“দেশা দ্যা লিডার” নোংরা পলিটিক্স আর বিশুদ্ধ ভালবাসার গল্প
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

10857959_799870720091834_1152149385201363895_n

একটা রিয়েলিটি শো কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে “দেশা দ্যা লিডার” সিনেমার গল্প। জনগনকে ভোটের মাধ্যমে তাদের নেক্সট লিডার নির্বাচন করতে হবে। মোট ভোটার থেকে লটারীর মাধ্যমে নির্বাচিত একজন ভোটারের জন্যও থাকছে বিশেষ পুরস্কার(!) সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে যে লিডার বিজয়ী হবেন তিনি যাবেন লটারিতে বিজয়ী হওয়া ভোটারের বাড়িতে, থাকবেন দুইদিন। মুভির শুরুটা এখান থেকেই। এরপর দলীয়, বিরোধী দলীয় আর জনগনের পক্ষ থেকে পদে পদে পাকাতে থাকে নানান জটলা। রাজনীতির মারপ্যাঁচে জনগনসহ রাজনীতিবিদদেরও জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ। এক জাল থেকে বের হয়ে জড়িয়ে পড়ে নতুন আরেক জালে। পলিটিক্যাল লিডাররা আটতে থাকে নানান ফন্দি, এদিকে বেশি টিআরপি’র উন্মাদনায় মিডিয়াগুলো মেতে উঠে নোংরা খেলায়। বের হয়ে আসতে থাকে রাজনীতি আর মিডিয়ার নষ্ট চিত্র।

 

10451690_699413140137593_4628807107992617315_nএই মুভির সবচেয়ে বড় আকর্ষন ছিল ভিন্ন গেটআপে মাহিয়া মাহি। অভিনয়ে এখনো কিছুটা খামতি থাকলেও সৌন্দর্যে এগিয়ে গেছেন অনেক। তবে আগের মুভিগুলো থেকে এটাতে মাহির অভিনয় অনেক ভাল ছিল। এখন পর্যন্ত তার সেরা কাজ বলা যায়। মাহি বরাবরই সুন্দরী, কিন্তু এই মুভিতে তাকে চমৎকারভাবে  রিপ্রেজেন্ট করা হয়েছে। অবশ্য এর বেশির ভাগ কৃতিত্বই যায় পরিচালকের উপর। উপস্থাপক আর সাংবাদিক হিসেবে মাহির পারফরমেন্স কিছু জায়গায় চোখে লাগলেও শুধু প্রেজেন্টেশনের জন্যই সেটা উৎরে গিয়েছে। এই মুভিতে সাংবাদিক সৃষ্টি চরিত্রটায় ন্যাকামি করার কোন চান্স ছিল না, এটা ছিল মাহির জন্য পজেটিভ দিক। শক্তিশালী এই চরিত্রটাকে পুঁজি করে নিজের সর্বোচ্চ টা দেয়ার চেষ্টা করেছেন, এবং তাতে অনেকটাই সফল মাহি।

 

1689240_649297508482490_1898726338_nর‍্যাম্প দিয়ে কাজ শুরু করলেও এই প্রথম শিপন কোন সিনেমায় অভিনয় করলো। নিউ কামার হিসেবে ভালই করেছে। বর্তমানে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে সুদর্শন হিরো বলা যায় তাকে। তবে শিগগির জিম শুরু করতে হবে, তাহলে আরিফিন শুভ’র সাথে ফিটনেসের দিক থেকে পাল্লা দিতে পারবে। পুরো মুভিতে সেলিম চরিত্রে শিপনের পারফরমেন্স ছিল রঙধনুর মত, একেক সময় একেক রকম। সিনেমার একদম শুরুতে গ্রামের সহজ সরল ছেলে হিসেবে ভালই ছিল, কিন্তু একটু পরেই কেমন যেন আনকমফর্টেবল মনে হচ্ছিল। কষ্ট, রাগ যেকোন অবস্থাতেই ভাবলেশহীন মনে হচ্ছিল। তবে বিরতির পর ভাষন দেয়ার সময় থেকে শিপন ফিরে আসে তার পুরোনো ট্র্যাকে। এরপর থেকে বাকি মুভিতে তার পারফরমেন্স পুরোনো ঘাটতি ভুলিয়ে দিয়েছে। প্রথম গানটাতে শিপনের ডান্স করার দক্ষতা চোখে পড়েছে। তার স্টেপগুলো খুবই ক্লিয়ার, একদম মাপামাপা। কিন্তু এক্সপ্রেশন ছিল খুবই কম, তাই  দেখে তৃপ্তি পাওয়া যাচ্ছিল না। এগুলো সংশোধন করা ছাড়াও উচ্চারনের “প্রতি” আরেকটু যত্ন দিলে শিপনকে আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। ইদানিং বাংলা সিনেমায় বেশ কিছু স্মার্ট আর হ্যান্ডসাম হিরো আসলেও “টকলেট বয়” টাইপের হিরো নাই, শিপন সেই ঘাটতিটা পূরন করতে যাচ্ছে।

 

10311826_677093689036205_710849662298485430_nএই সিনেমায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তারিক আনাম খান। উনি বরাবরই অসাধারন অভিনয় করেন, উনাকে নিয়ে কিছু বলার নাই। রাতে গ্রামে মাছ ধরা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সভায় ভাষন দেয়ার পর্যন্ত সব দৃশ্যেই তিনি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। তবে এটা উনার সেরা কাজ না। এর আগের সিনেমা “ঘেটুপুত্র কমলা”তেও তিনি এরচেয়ে ভাল পারফর্ম করেছিলেন। দেশা দ্যা লিডারে বেস্ট পারফর্মার ছিলেন টাইগার রবি। উনি তাঁর প্রথম ছবি “কিস্তিমাত” তেই তাঁর জাত চিনিয়েছিলেন। এত সহজাত খল অভিনেতা খুব বেশি নাই বাংলা সিনেমায়। উনার রাগ, কথা বলার ধরন, এক্সপ্রেশন সবকিছুই একদম খাপেখাপ। পুরো সিনেমায় উনার বেশ কিছু চমৎকার সংলাপ ছিল, কিছু মজার সংলাপও ছিল। সিনেমার একপর্যায়ে নির্বাচিত লিডার যখন সব ক্ষমতার দায়িত্ব আরেকজনকে দিয়ে দেয় তখন উনি বলে উঠেন; “করসে কি হালায়! গাঞ্জা গুঞ্জা খাইছে নাকি?” এটা বলার ধরন আর উনার এটিচ্যিউট দেখে দর্শক হাসতে বাধ্য।

 

73552_1392901594422_7009437_nসিনেমায় ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করা প্রায় প্রত্যেকেই ভাল করেছেন। শুরুতেই বলতে হয় চেয়ারম্যান চরিত্রে অভিনয় করা সোহেল খানের কথা। এরকম একটা সিরিয়াস ইস্যুর মুভিতে কিভাবে পাঞ্চ দিয়ে কথা বললে কমেডি বের হবে সেটা উনি জানেন। উনার মধ্যে ভাঁড়ামির একটা প্রবনতা থাকলেও পুরো মুভিতে সেটা একবারও বুঝা যায়নি। যতক্ষন পর্দায় ছিলেন নির্মল বিনোদন দিয়ে গেছেন। এরপর বলায় পুলিশ ইন্সপেক্টার চরিত্রে এ কে আজাদের কথা। একেবারেই ছোট চরিত্র, কিন্তু যতক্ষন স্ক্রীনে ছিলেন দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। অনেক স্মার্টলি প্রেজেন্ট করা হয়েছে চরিত্রটা। টেলিভিশনের অপরাধ বিষয়ক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান “তালাশ”র উপস্থাপক মুঞ্জুরুল করিম এই মুভিতে ছোট একটা চরিত্র করেছেন এবং উনি উনার মান বজায় রেখেছেন। এঁরা ছাড়াও শিমুল খান, শাকিল আহমেদ, সৃষ্টির ক্যামেরাম্যান, সব সময় বার্গার খেতে থাকা মেয়েটাসহ চ্যানেল 99 এর প্রায় সবাই ই ভাল করেছেন।

 

10671256_788689204543319_3534411483730958208_nমুক্তির আগে যখন এই সিনেমার গানগুলো শুনেছিলাম তখন তেমন ভাল লাগেনি। কিন্তু সিনেমাটা দেখের সময় প্রায় সবগুলো গানই ভাল লেগেছে। অনেকদিন পর বাংলা ছবিতে জেমসের গান দেখে খুব ভাল লেগেছে। গানে জেমসের কন্ঠে প্রথম শব্দটা শুনেই দর্শক উল্লাস শুরু করে। সিনেমার প্রথম রোমান্টিক গানটার দৃশায়ন গতানুগতিক হলেও শুনতে বেশ ভাল লাগছিল। শফিক তুহিন আর কিশোর বেশ ভাল সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। তবে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরে ইমন সাহা ফাটিয়ে দিয়েছেন। এরকম পলিটিক্যাল থ্রিলারের জন্য উনি চমৎকার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর তৈরি করেছেন। প্রথম গানটা ছাড়া বাকি গানগুলোতে মাসুম বাবুল আর হাবিবের কোরিওগ্রাফি মোটামুটি লেগেছে, গ্রামের গানটাতে কোরিওগ্রাফি বেশ ভাল ছিল। দৃষ্টিনন্দন।

 

1909753_721480687930838_1245656840659030141_nদেশা দ্যা লিডারে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা চোখে পড়লেও ডিরেক্টর সৈকত নাসিরের বুদ্ধিমত্তার কারনে সেগুলো খুব একটা আমলে আসেনি। তারপরও যে ব্যাপারগুলো বেশি চোখে লেগেছে তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে “লাইভ টেলিকাস্ট”। কয়েক মাস ধরে যে অনুষ্ঠান দর্শক অনেক আগ্রহ নিয়ে দেখেছে আর ভোট করেছে সেই অনুষ্ঠানের ফাইনাল রেজাল্টের দিন গ্রামের দর্শকগুলো সেই লাইভ অনুষ্ঠান না দেখে গ্রামে খেলাধুলা করছে। এই ব্যাপারটা কেমন না?! এটা যদি লাইভ টেলিকাস্ট না হতো তাহলে ব্যাপারটা মেনে নেয়া যেত। তাছাড়া অনুষ্ঠানটা লিডার খোঁজার রিয়েলিটি শোর চেয়ে লটারির মাধ্যমে একজন ভোটার খোঁজার অনুষ্ঠান বেশি মনে হয়েছে। সিনেমাটাতে মাত্রাতিরিক্ত হাতিরঝিলের ব্যবহার হয়েছে, একটু পর পর হাতিরঝিল দেখানোটা একটু দৃষ্টিকটু ছিল। এছাড়া ছবির মেইন টুইস্ট টা আগে থেকেই আন্দাজ করা যাচ্ছিল। কারন দর্শক অন্য কাউকে সন্দেহ করার কোন অপশন ছিল না। একটা অবশ্য ছিল, কিন্তু সেটা কোন স্ট্রং অপশন না। এরপর অনেকটা সময় ধরে সিনেমাটা চলতে থেকে একসময় মনে হলো হুট করে সিনেমাটা শেষ হয়ে গেছে। সিনেমাটা যেখানে শেষ হয়েছে সেটা ঠিকই ছিল কিন্তু দর্শকের প্রতি কোন অ্যাপিল তৈরি না করে হঠাত করে শেষ হয়ে গেছে। ডিরেক্টর চেয়েছিলেন একটু ভিন্নভাবে ছবিটা শেষ করতে কিন্তু সেই ইমোশনটা তৈরি করতে পারেননি। ২ ঘন্টা ২৫ মিনিটের ছবিটা যদি শেষে আর ১ মিনিট বাড়াতো বা সেই ইমোশনটা তৈরি করতে পারতো তাহলে অনেকটা সময় দর্শকের মনে ছবিটার রেশ থেকে যেত।

 

x2014_12_26_1_11_b.jpg.pagespeed.ic.1B3u2klbJiএই সিনেমার সবচেয়ে ভাল দিক ছিল এর গল্প। পাশের দেশের “কানামাছি” সহ ২-৩টা মুভির সাথে এর প্লটের মিল থাকলেও ডিরেক্টর কোন কপি করেননি সেগুলো থেকে। ডিরেক্টর সৈকত নাসির নিজে ছবিটার গল্প লিখেছেন। এই ধরনের গল্পের ছবি বহুদিন বাংলা সিনেমায় দেখা যায় না। তার উপর টেকনিক্যালি ছবিটা বেশ ভালভাবে তৈরি করা হয়েছে। অনেক দৃশ্যেই বুঝা যাচ্ছিল পর্দায় যা দেখা যাচ্ছে ডিরেক্টর সেগুলোর প্রতি খুবই মনোযোগী ছিলেন। গ্রামের দৃশ্যগুলোতে গ্রামের মানুষদের পায়ে আমি কোন জুতা দেখিনি। যে গানটাতে শিপন পারফর্ম করেছে সেটাতে মাহির পায়ে জুতা থাকলেও শিপনের পা খালি ছিল। তাছাড়া অনেক দৃশ্যেই দেখা যাচ্ছিল পর্দায় যা দেখা যাচ্ছে সবকিছুই অনেক গোছানো। পরিচ্ছন্ন। 1613954_653572831388291_837711144_n এখন পর্যন্ত যতগুলো ছবিতে মাহি অভিনয় করেছে কোন ছবিতেই মাহিকে এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। এক্সপোজ ছাড়াও যে নায়িকাদের আকর্ষনীয়ভাবে প্রেজেন্ট করা যায় সেটা এই ছবিতে আবারো প্রমানিত হলো। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি খুবই ভাল হয়েছে। কিছু জায়গায় দৃশ্যায়নে মুগ্ধ হয়েছি। স্পেশালি বলতে হয় নদীতে(!) ধোপাদের কাপড় কাঁচার সিক্যোয়েন্সটা। কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য, তেমন ইম্পোর্টেন্টও কিছু না এটা কিন্তু এটার দৃশ্যায়ন ছিল চমৎকার। সাথে ছিল কাপড় কাঁচার শব্দে দূর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। এটা ছাড়াও রাস্তায় কিছু ড্রাইভিং এর দৃশ্যও চমৎকার লেগেছে। ছবির কালার গ্রেডিংও ছিল অনেক ভাল। মোটকথা উপভোগ্য একটা ছবি। শুধু খেই হারিয়ে যাওয়া বা ধারাবাহিকতার একটু অভাব ছিল। ডিরেক্টর সম্ভবত আগে তেমন কোন কাজ করেননি। সিনেমা বানানোর আগে উনি যদি বেশ কিছু ডকুমেন্টরি আর শর্টফিল্ম বানিয়ে অভিজ্ঞ হয়ে আসতেন তাহলে এই সমস্যাটা হতো না। পুরো সিনেমাটা দেখে বুঝা যাচ্ছিল উনি ভাল কাজ বুঝেন, গুছিয়ে কাজ করতে জানেন। আরেকটু এক্সপেরিয়ান্স মিশিয়ে সময় নিয়ে মুভিটা শেষ করলে এটা এবছরের সেরা বাংলা সিনেমা হতে পারতো। তারপরও সৈকত নাসির নতুন ডিরেক্টর হিসেবে অনেক ভাল করেছেন। উনার আগামী ছবিগুলো অনেক ভাল হবে সেটা সহজেই আশা করা যায়। :)


এই পোস্টটিতে ১০ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. রিফাত আহমেদ রিফাত আহমেদ says:

    সব সময়ের মতোই ভালো লিখেছেন, তবে আমার পিঁপড়াবিদ্যা এর রিভিউ বেশি ভাল্লাগছে :p

  2. ডার্টি হ্যারি ডার্টি হ্যারি says:

    ট্রিপল এস আবারো ফাটিয়ে দিলেন 😀

  3. রিফাত আহমেদ রিফাত আহমেদ says:

    এইটার সাথে তুলনা করে বললাম …মানে এইটার চেয়ে অগ্নি আর পিঁপড়াবিদ্যা এর রিভিউ পড়ে বেশি মজা পাইছিলাম :p :p

  4. আইম্যান আইম্যান says:

    একটু চাপে আছি নইলে মুভিটা সিনেমা হলেই দেখার ইচ্ছা ছিল :) এখনও দেখার ইচ্ছা খুব। সুযোগ পেলে দেখে নিব। রিভিউ বরাবরের মত চমৎকার, যদিও আপনার লেখা পড়তে একটু সময় বেশি লাগে 😛 বড় বড় রিভিউ 😀

  5. তানিয়া says:

    বাস্তবের পলিটিক্স পছন্দ করি না মোটেও কিন্তু পলিটিক্স সম্পর্কিত মুভিগুলো আমার বেশ ভালো লাগে, এই মুভির কাহিনী এমন কিছু বুঝতাম না যদি না তোমার রিভিউ পড়তাম 😀 কাহিনী ভালো লাগছে, মুভি মেকিং যেমনই হোক, বাংলা ছবিতে কাহিনীর ভিন্নতার জন্য হলেও দেখার আগ্রহ বেড়ে গেলো মুভিটার প্রতি :)
    আর রিভিউয়ে কাহিনী,চরিত্র, সেই সাথে ছোটো বড় বিষয় গুলোকে বিশ্লেষণ ভালো লেগেছে। মোট কথা রিভিউ ভাললাগছে 😀

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন