মুসাফিরঃকারিগরি নৈপুণ্যের সাথে ধোঁয়া ধোঁয়া আশা ও হতাশা !
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

musafir

হতে পারে- আমি একটু পুরনো দিনের ছবি দেখলাম। হতেই পারে তা কিছুটা ঘোলাটে বা সাদাকালো ছবি,   হতে পারে সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির তেমন ছোঁয়া নেই – তারপরও কোন গুণে তা মনে দাগ কাটতে পারে, কিছুক্ষণের জন্য হলেও চিন্তার খোরাক জোগাতে পারে? পরিচালক আর পর্দার পেছনের টিমকে তো দর্শকের চোখে পড়ে না- তাই কাহিনী, চরিত্রগুলোর একাত্মতা আর সেই কাহিনীচিত্রকে ফুটিয়ে তোলার  গুণ , দৃশ্যায়ন, সংলাপ থেকে অভিনয় সবকিছু  দর্শক অবলোকন করেন – তবে দেখা শেষে দর্শকদের প্রশংসা বা সমালোচনার  ভাগীদার হন সেই মুভির সকল কুশীলবেরা। আধুনিক ছবিতে প্রযুক্তির দুর্দান্ত ছোঁয়া লাগছে, দেখে আমরা চমৎকৃত হই- সাধুবাদ জানাই, তাই বলে একেবারে মৌলিক বিষয়গুলো-সেই আবেগ, অনুভূতি, এমনকি সাধারণ যুক্তিকে  কিন্তু উপেক্ষা করতে পারি না! ধান ভানতে শিবের গীত  নয়, প্রথম দিন প্রথম শো- তে “মুসাফির” ছবি দেখে এসেই এসব যৌক্তিক কথার অবতারণা।

13010717_494270830765983_3993720940455910863_n

নায়ক-শিল্পপতি অনন্ত জলিল- তার মানবসেবামূলক বিভিন্ন  কর্মকাণ্ডের কথা কমবেশি সবাই গণমাধ্যমগুলোর বরাতে জেনে থাকি, সাথে শিল্পী হিসেবে- নিজের কাজ নিয়ে তিনি যে বেশিমাত্রায় অহংকারী তাও জানি। তো সেই অহংবোধ থেকেই “মোস্ট ওয়েলকাম-২” এর প্রচারণা করতে এক টিভি সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তিনি এমনটাই বলেছিলেন- তিনি আরও একশ বছর বাঁচতে চান ও দেখে যেতে চান- আগামী ১০০ বছরেও নাকি বাংলাদেশে  তার ছবির সমকক্ষ কোন মুভি তৈরি হয় কী না  [অবশ্যই   কারিগরি দিক দিয়ে!] ২ বছরও তো পার হল না, আশা করি- জলিল সাহেব “মুসাফির”ছবিটি দেখবেন। কারণ ছবিটি কারিগরি উৎকর্ষতায়, প্রযুক্তির উপযুক্ত ব্যবহারের দিক দিয়ে  দেশের বিগত সব  মুভিকে ছাপিয়ে গেছে! শুধু তাই নয়- এতে  আছে আরেফিন শুভ-র মত একজন ফিট-যোগ্য নায়কের উপযুক্ত ব্যবহার , পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন  লোকেশনে কিছু দুর্ধর্ষ ফাইটিং সিকোয়েন্স [দেখা গেছে, নায়ক ভিলেন/গুণ্ডাকে নয়, উল্টা গুণ্ডারা নায়ককে মারপিট করলেই দর্শকরা খুশি হয়ে হাততালি দিচ্ছেন! ] , সাথে আছে ক্যামেরার কিছু দৃষ্টিনন্দন ব্যবহার-উপর থেকে ধারণ করা ঢাকা শহরের পথঘাট চোখ জুড়িয়ে দেয়। ভিলেন চরিত্রের অভিনেতারা- টাইগার রবি থেকে মিশা সওদাগর মাত করে দিয়েছেন, নায়কের সহকারী বান্টি চরিত্রটাও দর্শকদের যথেষ্ট হাস্যরস জুগিয়েছে। এত তো গেল সব আশাপ্রদ কথা, এর মধ্যে আবার হতাশা কই? আছে বই কী, সে কথা এখন হবে!

13002565_494313100761756_475288084708745266_o

আরেফিন শুভ-র চরিত্র সানি নির্দোষ হলেও তার প্রাক্তন প্রেমিকার ফাঁদে পড়ে ১০ বছর জেল খেটেছেন, সেখানে এক ফাঁসির আসামীর কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন [ ইয়ে, ফাঁসির আসামীকে আলাদা সেলে রাখার কথা না?ব্যাপার না, এত ছোটখাটো ব্যাপার নির্দ্বিধায় মেনে নিচ্ছি! 🙂 ] , জেল থেকে বেরিয়ে তার চোখে   প্রতিশোধের আগুন- বেশ থ্রিলিং কায়দায় ব্যাপারগুলো দেখানো হল। কিন্তু নায়িকা মারজান জেনিফা-র কাহিনী কী?  তিনি ডাক্তার (কসমেটিক  সার্জন) ও সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স দলের সদস্য। তো মোটামুটি প্রথম দিকেই  দেখা গেল- তার সহযোগী কোন এক কারণে [স্পয়লার দিচ্ছি না!]  নায়িকাকে বাঁচাতে একটা হাসপাতালই  উড়িয়ে দিলেন! যদিও হাসপাতাল ভবনে আগুন ধরার দৃশ্যটা যথেষ্ট মেকী লাগল, কিন্তু ভাবুন তো- এটা কী হল?!!  সেই হসপিটালের প্রধান ডাক্তার নায়িকাকে নিজের মেয়ের মত স্নেহ করতেন [মূলত কৌতুক অভিনেতার রোল করা আফজাল শরীফ এই চরিত্রে কতটা মানানসই, সে প্রশ্ন বাদ দিলাম- কয়েকজন গুণ্ডার সাথে কথা বলার দৃশ্য দেখিয়ে তাকে একটু খারাপ প্রমাণের চেষ্টা অবশ্য ছিল],আরেক মোটু  ডাক্তার  “ছুঁয়ে দিলে মন” এ শুভ-র বন্ধুর চরিত্র করেছিলেন- এই সিনেমায়ও নায়িকার প্রতি অনুরক্ত  কমেডি ডাক্তারের ভূমিকায় ভালো করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা-সিনেমায় নাহয় না-ই বা দেখালেন, কিন্তু একটা  অগামগা  হাসপাতালেও দিনরাত যথেষ্ট পরিমাণ রোগী থাকে, সাথে অনেক ডাক্তার-নার্সও থাকে।  তো তাদের সবাইকে নিয়ে [জনশূন্য করে না!]  হাসপাতাল উড়িয়ে দিলেন নায়িকার সহযোগী ডাক্তার, কিন্তু নায়িকার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা হল না –[ উনি আবার মেন্টাল বা শক্ত মনের মানুষও না, নায়কের প্রেমে যেভাবে গলে গেলেন!] কত মানুষ হতাহত হলেন, ডাক্তার-রোগীগুলোর কী হল তার খবর ঠিক  নেই,  উল্টো সিনেমার সর্বত্র নায়িকার  সহযোগী-র এই “বীরত্বের” খবর ফলাও করে প্রচার করা হল। কাহিনীভক্ত আমি এমন কাহিনী-সূচনা দেখে যথেষ্ট আহত বোধ করলাম, বলা যায়-অনেকটা বিশ্বাসও উঠে গেল! ভাবলাম- আরও দেরি করে যদি হলে আসতাম, এ দৃশ্য যদি দেখা না লাগত!  🙁

11207326_416653008527766_4472688304344031104_n

তারপর আসি নায়িকা-র ফিটনেস ও মানানসইতা নিয়ে। আমরা আমজনতা অত স্বাস্থ্যসচেতন না থাকতে পারি, সিনেমার নায়ক-নায়িকাকে তো ফিট থাকতে হবে [কাহিনী-চরিত্র যখন ডিমান্ড করেই!]  জিম করা,  ফিটফাট নায়ক আরেফিন শুভ-র পাশে আমাদের একটু বেখাপ্পা নাদুস গোছের নায়িকা-কে দেখে একটা কথা মনে পড়ে গেল। এক অভিজ্ঞ, সিনিয়র কোরিয়ান অভিনেত্রী এক টিভি সিরিজে অভিনয় করতে গিয়ে বলেছিলেন- “ আমার সব সময় চিন্তা হয়- ওর (জুনিয়র নায়ক) পাশে আমাকে মানাচ্ছে তো! তাই নিজের ফিটনেসের ব্যাপারে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হয়।” আমাদের দেশের কিছু সিনিয়র চলচ্চিত্র অভিনেত্রী চমৎকার অভিনয় করলেও ক্যারিয়ারের মাঝপথে এসে ফিটনেস হারিয়ে ফেলেন, পরে সেই মোটুসোটু অবস্থাতেই নায়িকার পার্ট  করতে থাকেন। এই নায়িকা অভিষেকেই কেমন যেন ফিটনেসহীন, তার উপর উনার চরিত্র শুধু নায়কের  লাভ ইন্টারেস্ট, পাশের বাড়ির মেয়ে গোছের নয়- কাহিনীর মোটামুটি বড় অংশ জুড়ে থাকা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় , ডাক্তারের বেশে থাকা সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স দলের সদস্য- মিশা সওদাগরের মতে যাদের অন্তত তিন বছরের ট্রেনিং নিতে হয়! কী অবাক ব্যাপার- সেই ট্রেনিং নিয়ে মহামান্য নায়িকার এমনি হাল তিনি মারামারি তো দূরের কথা, গাড়ির পেছনে লুকিয়ে থাকেন, “সানি-সানি” (নায়কের নাম) বলে হাঁক ছাড়েন! তার চেয়ে বরং মিশা সওদাগরের সহযোগী নারী চরিত্র অনেক ফিট ছিলেন, অল্প সময়ের খলনায়িকা সিন্ডিও বেশ ভালো করেছেন। রোম্যান্টিক গানের অল্প কয়েকটি  দৃশ্যে ভালো  দেখালেই তো আর ফটোজেনিক হওয়া যায় না! তা ছাড়া অভিনয়েও বেশ কাঁচামি-  ইমোশনাল দৃশ্যে বড় ন্যাকামি। তার উপর যেই নায়িকা-র ডাবিং করেছেন তার গলা আরও ন্যাকামিতে ভরা- কোনমতেই তা এই নায়িকার  রোলের সাথে যায় না। এই অবস্থা দেখে স্ক্রিনের ওপর থেকে চোখ  সরিয়ে নিতে ইচ্ছে হয়,কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়েও ছিলাম !  [ সে সময় “অগ্নি” মুভি-র মাহিয়া মাহি-র কথা মনে পড়ল, তারও তো ন্যাকামি দোষ ছিল, তারপরও ফিটনেস, ফাইটিং-অভিনয় দিয়ে এর চেয়ে বহুগুণ ভালো উতরে গিয়েছিলেন, এই মুভিতে সত্যিই এমন ফিট-কঠিন নায়িকার বড়ই দরকার ছিল!]

11110162_385736018286132_6222308486451283652_n

আরেফিন শুভ- ঢাকাই ছবিতে এই নায়ককে নিয়েই কেন এত ক্রেজ ,এত মাতামাতি তৈরি হচ্ছে- এই ছবিতে তিনি তা ভালোভাবেই প্রমাণ করেছেন। একদিকে তার সৌভাগ্য- তিনি কারিগরি নৈপুণ্যে ভরপুর, বেশ বৈচিত্র্যময় ছবিগুলোতে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন; অন্যদিকে এই মুভিতে কিলার চরিত্রের থ্রিলার,কমেডি, রোমান্স- তার অভিনয় নৈপুণ্যের ওপর ভর করেই এগিয়েছে। বিশেষ করে তার সহচরীকে যোগ্য না মনে হওয়ায়- তার উপর আরও বেশি ফোকাস করাই বাধ্যতামূলক ছিল। তখন একটি গানে কিঞ্চিৎ কস্টিউমের ব্যাপার ছাড়া তার দিক থেকে তেমন ত্রুটি পেলাম না! সত্যিই এমন চরিত্রে  অভিনয়ের জন্য তার  মত ফিটফাট আর সুযোগ্য অভিনেতা বর্তমানে বাংলা ছবিতে দ্বিতীয়টি আর নেই! ভবিষ্যতে তিনি নিজে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন, আরও কৌশলী পরিচালকদের সাথে নিত্য-নতুন কাজ করবেন, দেশী ছবিতে এমন আরও যোগ্য-সচেতন নায়করা আসবেন- এমনটাই প্রত্যাশা করা যায়।

10462935_382926185233782_8910540111342718067_n

কিছু টুইস্ট রাখার চেষ্টা [অতিথি চরিত্র এনেও] , মিশা সওদাগরের চরিত্রকে বেশ গুরুত্ব দেয়া- তার  অতীত জীবনের ফ্লাশব্যাক ভালো ছিল। পিস্তল নিয়ে খেলা করাটা মনে থাকবে! গানগুলোও বেশ মানানসই ও শ্রুতিমধুর ছিল ।

তারপরও-

“ নায়ক-ভিলেন দল ছিল যত ভালো

নায়িকার কাহিনী-অভিনয়  বড়ই ডোবাল!”

চিন্তা করুন- একটা ইমোশোনাল দৃশ্যে হলভর্তি মানুষ হাসাহাসি করেছে-সেখানে নায়িকার ন্যাকামিপূর্ণ অভিনয়ের সাথে  কাহিনী-সংলাপেরও বেশ দোষ ছিল, ছোট ভাই বলল- এত লেইম, কমনসেন্সের অভাব!  পট পরিবর্তনের বাঁকে বাঁকে এমন ছোটবড় কিছু খাপছাড়া ভাব ছিল। আরেকটা ব্যাপার- CGI  ইফেক্ট-  রেলগাড়ির ছাদের  উপরে নায়কের সাথে ভিলেনের মারামারির সময় চারপাশের পরাবাস্তব আবহ দেখেই সবাই বুঝলাম-স্টুডিওতে ধারণকৃত দৃশ্যে CGI ইফেক্ট প্রয়োগকরা হয়েছে- কেমন কার্টুন-কার্টুন ভাব এসে গেল না! মেঘলা আকাশ, রাতের পথঘাটও  এনিমেশনের প্রভাব দিয়ে করা দেখে পাশ থেকে বান্ধবী বলল, সবই  এনিমেশন দিয়ে করা লাগে! [যদিও ছোটভাই বলল, ‘এত ভালো অ্যানিমেশন’;  তারপরও মেকী যে লাগে!] মুভির শেষে আবার লেখা দেখলাম-“মুসাফির-২”। ভাই, এত ইন্টারেস্ট নাই, শেষে ২-৩ টা গুলি খেয়েও নায়ক যেমনে চোটবিহীন অবস্থায় উঠে নায়িকা উদ্ধারে গেল – এমন কাহিনীপট+ নায়িকা থাকলে “মুসাফির-২” জাতীয় কোন মুভি দেখার ইচ্ছে আমাদের জনাপাঁচেকের অন্তত নেই!

সব মিলিয়ে নিজের দেয়া রেটিং-  মেকিং এর জন্য- ৮/১০ তবে প্লট-পরিক্রমার  জন্য- ৬/১০

12046681_438204333039300_5678826753922373512_n

“মুসাফির” ছবির পুরো টিম অভিনন্দন প্রাপ্য- তাদের কারিগরি নৈপুণ্য আর অনবদ্য প্রচেষ্টার জন্য-  জানি না, বড় বাজেট আর বড় পরিসরের আধুনিক ছবিটিতে এমন অযৌক্তিকতা আর অসঙ্গতিগুলো  উপজাত হিসেবে আসাটা কতটা যৌক্তিক ছিল! তারপরও সবাই প্রেক্ষাগৃহে গিয়েই উপভোগ করুন “মুসাফির”- নিপুণতার প্রশংসা করুন মনখুলে, সাথে গঠনমূলক সমালোচনাও করুন- বাংলা চলচ্চিত্র এমন কারিগরি উৎকর্ষের  সাথে সাথে যৌক্তিক-মৌলিক কাহিনী- চরিত্রায়নেরও মেলবন্ধন রচনা করে দিনে দিনে এগিয়ে যাক খানিকটা দূর! 🙂

 

Musafir (2016)
Musafir poster Rating: N/A/10 (N/A votes)
Director: Ashiqur Rahman
Writer: Ashiqur Rahman (screenplay), Ashiqur Rahman (script)
Stars: Arifin Shuvo, Marjaan Jenifa, Misa Sawdagar, Tiger Robi
Runtime: 148 min
Rated: N/A
Genre: Action, Crime, Thriller
Released: 22 Apr 2016
Plot: A race between secret service agency and underworld mafia to have classified information of the agency.

এই পোস্টটিতে ৭ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. দেশীয় সিনেমার মঙ্গল কামনা করি।
    লেখাটি পড়ে ভালো লেগেছে 😊

  2. First teach the actors how to hold a gun properly maybe then I can enjoy Bangla movies properly

  3. বাংলাদেশে সিনেমা বানানোর বর একটা প্রবলেম বাজেট

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন