হালদার নোনা জলে সিক্ত হল হৃদয়…💜
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

কিন্তু পুরাপুরি হয় নি,আশা ছিল আরো বেশি!!

“আহা জীবন কত ভালোবাসা ভালোবাসি
নোনা জলে নোনা জলে কত হাসাহাসি”

হালদা পাড়ের মানুষের সাধারন জীবনের এক অনবদ্য প্রতিচ্ছবি হালদা সিনেমাটি।যে সিনেমায় আপনি আস্তে আস্তে ডুবে যাবেন, সিনেমা শেষ হওয়ার পরেও আপনার কানে বাজতে থাকবে ছলাত ছলাত শব্দ।এ এক অদ্ভুত অনুভূতি, এ এক অদ্ভুত রেশ।

সিনেমা নিয়ে বলার আগে আসুন আগে নদীটা সম্পর্কে একটু জেনে নেয়া যাক—-চট্রগ্রামের মানিকছড়ি উপজেলার একটি পাহাড়ী গ্রাম সালদা,যার ঝর্না থেকে নেমে আসে একটি নদী নাম হয়ে যায় হালদা, যা এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদী নামে পরিচিত, নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৮ কিলোমিটার আর গভীরতা স্থান বিশেষে ২৫ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত, নদী-টি ফটিকছড়ির রাওজান, হাটহাজারীর কালুরঘাট স্থান অতিক্রম করে কর্ণফুলী নদীতে মিশেছে, প্রতিবছর এই হালদা নদীতে একটি বিশেষ মূহুর্তে ও বিশেষ পরিবেশে রুই , কাতলা,মৃগেল , কালিবাউস সহ আরো বেশ কিছু মিঠা পানির মা-মাছ প্রচুর পরিমানে ডিম ছাড়ে।মা মাছেরা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অমাবস্যা বা পূর্ণিমার তিথিতে এখানে ডিম ছাড়ে। এই নদী ও নদীর গতি-প্রকৃতি, নদীর ক্ষয় ও নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন প্রবাহ ও জটিলতা তুলে ধরা হয়েছে গল্পে।সময়ের সাথে অন্যান্য নদীর মত হালদা নদীও দখল ও দুষণের স্বীকার হয়ে হারাবার পথে।

আমাদের দেশের সিনেমাতে মেটাফোর খুব একটা দেখা যায় না,তবে ইদানীং দেখা যাচ্ছে।আর এই সিনেমায় তো পরিচালক তৌকির অসাধারণ দক্ষতায় সিনেমার নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে হালদা নদীর উপর,মা মাছের উপর যে পরিমাণ অত্যাচার হচ্ছে তারই সুনিপুণ চিত্রায়ন করতে সমর্থ হয়েছেন।

হালদা নদীর দুরাবস্থার কারণে জেলেরা এখন যায় সাগরে মাছ ধরতে।তাদেরই একজন ফজলুর রহমান বাবু।মেয়ে তিশা আর বউকে নিয়ে ছিমছাম সংসার।কিন্তু সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনার স্বীকার হোন বাবু।একজনের সহায়তায় সেই যাত্রায় বেচে গেলেও বিশাল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ থেকে রেহাই মেলে না।তাই তো বাধ্য হয়ে নিজের মতের বিরুদ্ধে, মেয়ে তিশাও বাবার দুরাবস্থা দেখে নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে রাজি হয় সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিকে বিয়ে করতে রাজি হয়।যাদের কারণে আজ হালদা নদীর এই অবস্থা!তো তিশা মানে হাসু কি সুখী হল নাকি ফিরে যায় তার ভালোবাসার কাছে নাকি তার জীবনে অপেক্ষা অন্য কোন নিয়তি,জানতে হলে দেখতে হবে হালদা।

গল্পটা আদতে সাদামাটা মনে হলেও উপস্থাপন ছিল বেশ ভালো।তবে আমি আসলে আরো জমজমাট গল্প আশা করেছিলাম বা আরেকটু শক্তিশালী চিত্রনাট্য। বেশির ভাগ সিকোয়েন্স খুবই প্রেডিক্টেবল ছিল,যা মনটাকে পীড়া দিয়েছে।তবে এই সাধারণ গল্পের মাঝেও যে অসাধারণ ম্যেসেজগুলা ছিল তা অনুধাবন না করতে পারলে,সিনেমার উদ্দেশ্যটাই মাঠে মারা যাবে।
আমাদের দেশে অনেক দিন সাবজেক্টিভ একটা মুভি দেখতে পেলাম।সাবজেক্টিভ মুভির কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে।সিনেমা একটু ধীরগতির হয়,অবশ্য পরিচালক চাইলে কিছু সময় এটলিস্ট ১৫-২০ মিনিট কমানো যেত।আপনি যদি অজ্ঞাতনামার সাথে তুলনায় যান তাহলে বলতে হবে গল্পের গাঁথুনিটা অজ্ঞাতনামার তুলনায় কম জমজমাট ছিল। তবে এর মধ্যেও তৌকির তার নিজ দক্ষতায় উতরে গেছেন এবং পরিস্কারভাবেই তিনি তার বক্তব্য তুলে ধরতে পেরেছেন একদম সহজ সরল ভাষায়।এটাই এই গ্ল্যামার বিহীন সিনেমার সবচেয়ে বড় গ্ল্যামার।

সিনেমাটি আসলেই নদী এবং নারীর গল্প।কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র হাসু যেমন নানা রকম বঞ্চনার স্বীকার, হালদারও সেই অবস্থা।পুরুষের চোখে নারী শুধুই বাচ্চা উৎপাদনের যন্ত্র এবং ভোগের বস্তু।বিয়ের পর নারীর অস্তিত্বও সংকটের সম্মুখীন হয়।তাইতো হাসুর শ্বাশুরীর নাম সুরত বানু হারিয়ে যায় কালের গহ্বরে।শেষ বয়সে এসে বুঝতে পারেন এই নামেই লুকিয়ে আছে তার অস্তিত্ব তাইতো ছেলের বউকে সে হাসু বলেই ডাকে।আবার পরিচালক এও দেখিয়েছেন যে নারীরাও নারীদের উন্নতির পথে অন্তরায়,যা আমারদের সমাজে মাঝে মাঝেই দেখা যায়।হাসু যাতে পরিবারে বেশি প্রায়োরিটি না পায় তাই বড় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
এছাড়া আরো কিছু জিনিসের তিনি ফোকাস করেছেন তা হল মা মাছ মারা মহাপাপ।এবং এর মধ্যে যখন হাসুর জামাই সরকারী কর্মকর্তা কে বশে আনার উদ্দেশ্যে মা মাছ দিয়ে আপ্যায়ন করার প্রেক্ষাপটটা ছিল দুর্দান্ত।
মাঝে মাঝেই মা মাছ মারা দৃশ্যটি দুঃস্বপ্ন হিসেবে দেখানোটা বেশ ছিল,এছাড়া হালদা দূষিত হওয়ার দৃশ্যটিও বেশ কয়েক বার এসেছে।এগুলো মেটাফোর হিসেবে সিনেমাটিকে আরো শক্তিশালী করেছে।

এই সিনেমার আরো দুইটি শক্তিশালী দিক ছিল,এক ছিল চোখে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়া সিনেমাটোগ্রাফি।যা আপনাকে মোহিত করবেই।কখনো নদীর ঢেউ মিলেছে দুর দিগন্তে,কখনো আকাশ চিঁড়ে বৃষ্টি আবার কখনো নদীর ঢেউ আচড়ে পরছে সবুজ প্রকৃতির কোলে। এরকম অসাধারণ মুহুর্ত তুলে আনার জন্য বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য চিত্রগ্রাহক এনামুল হক সোহেলের।

আরেকটি শক্তিশালী দিক হল মনোমুগ্ধকর অভিনয়।কারটা ছেড়ে কারটা বলব?এই সিনেমতে তো শুধু অভিনয়েই বুদ হয়ে থাকা সম্ভব।মোশাররফ করিম যে কত ভালো অভিনেতা তিনি তা আবার প্রমাণ করলেন।তার কাছে অনুরোধ তিনি যেন নিজেকে কমেডিয়ান না বানিয়ে একজন পুরিপূর্ণ অভিনেতা হিসেবে উপস্থাপনে সচেষ্ট হবেন।
আর নেগেটিভ রোলে জাহিদ হাসান ছিলেন পারফেক্ট কাস্ট।কিছু কিছু দৃশ্যে তার ওই রকম নীরব চাহনি যথেষ্ট ভয়জাগানিয়া ছিল। বিশেষ করে দুই পাশের গাল কাপানোটা সেই ছিল। নেগেটিভ রোল মানেই কিন্ত সারা সিনেমায় চিৎকার চেঁচামেচি করে বেড়ানো না!
এই ধরণের চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু বরাবরাই ভালো করেন।এবারো ব্যতিক্রম নয়।তবে তার চরিত্র নির্বাচন টা টাইপড হয়ে যাচ্ছে।এইদিকটা নজর দেয়া উচিত।এছাড়া দিলারা জামান, রুনুখান সবাই টপক্লাস অভিনয় করেছেন।দিলারা জামান এই বয়সে এসেও তার অভিনয় দ্যুতি যে কমে যায়নি তারই প্রমাণ দিলেন।


তবে হাসু চরিত্রে তিশার কথা আলাদা করে না বললে তা বড় ধরণের অপরাধের শামিল হবে।তিনি তো এক কথা ফাটিয়ে দিয়েছেন।উনি মনে হয় দিন দিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।তিনি এখানে কন্যা,প্রেমিকা এবং স্ত্রী এই তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন।চরিত্রানুযায়ী ছিল তার এক্সপ্রেশন এবং ডায়লগ ডেলিভারি। এই রকম পরিণত এবং পরিমিত অভিনয়ের সমাহরই ছিল পুরো সিনেমা জুড়ে।

আবহসঙ্গীতে পিন্টু ঘোষ তার প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন।তবে আরো ভালো হতে পারত।তবে সংগীত পরিচালক হিসেবে তাকে ফুল মার্কস দিতেই হবে।গম গম লাগে আর, প্রেমের আগুনে,নোনা জল তিনটা গানই অসম্ভব সুন্দর।

সবশেষে বলতে হয় ক্যাপ্টেন অফ দ্যা শিপের কথা।তৌকির আহমেদ তার দক্ষ হাতে একসুতায় সবকিছু গাঁথতে পেরেছেন বলেই আমরা এই রকম চলচ্চিত্র পেয়েছি।মাছের বিয়ে,বলী খেলা এইসব খুটিনাটি সহ হালদাপাড়ের জেলেপল্লীর সংস্কৃতিকে, হালদাকে উপস্থাপন করেছেন অনন্য নিপুণতায়।অনেকদিন পর মনে হল আমাদের সিনেমা দেখলাম,দেশের সিনেমা দেখলাম।

তবে শেষ দৃশ্যটা মনে গেঁথে আছে,হালদা নদী যে ভাবে দূষিত হচ্ছে এর কি কোন  সমাধান আছে???এর শেষ কোথায়?? এই প্রশ্নটাই খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করলেন পরিচালক নারীর মাধ্যমে,তার ও তো উদ্দেশ্য বিহীন যাত্রা !!

“– সাগর ছাড়ি আইলে সাগরের কথা মনে পড়ে, নদী ছাড়ি আইলে নদীর কথা…
– আর মানুষ! মানুষের কথা ন ভাব?”

আর এইখানেই লুকিয়ে আছে সিনেমাটির মূল বক্তব্য।আমরা তো মানুষ,আসুন আমরা মানুষের কথা ভাবি, ভাবি নারী কথা নদীর কথা, আমাদের প্রকৃতির কথা।

এই পোস্টটিতে ১৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. ছবিটা সুন্দর কিন্তু নাটকের camera দিয়া বানাইছে। এইটা ভাল লাগল না। কোনটা টেলিফিল্ম কোনটা সিনেমা বুঝা যায় না।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন