“পিতা” আমার দেখা ২০১২’র সেরা বাংলা সিনেমা

543033_494621887235814_809352690_n
এ বছর ভাল মানের বেশ কিছু বাংলা সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু আমার দেখা সবচেয়ে পছন্দের সিনেমার নাম জিগেস করলে “পিতা” সিনেমাটার নাম বলবো। এটার কাহিনী গড়ে উঠেছে মূলত ১৯৭১ সালের একটি গ্রামের দুই দিনের গল্প নিয়ে। তখনকার আধুনিক সভ্যতা থেকে পিছিয়ে থাকা এই গ্রামে কোন সংবাদ মাধ্যম ছিল নেই। পুরো গ্রামে একজনের কাছে একটা রেডিও আছে কিন্তু সেটা কেউ বাজাতে পারে না। দুইদিনের প্রথম দিন সকাল বেলা এই গ্রামে ঢুকে পরে বুনো শুকর, তারপর গ্রামের সব মানুষ এক হয়ে শুকর তাড়িয়ে দেয়। দিনটিতে গ্রামে আনন্দ বেদনার বিভিন্ন চিত্র ফুটে উঠে। ঠিক পরদিনই গ্রামে হাজির হয় পাকিস্তানি মিলিটারির মত একদল বুনো শুকর। তারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে। এই সময়টাতেই এক পিতা তার সন্তানদের বাচাঁতে ছোঁরা, বাশঁ, বর্শা, বল্লমসহ নানা গ্রামীন অস্ত্র নিয়ে নেমে পড়ে মিলিটারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। শুরু হয় সন্তানদের বাচাঁতে এক পিতার লড়াই।

428637_10150655665423535_2068174102_nসিনেমাতে যে গ্রামটি দেখানো হয়েছে সেখানে জলিল কামার ছাড়া সবাই হিন্দু ধর্মের। গ্রামের একমাত্র মুসলমান কামার জলিল ছোটবেলা থেকেই বিষু নামের এক হিন্দু কামারের কাছে মানুষ এবং তাকেই বাবা বলে ডাকে। সামসু, লীলা, সামাদ আর শহীদ এই চার ছেলেমেয়ে নিয়ে জলিলের সংসার, স্ত্রী কুসুম কয়েক মাস আগেই মারা গেছে। চার ভাই-বোনদের মধ্যে ছোট ছোট খুনঁসুটি গুলো খুব উপভোগ্য ছিল। বড়ভাই ১৪-১৫ বছরের সামসুর অভিব্যক্তি দারুন লেগেছে, বড় ভাই হিসেবে অনেক দায়িত্ব পরায়ন একটা ভাব ছিল। সিনেমায় ১২-১৩ বছরের বোন লীলা একাই পুরো সংসারটা কে দেখে রাখে, সব কাজ করে। এখানে লীলা চরিত্রে অরা আর সামসু চরিত্রে আলিফ চমৎকার অভিনয় করেছে।

 

389532_483797311651605_252654950_nযুদ্ধের আভাস পাবার পর গ্রামের অনেকই ইন্ডিয়া চলে যায় কিন্তু শরৎ তার নিজের দেশ রেখে কোথাও যেতে চায় না। শুরু হয় বাবা বিপিনের সাথে তার বাক-বিতন্ডা। এদিকে শরৎের গর্ভবতী স্ত্রী পল্লবীর প্রসবের সময় হয়ে এসেছে। সিনেমাতে শরৎ আর পল্লবীর উপর “একের ভেতর দুই” শিরোনামে একটা রোমান্টিক গান দেখানো হয়। চঞ্চল চৌধুরি আর মেহের আফরোজ শাওনের গাওয়া এই গানটা সিনেমার সবচেয়ে ভাল লাগার একটা গান। গানটার চেয়ে বেশি দারুন লেগেছে গানটাতে কল্যান কোরায়া আর শায়না আমিনের পারফরমেন্স।

 

293856_483796554985014_1891504285_nগ্রামের বাজারে জয়ন্তের একটা দোকান আছে। তার কাছেই আছে গ্রামের একমাত্র সেই রেডিও টা যা সে যৌতুক হিসেবে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে পেয়েছে। স্ত্রী কে নিয়ে জয়ন্তের সুখের সংসার।
এদিকে গ্রামের হিন্দু ব্রাম্মন নিতাইয়ের মেয়ে শর্মিলী এক বছর হলো বিধবা হয়েছে। মুসলমান কামার জলিল কে তার অনেক পছন্দ। শর্মিলীর মা আর কমলা পিসি ব্যাপারটা ঠিক পছন্দ করে না। এখানে কমলা চরিত্রে অভিনয় করেছেন শামিমা নাজনীন। এই ভদ্রমহিলা এ বছর একের পর এক ভাল মানের সিনেমায় অভিনয় করে যাচ্ছেন। ঘেটুপুত্র কমলা তে উনার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, গত সপ্তাহে দেখলাম উনার চোরাবালি আর আজ পিতা। যদিও পিতা তে উনার চরিত্রটা খুব ছোট, তারপরও তিনি দাপটের সাথে অভিনয় করে গেছেন।

 

Indian_Bangla_Movieএই সিনেমায় অনেক ভাল লাগার ব্যাপারটা হলো পরিচালক সম্পূর্ন অজ-পাড়া গাঁয়ের এই সিনেমায় বর্তমান প্রজন্মের কয়েকজন মডেল কে দিয়ে দুর্দান্ত অভিনয় করিয়েছেন। মডেলিং এর পাশাপাশি কল্যান আর শায়না কে আমরা টিভি পর্দায়ও দেখেছি। আর শায়না তো “এক জীবনে এত প্রেম পাব কোথায়” খ্যাত মিউজিক ভিডিও আর বহুল সমালোচিত “মেহেরজান” সিনেমায় ভাল অভিনয় করে আগেই আলোচিত হয়েছিলেন। আবার বাংলালিঙ্ক বিজ্ঞাপনের মডেল নিয়াজ মোর্শেদ কেও সিনেমায় সম্ভবত নুকুল চরিত্রে দেখা গেছে (চরিত্রটা ছোট ছিল তাই নামটা ঠিক ধরতে পারি নি)

 

3503_493377547360248_382259999_nকিন্তু ছবিতে সবচেয়ে ভাল লেগেছে পাকিস্তানি মেজর চরিত্রে মডেল মইন কে দেখে। বাংলাদেশে বর্তমানে আমার অনেক পছন্দের একজন পুরুষ মডেল হচ্ছে মইন। তাকে কে আগে কখনো অভিনয় করতে দেখিনি কিন্তু এই চরিত্রে মইন একদম ফাটিয়ে দিয়েছেন। মইনের উর্দু-ইংরেজি কথা আর অভিনয় দেখে আমি রীতিমত মুগ্ধ! 421251_10150655657258535_2139834137_n গেরিলা সিনেমায় শতাব্দী ওয়াদুদ এমনই একটি পাকিস্তানি মেজর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, অবশ্য পিতা তে মইনের চরিত্রটা পরিচালক অতটা ফুটিয়ে তুলেন নি। তবে অভিনেতা নির্বাচনের জন্য পরিচালকের প্রশংসা করতে হয় যে এই মেজর চরিত্রের জন্য উনি কাশ্মীরের বংশদ্ভূত এই বাংলাদেশি মডেল কে নিয়েছেন। উনার মত এ রকম অন্য পরিচাকরাও এভাবে নতুনদের নিয়ে কাজ করলে আমরা সামনে আরো কিছু স্মার্ট আর সুদর্শন কিছু নায়ক নায়িকা পেতে পারি।
আর সিনেমার ইম্পোর্টেন্ট একটা চরিত্র হচ্ছে শর্মিলী,যাতে অভিনয় করেছে উপমা। নাম শুনলে হয়তো অনেকেই চিনবে না কিন্তু উপমা অনেক ছোট বেলা থেকেই অভিনয় করছে। একুশে টিভির শুরুর দিকে “বন্ধন” নামে জনপ্রিয় এক ধারাবাহিকে উপমার লোকমানের স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিল। যাইহোক এই সিনেমায় উপমা দুর্দান্ত অভিনয় করে নিজেকে আবারো দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে প্রমান করলেন।

 

 

483406_559658644065471_1706187053_nসিনেমার কয়েকটা গান খুব ভাল লেগেছে। শাওন আর চঞ্চল চৌধুরির গাওয়া গানটা ছাড়াও কনার গাওয়া “আয়না” আর সায়ানের গাওয়া “এইবার এইবার” গানটা বেশ উপভোগ্য। এছাড়াও সিনেমার শেষে যখন আগুন জ্বালানো বাংলাদেশের জ্বলন্ত মানচিত্রের মধ্য দিয়ে লাশ নিয়ে আসা হচ্ছিল তখন ছয় বছরের কন্ঠশিল্পী তূর্যের গাওয়া “মঙ্গল বারতা” রবীন্দ্রসঙ্গীত টা শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। সব মিলিয়ে পিতা আমার কাছে অনেক ভাল লেগেছে, সিনেমার শুরু থেকে শেষ সব কিছুই আমার ভাল লেগেছে। শুরুতেই ভাল লাগে বুনো শুকর আর পাকিস্তানি তাড়ানোর ব্যাপারটা। পুরো সিনেমায় এমন অনেক সংলাপ আছে যা আমাদের ভাবিয়ে তুলে। মতি রাজাকার যখন জলিল কে বলে মুসলমান হয়ে ধুতি পরে কেন, ধুতি পরা হারাম। তখন জলিলেল ধীর গলায় উত্তর “কাপড়ের মধ্যেও হারাম!”। আবার যখন শর্মিলী বিধবা হবার পরও আমিষ খাবার আকুলতা দেখায়। যখন শর্মিলী তার ভাললাগার কথা তার পরিবার কে জানাতে না পেরে বলে; “আচ্ছা হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে বিয়া হয় না কেন?” তখন আমাদের বিবেককেও নাড়িয়ে দেয়। সিনেমাতে পরিচালক কোন কিছুর কমতি রাখেন নাই। প্রত্যেকটা জিনিসই অনেক সুক্ষভাবে করেছেন। মিলিটারি মেজর যখন গাড়ি করে যাচ্ছিলেন তখন গাড়িতে সত্তর দশকের ইংরেজী গানটা আস্তে আস্তে বাজছিল এটা শুনে বেশ মজা পেয়েছি।

vlcsnap-2013-08-09-15h39m14s240পুরো সিনেমা জুড়ে বসে ছিলাম সমালোচনা করার মত কিছু খুজেঁ বের করতে কিন্তু বলার মত তেমন কিছুই পাইনি। ২ ঘন্টা ৫ মিনিটের এই সিনেমাটা মনে হয়েছে একটু তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেছে, আরো কি যেন দেখার বাকি ছিল। পরিচালক নিজে অনেকদিন হুমায়ুন আহমেদের সাথে কাজ করেছেন, সেই সুবাদেই হয়তো হুমায়ুন আহমেদের নাটক সিনেমার সংলাপের মত এই সিনেমার সংলাপ ছিল। একটা হুমায়ুন আহমেদীয় ফ্লেবার রেখেছেন সেক্ষেত্রে নিজস্ব স্ব্কীয়তা দেখালে আরো ভাল লাগতো । সিনেমার কোথাও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অনেক ভাল লেগেছে আর কোথাও অনেক লাউড মনে হয়েছে। তবে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক গতানুগতিক বাংলা সিনেমার মত লাগে নি, নতুনত্ব ছিল। জলিলের স্ত্রী কুসুম চরিত্রে অতিথি শিল্পী হিসেবে বন্যা মির্জার অভিনয় বেশ ভাল লেগেছে, তবে উনার মারা যাওয়া টাও মনে হয়েছে হুট করে হয়েছে, হঠাৎ একদিন অসুস্থ অবস্থায় ঘর মুছতে মুছতে মারা গেছেন। সেক্ষেত্রে উনার কাজ করাটা না দেখিয়ে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় মারা গেছে দেখালে ভাল লাগতো। বিরতির আগে জয়ন্ত আর তার স্ত্রীর এবং তার পরপরই শরৎ আর পল্লবীর ২টা অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য ভাল লাগে নাই। মনে হয়েছে এই ২টা দৃশ্যের শেষ দিকে হুট করেই অন্তরঙ্গের ব্যাপারটা চলে এসেছে। আবার এমনো হতে পারে সাধারনত ব্যাপারটা এরকমই হয়, আমার আসলে এই বিষয়ে ঠিক ধারনা নাই; সিনেমায় স্টেপ বাই স্টেপ দেখে অভ্যস্ত তো তাই ঠিক বুঝি নি। 😛

 

422901_10150655650478535_1745083622_nপুরো লেখায় উপরে অনেকবারই সবার অভিনয়ের প্রশংসা করেছি। আসলে এই সিনেমায় প্রত্যেকটা চরিত্রেই সবাই অনেক দরদ দিয়ে অসাধারন অভিনয় করেছেন। কিছু জায়গায় তেমন কোন ইমোশনাল সংলাপ বা পরিবেশ না থাকার পরও শুধুমাত্র অভিনয়ের জন্যই চোখে পানি চলে আসছে। অনেক কিছু লিখে ফেলেছি এখন লেখা শেষ করবো। সবাই হয়তো ভাবছেন মাসুদ আখন্দ সম্পর্কে আমি তো কিছুই লিখি নি। আসলে উপরের যত টুকু লিখেছি সব কিছুই উনার কৃতিত্ব। উনার সম্পর্কে আলাদা কিছু লিখতে গেলে এত বড় আরেকটা লেখা হয়ে যাবে। সিনেমার (পিতা) জলিল চরিত্র সহ, পরিচালনা, সম্পাদনা, চিত্রনাট্য, সংলাপ সব উনি নিজে করেছেন। কেন্দ্রীয় চরিত্রে উনিই কেন নিজে অভিনয় করেছেন সেটা অনেকেই জিগেস করতে পারে, আমি নিজেও করবো। কিন্তু মাসুদ আখন্দ চরিত্রটাতে অনবদ্ধ অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে শেষ দিকে সন্তানদের বাচাঁনোর জন্যে পর্দায় যে হিংস্রতা উনি দেখিয়েছেন তা ভাবাই যায় না। ক’দিন ধরে চোরাবালি সিনেমার জন্য শহিদুজ্জামান সেলিম আগামি বছর শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পাবে বলে ধারনা করছিলাম কিন্তু এবার মনে হচ্ছে হিসাব পাল্টেও যেতে পারে। জোরদার কম্পিটিশান হবে মনে হচ্ছে। আর এই সিনেমাটা কে এক বাক্যে অসাধারন বলা ঠিক হবে, আরো অনেক বিশেষন দরকার। সবাইকে বলবো সিনেমাটা দেখে এই বছরের শেষ বা নতুন বছরের শুরুটা ভাল সিনেমা দিয়ে করুন।

(Visited 157 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    মাঝখানে ব্লগে সমস্যা হওয়ায় এই পোস্ট থেকে সবার প্রায় ৮০টা মন্তব্যের সবগুলো আটো ডিলিট হয়ে গেছে। 🙁

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন