বাপজানের বায়োস্কোপঃ আমাদের দেশে নির্মিত চমৎকার একটি সিনেমা
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

প্রতিদিন তো হলিউড, কোরিয়ান, সাউথ ইন্ডিয়ান, কলকাতার আরো নানা ভাষার মুভি নিয়ে কথা বলি। আর গ্রুপে বাংলা সিনেমা নিয়ে কথা হলেও, সবাই আজকাল ঢাকা এটাকের গল্পই বলে। তাই চলুন, আজ একটু ভিন্ন কোন গল্প থেকে ঘুরে আসা যাক। আপনাদের রুচির একটু পরিবর্তন আনতেই মূলত আমার আজকের এই ছোট প্রয়াস।
—————বাপজানের বায়োস্কোপ————–
আজ সকাল ৭:৩০ এ ঘুম থেকে উঠেছিলাম। একটা মুভির বাংলা সাবটাইটেলের এডিট বাকি ছিলো আর আজকেই রিলিজ দিবো বলে আগেই ঠিক করেছি। তাই সাব রিলিজ দিতে দিতে যখন দুপুর হয়ে এলো, নেয়ে- খেয়ে আর কিছুতেই চোখ দুটো খোলা রাখতে পারছিলাম না। কিন্তু শরীর যতই আরাম চেয়েই থাকুক না কেন, মন তো তা মেনে নিতে পারলো না। মনের তো তখন একটাই দাবি, ” আমি মুভি দেখবো! আমি মুভি দেখতে চাই!” অলসতার কারণে পিসিতে না গিয়ে শুয়ে শুয়েই মোবাইল হাতে ঢুকে পড়লাম ইউটিউবে, আর ইউটিউব ঘাঁটতেই চোখে পড়লো, “বাপজানের বায়োস্কোপ” নামের একটি মুভি। মুভির প্রশংসা আগেও কানে এসেছে। আর ইউটিউবের কমেন্ট গুলো পড়ে মনে হচ্ছিলো, না জানি কী মিস করে ফেলেছি! তাই দেখতে শুরু করে দেই মুভিটা। তারপর যা উপলব্ধি করি, তা লিখছি পরের প্যারায়।

মুভির একদম শুরুতে দেখানো হয়, নদীর তীড়ে উঠা একদম ফাঁকা লাঠি হাতে বসে আছে এক বৃদ্ধ। বৃদ্ধের খানিকদূরে রাখা একটি বায়োস্কোপের বাক্স। তারপর দেখানো হয়, একটি লোক মাথায় হাত দিয়ে মনমরা হয়ে বসে আছে, আর অনেক অনেক লোকজন তার কানের কাছে এসে বলছে, “ওই লবণ দে! লবণ দে!” এইটুকু দেখে আমি খানিকটা অবাক হলেও, উৎসাহ তখন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ঘুম টুমের কথা ফেলে একদম উঠে বসে মুভি দেখা শুরু করি।
তারপর যখন কলাকুশলীদের নাম দেখানোর পর মুভিটা আবার শুরু হয়, আলাদা এক রকমের ভালোলাগা মনের ভেতর ছেয়ে যেতে লাগে। নদী, নৌকা ও গ্রামাঞ্চলের সেই মায়া ধরানো গান। মুভির প্রতিটি গান অসাধারণ হলেও, প্রথম এই গানটা বেশি অস্থির লেগেছে। আমার ধারণা ছিলো, হয়তোবা মুভিটা গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলোকে আমাদের সামনে তুলে ধরবে। কিন্তু মুভি যে এতো সুন্দর একটা বার্তাও দিবে, আমার জানা ছিলো না। আসলে একটি নয়, মুভি অনেক গুলো বার্তা দিয়েছিলো।

প্রথমত, হাছনের চরিত্রের দিকে তাকিয়ে দেখলে দেখবেন, হাছন কিন্তু বাপ- দাদার শিকড়কে ভুলে যায়নি। আজকাল গ্রামের অনেক ঐতিহ্য আমরা হারিয়ে ফেলছি শুধুমাত্র নিজেদের অবহেলা ও অনাদরের ফলে। আমাদের গ্রামবাংলার গান, নানা খেলাধুলা, নানা শিল্প, সংস্কৃতি আমরা যদি হাছনের মতো করে সবার সামনে মেলে ধরতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের দেশ আরো এগিয়ে যাবে, আরো স্বতন্ত্রতা লাভ করবে।

দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধ। একটা মুভিকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক না করেও, গৌণভাবে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরে, এর তাৎপর্য কিভাবে দর্শকদের সামনে ফুটিয়ে তুলতে হয়, তার দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ এই মুভিটি। মুক্তিযুদ্ধ যে আমাদের দেশ, জাতি, আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য কতোটা অপরিসীম গুরুত্ববহন করে, তা এই মুভিতে নিপুণতার সাথে তুলে ধরা হয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়েই আমাদের যুদ্ধের দিন শেষ হয়ে যায়নি। যুগ যুগ ধরে, কালের পর কাল ধরে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পথ অনুসরণ করে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। অন্যায়, অবিচার ও শোসনের প্রতি। পাশবিকতা ও নিপীড়নের প্রতি। কারণ রাজাকাররা এখনো আমাদের মধ্যেই কিছু মানুষের অন্তরে লুকায়িত আছে।

তৃতীয়ত, মুভিতে নারীদের একটা দিকও কিন্তু তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের এই পুরুষশাসিত সমাজে বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে নারীরা ঘরের শোভা বৃদ্ধি করে ও ঘরকে আলোকিত করে। পুরুষেরা তাদের স্ত্রীকে শাড়ি, চুড়ি, সোনাদানা সব দিতে রাজি, কিন্তু তাদের স্বাধীনতা নয়। নারীদের যেন দুটোই কাজ, সংসার করা ও স্বামীর দেখাশুনা। আগেও শুনেছি, গ্রামাঞ্চলে নারীদের অভিমত, প্রতিবাদ ও সংগ্রামী পদক্ষেপকে কেউ সহজে মেনে নেয় না। এই মুভিতেও তাই দেখানো হয়েছে।

চতুর্থত, দশ জনের সাহসী ও আদর্শ লোকের দরকার নেই। একজন শতভাগ সাহসী ও অপ্রতিরোধ্য লোক একটি সমাজে থাকলেই যথেষ্ট। বাস্তব জগতে তারাই সুপার হিরোর দায়িত্ব পালন করে থাকে। আর মুভিতেও এমন এক চরিত্রের গল্প দেখানো হয়েছে। যে তার অদম্য মনোবল, দুঃসাহস ও বদ্ধপরিকর মন নিয়ে পুরো একটা সমাজকে নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়েছিলো। যদিওবা তাকে অনেক পরিশ্রম ও বাঁধা বিপত্তিকর পরিস্থিতিও সামাল দিতে হয়েছে।

পঞ্চমত, প্রতিটি মানুষের ভেতর একটা আদর্শবোধ ও ন্যায়বোধ বজায়মান থাকে। আর যখন অনেকগুলো মানুষ কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রতিপক্ষ যতোই শক্তিশালী হোক না কেন, হার তার মানতেই হয় দিনশেষে। আর মুভিতে গ্রামবাসী শেষের দিকে সেই ভূমিকাই পালন করেছিলো।

এটি কোন রিভিউ নয়। আমার নিজস্ব কিছু কথা। মুভিটা চমৎকার থেকে বেশি কিছু। মুভিটার গল্পটা অসাধারণ, অভিনয়শিল্পীদের অভিনয় দুর্দান্ত, গানগুলো অত্যন্ত শ্রুতিমধুর, সংলাপগুলো দারুণ ও সর্বোপরি মুভিটা আমার দেখা অন্যতম সেরা দেশী চলচ্চিত্র।
ইউটিউবে মুভিটি পাবেন।আশা করি, মুভিটি সবার ভালো লাগবে।

এই পোস্টটিতে ৬ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. Kabir Sumon says:

    খুবই সুন্দর একটা সিনেমা।।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন