আমার প্রথম হিন্দী সিনেমা দেখা!

তখন বেশ ছোট, স্কুলে প্রাইমারী ক্লাসে পড়ি মাত্র। সিনেমা বলতে শুধু সালমান শাহ, শাবনূর এদেরকেই বুঝতাম। তবে এর মাঝে শাবানা-কবরী, আলমগীর-রাজ্জাকও ছিল। বলতে পারেন আমার গন্ডি এতটুকুই। বাসায় ডিশের লাইন ছিল না তাই শুক্রবারটাই ভরসা। প্রতি শুক্রবার দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে টিভির সামনে বসা ছিল একটা রুটিন করা কাজ। আর যা কিছু করি আর না করি এটা করবই। তখন বাংলাদেশি সিনেমার বিশাল ভক্ত আমি, কোন সিনেমাটা দেখা ছিল না আমার? এদিক থেকে আমি ফার্স্ট। কিন্তু একটা দিক থেকে পিছিয়ে ছিলাম খুব। আমি কখনই হিন্দী সিনেমা দেখিনি (ইংলিশ তো দূরে থাক)। আমাদের ক্লাসের প্রত্যেকে হিন্দি সিনেমার পোকা। পুচকি পুচকি ছেলেগুলা চিল্লায় চিল্লায় “পার দেসি,পার দেসি” গানটা গাইতো। আমি তখন জানতামই না “কারিশমা কাপুর” কে? আর “আমির খান” ই-বা কি জিনিস!

ক্লাসের ফাঁকে টিফিন পিরিয়ডে বান্ধবীরা মিলে গানের কলি খেলতাম। বাংলা সিনেমার গানে আমাকে হারানো কঠিন। কিন্তু আমি কখনো হিন্দি সিনেমার গানে জিততে পারিনি। এমনকি আমি হিন্দি বলতেও জানতাম না। তবে শুনতাম হিন্দিতে নাকি “কুমকুম” নামের একটা সিরিয়াল হতো। আর ঐ সিরিয়ালের অন্ধ ভক্ত ছিলা আমার বান্ধবীরা। তারা এতটাই হিন্দি বুঝত যে কথার ফাঁকে ফাঁকে দু একটা হিন্দি বলা ওদের স্বভাবের পর্যায়ে পড়ে গেছে। এদিক থেকে আমি ওদের প্রতি বেশ ফেডআপ ছিলাম। পারতে কখনো কথাবার্তা টিভি প্রসংগের দিকে নিতাম না। তাইলেই হইছে। আমি হাবার মত বসে থাকতাম আর ওরা নিজেরা গল্প করত। ওদের কাছে টিভি মানেই হিন্দী সিরিয়াল অথবা হিন্দী সিনেমা।

খুব যে দুঃখ লাগত তা না। বাসায় কখনো বায়না ধরি নি “আব্বু ডিশ লাগাও প্লিজ”। যা ছিল তাতেই হ্যাপি ছিলাম। কিন্তু সমস্যা হচ্ছিল আমি ঠিক ওদের সাথে পেরে ঊঠতাম না। এটাই যা একটু রাগ লাগত! যা হোক, একবার আব্বুর সাথে বৈশাখী মেলায় গেলাম। আব্বু আমাকে ছোট একটা খেলনার ক্যামেরা কিনে দিল। আমি ক্যামেরাটা দেখে খুব পছন্দ করেছি। ক্যামেরার লেন্স দিয়ে তাকালে ভিতরে মানুষের ছবি দেখা যেত। আর সাটার টিপলে এক্টার পর একটা মানুষের ছবি আসত। আমি খুব খুশি হয়েছিলাম ক্যমেরায় এত এত মানুষ দেখা যায় তাই। বিকেলে খেলার মাঠে ক্যামেরা নিয়ে গেছি বান্ধবীদের দেখাব বলে। ওরা আমার ক্যমেরাটা নিয়ে টিপে টুপে দেখে রেখে দিল। আমি খুব অবাক হলাম, ওরা খুব একটা মজা পেল না। আমি বললাম “সুন্দর না? মজা পাসনি?” ওরা তেমন গা করল না। বলল, “এটা আবার এমন কি? এদেরকে তো প্রতিনিয়ত টিভিতেই দেখি।” পড়ে জানতে পারলাম আমার ক্যামেরার মানুষগুলো হচ্ছে শাহরুখ, সালমান, ঐশ্বরিয়া, কাজল কারিশমা, সাঈফ আলী এরা।

বহুত কথা বলে ফেলেছি, আসল মুভি দেখার কথাই বলা হল না। একবার আমি আমাদের বাড়িওয়ালার বাসায় গেলাম কোন একটা কাজে। দেখলাম আন্টি বসে বসে সিনেমা দেখছেন। আমিও বসলাম। বাড়িওয়ালার পিচ্চিটাকে নিয়ে খেলছি আর মাঝে মাঝে টিভি দেখছি। কাহিনী খুব একটা বুঝতে পারছিলাম না। তবে আন্টি দেখি মাঝে মাঝেই হেসে উঠছেন। এক পর্যায়ে সিনেমায় দেখলাম একটা পিচ্চি মেয়েকে। তারপর কিছু  মুখ পরিচিত মনে হল। এই মুখগুলো আমার সেই ক্যামেরায় ছিল। এরপর থেকে সিনেমাটায় আমি মন দেয়া শুরু করলাম। দেখছি। অনেক দৃশ্য মজা লাগছে। ভাষা বুঝতে না পারলেও অনেক কিছু বুঝতে পারছি। সিনেমার নায়ক-নায়িকার কান্ড-কারখানা, দু একটা লজ্জা-লজ্জা দৃশ্য, হাসি-কান্না দেখতে দেখতে সিনেমাটা শেষ হয়ে গেল। সিনেমার শেষে দেখি আন্টি চোখের পানি মুছে টিভিটা বন্ধ করে উঠে গেলেন। আমিও আমার চোখে হাত দিয়ে দেখি চোখ ভেজা! এতটাই মগ্ন ছিলাম সিনেমাটা দেখায়। তবে শেষ দৃশ্যে নায়ক-নায়িকার মিল দেখে খুব আনন্দ পেলাম।

ঐ আমার প্রথম হিন্দী ছবি দেখা। আমি যে সিনেমাটা দেখেছি তখনো সেটার নাম জানি না। কে কে অভিনয় করেছে তাদেরও নাম জানি না। তবে এটুকু বুঝতে পারছি সিনেমাটা আমার খুব ভাল লেগেছে। তারপর বেশ অনেকদিন পর সিনেমাটা আবার দেখলাম, আবারও ভাল লাগল। আমি একরকম সিনেমাটার ভক্ত হয়ে গেলাম। এখন পর্যন্ত যদি কখনো কোন চ্যানেলে সিনেমাটা দেখায় তবে আমি আবারও দেখি। বারবারই আমার সিনামাটা ভাল লাগে। পিচ্চি মেয়ের কথা বলায় অনেকে হয়তো এতক্ষনে বুঝে গেছেন কোন হিন্দী সিনেমাটার কথা বলেছি। শাহরুখ খান ও কাজল অভিনীত আমার সেই প্রিয় সিনেমাটার নাম “কুচ কুচ হোতায়্যে”।

(Visited 51 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন