প্রকাশ রাজঃ ভারতের এক রত্নতুল্য অভিনয়শিল্পী
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

প্রকাশ রাজকে চিনেন না, এমন সাউথ ইন্ডিয়ান মুভির ভক্ত আছে বলে আমার মনে হয়না। কারণ এই মানুষটিকে আপনি হয়তো নায়কের চরিত্রে দেখেননি সত্যি, কিন্তু সাউথ ইন্ডিয়ান চারটি ইন্ডাস্ট্রি সহ বলিউডে মুভি করার ফলে তাঁকে কোন না কোন মুভিতে আপনি অবশ্যই দেখেই থাকবেন। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, তাঁকে একবার দেখলেই আপনি তাঁকে আর সহজে ভুলতে পারবেন না। তাঁর অভিনয়শৈলীটাই ওমন, সহজে মন থেকে মুছে ফেলবার মতন নয়।
তাহলে এবার তাঁর সাথে আমার পরিচয় কিভাবে হয়েছিলো, সেই কাহিনীর অল্পবিস্তর একটু বলে নেই। আমার সাউথ ইন্ডিয়ান মুভির জগতে পথচলা শুরু হয়েছিলো মহেশ বাবুর কোন এক মুভির মাধ্যমে। আর ওই মুভিতে যিনি ভিলেন চরিত্রে ছিলেন, তিনি হলেন প্রকাশ রাজ। ওই একটা তেলুগু মুভি দেখেই আমি তাঁকে ভিলেন রূপে পছন্দ করা শুরু করি। এছাড়া মনে হয় আগেও বলিউডের মুভিতে তাঁকে দেখেছি, তবে সেইরকম কিছু এখন মাথায় নেই। তারপর একে একে মহেশের মুভি একটির পর একটি দেখা যখন চালিয়ে যাচ্ছিলাম, খেয়াল করলাম অর্ধেকের বেশি মুভিতে তিনি আছেন। আর তারপর থেকেই, আমার তাঁকে ভালো লাগার শুরু।

এবার তাঁর পরিচয়ের পর্ব থেকে ঘুরে আসা যাক। প্রকাশ রাই ১৯৬৫ সালের ২৬ শে মার্চ ব্যাঙ্গালুরের একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মঞ্জুনাথ একজন তুলুভাষী লোক ও মাতা স্বর্ণলতা একজন কন্নড়ভাষী ছিলেন।তিনি সেন্ট জোসেফ স্কুল ও কলেজ থেকে কমার্সে ডিগ্রী অর্জন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে দুইবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হোন।প্রথমবার, ১৯৯৪ সালে ললিতা কুমারী সাথে, তাঁরা একত্রে তিন সন্তানের জনক-জননী হোক। মেঘনা ও পূজা নামের দুই কন্যা ও মৃত পুত্র সিদু যে কিনা একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যায়। ২০০৯ সালে প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়ার পর ২০১০ সালে তিনি কোরিওগ্রাফার পনি ভার্মাকে বিয়ে করেন, পরে তাঁদের ঘর আলোকিত করে পুত্র ভেদান্ত আসে।
এবার তাঁর সিনেমাজগতে আসার গল্পের দিকে মনোযোগ দেওয়া যাক। প্রকাশ রাই নামক একজন অভিনেতা ১৯৮৬ সাল থেকে কন্নড়ের টিভি সিরিয়ালে অভিনয় শুরু করেন, তাঁর উল্লেখযোগ্য টিভি সিরিয়াল ছিলো, “দূরদর্শন”। এরপর তিনি কন্নড়ের মুভিগুলোতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলে ধীরেধীরে নিজের প্রতিভা বিকশিত করতে থাকেন।তারমধ্য রামচারী, লক আপ ডেথ, রানাধীরা অন্যতম। তাঁর মূল চরিত্রে অভিনীত প্রথম মুভি ছিলো, “হারাকেয়া কুরি” যাতে তাঁর অসামান্য অভিনয় দক্ষতা মুভির নায়িকা গীতার চোখে পরে ও তিনি তাঁকে নিজের গুরু তামিল পরিচালক কে. বালাচন্দ্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। বালাচন্দ্রেএ কথা মোতাবেক প্রকাশ রাই নিজের নাম বদলিয়ে প্রকাশ রাজে পরিণত হোন। ১৯৯৪ সালে তাঁর অভিনীত প্রথম তামিল মুভি, “ডুয়েট” মুক্তি পায় যার পরিচালক ছিলেন বালাচন্দ্র। এরপর প্রকাশ রাজ আবার কন্নড় ইন্ডাস্ট্রিতে ফিরে আসেন। ১৯৯৭ সালে তিনি মণি রত্মের মুভি, “ইরুভার” এ পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি সমালোচকদের দৃষ্টিও কেড়ে নেন।তারপর আর থেমে থাকা নেই। তেলুগু, মালায়ালাম, তামিল, কন্নড় চার ইন্ডাস্ট্রিতেই একনামে দাপটের সাথে অভিনয় করে চলেছেন তিনি। ২০০২ সালে বলিউডেও তাঁর অভিষেক ঘটে শক্তি মুভির মধ্যে দিয়ে।তবে তিনি বলিউডে পরিচিতি পান ২০০৯ সালের ওয়ান্টেড মুভির মাধ্যমে ও সেই থেকে এখন বলিউডেও নিয়মিত তিনি।

এবার প্রকাশ স্যারের অভিনয় জগতের অর্জনগুলো থেকে এক ঝলক দিয়ে আসা যাক। প্রথমে তাঁর অর্জিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের কথা বলতে হয়। তিনি ১৯৯৮ সালে ইরুভান মুভির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এরপর, আন্তাপুরান মুভির জন্য বিশেষ জুড়ি বোর্ড থেকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ২০০৯ সালে কাঞ্চিভারাম মুভির জন্য সেরা অভিনেতা ও ২০১১ সালে পুত্তাক্কানা হাইওয়ে মুভির জন্য প্রযোজক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত হোন।

এছাড়া তিনি ১৩ বার ফিল্মফেয়ারে মনোনয়ন লাভ করেন ও দুইবার সেরা পার্শ্ব অভিনেতা, দুইবার সেরা ভিলেন ও একবার সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতে নেন। তিনি ছয়টি নন্দী এওয়ার্ডও জিতেছেন। তাছাড়া আটটি তামিলনাড়ু স্টেট এওয়ার্ড, তিনটি বিজয় এওয়ার্ড, তিনটি সিনেমা এওয়ার্ড, একটি জি সিনে এওয়ার্ড, একটি ইন্টারন্যাশনাল তামিল ফিল্ম এওয়ার্ড, একটি ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়ান ফিল্ম একাডেমী এওয়ার্ড ও একটি সান্তোষাম এওয়ার্ড তাঁর ঝুলিতে তাঁর অমায়িক অভিনয়গুণের প্রাপ্তি হিসেবে সঞ্চিত রয়েছে।

এখন তাঁর সম্পর্কে কয়েকটি জানা-অজানা তথ্য শেয়ার করি। প্রকাশ রাজ ক্লাস সেভেনে থাকাকালীন সময় থেকে অভিনয়ের প্রতি টান অনুভব করেছিলেন। তিনি শুধু অভিনেতাই নন, পরিচালক ও প্রযোজকও বটে। তাঁর “ডুয়েট মুভিজ” নামক একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আছে। তিনি গৌতম বোদ্ধের অনুসারী ও তাঁর জীবন এই মহান ধর্মীয় প্রচারকের অনেক বড় প্রভাব রয়েছে। তিনি পুরো মাহাবুব নাগার জেলাকে দত্তক নেন এর উন্নয়ন সাধনের জন্য, যা তাঁর মহানুভবতার পরিচয় দেয়। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ধূমপান ও মদ্যপান করে থাকেন। তাঁর পছন্দের খাবার বিরিয়ানী। তাঁর পছন্দের অভিনেত্রী তৃষা। তাঁর উচ্চতা ৫ ফিট ৯ ইঞ্চি ও চোখের রঙ বাদামী। তিনি প্রতি মুভির জন্য ১.৫ কোটি রুপি নিয়ে থাকেন ও তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৫০ কোটি রুপি।
আর তাহলে লিখলাম না। এবার শুধু দুই-তিন লাইনে আমার নিজের তাঁকে নিয়ে কি ভাবনা তা লিখতে চাই। আমার মতে, ভিলেন এমন হওয়া উচিৎ যাকে এতোটাই ঘৃণা করা যাবে যে মুভিতে তাঁর মৃত্যুর জন্য মন থেকে দোআ আসবে। আর প্রকাশ স্যার ঠিক সেই ধরণের ভিলেন। যার অভিনয়শিল্প এতোই নিখুঁত যে পর্দার প্রকাশ রাজকে আপনি চরম ভাবে ঘৃনা না করে পারবেন না। এছাড়া কঠোর পুলিশ চরিত্রে ও স্নেহশীল পিতা চরিত্রেও তিনি বরাবরের মতন নিজের শতভাগ দিয়ে চরিত্রটিকে বাস্তবসম্মত করে তুলেন।

প্রকাশ স্যার, ভালো থাকুন।এভাবেই সাউথ ইন্ডিয়ান মুভিগুলোতে নিজের অসাধারণ অভিনয় ক্ষমতাবল দ্বারা দর্শকদের আনন্দদান করে যান আজীবন। আপনার জন্য মন থেকে শুভকামনা ও সালাম।

এই পোস্টটিতে ২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. Saif Sanvi says:

    কিন্তু দুখঃ হল যে আমাদের দেশের কাউকে নিয়ে ইনডিয়ার কেউ কোনদিন কিছু লিখলেন না।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন