ড. ক্যালিগারির বাক্স

তৎকালীন Weimer Republic অর্থাৎ জার্মানিতে ১৯১০ এবং বিশের দশকে বানানো ছবিগুলির প্রভাব ত্রিশ এবং চল্লিশের দশকেই ফুরিয়ে যায় নি। তাদের প্রভাব হাল আমলের ছবিগুলিতেও দেখা যায়। সেই সময়ের ছবিগুলিতে যেহেতু কথা ধারণ করবার কোনও ব্যবস্থা ছিলো না; পরিচালকেরা অন্যান্য যতো উপকরণ আছে তার মাধ্যমে বক্তব্যটা ফুটিয়ে তুলতে চাইতেন। চরিত্রগুলি কথা বলতে পারছে না। কিন্তু তাতে কী? অভিব্যক্তি এবং চলাফেরা, সেই সাথে আলোছায়া, ক্লোজ-আপ, তীর্যক ক্যামেরা কোণ ইত্যাদির মাধ্যমে হয়তো অনেক সময় পরিচালক এমন সব বক্তব্য রাখতে সফল হতেন, যেটা মুখের কথা দিয়েও বলা সম্ভব হতো না। বোবা কিছু চরিত্র শুধু অভিব্যক্তির মাধ্যমে তাদের অবস্থা প্রকাশ করে চলেছে, ব্যাপারটা কিছুটা হলেও দুঃস্বপ্নের সাথে তুলনীয়। কাজেই তৎকালীন জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট ছবিগুলি যে প্রোটো হরর, সেটা কাকতালীয় কিছু নয়।

মুভির পোস্টার। সেট ডিজাইন খেয়াল করুন।

মুভির পোস্টার। সেট ডিজাইন খেয়াল করুন।

স্পষ্টতঃই Das Cabinet des Dr. Caligari (The Cabinet of Dr. Caligari—১৯২০) আমরা যাকে ভূতের ছবি বলি তা নয়। তবে একে প্রোটো হরর বলা যায়। চিত্রনাট্যলেখক হান্স জানোভিৎজ় এবং কার্ল মেয়ার ঠিক করেছিলেন ভয়ের আবহ নিয়ে একটি গল্প বলতে। তাঁরা চাইছিলেন একদম নতুন রকমের একটি স্টোরিটেলিং উদ্ভাবন করতে—ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং। তাঁরা দুইজন এবং পরিচালক রবার্ট ভীন মিলে পৃথিবীর প্রথম “টুইস্ট এন্ডিং” সম্বলিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন। এই ছবিতে প্রতিটি ঘর, আসবাবপত্র, দেয়াল এবং স্থাপনা হয়ে গিয়েছে শিল্পীর ক্যানভাস। অভিনেতাদের সুরিয়্যালিস্টিক অভিনয় (এক্সপ্রেশনিজমের চূড়ান্ত ধাপ) এই দৃশ্যগত দুঃস্বপ্নের সাথে সঙ্গতি দিয়ে গিয়েছে।

প্রথম দৃশ্য। জনৈক বৃদ্ধ অশুভ আত্মাদের দিয়ে গল্প শুরু করেছেন।

প্রথম দৃশ্য। জনৈক বৃদ্ধ অশুভ আত্মাদের দিয়ে গল্প শুরু করেছেন।

গল্পটি বলা হয়েছে ফ্ল্যাশব্যাকে। ফ্রান্সিস (অভিনয় করেছেন ফ্রীড্‌রিখ ফেহের) নামের এক যুবক আর এক বৃদ্ধ আলাপ করছে। সেখানে একটি তরুণী মেয়ে ঘোরলাগা ভঙ্গি নিয়ে হেঁটে আসে। ফ্রান্সিস বলে যে মেয়েটি তার বাগদত্তা। এরপর তার গল্প শুরু হয়।

হল্‌স্টেনভাল্‌ নামে একটি শহরে থাকতো ফ্রান্সিস। অ্যালান নামে তার এক প্রাণের বন্ধু ছিলো। দুই বন্ধু একসাথে ভালোবাসতো জেইন (লিল্‌ ডাগোভার)-কে। সেই শহরে একদিন মেলা শুরু হয়। তাতে খেলা দেখাতে আসে এক জাদুকর। তার নাম—ড. ক্যালিগারি।

ড. ক্যালিগারি

ড. ক্যালিগারি

এবং সেই থেকে গণ্ডগোলের শুরু। যে অফিসার ক্যালিগারি যখন খেলা দেখাবার অনুমতি চাইতে গিয়েছিলো তখন তাকে যথেষ্ট সম্মান দেখায় নি, রাতে সে খুন হয়। আসলে ক্যালিগারির খেলাটা কী? সে একা আসে নি। তার সাথে আছে একটি বাক্স, এবং বাক্সের মধ্যে আছে চিরঘুমন্ত সীজার (দ্য ম্যান হু লাফস খ্যাত কিংবদন্তী অভিনেতা কন্‌রাড্‌ ভাইড্‌ট্‌ চরিত্রটিতে রূপদান করেছেন), যেকোনও প্রশ্নের উত্তর যার জানা।

‘Cesare! Do you hear me? It is I calling you: I, Caligari, your master. Awaken for a brief while from your dark night.’

‘Cesare! Do you hear me? It is I calling you: I, Caligari, your master. Awaken for a brief while
from your dark night.’

অ্যালান জিজ্ঞাসা করে, “আমি কতোদিন বাঁচবো?” এর উত্তর আসে, “আগামী সূর্যোদয় পর্যন্ত!”

ড. ক্যালিগারির ভূমিকায় ভের্‌নার্‌ ক্রাউস্‌-এর অভিনয়ের সাথে আধুনিক দর্শকেরা হয়তো খাপ খাওয়াতে সময় নেবেন। আমার দেখা শ্রেষ্ঠ এক্সপ্রেশনিস্ট অভিনয় এটি (হয়তো যুগ্মভাগে; সাথে নস্‌ফেরাতু ছবিতে কাউন্ট অর্‌লক্‌ ভূমিকায় ম্যাক্স শ্রেখ্‌-ও শক্তিশালী ক্যান্ডিডেট)। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপই ছিলো অতিনাটকীয়, অতিবাস্তব। সুদর্শন নায়ক ফ্রীড্‌রিখ ফেহের তাঁর চরিত্রের আবেগগুলি আমাদের সাথে ভাগাভাগি করেছেন পুরো আবেগ ঢেলে দিয়ে। কন্‌রাড্‌ ভাইড্‌ট্‌-এর মেইক-আপ পরবর্তীতে অনেকের জন্য আইকনিক হয়ে ওঠে, বিশেষতঃ নরওয়ের ব্ল্যাক মেটাল প্রেক্ষাপটের জন্যে। এইখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই জনি ডেপ্‌ এর “এডওয়ার্ড সিজরহ্যান্ড” এর এডওয়ার্ড এর মেইক আপ-এর আইডিয়া নেওয়া হয়েছে।

গল্পটা আসলে সাইকোলজিক্যাল ড্রামা। এখানে খুব সম্ভব প্রথমবারের মতো বাস্তবতার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। ছবিটার সাথে মার্টিন স্করসিসের শাটার আইল্যান্ড ছবিটার সাদৃশ্য লক্ষণীয়। দুইটি ছবিতেই গল্পের নায়ক একটি আপাত প্রশ্নবিদ্ধ মেন্টাল অ্যাসাইলামের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে চলে। তবে টুইস্ট এন্ডিং-এর পরিচয় করিয়ে দেওয়া, হরর ও নয়্যার জেনারে আদর্শ বলে পরিগণিত হওয়া ছাড়াও ছবিটির আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক আছে। মোটামুটি মাত্র একঘণ্টার ছবিটায় আমাদের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। সদ্য একটি বিশ্বযুদ্ধ দেখে ওঠা মানবসমাজ বুর্জোয়া আবেগে স্বকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। কঠোর বাস্তবতা প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের স্বপ্ন ভাঙ্গিয়ে দিচ্ছে। এইরকম সময়ে ড. ক্যালিগারির ক্যাবিনেট এর মতো একটি ছবি বানানো দুঃসাহসিক ছিলো, কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ছবিটির নতুনত্ব প্রায় একশ বছর পরও আমাদের কাছে ফুরিয়ে যায়নি। কেননা ছবিতে উঠে আসা প্যারানয়িক সাস্পেন্স, দুঃস্বপ্নের ঘোর, অতি পরিচিত বাস্তব জীবনে অবিশ্বাস্য নাটকীয় পদক্ষেপ আমাদের, একবিংশ শতকের মানুষের কাছেও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ছবির প্লট এবং এর বিস্তারিত বিশ্লেষণের দিকে এই কারণে গেলাম না যে, ছবিটি বহুল দর্শিত নয়। আমার মনে হয় প্রত্যেক চলচ্চিত্রপ্রেমীর জন্য ছবিটি অবশ্যই একবার করে হলেও দেখা উচিৎ। পাবলিক ডোমেইনে থাকায় যে-কোনও সময় যে-কোনও জায়গা থেকে ডাউনলোড করতে পারেন। তবে রিস্টোর্ড সংস্করণটি পাবেন https://archive.org/details/thecabinetofdrcaligari ঠিকানায়।

আমার রেটিং: ১০/১০

(Visited 89 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৩০ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. মুভি দেখি নাই । লেখায় ভালোলাগা

  2. অ্যান্থনি এডওয়ার্ড স্টার্ক says:

    এই মুভিটা নিয়ে লেখার জন্য ধন্যবাদ। ভালো লিখেছেন। 🙂

    ব্লগিং নাম বাংলা করুন, প্লিজ। আর প্রোফাইল পিক দিতে ভুলবেন না। পোস্টে আরো ভালো রেজুলেশনের ছবি দিয়েন।

    ব্লগে স্বাগতম। 🙂

    • সাজ্জাদ কবির জয় says:

      নাম বাংলা করলাম। প্রো পিক দিয়েছি, কিন্তু সেটা দেখা যাচ্ছে না বোধহয়… বুঝতে পারছি না সমস্যা কোথায়। আর ছবিগুলি সরাসরি আমার কম রেজ্যুলিশনের প্রিন্ট থেকে স্ক্রীনশট নিয়ে দিয়েছি বলে ভালো হয়নি… ভবিষ্যতে আর ভুল হবে না।

      অসংখ্য ধন্যবাদ 🙂

    • ডন মাইকেল করলিয়নে says:

      এখন আপনার চাঁদবদন খানা দেখা যাচ্ছে… 😛 🙂 😛

    • নস্‌ ফেরাতু says:

      হ্যাঁ মশাই, অ্যাভেটার রিমুভ করতেই ছবি চলে এলো!

  3. Sev Darcy says:

    যথারীতি সুন্দর লিখেছো! ব্লগে স্বাগতম!

  4. ডন মাইকেল করলিয়নে says:

    মাইরালা… কি মুভির সন্ধান দিলেন ভ্রাতা… আগ্রহ বিশাল বেড়ে গেলো… দেখে ফেলব মুভিটা… লেখায় ++++++++++ 😛 🙂

  5. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    ছবিটা অনেক স্লো ধাচের মনে হচ্ছে। তবে আপনার লিখাটা সুন্দর। আপনি ব্লগে নতুন মনে হচ্ছে তাই ব্লগে স্বাগতম।

    • নস্‌ ফেরাতু says:

      হ্যাঁ, ব্লগে এটাই আমার প্রথম লেখা। ধন্যবাদ। ছবিটা স্লো মনে হয় নি আমার… তবে যেহেতু ১৯২০ সালের মুভি, কাজেই প্রথম প্রথম একটু বেখাপ্পা লাগে। সাইকো হরর, নয়্যার, সাসপেন্স, সুরিয়্যাল ধাঁচের ছবিগুলি যদি আপনার ভালো লাগে তবে এটিও ভালো লাগবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

    • পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

      আশা করছি ভালো লাগবে।

  6. রীতিমত লিয়া says:

    রীতিমত সুন্দর লেখা৷ আমার ব্লগ পড়ার দাওয়াত দিলাম৷ আসবেন কিন্তু 😀

  7. মুভিটা দেখিনি। এমন মুভির খোঁজ বেবার জন্যই আপনার ধন্যবাদ প্রাপ্য। তার সাথে লেখাটাও ভালো লেগেছে।

  8. মুশাসি says:

    ব্লগে স্বাগতম ভাই। পৃথিবীর প্রথম “টুইস্ট এন্ডিং” সম্বলিত মুভির সন্ধান দেওয়ায় ধন্যবাদ। অসাধারন লিখেন আপনি।

    • নস্‌ ফেরাতু says:

      অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই 🙂 এই মুভিটার সাথে সাথে জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট মুভমেন্টের অন্যান্য মুভিগুলিও দেখে ফেলতে পারেন।

  9. James Bond says:

    অনেক সুন্দর করে গুছিয়ে লিখেছেন। স্বভাবতই দেখি নাই মুভিটা।।

  10. Aage jantam na, list e rakhlam, different type movie dekhar mojai alada.

  11. তানিয়া says:

    মুভি দেখি নাই তবে লিখা ভাল লেগেছে 🙂

  12. Hasan Al Mamun says:

    সচারচর এই জাতীয় মুভি দেখায় অনেক ধৈর্য্য’র প্রয়োজন। তবে বাহবা দিই রচয়িতাকে যিনি তার চেয়েও অধিক অধ্যাবসায় নিয়ে সাহস করেছেন এর রিভিউ লেখার। পড়লাম, বুঝলাম ও উপলব্ধি করলাম এই যে আপাত চোখে বিস্বাদ মনে হলেও চমৎকার লেখনীর গুণে পুরো ব্যাপারটিকে করে তুলেছেন উপাদেয়। ধন্যবাদ।।

    • নস্‌ ফেরাতু says:

      এরকম একটা ক্লাসিক মুভির রিভিউ লেখাটা সত্যিই আমার জন্যে কঠিন ছিলো। আপনাদের ভালোলাগায় আমি প্রত্যাশার চাইতেও বেশি সার্থকতার স্বাদ পেয়েছি। অসংখ্য ধন্যবাদ।

  13. সামিয়া রুপন্তি says:

    রিভিউ টা খুবই সুন্দর হয়েছে।এরকম আরো লেখা পাব সামনে বলে আশা করছি। আর মুভিটা তো দেখিনি, কিন্তু দেখার আগ্রহটা জাগিয়ে দিয়েছেন। আশা করছি কোনো একদিন দেখে ফেলব!

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন