আহত ফুলের গল্প: প্রথমবার বাংলা চলচ্চিত্রের ইংরেজি সাব করার অভিজ্ঞতা কথন
গত মাসে প্রথমবারের মতো এবং প্রায় এক মাসের বেশি সময় লাগিয়ে একটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইংরেজি সাবটাইটেল অর্থাৎ অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করেছিলাম- চলচ্চিত্রের নাম ‘আহত ফুলের গল্প’
 
একটু মজার ব্যাপার হচ্ছে, এর আগে শখের মতো অসুখের ন্যায় প্রায় ২৮ খানা কোরিয়ান চলচ্চিত্র/ ড্রামা এপিসোডের বাংলা সাব এবং প্রায় ৪০ টি কোরিয়ান শর্ট ক্লিপ/ ভিডিওর ইংরেজি অনুবাদ ও সাবটাইটেল করলেও কোনো পূর্ণাঙ্গ বাংলা কনটেন্টের ইংরেজি সাব কখনোই করা হয়নি। তবে মাঝেমধ্যে মনে হতো, এই যে আমাদের দেশীয় কিছু কালজয়ী চলচ্চিত্র এবং মানসম্পন্ন নাটক আছে, যেগুলো ইংরেজি সাবটাইটেলের অভাবেই বিশ্বব্যাপী দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারছে না। সে কারণে এরকম দুটি দেশীয় চলচ্চিত্র আর নাটকের ইংরেজি সাব করার কথা ভেবেছিলাম, এই নিয়তে একটি সিনেমার সিডিও-ও কিনেছিলাম, কিন্তু ‘শখের বশে করে কতোদূর যাবো, নিজের ইংরেজি জ্ঞানের ওপর বিশেষ ভরসা নেই’, এই ভেবে আর কিছু শুরু করা হয়নি।
তাই ‘আহত ফুলের গল্প’ চলচ্চিত্রের সম্মানিত পরিচালক যখন আচমকাই তার চলচ্চিত্রের ইংরেজি সাব করার প্রস্তাব দিলেন, তখন একদিকে যেমন ‘কতোদূর করতে পারবো’ ভেবে ভয় হয়েছিল, অন্যদিকে পরিচালকের ভরসা পেয়ে মনে মনে খুশিও হয়েছিলাম, এরকম একটা বাংলা চলচ্চিত্রের ইংরেজি সাব করাই তো আমার অনেক দিনের সাধ ছিল! পাশাপাশি এতো প্রায় অজানা কুরিয়ান ভাষা না যে, হানগুল ট্র্যান্সক্রিপ্ট দেখে দেখে, হানগুল অভিধানের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে করে অনুবাদ করতে হবে, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, সংলাপ শুনেই সব বুঝতে পারবো, বাংলা থেকে ইংরাজি অনুবাদ করে ইংরেজি জ্ঞানও একটু সমৃদ্ধ হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
তো ভাবনার রেশ কাটিয়ে দু’চারদিন পর হলো পুরো চলচ্চিত্র দর্শন (যদিও প্রথমে প্ল্যান ছিল, দেখতে দেখতে সাব করবো, অর্থাৎ যতদূর দেখব, ততদূর সাব করবো, তবে পরিচালকের কথামতো আগেভাগে পুরোটা দেখে নেয়াতে ভালোই হয়েছিল)। এরপর শুরু আসল কাজ অর্থাৎ সাবটাইটেলকরণ। ‘মাত্র’ দেড় ঘণ্টার মুভি, ঠিক টানা কাজ করতে পারিনি, তারপরও সব মিলিয়েই, কেন এক মাসের বেশি সময় লাগবে? এর প্রধান কারণ সম্ভবত সাবটাইটেলের জন্য লাইন ‘সেগমেন্টিং’ করা।
একেকটি সংলাপ তিন-চারবার শুনে, মিলিসেকেন্ড ধরে লাইন সেগমেন্ট করা, সত্যিই খানিকটা ধৈর্যের কাজ। তার উপর এর আগে বড়জোর ৫ মিনিটের ভিডিওর সাবের জন্য লাইন সেগমেন্ট করার অভিজ্ঞতা ছিল, দেড় ঘণ্টার ভিডিওর জন্য একেক করে ৭৪৪ টি লাইন সেগমেন্ট করা- নতুন অভিজ্ঞতাই বটে। এক সময় একটু ফেডআপও হয়ে পড়েছিলাম, মনে হয়েছিল, একটা চলচ্চিত্রের অনুবাদ আবার সাবের লাইন সেগমেন্টিং করা একার কম্ম নয়, এতো ধৈর্য সবসময় ঠিক আসে না!
তাছাড়া অনুবাদের ব্যাপারও আছে, সংলাপ শোনামাত্রই ঠাস ঠাস করে অনুবাদ করে ফেলবো, এতো পারদর্শিতা বা আত্মবিশ্বাস কোনোটাই নেই, সেজন্য প্রচুর সার্চ করতে হয়েছে- একেকটা সংলাপ ঠিক কোন শব্দ চয়ন করে অনুবাদ করলে একটু ন্যাচারাল, সাবলীল ইংলিশের মতো শোনাবে। এভাবে সব মিলিয়ে দেখা গেছে- পরিচালকের তাগাদা খেতে খেতে ভেবেছি, আজকে কাজ এগিয়ে রাখবো, অনেক দূর করে ফেলবো, কিন্তু সেই দিন রাত চারটা পর্যন্ত এই সাবটাইটেল নিয়ে বসে থেকে দেখলাম, আজ মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিটের কাজ হয়েছে! এর কারণ ওই তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হয়তো অনেক সংলাপ ছিল, সিরিয়াস সিরিয়াস সংলাপ ছিল, যেজন্য লাইন সেগমেন্ট করার পাশাপাশি অনুবাদ নিয়ে ভাবাভাবি করতেও যথেষ্ট সময় গেছে।
বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পাঠানোর তাড়া আছে, পরিচালকের এই তাগাদা খেতে খেতে এক সময় গাছে ফল ধরলো, দু’টি গানসহ পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের ইংরেজি সাবটাইটেলের কাজ শেষ হলো। এরপর সবসময় যা করি, ছোটবেলার পরীক্ষার খাতার মতো রিভাইজ দিতে বসলাম, রিভিশন দিতে বেশি সময় লাগে না, আর পুরোটা দেখেও আহামরি কিছু মনে হলো না, এই ‘কী এমন’ সাবটাইটেল তৈরি করতে কিনা এতো সময় লাগলো! তবে সময় যেহেতু লেগেছেই, নিজের পক্ষ থেকে ‘যথাসম্ভব নির্ভুল’ বা যুতসই করার ব্যাপারে চেষ্টার কমতি ছিল না, এটুক বলা যেতে পারে।
এরপর আসা যাক, আসল কথায় অর্থাৎ মূল চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে। গ্রামীণ পটভূমিতে এক কিশোরীর জীবনের নানা বাঁককে উপজীব্য করেই মূলত চলচ্চিত্রটির কাহিনী গড়ে উঠেছে। তবে শুধু সেই কিশোরী নয়, সিনেমায় আরও বেশ কিছু ক্যারেকটার আছে এবং কাহিনীবিন্যাসে তাদের প্রভাবও কোনো অংশে কম নয়। সব মিলিয়ে প্রথমে একটু বোরিং লাগলেও পরে যখন দেখলাম, গতানুগতিক ধারায় কাহিনী এগোয়নি, মনুষ্যত্ব আর মানুষের ভালোত্বকে ফোকাস করেই একটা সুন্দর এন্ডিং টানা হয়েছে, সেই তৃপ্তিদায়ক পরিণতি দেখে ভালোই লেগেছে। গত বছরের সাড়া জাগানো ‘দেবী’ দেখার চেয়ে সে অভিজ্ঞতা অবশ্যই ভালো, দেশীয় ‘ইনডিপেন্ডেন্ট’ নির্মাণ এবং কাহিনীবিন্যাস ও চিত্রায়ন মিলিয়ে এমন চলচ্চিত্র IMDb তে অন্তত আমার দর্শক চোখে ৮/১০ পাওয়ার যোগ্য বলে মনে হয়েছিল। কুশলী অভিনেতা গাজী রাকায়েত বাদে চলচ্চিত্রের সবাই ‘আমার দেখা’ নতুন মুখ, তারা প্রত্যেকেই সাবলীলভাবে অভিনয় করেছেন, আর এই সাবলীলতাটুকু বের আনাও নিশ্চয় পরিচালকের কৃতিত্ব ছিল।
 আমাদের দেশে ধুমধাড়াক্কা, সুপারস্টার নায়কের বাণিজ্যিক ছবি বা বড় বড় স্পন্সর পাওয়া ‘কতিপয়’ কিছু আর্ট ঘরানার ছবি বাদে বাকি সিনেমাগুলো হলই পায় না, অধিকাংশ সিনেমা হলের অবস্থাও সুবিধার নয়, অনেক প্রেক্ষাগৃহ নাকি বন্ধই হয়ে যাচ্ছে, সব মিলিয়ে দর্শকরাও অতো হলমুখী হন না, ইউটিউবমুখীই থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে ‘আহত ফুলের গল্পের’ মতো একটি সামাজিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে পরিচালক অন্ত আজাদ নিজের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি বেশ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, এখনো এই সিনেমাটি নিয়ে জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সামনে বিদেশি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পাঠাবেন, এরপর ঢাকায় প্রিমিয়ার শোর আয়োজন করে মুক্তি দেবেন- এমন সব পরিকল্পনাই রয়েছে তার।
আর সবশেষে, চলচ্চিত্রটির আরো একটি সার্থকতা হতে পারে, আমার আম্মুর মতো দর্শককে বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্র সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেয়া। আম্মু এখন জি বাংলারই নিয়মিত দর্শক, এর আগেও সিনেমা দেখতে যাওয়ার আগেপরে কোনো ‘মধুর বচন’ শুনিনি, রিভিউ লিখে দু’চারটি ভালো কথা শুনেছি, তারপরও আব্বু বা ভাইয়ের সাথে গেলেও- আম্মুর সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার ব্যাপারে এতোই নেগেটিভ ধারণা কেন, নানামুখী দুঃখের সাথে এ নিয়ে কিঞ্চিৎ দুঃখবোধ তো ছিলই। কিন্তু ‘আহত ফুলের গল্প’ – যদিও বাসায় বসেই দেখা হয়েছে, মূলত আমার সাবটাইটেল করার তাগিদে, তারপরও এই চলচ্চিত্রটি দেখার পর আম্মুর মনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে (যে একদম সামাজিক ছবিও তৈরি হয় এখন) এবং সেই ফলশ্রুতিতেই হয়তো একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখতে সপরিবারে স্টার সিনেপ্লেক্সমুখী হওয়া সম্ভব হয়েছে।
 
তারপর এই সাবটাইটেলের কাজ কতোদূর হলো, শেষ হলো কিনা, এ ব্যাপারে পরিচালকের পাশাপাশি আম্মুও মাঝেমাঝে খোঁজখবর নিয়েছে (তখন অবশ্য কিঞ্চিৎ বিরক্ত লাগতো, মনে হতো- ‘তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারলে তো হতোই’, তবে এমন বিরক্তবোধ আসা মোটেই উচিত হয়নি। ) আর পরিচালকের তাগাদা আর ভালো কিছু পরামর্শের জন্যও এই সাবটাইটেলের কাজ শেষ পর্যন্ত সমাপ্ত হয়েছিল। ‘আহামরি কিছু নয়, তবে সময় নিয়ে করতে হয়’- নিজে দেখার মতো, মোটামুটি মানসম্মত সাবটাইটেল তৈরির মূলমন্ত্রও এটি, আর একটি ‘সম্পূর্ণ সামাজিক’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইংরেজি সাব করার অভিজ্ঞতাকথন এখানেই শেষ হলো।

(Visited 238 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. আরিব্বাস! দারুণ কাজ ও অভিজ্ঞতা পেয়েছেন! এগিয়ে যান, অভিনন্দন।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন