ডুবঃসিনেমাটি মাস্টারপিস হতে হতেও হল না!!
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

“ডুব” ভাসল নাকি ডুবল সেই বিষয়ে কথা বলার আগে কয়েকটা বিষয় নিয়ে কথা বলা দরকার।

আমরা কেন কেন দিন এত অসহনশীল হয়ে যাচ্ছি??কারো মত নিজের মতের বিরুদ্ধে গেলেই তার চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়ি।একটা সিনেমা সকলের ভালো লাগবে কেন??অধিকাংশের কাছে খারাপ লাগা একটি সিনেমা অনেকের কাছে ভালো লাগলে সেইটা শেয়ার করলেই দালাল গালি,পেইড রিভিউ নানারকম তির্যক মন্তব্য ছুটে আসে।বিপরীত জিনিসটাও ঘটে।কোনটাই সহজভাবে নিতে পারছি না আমরা!!
আবার এমন কিছুও দেখা যায় হিট বা সর্বজন বিদিত একটি সিনেমাকে উল্টাপাল্টা সমালোচনা করে ফেলি নিজেকে ব্যতিক্রম দেখানোর জন্য,এটেনশন সিক করার জন্য।গঠনমূলক সমালোচনা কি জিনিস এইটা আমরা কবে বুঝব?

আবার হলে যেয়ে সিনেমা দেখে খারাপ লাগলেই বলতে হবে টাকাটা জলে গেল,সময়টা পুরা নষ্ট হল,মানুষকে বলে বেড়াতে হবে ভাই টাকা -সময় নষ্ট কইরা সিনেমাটা দেইখেন না।এতই যদি টাকার মায়া তাহলে কেন হলে যেয়ে সিনেমা দেখতে হবে?হলে সিনেমা দেখার জন্য বরাদ্দকৃত টাকার মায়া ছাড়তে পারলে হলে যেয়ে সিনেমা দেখবেন,না হইলে দেইখেন না!

আরেকটা হল মানুষের কথায় সিনেমা না দেখেই লাফানো।আপনি একটা জিনিস দেখলেনই না,আপনি সেই জিনিস বিচার করেন কোন আক্কেলে?একজনের খারাপ লাগছে আপনারও খারাপ লাগবে এমন কোন কথা নাই।তাহলে আপনার নিজস্বতা কোথায় থাকল?

#স্পয়লার_এলার্ট

এবার আসি “ডুব” প্রসঙ্গে।এক কথায় বললে সিনেমাটি মাস্টারপিস হতে হতেও হল না।

সিনেমাটি মুক্তির আগে যে বিতর্ক টি এর সাথে হাত ধরাধরি করে হেটেছে সেই” হুমায়ুন” বিষয়ক বিতর্ক মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেই সিনেমাটি দেখতে গিয়েছিলাম।
পরিচালকের ভাষায় সিনেমাটি ছিল নৈশ্যব্দের,অন্তর্মুখী বেদনার।যেখানে চরিত্রগুলো বিষন্নতায় ডুব দেয়।আমি প্রেমের জটিল উদ্যানের সেই চরিত্রগুলোকে অনুভব করতে গিয়েছিলাম।

লেখক,পরিচালক জাভেদ হাসান তার মেয়ে সাবেরি,ছেলে আহির এবং স্ত্রী মায়াকে নিয়ে সংসার।স্ত্রী মায়ার সাথে জাভেদের টানপোড়েন সিনেমার শুরু থেকেই,এর কোন গোড়াপত্তন সিনেমাতে দেখানো হয় নাই।পরে বুঝা যায় এর মূলে সাবেরীর বান্ধবী নিতু।নানা ঘাত প্রতিঘাতের পর নীতুর সাথেই থিতু হোন জাভেদ হাসান।মোটা দাগে এই হল কাহিনী।

এই সিনেমা মোটেও ফারুকী সিগনেচার না।হি কেম আউট ফ্রম হিজ ট্রেন্ড!!
সিনেমার কাহিনীটি ননলিনিয়ার।ভুবন মাঝির পর আরেকটা ননলিনিয়ার বাংলাদেশি সিনেমা পেলাম।তিনটা সময় দেখানো হইছে,নীতু এবং সাবেরীর বর্তমান অবস্থা,জাভেদ- মায়ার প্রেম, পলায়ন, বিয়ে এবং শেষে জাভেদ-নীতুর সম্পর্ক ঘিরে জাভদের সাথে মেয়ে সাবেরী, স্ত্রী মায়া এবং পুত্র আহীরের সম্পর্কের টানা পোড়েন।
এই সিনেমাতে ফারুকি অনেকগুলো নতুন ট্রিটমেন্ট ব্যবহার করেছন যার সাথে আমাদের দর্শকইই পরিচিত নয়।
অনেকগুলো জাম্পশট ব্যবহার করেছেন।অনেক ঘটনাই ডিটেইলস দেখানো হয় নাই।যেমন জাভেদের সাথে নীতুর প্রেম কি সিগারেট শেয়ারিং এ হয়ে গেল?আবার নীতুর আর সাবেরী প্রতিযোগিতা শুনেই গেলাম কিন্ত কি নিয়ে প্রতিযোগিতা সেইটাই দেখতে পেলাম না।আবার একদম হঠাৎ করেই জাভদের মৃত্যু দেখানো হল।এই রকম জাম্পশটের নেগেটিভ দিক হল এতে করে দর্শকরা সহজে সিনেমার চরিত্রগুলার সাথে,সিনেমার ঘটনার সাথে একাত্ন হতে পারে না।আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।জাভেদের মৃত্যু,সাবেরী কান্না,আহিরের নীরব বসে থাকা আমার হৃদয়ে কোন রক্তক্ষরণ করে না।আমি যে চরিত্রগুলার গভীরেই যেতে পারলাম না।আর পজেটিভ দিক হল এইসব জাম্পশট দর্শককে কল্পনাপ্রবণ করে,অনেক কিছু ভাবায়,নিজের মত করে সমীকরণ মেলায়।

প্রকৃতি কে না ভালোবাসে?কিন্ত প্রকৃতির এই রকম অনিন্দ্যসুন্দর উপস্থাপন আমরা কবে বাংলা সিনেমায় পেয়েছি?বাতাসের শো শো শব্দ,সবুজ প্রকৃতি,বৃষ্টি,নদীর বয়ে চলা স্রোতেরও তো অভিব্যক্তি আছে।এইসব প্রত্যেকটা শটের অন্তর্নিহিত অর্থ আছে,এসব মেটাফোর যদি আমরা না বুঝতে পারি তাহলে তো এটা পরিচালকের ব্যর্থতা না,আমাদের ব্যর্থতা।এইগুলো হল অনুভবের বিষয়।কিছু কিছু শট তো এখনো আমাকে ভাবায়।
জাভেদের সাথে সিগারেট শেয়ারিং পর নীতু যখন বেড়িয়ে গাড়িতে উঠল,এরপর যে ঝুম বৃষ্টিটি দেখানো তা অনেক দিন চোখে লেগে থাকবে!অসম্ভব সুন্দর দৃশ্যায়ন ছিল।এই বৃষ্টিই কিন্ত সবকিছু ধুয়েমুছে জাভেদকে নীতুর ঘনিষ্ঠ করে তুলল।আরেকটি শট ছিল জাভেদ এবং সাবেরীর কথোপকথন একটি ভাঙা জানালার মধ্যে।যা ছিল জাভেদের অবারিত স্বাধীনতা আর সাবেরীর সামাজিক শৃঙখলের বহি:প্রকাশ।তবে একটি শটের জন্যেই এই সিনেমাটি অনেক দিন মনে থাকবে তা হল সম্পর্কের এপার আর ওপারের গল্পের অবতারনা ঘটাতে, ট্রলারের মধ্যে দিয়ে জল সরে যাওয়ার যে দীর্ঘযাত্রা, যে দীর্ঘ আনকাট শট। এইসবই আমাদের অন্তর্গত বোধকে স্পর্শ করে।
ক্যামেরার পিছনে এই মানুষটিকে ধন্যবাদ না দিলে অন্যায় হবে।ধন্যবাদ শেখ রাজিবুল ইসলাম।

আমরা যারা বাংলা সিনেমা মানেই মেলোড্রামা মনে করে নাক সিটকাই,তাদের তো অবশ্যই এই সিনেমাটি দেখা উচিত,যেখানে মেলোড্রামা একদমই অনুপস্থিত। এই সিনেমাতে জাভেদ হাসানের ফ্যামিলিকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে তা হল এরা সহজে ভাঙবে না,এরা কষ্ট পেলে চিৎকার করে কাদে না,শোকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত বসবাস তাদের।
তাইতো স্বামীর অবর্তমানে মায়া বলিষ্ঠ হাতে সংসারের হাল ধরে।আবার স্বামীর মৃত্যুর খবরেও তেমন একটা বিচলিত করে না তাকে,বরং সে হাফ ছেড়ে বাঁচে,কারণ তখন জাভেদে উপর আর কারো অধিকার নেই।তাইতো বহুদিনের ধুলোপড়া ছবি আবার উঠে আসে ড্রেসিংটেবিলে।সাবেরীও বাবার মৃত্যুতে স্বাভাবিক কথোপকথন চালায় যায় মা র সাথে।কিন্ত ভিতরে ক্ষত বিক্ষত তার হৃদয়।তাইতো বাথটাবে জল ছেড়ে নীরবে কাঁদতে থাকে বাবা পাগল সেই মেয়েটি।
দ্বিতীয় বিয়ের পর জাভেদ কি খুব ভালো থাকে?প্রায়ই হুমায়ুন আহমেদের একটি কথা দেখা যায় পৃথিবী অনেক খারাপ মানুষ আছে,কিন্ত খারাপ বাবা একটিও নেই।তাইতো বিয়ের পরেও সন্তানের স্নেহে আদ্র হতে চাইত পিতার হৃদয়।
সাবেরী চরিত্রে তিশা মনে তার শ্রেষ্ঠ অভিনয়টা করে ফেলেছে
এত পরিমিত অভিনয় খুব কমই দেখা যায়।বাবার জন্য পানি নিয়ে আসার দৃশ্যটি অনেক দিন মনে থাকবে।গ্লাস হাতে তিশার যে এক্সপ্রেশনটা খুবই হৃদয় স্পর্শী।

সিনেমার যে দৃশ্যটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে তা হল সাবেরী তার মা কে নিয়ে যে ভাবে জন্মদিন উদযাপন করল।এবং এইখানে পরিচালক দেখিয়েছেন আসলেই তারা কত চাপা স্বভাবের।মাকে সামনি সামনি না বলা কথাগুলো পাশাপাশি থেকেও ফোনে জানাতে হয়।

ইরফান খানের বাংলা নিয়ে অনেকে অনেক কথা বললেও ওর থেকে বেশি ভালো বাংলা আশা করাটাও তো ঠিক না।যতটুকু বলেছে আমার কাছে ভালো লেগেছে,সবচেয়ে বড় কথা সে তার চরিত্রের মধ্যে ঢুকতে পেরেছে।এই জন্যেই ভালো লেগেছে।মায়া চরিত্রে রোকেয়া প্রাচীও ভালো করেছে।তবে সবচেয়ে খারাপ লেগেছে নীতু চরিত্রে পার্ণো মিত্রের স্ক্রিনিং টাইমটা কম হওয়াতে আর আহিরেরও স্ক্রিনিং টাইম টা আরেকটু হওয়া উচিত ছিল।

চিরকুটের আহারে জীবন গানটা তো এমনি ভালো লেগেছে।কিন্তু সিনেমাতে ডিউরেশনটা বেশি কম হয়ে গেছে,আরো ব্যবহার করা যেত,ইভেন ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও খুব একটা ছিল না।

“আমরা কেমন করে চাকুরীজীবী হয়ে গেলাম?বছরের পর বছর স্বামী স্ত্রীর পোস্টে চাকরী করে যাচ্ছি”

“মানুষ তখনই মারা যায় যখন পৃথিবীতে তার আর কোন প্রয়োজন থাকে না”

“মৃত্যু মানুষকে সম্মান,মমতা,ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়।”

এই তিনটি সংলাপই হল থেকে ফেরার পর থেকেই কান বাজছে।এমমিতেও সিনেমাতে আর তেমন
কোন ভালো সংলাপ নেই,এখানে সংলাপের থেকে অভিব্যক্তি বেশি।যাই হোক আসলে উপরোক্ত তিনটি সংলাপই সিনেমার আপ্তবাক্য।

ফারুকী সিনেমা বানাবে আর জাতি দুইভাগে বিভক্ত হবে না তা কি হয়?এমনিতেই যে পরিমাণে ওর হেটার!!হাজারো সমালোচনা সত্যেও তিনি যে সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে, নাচে গানে ভরপুর ফর্মুলা ভিত্তিক সিনেমা না বানিয়ে নিজেই যে নতুন ধারার তৈরির করার চেষ্টা করে যাচ্ছে এর জন্য তাকে সাধুবাদ জানাতেই হবে।

last but not the least,”ডুব” দিয়ে পুরোপুরি না ভিজলেও,আমি বাংলাদেশে এই ধারার সিনেমা দেখি নাই।যেখানে আপনি খুজে পাবেন ইরানী,ফ্রেঞ্চ সিনেমার স্বাদ!আমার কেন জানি মনে হয় আমাদের এবং এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির যদি বলিউডি বা তামিল ঘরণার ফর্মুলা ভিত্তিক সিনেমা থেকে মোহমুক্তি ঘটে তাহলে আজ থেকে কিছু বছর পর যখন সিনেমা নিয়ে আলোচনা হবে তখন “ডুব”কে কাল্ট সিনেমা আখ্যায়িত করা হবে।

এই পোস্টটিতে ১৬ টি মন্তব্য করা হয়েছে

    • Sahibul Alam says:

      ভাই আমি লিখছি বলেন কি হইছে??জ্বলে তো নাই,আপনি কি পুরা লেখাটা পড়েছেন??

    • Faysal Ahmed says:

      Sahibul Alam actually amra Faruki saheb er kache ar ak2 valo kichu asa korechilam. Apni to eta sikar korben j movie tao akta business. As a business graduate hisebe jodi ami boli, target customer fixed na kore apni kichu korle setar somalochona hobei. R DUB er ager week ei Dhaka Attack mukti pelo. Tar review r etar review apnar chokhe porar kotha. Apni nischoi Promoth Chowdhurir “Rochonoar Silpogun” probondho ti porechen. Sekhane sposto lekha chilo apni jai sristi koren na kano manus jano bujhte pare. Ta na hole apnar sei sristir kono sarthokota nei. R Faruki saheb er movie te amra sobsomoi different kichu message khuji. Ja ei movie te absent chilo. R sesh kotha DUB jokhon goto 1st april e mukti paoar kotha chilo, tokhon e Shawon madam er birodhita korechen. Manus chaisilo jano ei cinema die er uchit akta jobab dea jay. But ta r holo koi?

  1. বাংলা সিনেমায় ইরানি আর ফ্রেঞ্চ আবহ তৈরী করাকি খুব জরুরী ?? , বাংলাদেশের নিজেস্ব কোন স্বকীয়তা নেই বলে আপনার মনে হয় ??

    • Sahibul Alam says:

      না মোটেও জরুরী না, সিনেমার বিভিন্ন ভাষা আছে!
      একটা হল এবস্ট্রাক্ট ফিল্ম।ফারুকি সেই ভাষায় সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন যেখানে আমাদের দেশের বর্তমান সময়ের প্রতিচ্ছবি খুজে পাওয়া যায়।
      খুব কম সিনেমায় আমরা আমাদের জীবনের গল্পগুলোকে পর্দায় দেখতে পাই।আর এইসব গল্পই আমাদের স্বকীয়তা যেগুলো ফারুকী,অমিতাভ রেজ,গোলাম রাব্বানী, মোরশেদুল ইসলাম,তৌকির আহমেদ রা ফুটিয়ে তুলছেন।

    • ফারুকি সাহেব কি ফুটিয়ে তুলেছেন সেই বিষয়ে কিছু বলিনি , যিনি লিখেছেন সে এক পর্যায়ে বলেছেন সিনেমাটিতে ইরানি ও ফ্রেঞ্চ সিনেমার আবহ অনুভব করেছেন সেই কথা থেকে লিখেছি বাংলা সিনেমায় ইরানি ও ফ্রেঞ্চ ফ্লেভার খুব উপভোগ্য বিষয় কিনা , abstract film কম বেশি দেখা হয়েছে । ফারুকি সাহেব বলেছেনও সবার! জন্য সিনেমা তিনি বানাননি । তো যাদের সিনেমাটি ভালো লাগছেনা আর্ট পিস বানাবেন ভালো কথা , অতিব দূর্বধ্য আর্ট পিস বানানোর পর ব্যাপার টা এমন দাড়িয়েছে আর্ট গ্যালারি থেকে অতিব abstract সাধারণ বোধ গম্যের বাইরে একটা পেইন্টিং কিনে লিভিং রুমে সাজিয়ে গম্ভীর মুখে বসে থাকা এবং কেন সাধারণ মানুষ এই মূল্যবান পেইন্টিং এর দাম বুঝতেছেনা এই নিয়ে চিন্তিত থাকা এবং সুযোগে দামটা বলে ফেলার চেষ্টা করা যে ইহা একটি মূল্যবান পেইন্টিং

  2. বাবা চাটাবাজরা চাটা এবারের মত অফ কর রে বাবারা

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন