সাহেব বিবি গোলাম (২০১৬): একজন সাধারণ দর্শকের রিভিউ
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

Saheb_Bibi_Gollam

পরিচালক দাবি করেননি এটি কোনো আর্ট ফিল্ম। বরং উইকিপিডিয়ায় একে ক্রাইম বেংগলি মুভি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে খালি চোখেই বোঝা যায়, সাহেব বিবি গোলাম কোনো কমার্শিয়াল মুভি না। আর কলকাতার নন-কমার্শিয়াল মুভি বানানোর কমন একটা ফর্মুলা খুবই প্রচলিত। এই ফর্মুলাটা হলো, সমাজের রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে যে বিষয়গুলো ট্যাবু হিসেবে দেখা হয়, সেগুলো সব ঠেসেঠুসে একটা সিনেমায় ভরে দিয়ে সেটাকে স্লো স্পিডে টেনে নিয়ে যাওয়া। এই কমন ফর্মুলার আর্ট ফিল্ম বা ক্লাস ফিল্ম ঘরানার উপরে উঠে সত্যিকার আর্ট অর্থ্যাৎ শিল্প সৃষ্টি করা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়।

না, সাহেব বিবি গোলামকে কেউই মাস্টারপিস বা ক্লাসিক হিসেবে অভিহিত করবে না। আমিও করছি না। কিন্তু আমার মনে হয়, যদি “আর্ট ফর পিপলের” দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তবে ছবিটিতে যথেষ্ট পরিমাণ আর্টই পাওয়া যাবে। ছবিটি তরুণ পরিচালক প্রতীম গুপ্তার অনবদ্য সৃষ্টি হিসেবেই বিবেচিত হবে।

সাহেব বিবি গোলামের প্রথম দিকটায় আমার একে কলকাতার তথাকথিত আর্ট ফিল্মই মনে হচ্ছিল। বিশেষ করে হাউজ ওয়াইফ ক্লাবের ব্যাপারটা যখন দেখানো হলো। নিজেদের দাম্পত্য জীবনে অতৃপ্ত গৃহিনীরা এই ক্লাবের মাধ্যমে সঙ্গী খুঁজে নেয়।

vlcsnap-2016-11-08-01h54m01s141

এই ধরণের মুভিতে পরিচালক যদি কাহিনীর স্বকীয় উপস্থাপনা, মানুষের আবেগ অনুভূতি নিয়ে ব্যতিক্রমী এক্সপেরিমেন্ট, ভিন্নধর্মী সম্পাদনা বা আবহ সংগীত ইত্যাদির চমকপ্রদ মিশ্রণ ঘটাতে না পারেন তবে অতি ভারে ছবিটি নুয়ে পড়ার আশংকা তৈরি হয়। কিন্তু পরিচালক প্রতীম ছবির মাঝামাঝি গিয়ে সে পথে আর হাঁটার চেষ্টাই করেননি। পার্নো মিত্রর রেপ – এই টুইস্টটা রেখে পরিচালক ছবিতে সুনির্দিষ্ট একটা কাহিনী আনলেন। মেট্রোপলিটনের নানা শ্রেনী-পেশার মানুষের পেট্রোপলিস আবেগের সাথে “দুষ্টের দমন” এর বহুল প্রচলিত থিম ব্যবহার করে ছবিতে ক্লাসের সাথে মাস (mass) মিশিয়ে দিলেন অপূর্বভাবে।

উল্লেখ্য, থিমটা বহুল প্রচলিত হলেও ছিল একদম মেদহীন, ঝরঝরে। দর্শকের অশ্রু দেখার ইচ্ছা ছিল না পরিচালকের। বরং তার বদলে বাস্তবতা চিত্রিত করেছেন নিরাবেগভাবে। ভাবুন তো একবার ধর্ষক জিকো আর তার মিনিস্টার বাবার প্রথম কথোপকথেন দৃশ্যটা। অপরাধীর ও তার আশ্রয়দাতার নির্বিকার মনঃস্তত্ব এর চেয়ে ভালোভাবে বোধহয় দেখানো যেত না।

vlcsnap-2016-11-08-01h48m42s239

আর ছবির যে এন্ডিংটা হলো; বোদ্ধা হিসেবে নয়, সাধারণ দর্শক হিসেবে বিষয়টা খুব ভালো লেগেছে। যখন রুমি (পার্নো মিত্র) মারা গেলো এবং তারপর অঞ্জন দত্তের গুলিতে রেপিস্ট জিকোর (বিক্রম চ্যাটার্জি) বদলে রুমির ব্রয়ফ্রেন্ড ট্যাক্সি ড্রাইভার জাভেদ (ঋত্বিক চক্রবর্তী) গুলিবিদ্ধ হলো, মনে হচ্ছিল ছবির এন্ডিং তবে দয়ামায়াহীনরকম বাস্তবসম্মতই হতে যাচ্ছে। যার হারায় সেতো সবই হারায়। আর যার কারণে হারায় সে সুখে-শান্তিতে বেঁচেবর্তে থাকে। তবে এই ছবিতে পরিচালক অতি জীবনঘনিষ্ঠ হওয়ার লোভ সামলেছেন। তাই নানারকম পারিবারিক টানাপোড়েনে ক্লান্ত-ক্ষুদ্ধ ভাড়াটে খুনি অঞ্জন দত্তের হাতে শাস্তি পাইয়ে দিয়েছেন জিকোকে। সে জন্য পরিচালককে সাধারণ দর্শক হিসেবে ধন্যবাদ।

ছবির সংগীত কলকাতার ভিন্ন ট্র‍্যাকের অন্য মুভিগুলোর চেয়ে আলাদা কিছু মনে হয়নি, তবে লাইটিং এর কাজ মন টানবে। কিন্তু এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে হুট করে ক্যামেরা চলে যাচ্ছে বলে মনে হতে পারে। বিশেষ করে ৩টি আলাদা মানুষের ৩টি আলাদা কাহিনী যেহেতু দেখানো হচ্ছিল, সেক্ষেত্রে দর্শকদের প্রথমটায় রিদম খুঁজে পেতে সমস্যা হতে পারে।

vlcsnap-2016-11-08-01h56m34s177মুভিতে প্রত্যেকের অভিনয় যথাযথ। তবে এই ছবিতে অন্যদের তুলনায় হাইলাইটেড না হওয়ার পরও আলাদা করে বলতে চাই স্বস্তিকা মুখার্জীর কথা। স্বস্তিকা আমার বরাবরই পছন্দ। বিতর্কিত চরিত্রে অভিনয় করার কারণে বিভিন্ন সময় তীব্রভাবে সমালোচিতও হয়েছেন এই প্রতিভাবান অভিনেত্রী। কিন্তু শুভ্র ত্বকের এই মেয়েটি প্রতি ছবিতেই যেভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন তাতে টলিউডে বৈচিত্র‍্যময় চরিত্র করার জন্য তিনি এক রকম অপ্রতিদ্বন্দ্বীই হয়ে উঠছেন বলতে হয়।

সবশেষে একটা ব্যক্তিগত অনুযোগ। ছবির গল্পটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে স্বস্তিকা ও অঞ্জন দত্ত জাভেদের প্রতি সহমর্মিতা বোধ করে এবং সেই থেকে জাভেদের গার্লফ্রেন্ডের ঘাতক জিকোকে শাস্তি দেয়। কিন্তু পার্নো মিত্রর ধর্ষিত হয়ে মৃত্যুবরণ করার ঘটনায় জাভেদ, রুমির মা-বাবা অনেকের জীবনই পরিবর্তিত হয়েছে সত্যি; কিন্তু মূল ক্ষতিগ্রস্ত তো পার্নো বা রুমি। রুমির প্রতি সহানুভূতি থেকে জিকোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে, কোনোভাবে এমন একটা বিষয় কি পরিচালক ছবিতে অন্তর্ভূক্ত করতে পারতেন না?

অবশ্য যে কারণেই হোক, অপরাধীর শাস্তি হয়েছে এটাই বা কম কী!!….

শাস্তি বাস্তবে না হয়ে না হয় মুভিতেই হয়েছে, তাই বা কম কী!!….

 


মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন