দেবী দর্শন:আপনি সিনেমাটি দেখে সজোরে হাততালি দিয়ে না ই উঠতে পারেন,কিন্তু টিকিটের টাকা বা দুই ঘন্টা সময় যে ফেরত চাবেন না তা নিশ্চিত করেই বলতে পারি।
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে কিছু কথা বলে নেই।আমরা যখন কোন উপন্যাস পড়ি পাঠক হিসেবে আমাদের অনেক স্বাধীনতা থাকে বিষয়টিকে কল্পনা করে নেয়ার। যখন কেউ সেই উপন্যাসকে অবলম্বন করে সিনেমা বানায় তখন পরিচালকেরও স্বাধীনতা আছে যে তিনি যেভাবে গল্পটিকে দেখেছেন সেইভাবে উপস্থাপন করার।শুধু তাই না চাইলে তিনি সিনেমার প্রয়োজনে মূল জিনিস ঠিক রেখে কিছু সংযোজন বিয়োজন করতেই পারেন।এখন দর্শক হিসেবে যদি তা আমাদের কল্পনার সাথে মিলে যায় তা আমাদের ভালো লাগবে আর যদি না মিলে তখনই খারাপ লাগাটা কাজ করে।বহুল পঠিত উপন্যাস নিয়ে সিনেমা বানানোটা এই জন্যই রিস্কি কাজ।এই জন্য অবশ্য সাহসটাও জরুরি।

আর সেই সাহসী কাজটাই প্রথম সিনেমাতেই করে দেখালেন প্রযোজক জয়া আহসান এবং পরিচালক আয়নাবাজির অন্যতম স্ক্রিপরাইটার অনম বিশ্বাস।সেই সাথে তারা যে একটি সাইকলজিক্যাল হরর থ্রিলারের নতুন জনরা তৈরি করলেন বাংলা সিনেমাতে তার জন্য অবশ্যই সাধুবাদ পাবার যোগ্য।কিন্তু এতেই কি বলা যায় তাদের এই সিনেমাটি সফল??না, বলা যায় না।কেন বলা যায় না আসেন সেই বিষয়টিতে।

একটি এডাপ্টেশনকে তখনই ভালো বলা যায় যদি দেখা যায় পরিচালক যা দেখাতে চেয়েছেন, দর্শক তা বুঝতে পেরেছে, সিনেমাটির সাথে নিজেকে কানেক্ট করতে পেরেছে সর্বোপরি দর্শকের মনোজগতে আলোড়ন তুলতে পেরেছে।এখন প্রশ্ন এই সিনেমাটা কি তা পেরেছে।না পারে নি।পরিচালক যে দেখাতে চেয়েছেন তা আমি বুঝতে পেরেছি।কিন্তু আমার মনোজগতে তা নতুন করে কোন আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি,যেটা দেবী উপন্যাসটি পড়ে হয়েছিল।যেহেতু গল্পটি আমার জানা,তাই আমি সহজেই বুঝতে পারছিলাম কখন কি ঘটবে।পরিচালকের আরো যত্নবান হওয়া উচিত ছিল স্ক্রিপ্ট রাইটিং এ,গল্পের ডিটেইলিং এ।গল্পের গাথুনি আরো স্ট্রং হতে পারত।সংলাপ আরো অর্থপূর্ণ হতে পারত।কেন জানি মনে হল তাড়াহুড়ো করে শেষ করে দেয়া হয়েছে।মিসির আলী এমন একটি চরিত্র যা আরো ডিটেইল এক্সপোজার আশা করে।তার ইন্টোরিগেশন পদ্ধতিটিকে আরো বিস্তৃত উপায়ে দেখানো যেত।আহমদে সাবেত চরিত্রটি এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই অনুযায়ী তার স্ক্রিনিং টাইম ছিল খুবই কম।শেষের দিকে আরো কিছু টুইস্ট স্বাভাবিক ভাবেই আশা করেছিলাম।

একটি হরর থ্রিলার বানাতে পরিচালকের চেষ্টার কমতি ছিল না তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।সবচেয়ে ভালো ছিল এর সাউন্ড ডিজাইন, দেশীয় বাংলা সিনেমাতে যা আমি কখনোই পাই নি। লাইটিং,সিনেমাটোগ্রাফিও বেশ।তবে আরো একটি বিষয় চোখে পরার মত ছিল,তা হল ক্লোজ শটগুলো।ট্যেকনিক্যালি সাউন্ড মুভি এটি তা বলাই যায়।

মিসির আলি এমন একটি চরিত্র যারা এটি পড়েছন,তাদের সকলের কল্পনায় এই চরিত্রটির একটি রুপ দাড় করানো আছে।সবাই চাইবে তার কল্পনার মিসির আলী সাথে সিনেমার মিসির আলীকে মিলিয়ে দেখতে।এবং এই পরীক্ষায় ভালোভাবেই সফল চঞ্চল চৌধুরি।এক কথায় বলা যায় মেথড একটিং এ বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল এবং একমাত্র উদাহরণ, আর কেউ আছে কিনা আমার জানা নেই।

আর রাণু চরিত্রটিকে বেশ ভালো ভাবে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পেরেছেন জয়া আহসান।একবারের জন্যও মনে হয় নাই গল্পের রাণু ছিল অষ্টাদশী।তার অভিব্যাক্তি,তাকানোতে অপ্রকৃতিস্থ ভাবটির প্রকাশ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।রাণু চরিত্র এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা ফুটিয়ে তুলতে যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন পরিচালক তা বুঝাই যায়।রাণুর ছাদে পা ঝুলিয়ে বসা থাকাটি বেশ গা ছম ছমে ছিল।তবে জিতুর অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটিতে সারা হল যেভাবে চিৎকার করে উঠল তাতে বলাই যায় পরিচালক ভয় পাইয়ে দেয়াতে বেশ সফল হয়েছেন।সিনেমাটির দুটি দৃশ্য এখনো চোখে লেগে আছে।একটি ছিল রাণু বারন্দায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,আর পাশে টুপ-টাপ করে পাতা ঝড়ে পরছে।যা ছিল রাণু মানসিক রক্তক্ষরণের চমৎকার মেটাফোর।
আরেকটি ছিল ছাদে গাছের নীচে রাণুর পাশেই একটি পেঁচা বসে আছে। রাণুর মধ্যে অস্বাভাবিকতা প্রকাশের একটি দুর্দান্ত মেটাফোর ছিল এটি।

তবে সবচেয়ে অবাক করেছে নীলু চরিত্রটিতে শবনম ফারিয়া।তিনি যে এত ভালোভাবে চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলবেন কল্পনাই করি নাই!অসুন্দর না হয়েও এই নিয়ে দ্বিধান্বিত, সর্বদা একধরনের ভয়ের মধ্যে থাকা এই সবকিছুই ডায়লগ ডেলিভারীতে,অভিব্যাক্তিতে সুচারুভাবে প্রকাশিত ছিল।

আহমেদ সাবেত চরিত্রে ইরেশ যাকেরও বেশ।যদিও আগেই বলেছি এই চরিত্রটির স্ক্রিনিং টাইম নিয়ে আমি সন্তুষ্ট না।আরো একটি চরিত্র সেই ভাবে ফোকাসড হতে পারে নাই,তা বিলু চরিত্রটি।এই চরিত্রটি নিয়ে আরো কাজ করা যেত।আর আনিস চরিত্রতে অনিমেষ আইচ চলে টাইপ অভিনয় করেছেন।

আর অনুপমের যে গানটি নিয়ে অনেকেরই আপত্তি ছিল তা মনে হয়ে সিনেমাটি দেখার সাথে সাথে কেটে যাওয়া কথা।রাণুর মধ্যে যে শিশু সুলভ সারল্য ছিল তা এই গানের চিত্রায়নেই ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে।ব্যাকগ্রাউন্ডে গানটির দৃশ্যায়নও ছিল স্বল্প সময়ের জন্য। আমার দৃষ্টিতে তা সিনেমার তেমন কোন ক্ষতি করে নাই,বরং সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।এছাড়া আরো দুটি গান ছিল, একটির দুটি চরণ ব্যবহার করা হয়েছে সিনেমাটিতে আরেকটি ছিল শেষে, দুটিই বেশ শ্রুতিমধুর লেগেছে আমার কাছে।

পরিশেষে একটাই কথা মিসির আলী চরিত্রটিকে প্রথমবারের মত সিনেমায় দেখতে পেয়ে যারপরনাই খুশি।আশা করব এর সিক্যুয়েল নিশিথীনীও বানানো হবে যা দেবী কে দিবে পরিপূর্ণতা।এবং অবশ্যই অবশ্যই চাইব মিসির আলী চরিত্রটিকে সিনেমার পর্দায় বারংবার দেখতে।

“প্রকৃতি বড়ই অদ্ভুত, কিছু সত্য সে নিজের মাঝে পরম মমতায় লুকিয়ে রাখে।
আমরা সেই লুকিয়ে থাকা অলৌকিকের ব্যাখ্যা সাধারণ যুক্তি দিয়ে বার বার বোঝার চেষ্টা করি, বুঝতে না পারলে কাকতলীয় ঘটনা বলে চালিয়ে দেই”…

আসলেই কি কাকতালীয়?? সিনেমাটির শেষের দিকের চমকজাগানিয়া দৃশ্যায়ন কিন্তু তাই নির্দেশ করে।আরো অনেক কিছুই চমকে দিতে পারে আপনাকে।আপনি সিনেমাটি দেখে সজোরে হাততালি দিয়ে না ই উঠতে পারেন,কিন্তু টিকিটের টাকা বা দুই ঘন্টা সময় যে ফেরত চাবেন না তা নিশ্চিত করেই বলতে পারি।

এই পোস্টটিতে ৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন