি স্থির চিত্রের মাধ্যমে ।

মুভির প্রাণ হল মুভির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়কারী অভিনেত্রী ক্যাথরিন ডেনিয়ুব। শান্ত স্বভাবের ঠান্ডা মাথার যেমন অভিনয় দরকার ঠিক তেমন করে গেছেন। পুরো মুভিতে তিনি বল যায় নির্বাকের অভিনয় করেছেন। দু একটি কথা আর আর্তনাদ ছাড়া তেমন কোন সংলাপ নেই তার, তারপর ও পুরো মুভিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে রেখেছিলেন তিনি।

অনলাইন ওয়াচ (সাব টাইটেল সহ): 

 

Rosemary’s Baby (1968)

রোমান পোলানস্কি’র অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজির দ্বিতীয় ফিল্ম ‘Rosemary’s Baby (1968)। চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাইকোলজিক্যাল মুভি হিসাবে যার নাম লেখা রয়েছে। অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজির সেরা ফিল্ম হিসাবেও অনেকেই একে আখ্যায়িত করে থাকেন। রোজমেরি’স বেবি মুভিটি একই সাথে আপনাকে দিবে বিভিন্ন দিকে চিন্তা করার সুযোগ এবং একই সাথে দিবে একজন মায়ের সন্তানের প্রতি প্রগাড় মমতা অনুভবের অনুভূতি।

13511034_10205124225663570_4089708773742279255_n

আগের মুভির মত এই মুভির অধিকাংশ কাহিনী হয়ে থাকে একটি অ্যাপার্টমেন্টে। নতুন স্থানের জন্য রোজমেরী এবং তার স্বামী বাসা খোঁজা শুরু করে। মনের মত একটি বড় বাসা পেয়েও যায় তারা। কিছুদিন আগে এই বাসায় যে বৃদ্ধ মহিলা থাকত সে মারা গিয়েছে। তার কিছু আসবাব পত্র ছাড়া কিছু তেমন নেই এই বড় বাসাটিতে। রোজমেরির বাসাটি ভালো লাগার জন্য তার স্বামী বাসাটি নিয়ে নেয়। কিন্তু বাসার একটি রুমের পার্টিশন এমন ভাবে করা থাকে যে অন্য ফ্ল্যাটে কি হচ্ছে তা প্রধান শয়ন কক্ষ থেকে শোনা যায়। আর এই স্থানটি হল সব থেকে বড় যোগসূত্র মুভির কাহিনী উন্মচোন করার। রোজমেরি যখন এই বাসাটিতে আসে তখন সে ছিল নিঃসন্তান। তার স্বামীর ও ভালো কাজ হাত থেকে ছুটে যাচ্ছিল। অন্য অভিনেতা নিয়ে নিচ্ছে তার কাজগুলো। হুট করে সুখবর আসে রোজমেরির সংসারে। সন্তান আসছে তাদের ঘরে। ভালো ভালো কাজ ও পেয়ে যায় তার স্বামী। কিন্তু হুট করে এতো ভালো কিছু কেন ঘটছে? ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থেকে রোজমেরির সামনে সকল সত্য……… বাকিটা পর্দায় দেখবেন।

স্পয়লার এলার্ট 

আসলে রোজমেরি’স বেবি মুভিটি তখনকার সময়ের বিবেচনাতে খুব দূরদর্শী মুভি ছিল। হিচককের মুভির মত হয়তো মুভিটিতে খুব বড় শকিং কিছু নেই কিন্তু মুভির শেষদিকে আধুনিক মানুষের বেশ খারাপ রূপ উন্মোচিত হয়। মুভিটি ইরান লেভিন এর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে। কিন্তু মুভিটি সম্পুর্ণ উপন্যাস অনুসরণ করে নির্মান করেন নি রোমান পোলানস্কি। উপন্যাসের হিসাবে একেবারে শেষদিকে আধুনিক মানুষের কালো যাদু বিদ্যা কিংবা শয়তানের পূজার দিক উন্মোচন করে। কিন্তু রোমান পোলানস্কি মুভির মাঝামাঝিতে দেখিয়ে দিয়েছেন কি করে একটি মানুষকে কালো যাদু বিদ্যা কিংবা শয়তানের পূজার মাধ্যমের নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। ঘুমের মাঝে রোজমেরি দেখতে পায় যে অনেক পিশাচ তার সাথে মিলিত হচ্ছে। ঘুম ভেঙ্গেও সে কথা তার স্বামীকে বলে কিন্তু তার স্বামী সে কথা উড়িয়ে দেয়। কারণ তার স্বামী নিজের ক্যারিয়ারের জন্য নিজের সন্তানকে কালো যাদুর বলি করার সিন্ধান্ত নেন। তাদের পাশে যে প্রতিবেশীরা থাকত সবাই একটি কমিউনিটি করে নিয়েছিল। কারণ তাদের লক্ষ্য ছিল তাদের এই যাদুর ঈশ্বরের চোখ প্রদান করা। যা হতে হবে একটি শিশুর, তাই বেছে নেয় এই রোজমেরির অনাগত সন্তানকে। এখানে আমরা দেখতে পাই হিচককের Suspicion মুভির মত ঘটনা, যেখান স্ত্রী স্বামী দ্বারা প্রতারিত হয়। যদিও হিচককের অন্যসব হরর মুভির মত ক্ষমা না রেখে এখানে যা হওয়ার কথা তাই করে দেখিয়েছেন পোলানস্কি। রোজমেরি বই মারফত সব জানতে পারলেও এই চক্রটি এমন সংঘবদ্ধ যে তার হাত থেকে অনাগত সন্তানকে রক্ষা করতে পারেনি। কারণ সন্তানের বাবা তার স্বামী না, সে স্বপ্নে যে শয়তানের আকৃতি দেখেছিল তার সাথে মিলনের ফসল হল এই সন্তান।

মুভিটি সাইকোলজিক্যাল নাকি হরর মুভি এমন বিতর্ক যদিও আছে। আমার মতে এটি ভয় ছাড়া দারুণ এক হরর মুভি। কারণ এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কালো যাদু/ ব্ল্যাক ম্যাজিক এবং শয়তানের পূজা নিয়ে। মুভিটি আমার দেখা অন্যতম সেরা হররের তালিকায় থাকবে কারণ মুভির শেষদিকে যে চোখের দিকে ফোকাস করা হয়ে থাকে সেই দৃশ্য কিন্তু ভোলার মত নয়।

ডাউনলোড লিংকঃ ক্লিক করুণ

The Tenant(1976)

বিশ্বখ্যাত পোলিশ পরিচালক রোমান পোলানস্কি’র অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজির সর্বশেষ চলচ্চিত্র “The Tenant – ভাড়াটে (One Apartment can change your identity) ” :3 আমার মতে রোমান পোলানস্কির সব থেকে শক্তিশালী সিনেমা এই “ভাড়াটে (One Apartment can change your identity)”.

One Apartment can change your identity এই ট্যাগ লাইন দিয়েই আপনি বুঝতে পারবেন আসলে পুরো আইডেন্টিটি মনে হয় বদলে গিয়ে থাকবে। যদি ভেবে থাকেন লেখাটিতে স্পয়লার আছে তাহলে আমি বলব হ্যাঁ স্পয়লার আছে কিন্তু তা আপনাকে সিনেমাটি দেখতে বিন্দুমাত্র সাহায্য করবে না। কারণ হিসাবে সিনেমাটি একটি ওপেন এন্ডিং সিনেমা। নিজের মত করে চাইল ব্যখ্যা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সিনেমা নিয়ে আলোচনা করার জন্য আপনাকে স্বাগতম। তা যা বলছিলাম পোলানস্কির সব থেকে শক্তিশালী সিনেমা এই “ভাড়াটে”, কারণ হিসাবে আমি উপস্থাপন করব শুধুমাত্র রোমান পোলানস্কিকে । সিনেমাটিকে অনন্য স্থানে নিয়ে যাবার জন্য তিনি শুধু ক্যামেরার পিছনে থাকেন নি, চলে এসেছেন ক্যামেরার সামনে। একেবারে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় তাকে, হ্যাঁ ট্রেলকোভস্কি চরিত্রে অভিনয় করছেন এই পোলিশ সম্রাট।

icrtmawcnarmbig

সিনেমা শুরু হয় বেশ বড়সড় ধাক্কা দিয়ে। ট্রেলকোভস্কি থাকার জন্য একটি আবাস্থান খুঁজতে থাকে, পেয়েও যান সেটা তবে বেশ উচ্চমূল্য এবং কিছু শর্ত সাপেক্ষে। শর্ত হল শব্দ করা যাবে না, কারণ এই বাড়িতে যারা বসবাস করে তার খুব শান্তিপ্রিয়। ট্রেলকোভস্কি যে ফ্ল্যাটে উঠে সেখানে আগে থাকত একটি মেয়ে যিনি কিনা জানালা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এবং সে এখন হাসপাতালে আছে। কি ভাবছেন? এ আবার এমন কি কাহিনী যা নিয়ে সিনেমা করা লাগবে। আসলে সিনেমা বিষয়টি এমনি আমারা যা দেখি বা যা চিন্তা করি তা হঠাৎ করে পরিবর্তন করা হল সিনেমার কাজ। সিনেমার মূল কাহিনী শুরু হয় ঠিক ৫০ মিনিট পর এবং প্রতিটি সীন আপনাকে ভাবাবে কিন্তু আপনি উত্তর পাবেন না। ট্রেলকোভস্কি চেয়ার সরালে সমস্যা, ড্রয়ার খুললে সমস্যা, রেডিও শুনলে সমস্যা এমনকি কাশলেও সমস্যা। প্রতবেশীদের আচরণও উদ্ভট থেকে উদ্ভটতর হতে থাকে। কারণ কোন শব্দ করা যাবে না। প্রবল মানষিক সমস্যাতে ভুগতে থাকে সে। অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে গিয়েও কিন্তু স্বস্তি মিলে না ট্রেলকোভস্কির। রেস্টুরেন্টে গিয়ে এক অর্ডার দিলে ওয়েটার বারবার ভিন্ন অর্ডার নিয়ে আসতে থাকে। ওয়েটারের নিয়ে আসা ওই অর্ডারটাই যা মৃত সিমন শুল দিতেন। লাজুক, অর্ন্তমুখী ট্রেলকোভস্কি বিরক্ত হয়, মেজাজ হারায়। অন্যের ইচ্ছা মোতাবেক চলতে চলতে সে আপন সত্ত্বাই হারাতে বসে। তার ধারণা হয় সমগ্র প্যারিসবাসী এক জোট হয়েছে তাকে মৃত সিমন শুলের ধাঁচে গড়ার। প্রবল আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগতে শুরু করে সে। সকালের নাস্তায় শুল যা খেত, তা-ই খায়, নিজের সিগারেট ব্র্যান্ডও সে পাল্টে ফেলে। এমনকি অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে সে মাথায় উইগ পরে, ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়, চোখে দেয় আইলাইনার। সে আর ট্রেলকোভস্কি থাকে না, সে হয়ে যায় সিমন শুল!

ট্রেলকোভস্কির ফ্ল্যাটে কোন বাথরুম নেই, সবার জন্য কমন একটি বাথরুম যা সেই জানালা দিয়ে দেখা যায়। ট্রেলকোভস্কি প্রতি রাতে দেখে সেই বাথরুম থেকে দাঁড়িয়ে তার জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে বাড়ির বাসিন্দারা। কিন্তু কেন? আচ্ছা যদি ঘুম থেকে উঠার পর দেখেন আপনার একটি দাঁত নেই এবং সেটি যে মেয়েটি মারা গেছে তার রেখে যাওয়া দাঁতের পাশে অবস্থান করছে কি করবেন? কিছুতো বাকি রাখা লাগে, তাই রেখে দিলাম বাঁকিটা সিনেমাতে দেখবেন।

সিনেমার এন্ডিং নিয়ে যদি বলি তাহলে এটি একটি ওপেন এন্ডিং সিনেমা, আপনি চাইলে বিভিন্নভাবে ব্যখ্যা করতে পারেন। অনেকের কাছে এটি একটি সাইকোলোজিক্যাল থ্রিলার, অনেকের কাছে মিস্ট্রি থ্রিলার। সবার কথা জানি না, আমার কাছে মনে হয় সিনেমাটি একটি লুপ ছাড়া আর কিছু না। কারণ হিসাবে আমার যুক্তি হল তিনটি দৃশ্য –

(i) সিনেমার শেষ এবং প্রথম দৃশ্য। নিজেকে সিমন শুলের ফ্রেন্ড হিসাবে দাবী করা এবং সিমন শুলের কাপড় খুব ভালোভাবে তার গায়ে লেগে যাওয়া।
(ii) ট্রেলকোভস্কি বাথরুম থেকে নিজেকে নিজের ফ্ল্যাটে আবিস্কার করা।
(iiI) ফ্ল্যাটে অবস্থান করেই খুব সুন্দর করে সিমন শুলের দাঁতের অবস্থান বের করে ফেলা এবং সিমন শুল যে সিটে বসত ঠিক সেই আসনে গিয়ে বসা।

দ্য ট্যানান্ট – ভাড়াটে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিমত হল রোমান পোলানস্কির সব থেকে সেরা সৃষ্টি ভাড়াটে। পোলানস্কির সেরা কাজ পিয়নিস্ট হিসাবে অনেকে বলে থাকলেও আমার কাছে ভাড়াটে বেষ্ট। কারণ এমন দারুণ থ্রিলিং ও মাথা নষ্ট চিন্তা করার সুযোগ তিনি আর কোন সিনেমাতে দিয়েছেন বলে আমি মনে করি না। আপনি যদি না দেখে থাকেন তাহলে অবশ্যই দেখবেন, কারণ আপনি তখন চাইবেন চিন্তা করতে। মাথায় তখন একটি ভাবনা থাকবে, “এ কি হল ! কেন হল ! , জানি না, জানি না”
মনে শুধু একটি নাম থেকে যাবে The Tenant – ভাড়াটে :3

ডাউনলোড লিঙ্কঃ ক্লিক করুণ

(Visited 495 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন