ঢাকা অ্যাটাক-কেন এইটা একটি আলোচিত সিনেমা?
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

 

শিল্প এমন একটি বিমূর্ত বিষয়,যা ধরা যায় না ছোয়া যায় না শুধু উপভোগ করা যায়। কারো কাছে ভালো লাগতে পারে খারাপও লাগতে পারে,এই ভালো খারাপ বিষয়টা পুরাটাই আপেক্ষিক।
সিনেমাও তেমন একটি শিল্প,পরিচালক এর সৃষ্টিকর্তা।পরিচালককে এখানে প্রতি পদে পদে পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়।কিন্তু পরিচালকের সাথে আরো অনেক সহযোগী থাকে যাদেরকে ঠিক জাহাজের ক্যাপ্টেনের মতই পরিচালনা করতে হয়,তবেই তীরে ভিড়ে জাহাজ।
এই ক্যাপ্টেন অফ দ্যা শিপের মাথায় অনেক কিছুই রাখতে হয় আর আমাদের মত দেশে তো আরো বেশি!
সিনেমার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় বেশির ভাগ সময়ই জনপ্রিয়, ব্যবসাসফল সিনেমা ক্রিটিকদের পাশ মার্ক সহজে পায় না।আবার ক্রিটিকদের মন জয় করা সিনেমা জনপ্রিয় বা ব্যবসাসফল খুব একটা হয় না।এই যে চিরন্তন বৈপরীত্য এইটা ওভারকাম করা খুব একটা সহজ কাজ না।সেই কঠিন কাজটি করতে চেয়েছেন Dipankar Dipon দা।
জ্বি ভাই,ঢাকা অ্যাটাক – Dhaka Attack এর কথাই বলছি।সবাই মোটামুটি এই সিনেমাটি নিয়ে পোস্টমর্টেম করে ফেলেছে এতদিনে।কিন্তু আমি একটু অন্য বিষয়গুলো আলোকপাত করতে চাই,যেগুলো নিয়ে কম আলোচনা হয়েছে,বা হলেও আমার চোখে পড়ে নাই।

আমদের বর্তমান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু হলিউড বলিউড বা অন্যান্য লিডিং ইন্ডাস্ট্রির মত স্ট্রং না।খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলা একটি ইন্ডাস্ট্রি। যেখানে সবাই তীর্থের কাকের মত বসে থাকে কবে একটি সিনেমা হিট হবে।এখন সবাই যদি শুধু ক্রিটিকদেরই মন জয় করতে চায় তাহলে গণমানুষের মন কারা জয় করবে?এফডিসির হালের বস্তাপচা ডিরেক্টর বা নকল গল্প দিয়ে তো আর পোষাচ্ছে না।হল মালিকদের তো খেয়েপড়ে বাচতে হবে।
এমন একটি সিনেমা বানাতে হবে যাতে গণমানুষের মনও জয় করা যায় আবার ক্রিটিকদের চোখেও উতরে যায়।ঢাকা এটাক তেমনি একটা সিনেমা।
আসেন কিভাবে সেই ব্যাখ্যাটা একটু দেই।
তার আগে মোটা দাগে গল্পটা কেমন তা বলে নেই,একজন সাইকোপ্যাথ কিলার ঢাকা শহরে একের পর এক খুন করে যাচ্ছে এর পর শুরু করে বোমাহামলার মাধ্যমে খুন,তাকে ধরার মিশনই হচ্ছে এই সিনেমা।

 

আমারা যারা কপ থ্রিলার দেখি তারা সবাই জানে এখানে নায়িকা জিনিসটা খুব একটা ম্যাটার করে না।কিন্ত এই সিনেমায় একজন নায়িকা আছে যার চরিত্র সাংবাদিক।কপ থ্রিলার মুভিতে সাংবাদিক থাকতেই পারে কিন্তু এটাকে কতটুকু এক্সপোজার দেয়া যায় তা হল বিষয়।গণমানুষের কথা চিন্তা করেই এক্সপোজারের পরিমাণটা বাড়িয়ে দেয়া।আবার তাদের কথা চিন্তা করেই মাহিয়া মাহির মত বাণিজ্যিক ছবির নায়িকাকে নেয়া,যার একটি ফ্যানবেইজ আছে।
আমার কাছে মনে হয়েছে সে চেষ্টা করেছে সাবলীল অভিনয় করতে,যদিও তা আপ টু দ্যা মার্ক না,তবে এক্ষেত্রে তার ভয়েসটোন টাও একটা ফ্যাক্টর। আহ্লাদি বা ন্যাকামি ভয়েস।যদি সে ভালো অভিনেত্রী হতে চায় তবে তার এই বিষয়টা নিয়ে কাজ করা উচিত।
যে কাজটি করেছে Arifin Shuvoo।ওর ভয়েসেও এই প্রবলেমটা আছে যার জন্য ডায়লগ ডেলিভারিতে সমস্যা হয়।যার অনেকটাই দেখা গেল এই সিনেমাতে সে কাটিয়ে উঠেছে।

যাই হোক তাদের প্রেমের বিষয়টাও হজম হয়ে যেত যদি কিছু ডায়লগ এড়ানো যেত।কঠিন এক অপারেশনের প্রাক্কালে যদি প্রেয়সী মুখে পুলিশ(বোম্ব ডিসপোজাল) অফিসার কে শুনতে হয়” যদি মরতে হয় মরব একসাথে “,”তুমি সেফ থাইক” তাইলে আর হজম করা যায় না।

সাধারণ মানুষকে বিনোদন দেয়ার জন্য আইটেম সং রাখা,যা মোটেও অযাচিত নয়,গল্পের প্রয়োজনেই।কিন্তু এটা কাপড় চোপড় ছাড়া আইটেম সং, কাপড় চোপড় সহ আইটেম সং!আবার গানটাও বেশ প্রচলিত মজার একটি গান।স্টার সিনেপ্লেক্সে দর্শক রাও যে গানটি উপভোগ করছে তার প্রমাণ গানের সময় দর্শকদের হাততালি আর হর্ষধ্বনি।

এই উপমহাদেশের নিয়ম মেনে নায়ক নায়িকা গান থাকলে সিনেমা জমে না,সেই হিসেবে সুন্দর চিত্রায়নে তুই তুমি বিহীন একটি রোমান্টিক গান।আবার ব্যাকগ্রাউণ্ডেও রয়েছে গান ক্রিটিকদের রুলস মেনে।তবে সিনেমার শেষে যে গানটা ব্যবহার করা হয়েছে সেটা বেশি ভাল্লাগছে।

Abm Sumon আর Quazi Nawshaba Ahmed অংশটুকু বেশ ভালো ছিল।প্রেগনেন্সির সময়কার যে ঘটনা দেখানো হয়েছে তা কিন্তু সত্য ঘটনা।জ্বি এই ঘটনাটি কাহিনীকার Sunny Sanwar এর ব্যক্তিজীবনের ঘটনা,তিনি তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের সময় একটি অপারেশনে ছিলেন।

এই সিনেমাটি দেখে অন্তত একটি জিনিস আমাদের রিয়ালাইজেসনে আসা উচিৎ, তা হল এই যে পুলিশ,র‍্যাব, সোয়াট,বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সবারই পরিবার আছে।এই রকম আরো নানা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাদেরকে তাদের পরিবারকে রেখে নানা অভিযানে বেড়িয়ে পরতে হয় শুধু মাত্র দেশের ও মানুষের নিরাপত্তার খাতিরে।এই জন্যে হলেও তাদের প্রতি ন্যুনতম কৃতজ্ঞতাবোধ থাকা উচিৎ।

আইনের হাত অনেক লম্বা,আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না এইসব ডায়লগের বাইরে পুলিশের এই দিকটা আমাদের সিনেমায় এতদিন অনুপস্থিতই ছিল।কাহিনীকার, পরিচালককে ধন্যবাদ এইদিকটা সামনে আনার জন্য।

আমাদের দেশে ভিলেনদের বেশিরভাগ সময়ই টাইপরোল প্লে করতে দেখা যায়,কিন্ত এই সিনেমার ভিলেন তাসকিন রহমান যেন এলেন এক চিলতে রোদ হয়ে।এই রকম সাইকোপ্যাথ ভিলেন বাংলা সিনেমায় আর দেখা যায় নাই,হুমায়ুন ফরিদীর বিশ্বপ্রেমিক সিনেমাটি ছাড়া।
তাসকিনের চাহনি,নীল চোখ,ভয়েস সবমিলিয়ে কমপ্লিট প্যাকেজ।সিনেমা হলে কাকে জানি বলতে শুনলাম তাসকিনে ক্যারেকটারটি নাকি জোকার ক্যারেক্টারকে মনে করায় দিচ্ছে!!
যে ছেলেটি জ্বলন্ত সিগারেট হাতের মুঠোয় নিভিয়ে ফেলার জন্য আট আটটি শট দিতে পারে,তার ডেডিকেশন নিয়ে কোন সন্দেহ নাই।এইরকম আরো অনেক ডেডিকেশনেই ঢাকা অ্যাটাক দ্বিতীয় সপ্তাহে এসেও হাউজফুল।

বাজেট কনসিডার করে ভিএফএক্স নিয়ে কিছু বললাম না,তবে একটা মতামত এই ধরণের সিনেমায় বিদেশে শ্যূটিং না করে সেইটাকা দিয়ে ভিএফএক্সটা আরো উন্নত করা যায় ভেবে দেখা যেতে পারে।

তবে এই সিনেমায় কিছু র ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে,যা বেশ ভালো লেগেছে।
আচ্ছা একটা জিনিস ব্যতিক্রম লাগছে তা হলো সিনেমার নাম দেখানোর উপায়, শুনলাম এইখানেই নাকি পরিচালক কাহিনীর হিন্টস দিয়ে দিছিলেন!

হলিউড বলিউডের মুভিতে কার রেসিং হর হামেশা দেখা গেলেও বাংলা সিনেমাতে মনে হয় এই প্রথম,তবে বেস্ট লাগছে গাড়ির ক্যামোফ্লাজটা,সুপার ছিল ওই অংশটুকু।তবে যে অংশের কথা না বললেই না তা হল বোম্ব ডিসপোজাল অফিসার কতৃক বোম ডিসপোজের সময়। হলের সবাই মনে হয় ওই সময়টাতে পুরা টেনসড ছিল,আমার পাশের লোকটাকে আমি দুই আঙুলের নখই কামড়াইতে দেখছিলাম,পরে যখন সাকসেসফুল হল তখন পুরা হল হাত তালি আর আনন্দ চিৎকারে ফেটে পড়ল।

একটি সিনেমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে হয় সিনেমা শেষে দর্শকদের হাততালি,আয়নাবাজির পর আবার একই ঘটনার সাক্ষী হলাম।
সবচেয়ে বড় কথা পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখার মজাই আলাদা।

এই পোস্টটিতে ২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন