গহীন বালুচরে মুগ্ধতা
২০১৭ সালটা শেষ হলো বছরের সেরা চলচ্চিত্র দিয়ে, নাম “গহীন বালুচর”। পুরো বছর জুড়েই ঢাকা অ্যাটাক, ভুবন মাঝি, ডুব, সত্তা, হালদার মত দারুণ কিছু সিনেমা রিলিজ পেয়েছে। কিন্তু শেষ বেলায় এসে বাজিমাৎ করলো গহীন বালুচর। অনেকদিন পর পরিপূর্ণ একটা বাংলা সিনেমা দেখলাম। চমৎকার গল্পে, চমৎকার লোকেশনে, চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি আর আবহ সঙ্গীতে সুনির্মিত একটা সিনেমা। নবীন-প্রবীন প্রত্যেক অভিনয়শিল্পী দারুণ পারফর্ম করেছেন, আই রিপিট ‘প্রত্যেকে’।
এই সিনেমায় সবচেয়ে বেশি আগ্রহের কারণ ছিলো সুবর্ণা মুস্তফা, পুরো সময় উনি একাই পর্দা কাঁপিয়ে গেছেন। তবে উনার ‘আসমা’ ক্যারেক্টারটা আরেকটু কম ড্রামাটিক হলে হয়তো আরো ভালো লাগতো। মুভিতে মূল চরিত্র বলে কিছু নেই। প্রত্যেকটা ক্যারেক্টারই ইম্পোর্টেন্ট। ফজলুর রহমান বাবু, রাইসুল ইসলাম আসাদ, লুৎফর রহমান জর্জ বরাবরের মতই অসাধারণ। রুনা খান আর শর্মীমালা দূর্দান্ত! তাদের নারী চরিত্র দুটোতে তারা দূর্দান্ত অভিনয়ের সুযোগ পেলেও, শাহানা সুমী আর আফরোজা বানুর জন্য আফসোস লেগেছে, এত চমৎকার দুজন অভিনেত্রীকে চরিত্রগুলোতে পরিচালক আরো ডিটেইলি প্রেজেন্ট করতে পারতেন। কয়েক মিনিটের চরিত্রে বাজারের আড়তের সেই মেয়েটাও দারুণ পারফর্ম করেছে। সিনেমায় প্রত্যেকেই একজন আরেকজনের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেছেন। কিন্তু মুগ্ধ করেছেন তিনজন; এক খলচরিত্রে “জিতু আহসান”, দুই “শাহাদাৎ হোসেন” এবং তিন পরে বলছি। চরিত্রটিতে পুরোপুরি মিশে গিয়ে শাহাদাৎ হোসেনের অভিনয়, নাচ, আবেগ, এক্সপ্রেশন অদ্ভুত সুন্দর। আর জিতু আহসান পুরো ফাটিয়ে দিয়েছেন। এবছর খলচরিত্রে এখন পর্যন্ত “ঢাকা অ্যাটাক’ মুভির তাসকিনকেই সেরা মনে হলেও, এই মুভিতে হানিফ শিকদার চরিত্রে জিতু আহসানকে দেখে মত পাল্টে গেছে।
মুভিতে নায়ক-নায়িকার(!) চরিত্রে ছিলো তিনজন নবাগত অভিনেতা তানভীর-নীলা আর মুন। নীলা আর তানভীরের প্রতি কিছুটা প্রত্যাশা থাকলেও মুনের প্রতি একটুও এক্সপেক্টেশন ছিলো না। কিন্তু সিনেমায় মুন এভাবে বাজিমাৎ করবে ভাবিনি। মনপুরায় পরী চরিত্রে ফারহানা মিলির মত এই সিনেমায়ও পারুল চরিত্রে মুন মন কেড়েছে। সৌন্দর্যবেষ্টিত এই মুভির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য্য ছিলো নীলাঞ্জনা নীলা। একটা ভয় ছিলো; গ্রামীণ পটভূমিতে নিশি চরিত্রটা সে করতে পারবে কিনা, কিন্তু নীলা চমৎকার অভিনয় করেছে। যতক্ষণ পর্দায় ছিলো কখনো মন ভালো করিয়েছে, কখনো মন খারাপ। এই মেয়ে অনেকদূর যাবে। এবার তিনে আসি, সেই ‘মুগ্ধ’ হওয়া তিন। যে তিনজনের পারফরমেন্সে মুগ্ধ হয়েছি তাদের তৃতীয়জন তানভীর। সুজন চরিত্রে এই নবাগত অভিনেতা নিজের সেরাটা দিয়েছে। তার কথা বলা, উচ্চারণ, এক্সপ্রেশন, লুঙ্গি পরা, নৌকা চালানো, (দুই নায়িকার ঠোঁটে দুইবার চুমু দেয়া) কোন কিছুতেই মনে হয়নি সে নতুন অভিনেতা – এটা তার প্রথম সিনেমা। চরিত্রটিতে পুরোপুরি মিশে গেলেই এমন পারফরমেন্স সম্ভব।
মুভির এন্ডিং টা আরেকটু ধীরে আগালে হয়তো আরো ভালো লাগতো, হুট করে যেন সব ঘটে গেছে। এটা ছাড়া পুরো সিনেমাটাই দূর্দান্ত। পরিচালক বদরুল আনাম সৌদ অনেক যত্ন নিয়ে মুভিটা বানিয়েছেন। সিনেমার সবগুলো গানই খুব চমৎকার। অনেকদিন পর বাংলা সিনেমায় কোরিওগ্রাফী ভালো লাগলো, একেবারে গল্পের সাথে মিশে গেছে। আমি পারসোনালি গত ১০ বছরে এত ভালো কোরিওগ্রাফী দেখিনি, স্পেশালি প্রথম গানটাতে, অদ্ভুত সুন্দর। কস্টিউম ডিজাইনও ছিলো চমৎকার। সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য একটা মুভি। সিনেমাটা দেখার সময় কেনো জানি বারবার পাশের দেশে কিছু সময় আগে রিলিজ পাওয়া ‘রামলীলা’ আর ‘সাইরাত’ মুভির কথা মনে পরছিল। এই মুভিগুলোর মত আশা করি “গহীন বালুচর”ও অনেক দর্শকপ্রিয়তা পাবে। অবশ্য দর্শকপ্রিয়তা পেতে হলে দর্শককে এটা আগে দেখতে হবে।

(Visited 586 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন