দেখা হলো দেবী (২০১৮): রানু যে চলচ্চিত্রের প্রাণ

অবশেষে দেখা হলো ‘দেবী’ 🙂

উপন্যাস আর চলচ্চিত্র গল্পের ভাব প্রকাশের আলাদা মাধ্যম, আর প্রযোজক-নির্মাতাও বলেছেন, উপন্যাস হুবহু অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়নি, আশির দশকের কাহিনীকে বর্তমান সময়ের আঙ্গিকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তাই বেশ অনেক দিন আগে পড়া, নন্দিত ও বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চমকপ্রদ উপন্যাসটির কথা না ভেবে নির্মোহভাবেই দেখার চেষ্টা ছিল।

প্রথমেই বলতে হয়, চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র ‘রানুর’ কথা, জয়া আহসানের অভিনয় এই সিনেমার প্রাণ বলা চলে। তিনি যখন অভিনয় করেন, সত্যিই চরিত্রের সাথে পুরোপুরি মিশে যান! ‘রানু’ বা ‘দেবীর’ বাইরে তাকে কখনোই ভিন্ন কিছু মনে হয়নি, এরকম একটি টাফ চরিত্রে তার বিকল্প কারো কথাও মাথায় আসেনি।

আর তার এই সাবলীল অভিনয় ও ন্যাচারাল সৌন্দর্যকে সঙ্গত দিয়ে বেশ কিছু দৃশ্যের সিনেমাটোগ্রাফি ও সার্বিক আয়োজন ছিল চমৎকার। দুইটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ছে, একটি দৃশ্যে ছাদের দেয়ালে রানু বসে, পাশে একটি পেঁচা আর পেছনে দাঁড়িয়ে দুই অশরীরী মেয়ের আত্মা। আরেকটি দৃশ্যে মিসির আলি রানুদের বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, আর রানু চন্দ্রাহতের মতো বারান্দার রেলিং ধরে যেন ঝুলছে। এছাড়াও রানু যখন বিপজ্জনকভাবে ছাদের কার্নিশে বসে থাকে… সব মিলিয়ে, রানুকেন্দ্রিক প্রায় সব দৃশ্যেই (নীলুর সাথে একটি দৃশ্য বাদে) অভিনয় আর দৃশ্যায়নগুণ মিলিয়ে দর্শক রানুর সাথে একাত্ম হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

সত্যিই যেন রানুর মধ্যে অলৌকিক ক্ষমতা আছে, তার ওপর অশরীরী কিছু ভর করেছে, আর এসবকিছু জয়া আহসানের অভিনয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে । রানুর ছোটবেলার চরিত্রও একই সাবলীলতায় উঠে এসেছে, মমতাজের ‘দোয়েল পাখি কন্যা রে’ গানটি রেখে এই কিশোরী রানুকে আরেকটু স্ক্রিনটাইম দিলেও ভালো হতো 🙂

অন্যদিকে মিসির আলি চরিত্রটি যে কোনো ফোকাস পায়নি তা কিন্তু নয়, তবে সিনেমায় অনেক সময় কমিক রিলিফ হিসেবেই এসেছে, দর্শকরাও তা উপভোগ করেছেন। সব মিলিয়ে, পরিচালকের নির্দেশনামতো দক্ষ অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী তার চরিত্রের বিস্তার ও সুযোগ অনুযায়ীই ভালো অভিনয় করেছেন মনে হলো। এই চরিত্র নিয়ে একটাই অভিযোগ থাকতে পারে, মেকআপে আরো যত্নশীল হলে প্রৌঢ় ভাবটা ভালোভাবে ফুটে উঠতো।

বাকি প্রধান অভিনয়শিল্পীরা অর্থাৎ অনিমেষ আইচ,শবনম ফারিয়া ,তারা সবাই নিজেদের চরিত্র অনুযায়ী ভালো অভিনয় করেছেন। কিন্তু এইখানে সিনেমার একটা নেগেটিভ দিকের কথা আসতে পারে, সেটা হলো, সাবেত চরিত্রটি একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায় উঠে এসেছে। মানে প্রথম থেকে, নীলু যখন সাবেতের সাথে বার্তা চালাচালি করছিলো, তখন সাবেতের হয়ে ভয়েসওভার দিয়েছেন জয়া আহসান!সিরিয়াসলি? এতে বই না পড়া কোনো দর্শক তো বুঝতেই পারবেন না, বই পড়া দর্শকেরও কনফিউজড হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কারণ,আর যাই হোক, দুই মেয়ের কথোপকথন থেকে তো নারী-পুরুষের প্রেমপ্রেম ভাব আঁচ করা সম্ভব নয়!

 

তারপর ইরেশ যাকের যখন সাবেতরূপে এন্ট্রি করলেন, তখন তাকে না সুদর্শন, না গোবেচারা, না মিচকে শয়তান, ঠিক কিছুই যেন মনে হলো না। আবার ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে সাবেতের এরকম আচরণের কারণ কী, এটা ভাবতে গেলে না চাইতেও সেই মূল উপন্যাসের আশ্রয় নিতে হয়, কারণ এখানে সাবেতের মনমানসিকতার কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড বা স্বগতোক্তিও উঠে আসেনি। যদিও মূল উপন্যাসেও সাবেত চরিত্রের বিস্তার কম, তারপরও সে ক্লাইম্যাক্সের একটি প্রধান অংশ, তাকে একটা শক্ত ভিত্তি দিলে সিনেমাটির কাহিনীপটও আরো শক্তিশালী হতো।

প্রীতম ও অনুপমের সঙ্গীতায়োজনে বেশ কিছু চমৎকার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বিভিন্ন দৃশ্যের আধিভৌতিক ও মায়াময় ভাবকে সুন্দর সঙ্গত দিয়েছে, অবশ্য প্রথমদিকে ‘মুহাহা’ করে আলগা হরর ভাব আনার চেষ্টা ভালো লাগেনি। আর ক্লাইম্যাক্সে জয়া আহসানের হৃদয়গ্রাহী অভিনয় যখন পুরোপুরি জমজমাট ভাব এনে দিয়েছে, নীলুরূপী শবনম ফারিয়ার জীবনও সংকটাপন্ন, ঠিক তখনই যেন বই থেকে কয়েক লাইন ঝেড়ে, একটু ব্যতিব্যস্ত হয়ে একটা এন্ডিং টেনে দেয়া হলো।

নগণ্য দর্শকের পক্ষ থেকে সার্বিক রেটিং ৭/১০।

তবে সব মিলিয়ে, প্রত্যাশার পূর্ণতা বা অপূর্ণতার কথা না ভেবে বলতে হয়, ‘দেবীর’ মতো এমন আরো প্রচেষ্টা, এমন সব নান্দনিক সিনেমাই সব ধরনের দর্শককে সপরিবারে হলমুখী করতে পারে। আর জয়া আহসানের সব কাজ ফলো করা হয় না, কিন্তু কমবেশি সবাই স্বীকার করবেন, এই সিনেমায় তিনি সামনের বারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পাওয়ার মতো, ‘দেবীসুলভ’ অভিনয়টাই দেখিয়েছেন। অথচ তার মতো এভারগ্রিন, সুঅভিনেত্রীদের অভিনয় দেখানোর স্কোপ দুঃখজনকভাবেই আমাদের বাণিজ্যিক ঘরানার চলচ্চিত্রগুলোতে মোটেই থাকে না।

 

আবার দেশের চলচ্চিত্র বাজার, প্রেক্ষাগৃহেরও যখন দুরবস্থা, অনেকে ইউটিউবেই সব নাটক-সিনেমা দেখতে আগ্রহী, এমন সময়ে তিনি প্রযোজনারও দুঃসাহস দেখিয়েছেন (অনেক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার পরও, গাঁটের পয়সাও নিশ্চয় কম খরচ হয়নি)। কিছু অপ্রাপ্তির কথা মনে উঁকিঝুঁকি দিলেও প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ ও এমন নিরলস প্রচেষ্টার জন্য নির্মাতা অনম বিশ্বাসকেও সাধুবাদ জানাই। দেবীর মতো কাহিনী ও সুঅভিনয়নির্ভর চলচ্চিত্র উপভোগ করার জন্য হলমুখী দর্শকদের জোয়ারের ধারা অব্যাহত থাকুক, প্রেক্ষাগৃহে গিয়েই যতো মানসম্পন্ন নির্মাণকে প্রণোদনা দিন, বাংলা চলচ্চিত্রের জয় হোক 🙂

(Visited 630 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন