আতঙ্কের শতবর্ষ : আ ব্রীফ হিস্টরি অভ্‌ হরর

সত্যজিৎ রায় না-কি ছয় বছর বয়সে বলেছিলেন, আমি জার্মানি গিয়ে ছবি বানাবো। হিসেব অনুসারে সেটা ১৯২৭ সাল হবার কথা। আর কাহিনী সত্যি হয়ে থাকলে শিশু সত্যজিৎ জায়গা চিনতে ভুল করেন নি। নির্বাক যুগের শ্রেষ্ঠ সব মাস্টারপীস তখন বানানো হচ্ছে Weimar Republicতৎকালীন জার্মানিতে। বিশ্বচলচ্চিত্রের উপর এইসব নির্বাক ছবির প্রভাব এতোটাই প্রবল যে, আমাদের সময়ের সিনেমাতেও তাদের টের পাওয়া সম্ভব।

Le Manoir du Diable (১৮৯৬), যাকে প্রায়ই বলা হয় পৃথিবীর প্রথম ভয়ের ছবি।

Le Manoir du Diable (১৮৯৬), যাকে প্রায়ই বলা হয় পৃথিবীর প্রথম ভয়ের ছবি।

এদের সাধারণ নাম এক্সপ্রেশনিস্ট মুভি। এরকম নাম হবার পেছনে কারণ হলো, কথার অভাব পূরণ করা হতো অভিব্যক্তির দ্বারা। এই অভিব্যক্তি শুধু অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অংশে নয়—পুরো প্রোডাকশনের আবহজুড়ে। প্লটের প্রতিটি নাটকীয়তা প্রকাশ করার মাধ্যম ছিলো পাত্র-পাত্রীদের মুখের ক্লোজ শট, ছায়ার উপস্থিতি এবং বিষাদের প্রগাঢ়তা। কয়েকটি ছবি (বিখ্যাত উদাহরণ দাস্‌ কাবিনেট্‌ দেস্‌ ডক্‌টর ক্যালিগারি—ড. ক্যালিগারির ক্যাবিনেট, ১৯২০)-তে কলাকুশলীর অঙ্গসঞ্চালন পর্যন্ত ছিলো নাটকীয়, এবং সেট নির্মাণ করা হয়েছে স্বপ্নদৃশ্যের আবহে। প্রসঙ্গত The Cabinet of Dr. Caligari “টুইস্ট এন্ডিং” প্লট সম্বলিত সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র।

ক্যালিগারির ক্যাবিনেট, মনস্তত্ব নিয়ে নির্মিত প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ ছবিগুলির একটি

ক্যালিগারির ক্যাবিনেট, মনস্তত্ব নিয়ে নির্মিত প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ ছবিগুলির একটি

এইসময়ের প্রায় সমস্ত এক্সপ্রেশনিস্ট ছবির মূল আবহ ছিলো ভৌতিক। এটি লক্ষ্যণীয়; চলচ্চিত্রের ইতিহাস সমৃদ্ধ করতে সবচে’ বেশি অবদান এই জেনার-টিরই। ১৯১৩ সালের The Student of Prague, ১৯১৪ সালের ডের গোলেম হরর জেনারের প্রথমদিককার উদাহরণ। যদিও তারা প্রথম সার্থক হরর মুভি নয়। সেই কৃতিত্বটি সাধারণত দেওয়া হয় ১৯২২ সালের সিনেমা নসফেরাতু-কে, মুর্নাউ পরিচালিত। ১৮৯৭ সালে বের হওয়া ব্র্যাম স্টোকারের গথিক উপন্যাস Dracula অবলম্বনে নির্মিত আমাদের হাতে পৌঁছানো প্রথম চলচ্চিত্র। তবে আইনি জটিলতার কারণে স্টোকারের বিধবা স্ত্রী ছবিটির সকল প্রিন্ট বাজেয়াপ্ত করতে সক্ষম হন, এবং কয়েকটি বাদে সমস্ত প্রিন্ট পুড়িয়ে ফেলাও হয়। চলচ্চিত্র সমালোচকেরা ছবিটি নিয়ে কথা বলতে গেলে একবার করে অবশ্যই বলে থাকেন আমরা কতোটা ভাগ্যবান।

নসফেরাতু সিনেমার একটি আইকনিক দৃশ্য

নসফেরাতু সিনেমার একটি আইকনিক দৃশ্য

আইনসম্মত অনুমোদন ব্যতিরেকে নির্মিত হবার সুবাদে স্টোকারের কাউন্ট ড্রাকুলা হয়ে যায় কাউন্ট অর্‌লক, ভ্যাম্পায়ার হয়ে পড়ে নসফেরাতু। হার্কার বনে যায় হাটার, তার স্ত্রী মিনা হয়ে পড়ে এলেন। কাহিনীতেও প্রচুর রদবদল আনা হয়, বিশেষ করে প্লটের ক্রান্তিলগ্নে। এরপরও আমার ব্যক্তিগত বিচারে উপন্যাসটির শ্রেষ্ঠতম রূপায়ণ এটি। পুর্বোল্লেখিত এক্সপ্রেশনিজম পুরো গথিক আবহকে এমন এক উচ্চতর দুঃস্বপ্নের বায়ুমণ্ডলে পৌঁছে দিয়েছে, যেটা অনেক ক্ষেত্রে স্টোকারের মূল উপন্যাসের চাইতেও বেশি সার্থক। মুর্নাউ এর পর, ১৯২৬ সালে, আরেকটি মাস্টারপীস নির্মাণ করেন, গ্যেটে-র নাটক ও প্রচলিত লোককাহিনী অবলম্বনে ফাউস্ট। আমাদের পরিচিত কমিক চরিত্র “জোকার” এর বীজ পরোক্ষভাবে রোপণ করে মেফিস্টো, আর প্রত্যক্ষভাবে রোপণ করে আরেক জার্মান ছবি, ১৯২৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত The Man Who Laughs, অনেকের মতে জার্মান নির্বাক এক্সপ্রেশনিস্ট যুগের শেষ সোনালী ফসল। ভিক্তর হুগো-র গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিটির নায়ক ছোটবেলায় ডাকাতের হাতে বন্দী হয়। ডাকাত সর্দার তার গাল এমনভাবে কেটে দেয়, যাতে মনে হয় তার মুখে অমোচনীয় একটি হাসি লেগে আছে। যাকে বলে আয়রনি, সেটি হলো তার বাস্তব দুঃখভারাক্রান্ত জীবন।

The Man Who Laughs চলচ্চিত্রে কন্‌রাড্‌ ভাইড্‌ট্‌

The Man Who Laughs চলচ্চিত্রে কন্‌রাড্‌ ভাইড্‌ট্‌

জার্মানদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে হলিউডেও এমন ভয়ের আবহে ছবি নির্মিত হতে থাকে, এর ভেতর উল্লেখযোগ্য Dr. Jekyll and Mr. Hyde (১৯২০), The Hunchback of Notre Dame (১৯২৩), The Phantom of the Opera (১৯২৫), The Cat and the Canary (১৯২৭)।

Phantom of the Opera ছবিতে লন্‌ চ্যানি

Phantom of the Opera ছবিতে লন্‌ চ্যানি

বলা হয়ে থাকে, আমরা এখন মুভি যেরকম দেখি, আলফ্রেড হিচ্‌ককের জন্ম না হলে সেরকম দেখতাম না। এই একক প্রভাবশালী চিত্রনির্মাতা তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেন জার্মানিতে, এবং তাঁর প্রথম দিককার ছবিগুলি সরাসরি এক্সপ্রেশনিস্ট। ১৯৬০ সালে তিনি যে হরর জেনারের মাইলফলক মুভি সাইকো নির্মাণ করবেন, এতে আর আশ্চর্য কী?

হরর মুভি সম্ভবত চলচ্চিত্রের সবচাইতে পুরাতন শাখা। ১৮৯০ এর পর, চলমান দৃশ্য ধারণের টেকনোলজি আবিষ্কৃত হবার পর-পরই, ভয়ের ছবি নির্মাণের প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। নির্বাক যুগের অবসানের পর ত্রিশের দশকে “ক্লাসিক” ভয়ের ছবি আমরা দেখতে পাই। এর ভেতর ১৯৩১ সালের হলিউডি ছবি ড্রাকুলা, একই বছরের ফ্রাঙ্কেন্‌স্টাইন এবং ১৯৩২ এর দ্য মামি নাম করার মতন। ১৯৪২ এর ক্যাট পীপল সাইকোলজিক্যাল হরর জেনারের প্রথম নিদর্শন বলা চলে।

১৯৫০ এর ভয়ের ছবিগুলিতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর ছায়া পড়ে। জাপানী গজিরা (Godzilla, ১৯৫৪) এবং রাদন (Rodan, ১৯৫৬) এই ঘরানার ছবি। ষাটের দশকে হিচ্‌ককের Psycho, রোমান পোলান্‌স্কি-র Repulsion (১৯৬৫) মানুষের ব্যক্তিগত সঙ্কটাপন্ন মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশের যেসব আতঙ্ক, তাদের সার্থক চিত্রায়ন।

Psycho সিনেমার বহুল আলোচিত শাওয়ার দৃশ্য

Psycho সিনেমার বহুল আলোচিত শাওয়ার দৃশ্য

ষাটের দশকের শেষভাগ এবং সত্তরের দশক উপহার দেয় শয়তান সংক্রান্ত বেশ কিছু চলচ্চিত্র। পোলান্‌স্কি-র Rosemary’s Baby (১৯৬৮), ১৯৭৩ এর The Exorcist এবং ১৯৭৬ সালের The Omen-কে একত্রে বলা হয় “ডিমোনিক পজেশন চাইল্ড” ত্রয়ী।

আশির দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভয়ের ছবি স্ট্যানলি কুবরিক-এর The Shining (১৯৮০)। তীব্র অশুভ অতিপ্রাকৃত, উন্মাদনা, বেঁচে থাকার তাগিদ এই ছবিতে উঠে এসেছে ওভারলুক হোটেলের শীতকালীন কেয়ারটেকার জ্যাক টর‍্যান্স (জ্যাক নিকোলসন) এবং তার পরিবারের মধ্য দিয়ে। জ্যাকের ছেলে ড্যানি-র অতিলৌকিক কিছু ক্ষমতা রয়েছে। ওভারলুক হোটেলের পৈশাচ থেকে পরিবারটির রক্ষা পাবার যেটি একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

Here's Jooooohnney!

Here’s Jooooohnney!

সত্তর-আশির দশক স্ল্যাশার ফিল্মেরও যুগ। বেশ কিছু স্বাধীন চলচ্চিত্রকার (এই ধারার সূচনাকারী অবশ্য সব অর্থে ১৯৬৮ এর Night of the Living Dead) নামমাত্র বাজেটে প্রচণ্ড ব্যবসাসফল, প্রচণ্ড ভায়োলেন্ট কিছু মুভি নির্মাণ করেন। The Texas Chainsaw Massacre (১৯৭৪) ও Halloween (১৯৭৮); আশির দশকের The Evil DeadNightmare on Elm Street উল্লেখ করার মতো। ক্লাইভ বার্কার-এর Hellraiser (১৯৮৭) সফল এক্সপেরিমেন্টের উদাহরণ।

সাইকো থ্রিলার ও স্ল্যাশার ফিল্মের মিশেল The Silence of the Lambs নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিককার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। ১৯৯৮ সালের রিংগু (The Ring) জাপানের সবচাইতে সফলআর্থিক এবং নান্দনিক বিচারেহরর মুভি। আমেরিকান ছবি The Blair Witch Project (১৯৯৯) ডকুমেন্টারি স্টাইলে বানানো অভিনব এক চলচ্চিত্র।
নতুন সহস্রাব্দে যেসব ভালো ভয়ের ছবি হয়েছে তার মধ্যে দু’টি স্পেনদেশীয় ছবির নাম না করলেই নয়। একটি হলো ২০০৪ এর The Others এবং অপরটি ২০০৭ এর REC

অতিপ্রাকৃতের উপস্থিতি অনেকে বাস্তবতার পরিপন্থী হিসেবে গণ্য করেছেন। মানুষকে ভয় দেখানো ছাড়া আর কোনও মহৎ উদ্দেশ্য সাধন না করারও দুর্নাম রয়েছে হরর জেনারের। যখন এভাবে আমরা ভাবি, তখন আসলে আমরা ভুলে যাই চলচ্চিত্রের আদি এবং অন্যতম লক্ষ্য দর্শকের মনের দরজা খুলে তার ভেতরে প্রবেশ করা, ছবির সাথে দর্শককে একাত্ম করা, তার ভেতর একটি ভাব জাগিয়ে তোলা। যে-চলচ্চিত্র এইসবে সফল হবে, আমরা কী করে তার নান্দনিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি? আমরা এ-ও প্রায়শঃ ভুলে যাই, ভয়ের ছবি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা অশুভ, নানা কষ্ট এবং বোবা আতঙ্ক ফুটিয়ে তোলে অহরহ, প্রতীকের মাধ্যমে, রূপকের মাধ্যমে। সত্যি বলতে, “এফেক্টিভনেস্‌” বিবেচনায়, ভয়ের ছবির বিকল্প আর কোনও চলচ্চিত্রের ধারা কল্পনা করা সম্ভব নয়।

(Visited 153 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. Sev Darcy says:

    যথারীতি চমত্‍কার লেখা! লেখায় উল্লেখ্য করা অধিকাংশ মুভিগুলোই দেখা হয়নি, ঐগুলো দেখে নেয়া উচিত।

    • নস্‌ ফেরাতু says:

      ধন্যবাদ সেভ! আমারও অনেকগুলি দেখা বাকি। বিশেষতঃ এখনও টেক্সাস চেইনস’ ম্যাসাকার দেখা হয়ে উঠলো না, এই আফসোস কোথায় রাখি!

  2. ধ্রুব নীল says:

    একখান ভয়যুক্ত রিভিউ :jrb:

    নতুন সহস্রাব্দের মুভিগুলোর মাঝে The Skeleton Key মুভিটাও উল্লেখযোগ্য ।

  3. সি.এম. তানভীর উল ইসলাম says:

    লেখা অনেক ভালো লেগেছে এবং অনেক কিছু জানলাম 🙂 সিরিজ আকারে ও অনেক বিস্তারিত লিখলে ভালই হত…

  4. অনিক চৌধুরী says:

    হরর জেনার খুব প্রিয় আর লেখাটা পড়ে খুব ভাল লাগলো।

  5. মিজানুর রহমান মিজানুর রহমান says:

    চমত্‍কার লেখা ! হরর জেনার খুব প্রিয় আর লেখাটা পড়ে খুব ভাল লাগলো।
    :rate

  6. মেগামাইন্ড says:

    চমৎকার লিখসেন

  7. নস্‌ ফেরাতু says:

    ধন্যবাদ @মেগামাইন্ড!

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন