মুভি রিভিউ – 300 ও 300 পার্ট ২ (স্পয়লার এলার্ট)

images (14)

 

মুভি দুটি অনেকেই দেখেছে তবে এর পেছনের কাহিনি অনেকেই জানে না বিধায় এই পোষ্টের অবতারনা । প্রথমেই বলি এখানে ঐতিহাসিক কাহিনীকে অনেকাংশে রেপ করা হয়েছে । 300 করেই রেখে দিলে বোধ হয় ভালো হত । এই বাজে মানের ফালতু স্ক্রিপ্টে সিকুয়েল করে সব বরবাদ করে দিয়েছে । । তাছাড়া মুভিটি কোন মৌলিক মুভি নয় । ১৯৯৮ সালে নির্মিত ফ্রাঙ্ক মিলারের কমিক সিরিজ অফ দ্যা সেম নেইম থেকে নির্মিত । পরিচালনা করেছেন জ্যাক স্নাইডার । যে যাইহোক কাহিনীতে আসি । মুভি দুটি ভালো করে বুঝতে গেলে এর কাহিনী বুঝে উঠা আগে দরকার ।

 

downloadimages (6)

 

প্রথমেই মুভির ইতিহাসে একটু পিছে যেতে হবে । ৪৯০বিসি তে পার্সিয়ান বা পারসিকরা ম্যারাথনের যুদ্ধে ২,৫০,০০০ হাজার সৈন্য নিয়ে গ্রীক বীর ম্যাল্টিয়াডিসের হাতে মাত্র ১০০০০ এথেনীয় সৈন্য নিয়ে সমূলে মারা পড়ে । যা বিশাল পারস্য সাম্রাজ্যের (বর্তমান ইরান) অধিপতি সম্রাট দারিয়ুসের পক্ষে হজম করা অসাধ্য ছিল । এটাকে উনি ব্যাক্তিগত অপমান হিসেবে নিলেন । মিথ আছে প্রতিদিনের তিন বেলা খাবারের আগে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিতেন “এথেন্স যেদিন আগুনে জ্বলবে, আমার সকল দায়িত্ব শেষ হবে” কিন্তু তার জীবদ্দশায় তা আর সম্ভব হয়নি । দারিয়ুস মৃত্যু শয্যায় পুত্র জারক্সিসকে এথেন্সের (বর্তমান গ্রীস বলা চলে) বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিবার ওয়াদা করিয়ে নেন ।

images (4)

 

দারিয়ূসের মৃত্যুর পর পিতার প্রতিশোধ নিতে পুত্র ‘জারক্সিস’ প্রায় ৫ লক্ষের বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ম্যারাথনের যুদ্ধের (ম্যারাথনের বিখ্যাত দৌড় এখানে থেকেই শুরু) ১০ বছর পরে আবারো আক্রমণ চালায় গ্রীস তথা ইউরোপে এবং এই সময়ই রচিত হয় 300 খ্যাত থার্মোপলির যুদ্ধের ইতিহাস ।এখান থেকে শুরু হয় মুভির কাহিনী ।

 

images

 

সত্য কথা বলতে কি ৫ লক্ষ সৈন্যের সামনে দাড়ানোর সাহস কারো নেই । এথেন্সেরও না। গ্রীক বীর ম্যাল্টিয়াডিসও তখন বেঁচে নেই । বাধ্য হয়ে এথেন্স সাহায্যের হাত বাড়ায় তাদের চিরশত্রু স্পার্টানদের রাজা লিওনাইদাসের কাছে । লিওনাইদাস বোকা ছিলেন না, তিনি জানতেন এথেন্স হারার পর স্পার্টা হবে পারসিকদের পরবর্তী লক্ষ্য । উনি সময় চাইলেন । আর ইশ্বরের আদেশ শোনার জন্য গেলেন ডেলফি মন্দিরে । প্রাচীন ইতিহাসের পট পরিবর্তনে এই মন্দির চিরকালই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছে । ডেলফির মন্দির ওরাকলের কাছ থেকে ঐশ্বরিক বাণী আসলো ।

 

download (1)

 

“এথেন্স পরাভূত হবে পার্সিয়ানদের কাছে , কিন্তু স্পার্টা রক্ষা পাবে যদি মহান হেরাক্লিসের উত্তরসূরি স্পার্টান রাজা আত্মত্যাগ করে” লিওনাইদাস ভাবলেন, এই বাণী তাঁকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে এবং তার আত্মত্যাগেই রক্ষা পাবে স্পার্টা । কিন্তু স্পার্টা’র রাজ্যসভা তার এই দাবীকে উপেক্ষা করল, তাই নিজের ব্যক্তিগত বাহিনীর মাত্র ৩০০ জনকে নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করলেন । তবে আশে পাশের ছোট ছোট রাজ্যগুলো হতে আরও ৭০০০ হাজার সেনা যোগ দিল তার অধীনে । কিন্তু এতো অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে কিভাবে বিশাল ৫ লক্ষ পার্সিয়ান বাহিনীর মোকাবেলা করা হবে? লিওনাইদাস জানতেন এর উত্তর । শুধু একটি স্থানেই আটকে দেওয়া সম্ভব পার্সিয়ানদের আর তা হচ্ছে থার্মোপলির রণক্ষেত্র ।

 

images (7)

থার্মোপলির যুদ্ধ বললে সবার চোখেই রাজা লিওনাইদাসের ছবি ভেসে উঠলেও, যুদ্ধের প্রকৃত মাস্টার মাইন্ড ছিলেন থেমিস্টোক্লিস । থার্মোপলির সহ কোথায় , কিভাবে পার্সিয়ানদের মোকাবেলা করা হবে, তার সবই পরিকল্পণা করেন তিনি । এবং নিজে দায়িত্ব নেন এথেনীয় নৌ-বাহিনীর । কারণ যুদ্ধ এখানে একটি নয় দুটো । একটি স্থল পথে আরেকটি সমুদ্র পথে ।

 

images (8)

 

মাত্র ২০০ গ্রীক জাহাজের বিপরীতে ১০০০ জাহাজ নিয়ে পার্সিয়ান নৌ সেনাপতি তাদের পাত্তাই দিলেন না । তিনি জানতেন এই ক্ষুদ্র বহর নিয়ে গ্রীকরা কিছুতেই তাদের উপর আগ বাড়িয়ে আক্রমণে আসবে না। তাই উনি তার ২০০ জাহাজকে অন্যপথে পাঠিয়ে দিলেন, যেন তারা বিভিন্ন দ্বীপ ঘুরে লিওনাইদাসের বাহিনীর পিছনে অবতরণ করে গ্রীকদের আক্রমণ করতে পারে কিন্তু তারা প্রাচীন নেপালিয়ান থেমিস্টোক্লিসকে চিনতে ভুল করেছিল । সারাদিন চুপ থাকলেও থেমিস্টোক্লিস কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে আক্রমণ চালালেন । তিনি জানতেন দীর্ঘক্ষণ নৌযুদ্ধে এই বিশাল পার্সিয়ান বহরকে পরাস্ত করা যাবেনা বরঞ্চ নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যাবেন; তাই বেছে নিলেন দিনের আলোর শেষ সময়টুকু। রাতে নৌযুদ্ধ করা কিছুতেই সম্ভব নয়, তাই আঁধার নেমে আসার আগেই যতটুকু সম্ভব ক্ষতি করতে চাইলেন পার্সিয়ান বাহিনীর । আর তা করলেনও , সাথে সাথে তার কপালও ভালো ছিল , যে ২০০ জাহাজ অন্য পথে ঘুরে স্থলবাহিনী সাহায্য করতে গিয়েছিল তারা ঝড়ে ডুবে গেল ।

 

 

images (9)

 

স্থলে তখন অন্য রকম খেলা চলছে । ইতিহাসের জনক হেরোডটাস বলেছেন , যুদ্ধ শুরুর পূর্বে, জারক্সিসের দূত আত্মসমর্পণ করার প্রস্তাব নিয়ে হাজির হল স্পার্টানদের শিবিরে। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুকে যারা গৌরবের মনে করে সেই স্পার্টানরা তাচ্ছিল্যভরে প্রত্যাখ্যান করল সেই প্রস্তাব ।

 

images (2)

 

হেরোডিটাসের লিখলেন-
.
পার্সিয়ান দূত বলল-You will die. Our arrows will block the sun. তোমরা মরবেই , আমাদের তীর সূর্যকে পযর্ন্ত কালো করে দিবে ।
.
জবাবে স্পার্টান সেনা ডিয়েনিকেস বলল- Good, then we will fight in the shade. তাহলে তো ভালোই আমরা ছায়াতে যুদ্ধ করতে পারবো ।

ইতিহাসে অমর হয়ে যাওয়া যুদ্ধের ময়দানের সবচেয়ে পুরাতন ও বিখ্যাত উক্তি কিন্তু এটাই।

 

images (3)

 

পার্সিয়ানরা দুদিন ২০ হাজার সৈন্য হারালো । এতে অন্যদের মনবলেও ঘাটতি দেখা দিলো । জারক্সিস চোখে দিশেহারা দেখছেন । এমন সময় পার্সিয়ান উদ্ধারকর্তা হয়ে এলো গ্রীক বিশ্বাসঘাতক “এফিয়াল্টিস” । পরবর্তীতে দুঃখ বেদনায় জর্জরিত হয়ে যার নামের অনুবাদ গ্রীকরা করেছিল “রাতের দুঃস্বপ্ন” নামে । এফিয়াল্টিস সন্ধান দিল এক গুপ্ত পথের , যা ঘুরে স্পার্টান বাহিনীর পিছন ঠিক দিয়ে বেড়িয়ে এসেছে । কথা হিসেবে এটি দু লাইনের তবে প্রভাব অনেক । ব্যাস এতেই যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেলো ।

 

shantonu007-1446742401-7bd93ab_xlarge

 

বিপদ টের পেয়ে রাজা লিওনাইদাস সবাইকে পালিয়ে যেতে বললেও উনি উনার ৩০০ স্পার্টান যোদ্ধা নিয়ে থেমে গেলেন । ওরাকলের বাণী শুনেই লিওনাইদাস আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিলেন, তাঁর প্রাণের বিনিময়ে স্পার্টা স্বাধীন থাকবে, এটাই ছিল তাঁর চাওয়া। আর সৈন্যদের জন্য রাজার পাশে যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করা ছিল পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার । স্পার্টান হেরে গেলো । হেরে গেলো এথেন্স । হেরেডোটাস বললেন – প্রথমে বর্শা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো তারপর তলোয়ার ভাঙ্গলো এরপর বর্ম ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেলো অবশেষে আকাশ কালো করা লক্ষ লক্ষ তীর তাদের শরীর বির্দীণ করে দিল ।
.
সবকিছু শান্ত হয়ে গেলে ধীর পায়ে হেঁটে এলেন জারক্সিস, ঘৃণাভরে এগিয়ে গেলেন রাজা লিওনাইদাসের কাছে । শুধুমাত্র তাঁর কারণেই মাত্র দুইদিনে ২০০০০ সৈন্য হারিয়েছেন। জারক্সিসের আদেশ দিলেন লিওনাইদাসের মাথাটি কেটে তার দন্ডের মাথায় যেন বসিয়ে দেওয়া হয় ।

 

images (10)images (11)

 

 

অবশেষে পিতার কাছে দেওয়া ওয়াদা অনুযায়ী জারক্সিস এসে উপস্থিত হলেন এথেন্সে । সমগ্র এথেন্সকে আগুনে পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হল নিষ্টুর ভাবে । তবে শুধুমাত্র মন্দিরের অল্পকিছু পুরোহিত ছাড়া খুব কম সংখ্যক লোকই ছিল নগরে। ফলে প্রাণহানি হল খুবই নগন্য । তার কারণ আরেক বীর থেমিস্টোক্লিস তখনো বেঁচে আছে । ডেলফি মন্দিরে ওখান থেকে আবার ওরাকল/ভবিষৎবাণী হলো – “কাঠের নগরে আশ্রয় নাও” এই ভবিষৎবাণীর অর্থ কেউ না বুঝলেও থেমিস্টোক্লিস বুঝলেন উনি নগরবাসীদের জাহাজে নিয়ে লুকিয়ে পড়লেন । অপেক্ষা করলেন মোক্ষম সময়ের জন্য । এথেন্স ধ্বংস করার পর জারক্সিস অন্যান্য অঞ্চলের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশকে দিয়ে ফিরে এলেন । যা পরবর্তী ১মাসে খন্ড খন্ড যুদ্ধে থেমিস্টোক্লিস আবার জয় করে নিলেন । ঠিক যেখান থেকে শুরু হয়ে ছিলো সেখানেই ফিরে এলো ।

 

images (12)

 

এরপর দীর্ঘদিনের শান্তি । জারক্সিস এথেন্সকে পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়াতে পিতার ওয়াদা রক্ষা হওয়ায় উনি আর গ্রীকদের নিয়ে মাথা ঘামাননি । সত্য করে বলতে গেলে জারক্সিস ২য় আর কোন চান্স নিতে চায়নি ।
.
সবাইকে অবাক করে দিয়ে ডেলফি মন্দির হতে আবার একটি ভবিষৎবাণী হল -“আর ১৩০ বছর”

এই সংখ্যাটির অর্থ সে মুহুর্তে না বুঝলেও পরবর্তীতে ঐতিহাসিকরা এর অর্থ বের করতে পেরেছিলেন । কারণ এই ১৩০ বছর পর এই গ্রীকের মাটি থেকে জন্ম নিবে ম্যাল্টিয়াডিস , লিওনাইদাস ও থেমিস্টোক্লিস এর এক যোগ্য উত্তরসূরী । যে এই মহাপরাক্রমশীল সম্রাট পারসিক সাম্রাজ্যকে তার পদানদ করবে, উড়াবে তার দেশের পতাকা । সূচনা করবে নতুন সভ্যতা ও সাম্রাজ্য ।
.
যাকে ইতিহাস চিনবে “আলেকজেন্ডার দ্যা গ্রেট” নামে । মাই সুপার হিরো ।

 

images (13)

(Visited 319 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৭ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. লেখাটা ভালো হয়েছে ,যদিও 300 সিনেমার আরো সমালোচনা প্রয়োজন ।কিন্তু “তাছাড়া মুভিটি কোন মৌলিক মুভি নয় । ১৯৯৮ সালে নির্মিত ফ্রাঙ্ক মিলারের কমিক সিরিজ অফ দ্যা সেম নেইম থেকে নির্মিত” এটার সঙ্গে একমত নয়,পৃথিবীর বহু সিনেমাই বই অথবা কমিকস বই থেকে নির্মিত হয়,সেটা পথের পাঁচালি হোক বা ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার ,এগুলো কী মৌলিক সিনেমা নয় ? কারন এগুলো কোন বই বা গ্রাফিক্স নভেল কে ভিত্তি করে করা হয়েছে ।তবে মিলারের গ্রাফিক্স নভেলটাও সেই ইউরোসেন্ট্রিক অলীক বর্নবাদে ভরা যেটা সিনেমাতে আছে ।এখানে হেরোডোটাসের মত কে প্রধান্য দেওয়া হয়,যা এশিয়ানদের হেয় করে।

  2. Sohel Khan says:

    প্রথম পর্বের এ্যাকশান দৃশ্যের সাথে বেজ গিটারের মূর্ছনা একটি চরম ফিলিংস তৈরি করেছিলো।

  3. অসাধারণ .. আরোও এমন লেখা চাই

  4. shantonu007 shantonu007 says:

    ট্রাই মাই বেষ্ট

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন