মন ছুঁয়ে দিল “ছুঁয়ে দিলে মন”
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

11148700_985515878126226_1864753657974100904_n

হৃদয়পুরের ছেলে আবির। এলাকার বড় ভাইয়ের প্রেমে সাহায্য করতে গিয়ে টিনেজ আবিরের পরিচয় হয় নিলার সাথে। সেই বয়সেই দুজনের মধ্যে ভাল লাগা তৈরি হয় কিন্তু এরপরই ঘটে যায় কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আবির-নীলা হয়ে যায় আলাদা। দুজন দুজনের কাছ থেকে অনেক দূরে। বারো বছর পর একদিন হরতাল-অবরোধের বদৌলতে দুজনের দেখা হয়ে যায় (দাগ থেকে যদি হয় দারুণ কিছু, তাহলে দাগই ভাল)। কিন্তু এই বারো বছরে পাল্টে গেছে অনেক কিছু। এই পাল্টে যাওয়া ব্যাপারগুলো নিজেদের আয়ত্বে আনতে যুদ্ধে নামে আবির, আর সেই যুদ্ধে লুকিয়ে লুকিয়ে সাহায্য করে অদ্ভুত সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগতে থাকা নিলা। মূলত এখন থেকেই শুরু হয় “ছুঁয়ে দিলে মন” সিনেমার গল্প। কাহিনীতে ঢুকে পড়ে অনেক ছোট ছোট চরিত্র, তৈরি হয় নতুন নতুন বাঁধা বিপত্তির। সকল সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে যেতে থাকে আবির-নিলা আর ছবির ডিরেক্টর শিহাব শাহীন নিজে। উনি দর্শকদের কাছে এমনিতেই অনেক জনপ্রিয় চমৎকার কিছু টেলিফিল্ম নির্মানের জন্য। ছোট পর্দায় যে সকল সফল নির্মাতারা সিনেমা বানানো শুরু করেছেন তাদের অধিকাংশই কেন জানি সিনেমাটা ঠিকভাবে তৈরি করতে পারছেন না, কোথায় যেন ঘাটতি থেকেই যায়। সুনিপন কাজের জন্য ছোট পর্দায় পাওয়া সাফল্যটা সিনেমায় ধরে রাখতে পারেন না অনেকেই। সেক্ষেত্রে শিহাব শাহীন অনেকটাই সফল। পুরোপুরি বানিজ্যিক ধারার খুবই এন্টারটেইনিং আর কালারফুল একটা সিনেমা উপহার দিয়েছেন দর্শকদের।

.
3

ছবিতে নিলা চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাকিয়া বারী মম। নিলা চরিত্রে নিজের শতভাগ দিয়ে আরো বাড়তি কিছু দেয়ার চেষ্টা করেছেন মম। নিজের সাধারন ঘরোয়া মেয়ের ইমেজটাকে ভেঙ্গে নতুন রূপে আবির্ভুত হয়েছেন ছুঁয়ে দিলে মনে। মম নিজের অভিনয় দিয়েই সব সময় নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যান, কিন্তু চমৎকার অভিনেত্রী মম যে এতটা গ্ল্যামারাস সেটা এই ছবিতেই প্রথম চোখে পড়লো। ছবিটা রিলিজের আগে এটার কয়েকটা গান দেখে মম’র মেকাপ নিয়ে বিরক্ত ছিলাম, মাত্রাতিরিক্ত মেকাপ নিয়েছে মনে হচ্ছিল। কিন্তু বড় পর্দায় মমকে দেখে তেমন কিছুই মনে হয়নি, বরং মম’র ড্রেস, গেটাপ আর প্রেজেন্টেশন দেখে রীতিমত মুগ্ধ হয়েছি। এজন্য সিনেমার কস্টিউম ডিজাইনারকে সাধুবাদ চমৎকার কাজ দেখানোর জন্য। সাধারনত বর্তমানের বাংলা সিনেমাগুলোতে দেখা যায় অধিকাংশ নায়িকারাই অভিনয়ে পিছিয়ে থাকে, নিজের সৌন্দর্য দিয়ে সিনেমাটা এগিয়ে নিয়ে যায়। কয়েক বছর ধরে এমন একটা ট্রেন্ড তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু মম এটাকে পুরোপুরি ভেঙ্গে নিজের সৌন্দর্যের সাথে চমৎকার অভিনয় দিয়ে সিনেমাটায় দাপটের সাথে এগিয়ে গেছেন। দারুচিনি দ্বীপ সহ মম এখন পর্যন্ত ৩-৪টা ছবিতে অভিনয় করেছেন, কিন্তু এই মুভিতে ছিল মম’র বেস্ট পারফরমেন্স। নিজেকে একদম ছাপিয়ে গেছেন।

.

10422127_335554129983144_4444290616862276998_n

আবির চরিত্রে ছিলেন আরিফিন শুভ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একদম মাপা মাপা অভিনয় করে গেছেন। গত কয়েক বছর ধরে শুভ অনেকগুলো সিনেমায় অভিনয় করলেও কেন জানি নিজের সেরাটা ঠিকমত দিতে পারছিলেন না। কখনো ড্যান্স বা অ্যাকশনে এগিয়ে গেলেও অভিনয়ে ঘাটতি থেকে যেত। কিন্তু এই ছবিতে ফুল প্যাকেজ নিয়ে আরিফিন শুভ পর্দায় হাজির হয়েছেন। শুভ’র অন্য ছবির তুলনায় এই ছবিতে তার ড্যান্স আর অ্যাকশনের সুযোগ কম ছিল, তাই পুরোটা সময় অভিনয়েই বেশি জোর দিতে হয়েছে। এবং সেক্ষেত্রে আরিফিন শুভ এবার সফল। কোন অতি অভিনয় ছিল না, পুরোটা সিনেমা জুড়ে একদম মেপে মেপে অভিনয় করে গেছেন। থাপ্পড় দিতে গিয়ে হাত কতটুকু উপরে উঠে কত টুকুতে গিয়ে থাকবে সব একদম মাপা মাপা। এক্সপ্রেশন আর ডায়ালোগ ডেলিভারি পারফেক্ট। এই ছবির জন্য নিজের সূক্ষ সূক্ষ ব্যাপারগুলোকেও শুভ অনেক আমলে নিয়েছেন সেটা বুঝাই যাচ্ছিল। পুরো ছবিতে আবির চরিত্রে এক কমপ্লিট শুভকে পেয়েছে দর্শক।

.

10731057_336985296506694_1376374751303943402_n

প্রথমবারের মত কোন ছবিতে গুরুত্বপূর্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইরেশ যাকের। এখন পর্যন্ত অনেকগুলো সিনেমায় ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি এবং সেগুলোতে পারফরমেন্সও ছিল হতাশা জনক। উনি বরাবরই অনেক ভাল অভিনয় করেন কিন্তু সিনেমায় আসলে কি যেন এক অদ্ভুত সমস্যা দেখা দেয়। ডিরেক্টররা উনার কাছ থেকে ইরেশ যাকেরীয় পারফরমেন্সটা আদায় করে নিতে পারেন না। কিন্তু এই সিনেমায় ছিল ভিন্ন রূপ। (সবাই এই ছবিতেই কেন নিজের সেরাটা দিল সেটা একটা ভাববার বিষয়। ডিরেক্টরের কৃতিত্ব!) ব্যাডবয় ড্যানি চরিত্রে এক কথায় ফাটিয়ে দিয়েছেন ইরেশ যাকের। কখনো হাস্যরস, কখনো ভয়ংকর চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছেন পর্দায়। মূল অভিনেতাদের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেছেন। উনার লুক আর চুলের কাট টা ছিল দূর্দান্ত। অনেক কারনেই ড্যানি চরিত্রের প্রতি একটা বাড়তি আকর্ষন তৈরি করে ফেলেছিলেন। দর্শককে দেখলাম উনার সব কিছুই পছন্দ করছে, ভাল খারাপ সব কিছুতেই শিষ বাজিয়ে হাত তালি দিচ্ছে। এক সময় মনে হলো সাধারন দর্শক কনফিউজ, তারা কার পক্ষে যাবে নায়কের নাকি ভিলেনের। আমিও সেই দলেরই একজন সাধারন দর্শক।

.

10653357_10204592364230557_3778511880273927574_n

সিনেমায় ছোট ছোট অনেকগুলো চরিত্র ছিল। এই ছবির ভাল দিক গুলোর একটা হচ্ছে এই ছোট ছোট চরিত্র গুলোতে পারফেক্ট কাস্টিং। আবিরের বড় বোনের চরিত্রে ছিলেন সুষমা সরকার। ছবির শুরুর দিকে স্ক্রীনে তখনো মম’র এন্ট্রি হয়নি সেই সময় পর্দায় আসলেন সুষমা। না জানা দর্শকরা উনাকেই ছবির নায়িকা ভাবতে পারেন তখন। উনি অনেক ভাল অভিনেত্রী কিন্তু কাজ করেন কম। ভাল অভিনয়ের সুবাদেই উনাকে চেনা। কিন্তু এই সিনেমার শুরুতে বিয়ের আগের চরিত্রটাতে উনাকে খুবই আকর্ষনীয়ভাবে প্রেজেন্ট করার কারনে উনার সৌন্দর্যের সাথেও পরিচয় হয়ে গেল। উনার হাসব্যান্ডের চরিত্রে মানে আবিরের দুলাভাইয়ের চরিত্রে ছিলেন মিশা সওদাগর। প্রায় ছয়-সাত শো সিনেমায় ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করা মিশা সওদাগর এই ছবিতে করেছেন পজেটিভ চরিত্রে, এবং খুবই মজার একটা চরিত্রে। পুরোটা সময় জোকস বলার চেষ্টা করে দর্শককে মাতিয়ে রেখেছেন। শান্তশিষ্ট-ভদ্র চরিত্রটা যখন প্রতিবাদ করতে গিয়ে কঠিন রূপ ধরলেন তখন দর্শক অনেক উপভোগ করেছে। উনার সংলাপ গুলো ছিল খুবই ইন্টারেস্টিং। এরকম একটা নিরীহ চরিত্রে উনার পারফরমেন্স ছিল অসাধারন। সবার সামনে নিলা আবিরকে বিয়ে করবে না জানানোর পর উনার কষ্ট পেয়ে বসে পড়ার দৃশ্যটাতে সাধারন দর্শকের চোখেও পানি চলে এসেছিল।

.

10523976_10204463257202962_3196400136247526037_n

আবিরের মজার বন্ধু হাতির বাচ্চা পাভেল চরিত্রে অভিনয় করেছেন আনন্দ খালেদ। পুরো সিনেমায় হাস্যরসের সিংহ ভাগই এসেছে আনন্দের পারফরমেন্স থেকে। বিশাল স্বাস্থ্য নিয়ে পর্দায় তাকে অধিকাংশ সময়ই দৌড়াতে আর বন্ধুকে সাহায্য করতে দেখা গেছে, কখনো চাপাতি হাতে ভিলেনের তাড়া খেয়ে দৌড়িয়েছে কখনো বন্ধুর কারনে তৈরি হওয়া ঝামেলায় পড়েছে। ছবিতে আনন্দের মজার অভিনয়ের জন্য পুরো হল মেতে ছিল। আরেকটা গুরুত্বপূর্ন চরিত্র নিলার বদরাগী বাবা আফজাল খানের ক্যারেক্টারে অভিনয় করেছেন আলীরাজ। উনি ইদানিং বিভিন্ন বাংলা ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কিছু ক্যারেক্টার করে চমৎকার পারফর্ম করছেন। এ ছবিতেও জমিদার বংশের বদরাগী উত্তরধিকারী চরিত্রে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। সিনেমায় আরো কিছু ছোট ছোট চরিত্রে নওশাবা, মাহবুবুজ্জামান, মিঠু, উজ্জ্বল, মেজবাহ উদ্দিন সুমন সহ ড্যানির সাঙ্গো-পাঙ্গো সবাই যার যার চরিত্রে ভাল করেছেন। তবে যাদের কথা আলাদা ভাবে না বললেই না তারা হলো আবির আর নিলার ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করা পিদিম আর অর্পা। ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে প্রত্যেকেই ভাল পারফর্ম করেছেন তারপরও যদি ভাল অভিনেতাদের ক্রমানুসারে সাজানো হয় তাহলে এই বাচ্চা দুটো উপরের দিকে থাকবে। এই বয়সেই অসাধারন অভিনয় করেছে এরা, স্পেশালি পিদিম। তাহসানের ছুঁয়ে দিলে মন টাইটেল ট্র্যাকটা যখন বাচ্চার ভয়েসে পিদিম পারফর্ম করছিল তখন তার এক্সপ্রেশন ছিল দূর্দান্ত, শিশু কন্ঠশিল্পীর গলায় গানটা শুনে তখন একটা বাড়তি আবেদন তৈরি হয়েছিল।

.

10845925_10205315958319957_8887123465017742007_n

ছুঁয়ে দিলে মনকে উপভোগ্য একটা সিনেমা হিসেবে করার ক্ষেত্রে অনেক বড় অবদান এই ছবির মিউজিক ডিরেক্টর সাজিদ সরকারের। ছবির প্রত্যেকটা সিক্যোয়েন্সের সাথে মিল রেখে চমৎকার সব ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর তৈরি করেছে এই তরুন মিউজিশিয়ান। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের জন্যই সিনেমাটার প্রত্যেকটা দৃশ্য বেশি উপভোগ্য ছিল। এগুলোর পাশাপাশি গানগুলোও ছিল চমৎকার। আসলে গত কয়েক বছর ধরে বাংলা সিনেমায় অনেক ভাল গান হচ্ছে, সেগুলো জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। প্রায় সব ছবিতেই চমৎকার কিছু গান থাকছে, অনেক সময় গানের জন্যই ছবিটা ব্যবসা সফলতা পাচ্ছে। কিন্তু কোন ছবিরই সবগুলো গান অসাধারন এমন নজির বেশ কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে না ইন্ডাস্ট্রিতে। শেষ সেই “মনপুরা”র গানগুলো ছিল, প্রত্যেকটা গানই চমৎকার, পাশাপাশি জনপ্রিয়। মনপুরার সফলতার অনেক বড় কারণ ছিল গানগুলো। এর প্রায় সাত বছর পর কোন ছবি রিলিজ পেল যে ছবিটার সবগুলো গানই চমৎকার। বাংলা সিনেমায় এত শ্রুতিমধুর গান অনেকদিন শোনা হয় না, তাও একটা ছবির সবগুলো গান। গানগুলোর মধ্যে হাবিব ওয়াহিদের “ভালবাসা দাও” গানটা সবেয়ে বেশি ভাল লেগেছে, গানে মারজুক রাসেলের লিরিকটাও ছিল অসাধারন। এই ছবির মাধ্যমেই সম্ভবত প্রথমবারের মত তাহসান কোন ছবিতে প্লেব্যাক করলেন। তাও আবার ছবির টাইটেল ট্র্যাক। শাহান কবন্ধের লেখায় শাকিলা সাকির সাথে তাহসানের গাওয়া এই “ছুঁয়ে দিলে মন” গানটাকে গত কয়েক বছরের সেরা রোমান্টিক গানগুলোর একটা বলা যায়। ইমরান আর কণার গাওয়া “শূন্য থেকে আসে প্রেম” গানে প্রায় পুরো হল নাচা শুরু করছিল। গানটাই এমন যে স্থির হয়ে বসে শুনা যায় না, না চাইলেও মাথা-হাত-পা ঝাঁকাতে হয়। সাজ্জাদ শাওনের “চিনি না আমি” গানটাও অনেক শ্রুতিমধুর, গানটার শেষ দিকে পুরোনো গানের দুই লাইন রিমিক্স করে “প্রেম যে কাঁঠালের আঠা” গাওয়া অংশটুকুতে পুরো হল চিৎকার করে গাচ্ছিল। এগুলো ছাড়াও “চলে যাও” আর নির্ঝো হাবিবের গাওয়া “ছুঁয়ে দিলাম” গান দুইটাও অনেক ভাল লেগেছে। সাজু খাদেম, সিরাজুম মুনির, শমশের আলির লেখা এই গানগুলোর কথাগুলোও ছিল চমৎকার। প্রত্যেকটা গানের দৃশ্যায়নই ছিল মনোমুগ্ধকর। চোখের শান্তি। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে কয়েকটা দেশাত্ববোধক গান মিলিয়ে ছবির শেষ দিকে বাচ্চাদের একটা পারফরমেন্স ছিল অনেক উপভোগ্য। সেটাতে বাড়তি আনন্দ হিসেবে ছিল মিশা সওদাগরকেও বাচ্চাদের সাথে নাচতে দেখা। সব মিলিয়ে ছবির প্রত্যেকটা গানই অনেক ভাল লেগেছে। এই গানগুলোর জন্যই ছবিটা দেখতে হলে যাবে অনেক দর্শক।

.

10428552_347320378806519_5473113043649902749_n

শিহাব শাহীনের বানিজ্যিক ধারার এই ছবিটা এতই উপভোগ্য ছিল যে এটার ছোট ছোট ভুলগুলো তেমন আমলে আসেনি, বা চোখ এড়িয়ে গেছে। তারপরও যদি সমালোচনা করার কোন দিক থাকে সেটা হলো সিনেমার প্লট। গল্পটা একেবারেই গতানুগতিক। এমন গল্পের অনেক ছবির সাথেই দর্শক পরিচিত। তবে এটা ঠিক আমাদের রোমান্টিক ছবির প্রায় সব গল্পই একই লাইনের হয়, তখন গল্পটা কিভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এটা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। সেক্ষেত্রে নৈপুন্য ও চমৎকার উপস্থাপনের কারনে শিহাব শাহীন এটাতে উৎরে গেছেন। দর্শক চেনা গল্প এড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে সিনেমার প্রেজেন্টেশন দেখছিলেন। অন্য বাংলা কমার্শিয়াল ছবিগুলোর মত এটাতেও লজিকের বাইরে বেশ কিছু কাজ ছিল। তবে শুধু মাত্র আনন্দ পাওয়ার জন্য দর্শক এই ছোট ভুলগুলো এড়িয়ে গেছে। যেমনঃ কলেজে শুভ’র গান শুনে মম রাস্তায় রিক্সা থেকে নেমে, তারপর কলেজের দিকে “দৌড়িয়ে” যায় (এই দৌড়িয়ে আসার ব্যাপারটা অবশ্য কিছু রোমান্টিক সিনেমার প্রধান বিষয়বস্তু। বাধ্যতামূলক!)। প্রায় পুরো গান স্টেজে গাওয়ার পর গানটা হঠাত পাহাড়ের উপর শুভ দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় শেষ হয়। (কারণ নায়িকা দৌড়িয়ে এসে নায়ককে বুকে জড়িয়ে ধরতে স্পেস লাগবে)। ছবির শেষদিকে দেখায় মিশা সওদাগর নিজের স্ত্রীকে নিয়ে গাড়ি করে হৃদয়পুর থেকে ঢাকা চলে যাচ্ছে, কিন্তু একটু পর তাদের দুজনকে ট্রেনে উঠতে দেখা গেল। (কারণ সিনেমার শেষদিকে রেল স্টেশনের দৃশ্যগুলো দর্শক বেশি উপভোগ করে)। তবে সিনেমায় এটা দেখানো হয়নি যে তাদের গাড়িটার কি হয়েছিল, সম্ভবত খালি গাড়িটাই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল যাতে তারা ট্রেনে গিয়ে দর্শককে বাড়তি এক্সাইটমেন্ট দিতে পারে। পুরো সিনেমায় নায়ক নায়িকা সহ অন্যান্য চরিত্রগুলো মাত্রাতিরিক্ত দৌড়াদৌড়ি করেছে। ভিলেন বা এলাকার লোকজনের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া তো ছিলই, প্রত্যেকটা রোমান্টিক গানে নায়ক নায়িকা নাচের চেয়ে অনেক বেশি পাহাড় পর্বতে দৌড়িয়েছে। সম্ভবত দেশের বাইরে থেকে আনা দুইজন কোরিওগ্রাফার ছিলেন এই দায়িত্বে। কোরিওগ্রাফার কেন গানগুলোতে নাচ কম রেখে এত দৌড় ঝাঁপ করিয়েছেন বুঝলাম না। তবে গানগুলোতে লোকেশন আর সেট ডিজাইন ছিল দূর্দান্ত।

.

10835148_366639776854562_1455227668040847380_o

উপরের কথাগুলো ছিল সিনেমাটার ছোটখাট কিছু ভুল নিয়ে। তবে সাধারন দর্শক যখন ছবি দেখে তখন এই ব্যাপারগুলো এড়িয়ে গিয়ে মূল ছবিটা উপভোগ করে। তারপরও নেক্সট ছবির জন্য ডিরেক্টরকে আরো সাবধান হতে হবে। ছুঁয়ে দিলে মনের সিনেমাটোগ্রাফী বেশ ভাল লেগেছে। কালার গ্রেডিংও ছিল চমৎকার। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে এর লোকেশন। বেশির ভাগ বাংলা ছবিরই একটা বড় অংশ এফডিসির বিভিন্ন ফ্লোরে শ্যুট করা হয় কিন্তু এই ছবি প্রায় পুরোটাই ছিল এফডিসির বাইরে। দেশের বিভিন্ন চমৎকার লোকেশন এটা শ্যুট করা হয়েছে। এটা খুবই খরুচে ব্যাপার। দর্শকের ভাল লাগার কথা চিন্তা করেই প্রডিউসার একটু বেশি খরচ করেছেন। ছবির কস্টিউম ডিজাইনার অনেক ভাল করেছেন। তবে মমকে একটু বেশিই বোল্ড করে প্রেজেন্ট করা হয়েছে, আরেকটু কম হলে আরো বেশি ভাল লাগতো। ছুঁয়ে দিলে মনের স্পন্সর ছিল মাইক্রোসফট। সিনেমায় তাই প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট হয়েছে অনেক কিন্তু দৃষ্টি কটু মনে হয়নি। সাধারনত বেশির ভাগ বাংলা ছবিতে খুবই বিচ্ছিরিভাবে প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট হয়। কথা নাই বার্তা নাই স্ক্রীনে হুট করে নারিকেল তেল চলে আসে, বাসায় সাজিয়ে রাখা জুস দেখায়, প্রান আপকে ফোকাস করে প্রানের সৌজন্যে কনসার্ট হয়। কিন্তু এই ছবিতে তেমন কিছুই ছিল না। খুবই চমৎকারভাবে এই সিনেমায় মাইক্রোসফট ফোনের প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট হয়েছে। ছবির ক্যামেরাটা মাইক্রোসফট ফোনের প্রতি কখনো আলাদাভাবে ফোকাস করেনি কিন্তু কয়েকজন অভিনেতার হাতেই বারবার মাইক্রোসফট ফোন দেখা গেছে। ব্যাপারটা খুবই ভাল লেগেছে। বাংলা সিনেমায় এত চমৎকার প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট চোখে পড়ে না। সিনেমার এডিটিং বেশ ভাল লেগেছে। সাউন্ডে একটু সমস্যা মনে হচ্ছিল, তবে সমস্যাটা সিনেমা হলের সাউন্ড সিস্টেমেও হতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে অনেক কারনেই ছবিটা দর্শকের কাছে ভাল লাগতে পারে। এই মানের এন্টারটেইনিং বাংলা সিনেমা অনেকদিন হয় না। বুঝাই যাচ্ছিল শিহাব শাহীন নিজের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করেছে এই ছবিতে, এবং তিনি সফল। বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমা হিসেবে “ছুঁয়ে দিলে মন”কে রেটিং করতে গেলে সহজেই ৪.৫/৫ দেয়া যায়। সর্বোপরি “ছুঁয়ে দিলে মন” আমার মন ছুঁয়ে গেছে, অনেকদিন পর কোন বাংলা ছবির সবকিছু এতটা ভাল লাগলো।


এই পোস্টটিতে ১১ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. Saikat Mitra says:

    ছুঁয়ে দিলে মন অসাধারণ একটা বাংলা ছবি হবে বলে মনে হয় :)

  2. পুরাই বাজিমাৎ! :) কবে যে মুভিটা দেখবো ভাবতেছি। :(

  3. নির্ঝর রুথ says:

    নতুন বাংলা মুভি বের হলেই আমি অপেক্ষায় থাকি ট্রিপল এস আর সৈয়দ নাজমুস সাকিবের রিভিউয়ের প্রতীক্ষায়। আপনাদের প্রশংসামূলক রিভিউ পড়লে আলগা একটা তাড়না অনুভব করি মুভিটা দেখার। তবে এই মুভিটা মুক্তির দিনই দেখার ইচ্ছে ছিল। শুধু পার্টনার পাই নি বলে যাওয়া হয় নি। একা একা মুভি দেখতে ভালো লাগে না।

    যথারীতি ট্রিপস এস টাইপ বর্ণনামূলক রিভিউ। তবে স্বভাবসুলভ রসিকতা কম ছিল :( । আর মনে হল, অনেকগুলো স্পয়লার পড়লাম? এলার্ট দিলে ভালো হতো।

    চালিয়ে যান, ভাইজান! 😀

    • ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

      বিশ্লেষন করতে গিয়ে একটু গল্প চলে আসছে, তবে তেমন কোন স্পয়লায় ছিল না তাই স্পয়লার অ্যালার্ট দেই নাই। আর রসিকতা ইচ্ছা করেই কম করেছি, কারণ বেশির ভাগ রসিকতাই মুভির নেগেটিভ সম্পর্কে হয়। এটাতে খুব বেশি নেগেটিভ দিক ছিল না। যাইহোক আশা করি আপনার মুভিটা ভাল লাগবে, বেশ উপভোগ করবেন। দেখে ফেলুন জলদি। আপনার সমস্যার কথাটা আগে জানলে এক সাথে দেখতে যেতে পারতাম… 😀

  4. Nasir Ahmed says:

    সালমান শাহ্ এর শেষ সমপন্ন সিনেমা “আনন্দ অশ্রু” দেখার পর আর কোন বাংলা মুভি বিগত বিশ বছরেও মনোযোগ দিয়ে দেখিনি। কারণ গতানুগতিক এবং একই ধারার স্ক্রিপ্ট্ এ নির্মিত ছবি তৈরী হচ্ছিলো অর্থাৎ প্রথম বিশ মিনিটেই বোরিং করে ফেলতো দর্শকদের। আর এত উচ্চ স্বরে চেঁচামেচি হয় বাংলাদেশের মুভি গুলোতে যা এক প্রকার বিরক্তিকর। কিন্তু “ছুঁয়ে দিলে মন” মুভিটি দেখে সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে এটা কি আসলেই বাংলাদেশী সেই গতানুগতিক মুভি!!!??? বিশ বছর পর পুরো মুভিটি মনোযোগ দিয়ে দেখলাম এবং এমন বাংলা মুভি দেখে সত্যিই গর্বে উদ্বেলিত হলাম। এই মুভির স্ক্রিপ্ট্ এতই শক্তিশালী ছিলো যে প্রত্যেকের অভিনয় আসলেই ছুঁয়ে দিয়েছে মন_ সিনিয়র জুনিয়র সবাই অসাধারণ অভিনয় করে রসাতলে যাওয়া বাংলা মুভিকে আবারও নতুন জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে। এরকম ভিন্ন ভিন্ন কাহিনীর উপভোগ্য মুভি নির্মিত হলে বাংলা সিনেমার সোনালী দিন ফিরে আসতে বাধ্য,, দর্শক আবারো হলমুখী হবে অবশ্যই। আর অনেকদিন মনে রাখার মতো এই মুভির গান গুলোও অসাধারণ।আরেফিন শুভ, মম, ইরেশ,মিশা,সুষমা সহ প্রত্যেকের পারফরমেন্স অসাধারণ। আমি এই মুভিকে ৯.৫/১০ রেটিং দিলাম।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন