বছরের সাড়া জাগানো থাই মুভি Bad Genius (2017): পরীক্ষায় নকলবাজির ধুরন্ধর ধান্ধা নিয়ে এক অসাধারণ- রোমাঞ্চকর-ধূর্ত থ্রিলার!

পরীক্ষায় নানা নকলবাজি মানে আশেপাশের বন্ধুদের কাছ থেকে একটু দেখাদেখির চেষ্টা তো কমবেশি সবাই হয়তো করেছেন! আর হাল আমলের ডিভাইসওয়ালারা তো এই নকলবাজি নিয়ে লাখ লাখ টাকার ব্যবসাই করছেন! কিন্তু আজকাল তাদের এসব করে অনেকে   হরহামেশা ধরাও পড়ে যাচ্ছেন, তাই না? তাই তো এখন থেকে নকলের আরও নিত্যনতুন  কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে, লিন নামের মেয়েটি ও তার বন্ধুদের মত নকলবাজিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে নিবিড়ভাবে সাধনা করতে হবে! আর সে জন্যও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী  হওয়া চাই, কলিজায় আরও জোর সাহস থাকা চাই! ( এই ফাঁকে বিনীতভাবে জানাতে চাই-এসব সাহস-বুদ্ধিশূন্যতার কারণে এই অধম যে কোন নকলবাজি, খাতা দেখাদেখিতেও সর্বকালই প্রায় আণ্ডা ছিলাম, তাই যারা দুই পাশের এমনকি সামনে-পেছনের বন্ধুদের খাতাও এক-দুই ঝলক দেখে সব লিখে ফেলতে পারেন বা ক্লাসটেস্টে কোলের মধ্যে বই রেখে দেখে দেখে লেখার দুঃসাহস রাখেন-তাদেরকে দূর থেকে অবলোকন করে আর্টিস্টের মর্যাদা দেয়া ছাড়া কিছু করার ছিল না।-যাক, সেসব দুঃখের কথা!)   কিন্তু লিন ও তার বন্ধুরা- কারা ওরা?  সে ব্যাপারে অবগত করতেই চলে যাচ্ছি “Bad Genius” এর মূল কাহিনীতে।

লাও লিন মেয়েটি এক দুর্দান্ত ম্যাথ জিনিয়াস, তীক্ষ্ণ মুখস্তশক্তির অধিকারীও, ক্লাস ওয়ান থেকে সেভেন পর্যন্ত জিপিএ ৪ এ ৪ পেয়ে এসেছে। তার বাবার আবার ইচ্ছে- মেয়েটি যেন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবার সুযোগ পায়, তাই তো মেয়েকে নিজে যেখানে শিক্ষকতা করেন সেই স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আরও ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে যান। সেখানকার শিক্ষকের সামনেও সেই স্কুলে পড়াশোনার অতিরিক্ত খরচ ক্যালকুলেশনে তাৎক্ষণিক দক্ষতা দেখিয়ে সে ফ্রি-তে পড়ার সুযোগ পেয়ে যায়। তারপর ছবি তুলতে গিয়ে পরিচয় হয় গ্রেস নামের এক ক্লাসমেট মেয়ের সাথে- সেই পরিচয় থেকে হল বন্ধুত্ব পাতানো। এই গ্রেস আবার পড়াশোনায় একটু কাঁচা, পরীক্ষায় অন্তত জিপিএ ৩.২৫ না পেলে স্কুল থেকে নাটকে অভিনয়ের সুযোগও মিলবে না- তাই লিনকে বলেকয়ে নিজের টিউটর বানায়। কিন্তু আসল  পরীক্ষার সময় গিয়ে দেখা গেল- কঠিন প্রশ্ন হয়েছে আর গ্রেসের মাথায় কিছুই নেই! তবে ওদের পরীক্ষা সিস্টেমে সবই নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন মানে গোল্লা ভরাটের কাজ তো, লিন তার বান্ধবীতে সাহায্য করতে কড়া গার্ডিং এর মাঝেও সুকৌশলে নিজের ইরেজারটা পেছনে বসা গ্রেসকে পাঠিয়ে দেয়- আর তার মধ্যে আছে সব সঠিক উত্তর লেখা! এভাবেই ইরেজারের মাধ্যমে নকল পদ্ধতিতে গ্রেস ৩.৮৭ -ই পেয়ে যায়, আর লিন বরাবরের মত ৪ এ ৪।

কিন্তু রূপকথার মত মধুরেণ সমাপয়েত তো আর হয় না, লিন পড়ে যায় আরও নকলবাজির চক্করে! মানে গ্রেস কথায় কথায় তার ছেলেবন্ধু প্যাটকে সব বলে  দিয়েছে, এখন সে-ও লিনের কাছে সাহায্য চায়! তাদের ক্লাসের আরও ছেলেপেলে এই সাহায্য বাবদ কোর্সপ্রতি ৩ হাজার বাথ দিতেও রাজি। লিন ভাবে, স্কুলে ফ্রি-তে পড়ার সুযোগ পেলেও “চা খরচ” বাবদ ২ লাখ বাথ ঠিকই দিতে হয়েছে, তার শিক্ষক বাবা-র অবস্থা খুব অবস্থাসম্পন্নও নয়, তাই সেসব খরচ তুলতে সে রাজি হয়ে যায়। অতঃপর ভাবতে ভাবতে মেন্টর লিন শুরু করে তার সেসব ক্লাসমেটদের জন্য পিয়ানো লেসন- মানে পিয়ানো শেখানোর আড়ালে তার হাতের ইশারা পড়ার বুদ্ধি শেখানো! এভাবে তার ব্যবসা ভালোই জমে ওঠে, কিন্তু পথে পথে কত বাধা… টিচাররা বুদ্ধি করে সেট করে প্রশ্নও করেন, আবার লিনের মত আরেক ট্র্যান্সফার ছাত্র এসেছে ব্যাং- সেও পড়াশোনায় তুখোড় , কিন্তু বেশিমাত্রায় সৎ, মানে নিজে তো দেখাবেই না, আবার অন্যরা দেখাদেখি-নকল করলেও স্যারকে বলে দেয়-এই অবস্থা!  এ সবকিছু, সব মান-অপমানের মাঝে নায়িকা কতদিনই বা নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে; ওদিকে গ্রেস আর তার সেই বালকবন্ধু আম্রিকার ভার্সিটিমুখী হওয়ার জন্য STIC পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবে, সেখানেও তারা লিনের সাহায্য চায়- চলতে থাকে অনিয়ম আর নৈতিকতার মাঝে টানটান উত্তেজনার ইঁদুর-বেড়াল দ্বন্দ্ব! আর এভাবেই এগিয়ে চলে সময়ের সাড়া জাগানো থাই চলচ্চিত্র “Bad Genius” এর কাহিনী।

জনপ্রিয় মেমে সাইট 9GAG এ শেয়ার হওয়া মুভিটির ট্রেইলার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দারুণ সাড়া ফেলেছিল, ভাইপ্রতিম এক অছাত্রও শেয়ার দিয়েছিল, আর কোন থাই মুভি সে দেখে নি জীবনে- এইটিই দেখবে! সেই শেয়ার করা ট্রেইলার আর দেখা পড়ে নি, ডিভিডিরিপ রিলিজের পরদিনই মুভিটি দেখে ফেললাম, IMDb তে হাই রেটিং দেখে প্রত্যাশাও মোটামুটি হাই ছিল- প্রায় শেষ অবধি সে প্রত্যাশার ব্যত্যয় হতে দেয় নি মুভিটি- হিউমারের ফাঁকে ফাঁকে  দারুণ সাসপেন্স থ্রিলার, রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা আর রোমাঞ্চের রোলার কোস্টারে চড়িয়ে ছেড়েছে মুভিটি! কোন আজগুবে ফ্যান্টাসি বা চৌর্যবৃত্তিও নয়, পরীক্ষায় নকলবাজির খেল আর প্রায় বাস্তবসম্মত পটভূমি নিয়ে  কী  দুর্দান্ত-উপভোগ্য কাহিনী হতে পারে!  পাশাপাশি পড়াশুনা কমবেশি সবাইকেই করতে হয়, তাই দর্শক হিসেবে গল্পের চরিত্রগুলোর সাথে  নিবিড় আত্মীকরণ হয়েছে- আবার ছবিতে দেখানো থাইল্যান্ডের সাদামাটা পথঘাট থেকে ময়লার ভাগাড়-তার মাঝেও কেমন বাংলাদেশের আবহ লাগে! অবশ্য এমন  বাস্তবসম্মত-হৃদয়গ্রাহী কাহিনী-চিত্রায়ন নন্দিত থাই চলচ্চিত্রকার-বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের ট্রেডমার্ক-ই বলা চলে 😀

নায়িকা লিন চরিত্রে থাই মডেল ছুতিমন (পুরো নাম- Chutimon Chuengcharoensukying -পড়েছেন? বাপ রে!) ডেব্যুটেই অসামান্য অভিনয় করেছেন। প্রচণ্ড মেধাবী মেয়েটির পড়াশোনার পারঙ্গমতার চেয়ে নকলবাজিতে তার জিনিয়াসগিরি ফোকাস করাই ছিল এই মুভির লক্ষ্য-আর এ তো যে সে নকলগিরি নয়, যেন চোখ বুজে- দৌড়ের ওপর করে যাওয়া এক নিবিড় সাধনা, কঠিন এক শিল্প- পিয়ানোর সুললিত বাদ্য!

নায়িকাপ্রধান চলচ্চিত্রের প্রতি কিঞ্চিৎ দুর্বলতা আছে, অপ্রত্যাশিতভাবে “Bad Genius” সেই ক্যাটাগরিতে পড়েছে, নায়িকার কঠিইইন অভিনয় যে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা নিয়ে দেখলাম, হেইস্ট কোরীয় মুভি “The Thieves” এ প্রিয় নায়িকা জুন জি হিয়ন দর্শন তার কাছে অনেক আগেই হার মেনেছে- গল্পগুণ, পরিচ্ছন্ন ভাব, অভিনয় যোগ- সব মিলিয়ে! স্বীকৃতি স্বরূপ ২১ বছর বয়সী নায়িকা জিতেছেন নিউইয়র্ক এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ইন্টারন্যাশনাল রাইজিং স্টার অফ এশিয়া এ্যাওয়ার্ড। তার সাথে দ্বৈতচারী ব্যাং আর বন্ধুবান্ধব গ্রেস-প্যাট চরিত্রগুলোতে অভিনয় করা অন্যান্য নবাগতরাও সাফল্যের সাথে উতরে গেছেন।


আর পরিচালক নাত্তাউত পুনপিরিয়া সম্পর্কে দুইটি কথা লিখি- ইউটিউবে “Present Perfect” , “Library” এসব জনপ্রিয় থাই শর্টফিল্ম দেখে থাকতে পারেন, এগুলোর পরিচালক+অন্যতম কাহিনীকারও এই ভদ্রলোক। শর্টফিল্ম বানিয়ে হাত পাকিয়ে “Bad Genius” এও একই ভূমিকায় বাজিমাত করলেন, বেশকিছু ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা পরিচালকের পুরস্কার প্রাপ্তি- সমালোচকধন্য হওয়ার পাশাপাশি বক্স অফিসেও হিট হয়েছে মুভিটি- থাই বক্স অফিসে ২০১৭ সালের সেরা আর আন্তর্জাতিক বাজারে এযাবতকালের সবচে’ বেশি আয় করা থাই মুভি! আর তার শর্টফিল্ম”Present Perfect (2014)” এর পর পূর্ণদৈর্ঘ্য “Bad Genius” আমার
প্রিয়তায় ও রিকমেন্ডেড থাই মুভির তালিকায় জায়গা করে নিল 🙂

“ব্যাড জিনিয়াস ฉลาดเกมส์โกง (২০১৭)”- একদম পরিণতিতে এসে টানটান ভাবে একটু ছেদ ঘটেছে মনে হলেও সব মিলিয়ে ৯/১০- এই রেটিং আমার পক্ষ থেকে দিতেই হয়! 🙂

পরিশেষে আসি নীতিকথায়- দুর্নীতির চক্করে একবার পড়লে বারবার তার মায়াজালে বন্দীই হতে হয়- তাতে অর্থবিত্ত, ভালো ফলাফল আসতে পারে কিন্তু মানসিক শান্তি, তৃপ্তি কতটুকু  আসে আসলে? সে উত্তরটাও আছে “Bad Genius” মুভিতে, অরিজিনাল কাহিনী নির্ভর কিন্তু নকলের নানা ফিকির দেখানো এ মুভিটি দেখে নকলের নানান ধান্ধা সম্পর্কে জ্ঞান বাড়লেও সব ছাত্রছাত্রীদের, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবারই বোধহয় দেখাই উচিত। বিশেষ করে যারা ডিভাইজ নিয়ে দুই নম্বরি আর প্রশ্নফাঁসের  খেলায় মেতে থাকেন, তাদের উদ্দেশ্যে ফাঁকা বুলি-  আপনাদের অনৈতিক স্পর্ধা আর লুলায়িত লোভকে দয়া করে সামাল দিতে শিখুন, কী আছে জীবনে-  “Bad Genius” দেখে সময় উসুল করা বিনোদন-রোমাঞ্চ উপভোগের সাথে ফ্রি কিছু শিক্ষাও হয়তো বা নিতে  পারেন! রিভিউ-র সমাপ্তি 🙂      -রিফাত স্বর্ণা

ডাউনলোড লিংক- ১]  https://goo.gl/5fZzmh

                                   ২] openload-  https://goo.gl/wp3gqN  

সাবটাইটেল- https://subscene.com/subtitles/bad-genius/english/1667524

 

(Visited 2,611 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১৭ টি মন্তব্য করা হয়েছে

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন