উধাওঃবাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সিনেমা আমার চোখে মাষ্টার পিস!
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

থ্রিলার মুভি আমার খুবই পছন্দের একটা জনরা।বিদেশী নানা থ্রিলার মুভি দেখে আমার থ্রিলার তৃষ্ণা ভালোই মিটছে।কিন্তু দেশি কোন থ্রিলার মুভি আমার তৃষ্ণা খুব একটা মিটাতে পারে নাই একমাত্র আয়নাবাজি ছাড়া।মুসাফিরের চেষ্টা ছিল।যাই হোক অনেক আগেই উধাও মুভিটার নাম শুনেছিলাম।পোস্টারটাও ছিল নজরকারা।কিন্তু এইসব মুভি কি আর হল পায়।যাই হোক বলাকায় রিলিজ পেয়েছিল,এক কি দুই সপ্তাহ চলেছিল,কিন্তু দুর্ভাগ্য হলে যেয়ে দেখার সুযোগ হয় নাই এই রকম একটা মাষ্টার পিসের!ভাবছেন এই মুভি আবার মাষ্টার পিস হল কেমনে,নামই শুনলাম না ঠিকমত!!কিন্তু বাংলা সিনেমার যারা নিয়মিত খোজ খবর রাখেন তাদের জানার কথা আর যারা দেখেছেন তাদেরও বুঝার কথা এই সিনেমাকে মাষ্টার পিস বলার হেতু।
বাংলাদেশের কন্টেক্সটে এই সিনেমা আমার চোখে মাষ্টার পিস,আসেন কেন এটাকে আমি মাষ্টার পিস বলছি স্পয়লার বিহীন সেই গল্পটা শুনাই।

 

আমাদের এই সমাজে বারো রকমের মানুষের বাস।উপর তলা নীচ তলা মধ্যবিত্ত নানারকম শ্রেণীতে বিভক্ত আমাদের এই সমাজ।মাঝে মাঝে এই তিন শ্রেণীর মানু্ষের জীবনে এমন সময়,পরিস্থিতি এসে হাজির হয় যখন মানুষ তার জীবন থেকে পালিয়ে বাচতে চায়।উধাও হয়ে যেতে চায়!
উধাও হয়ে শহরে এসে পালিয়ে বেড়ায়।আর এসব পালিয়ে বেড়ানো মানুষকে খুঁজে খুঁজে তাদের স্বজনদের কাছে পৌছে দেয় এক স্কুল ভ্যানচালক মনির।যার জন্য লোকজন তাকে রবিন হুড বলে ডাকে।
আকবর সাহেব সমাজের এক জন প্রতিষ্ঠিত এবং প্রভাবশালী মানুষ।স্ত্রীকে নিয়ে তার চাকচিক্যময় সংসার।অন্যান্য প্রভাবশালী মানুষের মত সেও রাজনীতি নামক ব্যবসায় জড়িত।অন্যান্যদের মত সেও নির্বাচন করতে ইচ্ছুক যাতে তার প্রভাব প্রতিপত্তি আরো বাড়ে।নির্বাচনী জমজামট ক্যাম্পেইন শুরু হয়।এসব কিছুই ফলো করতে থাকে সেই মনির নামক ভ্যান চালকটি।এই সাধারণ যুবকটি হঠাৎ করেই গায়েব করে ফেলে প্রভাবশালী সেই আকবর সাহেবকে!বড়ই অদ্ভুত তার আচরণ।সাধারণ এক স্কুল ভ্যানে প্রভাবশালী সেই ব্যক্তিটিকে আটকে রাখে বিচিত্র এক উপায়ে,সারা শরীরে শিকল দিয়ে পেঁচিয়ে সামনে তার সাথে ইট ঝুলিয়ে রাখে।এইভাবেই ভ্যানটি নিয়ে সে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে পথে প্রান্তরে।কিন্ত কেন??কি তার উদ্দেশ্য??বড় অংকের চাঁদা দাবি করা??আশফাক সাহেবের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের জন্য মাঠ ফাঁকা করে দেয়া??নিজ দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য?? কেনই বা সে তাঁকে তার জীবনের গল্প শুনাচ্ছে??
জানতে হলে এখনি দেখে ফেলুন,আশা করি হতাশ হবেন না,জম জমাট এক থ্রিলারের স্বাদ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।

এই সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হল এর পরিচালকের গল্প বলার ধরণ।বাংলা সিনেমাতে আমি এই ধারার গল্প বলা দেখি নাই!!কঠিন কঠিন কোন সংলাপ নাই কিন্তু রয়েছে সাধারণ সংলাপের এক অপুরুপ উপস্থাপন। এছাড়া এটি কোন প্যাঁচানো গল্প নয়, এটি ছিল একটি সরলরৈখিক গল্পের সুনিপুণ উপস্থাপন। কাহিনীতে নেই কোন অস্পষ্টতা।
এটি একটি মাল্টিস্টার বিহীন সিনেমা।মিডিয়ার মনযোগী দর্শক না হলে অনেককেই আপনার কাছে অপরিচিত লাগবে।কিন্ত এদের সাবলীল অভিনয়ই এই সিনেমার প্রাণ।এই সিনেমার প্রধান দুই চরিত্র আকবর এবং বাবু চরিত্রে রূপদান করেছেন মনির আহমেদ এবং শাহেদ আলী।শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দুই জনের এমন অভিনয় আপনাকে চুম্বকের মত আটকে রাখবে স্ক্রিনের সামনে।তবে এর থেকেও অবাক হওয়ার বিষয় ছিল রাজ চরিত্রে জিরো ডিগ্রী খ্যাত পরিচালক অনিমেষ আইচের আগমন দেখে।এই রকম পাগলা,ষন্ডা মার্কা ডার্ক ক্যারেক্টারে দুর্দান্ত অভিনয় করে তিনি একদম কাঁপিয়ে দিয়েছেন।তার বডিফিটনেস গেট আপ,এপিয়ারেন্স সবই মনে হয় এই ক্যারেক্টারের জন্য মনে হয় পারফেক্ট ছিল।এছাড়া নওশাবা সব যারা ছিলেন সকলেই তাদের সেরাটা দিয়েছেন এইটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

এখন আসি ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, মিউজিক ডিরেকশন এবং সাউন্ড মিক্সিংয়ে।এই সিনেমার সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল এটি একটি গান বিহীন সিনেমা!!বাংলা সিনেমায় তো এইটা চিন্তাই করা যায় না।পরিচালক যে এই দু:সাহসটি দেখিয়েছেন এর জন্য তাকে সাধুবাদ দেয়া উচিৎ।তবে ফকির লাল মিয়ার দুটি গান আংশিক ব্যাবহৃত হয়েছে।
এর সাউন্ড ডিজাইনার হলিউডের মিশন ইম্পসিবল থ্রি খ্যাত কেনিথ জনসন এবং সঙ্গীত পরিচালক হলিউডেরই আরেকজন জ্যাজ স্পেশালিষ্ট জেকব জোফি।এই দুইজনেই তাদের নামের প্রতি যথেষ্ট সুবিচার করেছেন,যা সিনেমাটির সংগীত বিভাগকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।
থ্রিলার সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সব কিছু যদি সিনক্রোনাইজ না হয় তাহলে পুরা সিনেমাটি হয়ে উঠতে পারে অখাদ্য। এটি যে উধাও য়ের ক্ষেত্রে ঘটে নাই তা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে ছিল কখনো সেতারের ঝংকার,বাশির করূণ সুর,তবলা -ঢোলের বাদ্য,যা আপনাকে দিবে থ্রিলার সিনেমার যথাযথ স্বাদ।গান বিহীন এই সিনেমাটি এক মিনিটের জন্যও বোরিং লাগবে না দুর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের জন্য।ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর,সাউন্ড মিক্সিং ও সংগীত পরিচালনা সবকিছুই সিনেমাটিকে করে তুলেছে উপভোগ্য।

তবে আমার চোখে এই সিনেমার সবকিছু ছাপিয়ে গেছে দেশি চিত্রগ্রাহক কাশেম শাহবাজি এবং বৃটিশ চিত্রগ্রাহক কায়েল হেসলপ এর দুর্দান্ত, হৃদয় জুড়ানো সিনেমাটোগ্রাফি।আমি এত বিশেষজ্ঞ নই ব্যাপারে,তবে আমার চোখকে যা প্রশান্তি দেয় সেইটাকেই তো ভালো বলব নাকি?কালারগ্রেডিংও ছিল খুবই ভালো।একটি থ্রিলার সিনেমার জন্য যে ধরণের শট নেয়া প্রয়োজন,ক্লোজ শট, লং শট সবই ছিল যথাযথ।বিশেষ করে বলতে হয় লাস্ট সিনের কথা।একে আসলে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।এই রকম সিন বাংলা সিনেমায় আবার কবে দেখা যাবে সেই চিন্তাই করছি!

এবার আসি সিনেমার মেক আপ এবং কস্টিউম ডিজাইনে।এই ক্ষেত্রেও লেটার মার্কস দিতে বাধ্য।চরিত্রানুযায়ী সবার মেকআপ, ড্রেসআপ ছিল যথেষ্ট সংগতি পূর্ণ।
ভ্যানচালক মনিরকে তো আমার প্রথম দেখায় সত্যি সত্যি ভ্যানচালকই মনে হয়েছিল!আকবর সাহেবের দুটি রূপ একটি সবজি বিক্রেতা আরেকটি শহরের সম্ভ্রান্তশালী ব্যক্তি,এই দুটি নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলা হয়েছে। আকবর সাহেবের গুলিতে ছিদ্র হয়ে যাওয়া ক্ষত যে কেউ সত্যি মনে করত বাধ্য। একটি সিকোয়েন্সে খুনের পর একজন ব্যক্তির রক্তাক্ত মুখ এমনই বিশ্বাসযোগ্য যে তা যেকোন দুর্বল চিত্তের মানুষের জন্য হজম করা কষ্ট হবে।আমারই তো খবর হয়ে গিয়েছিল!

এ যাবতকালে কোন বাংলা সিনেমার ফিনিশিং দেখে এতটা ‘তব্দা’ খাই নাই যতটা খেয়েছি উধাও দেখে!এই রকম যে টুইস্ট আমার জন্য অপেক্ষা করছে তা কল্পনার বাইরে ছিল।

তবে কথা থেকে যায়,আমার মনে হয় না এখনো বাংলাদেশের মানুষ এই ধরণের সিনেমার জন্য তৈরি।অনেকের কাছেই ভালো নাই লাগতে পারে।জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা,মারমার কাট কাট একশন,ধুন্ধুমার নাচ-গান,ঝা চক চকে সেট,মনোরম লোকেশনে গানের চিত্রায়ন সব কিছুই অনুপস্থিত,যা বর্তমান সময়ের সিনেমা হিটের পূর্বশর্ত বলে মনে করা হয়।তবুও একটি শক্তিশালী গল্প,সাবলীল অভিনয় কিভাবে একট সিনেমার দুর্দান্ত ফিনিশং এনে দিতে পারে তার জন্যই উধাও সিনেমাটি দেখা উচিত।

এই ধরণের সিনেমা যত বেশি হবে, যত বেশি এই ধরণের সিনেমা নিয়ে আলোচনা হবে ততই মানুষের আগ্রহ বাড়বে,রুচিতেও পরিবর্তনন আসবে,তখন মানুষ এই ধরণের সিনেমাকে সাদরে গ্রহণ করে নিতে পারবে।

অমিত আশরাফের মত মেধাবী পরিচালকদের সৃষ্টিশীল কাজের অপেক্ষায়…

মুভিটির ডাউনলোড লিংক

https://www.youtube.com/watch?v=oLMvExkbkKc

এই পোস্টটিতে ৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. Sahibul Alam says:

    Mamun Rume Unstable Boy Kalam আপনাদের হাসির কারণটা জানতে পারি??

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন