পরিচালকদের নিয়ে ধারাবাহিক পোস্ট- আজকের পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম

Chasi-nazrul-Islam_চাষী-নজরুল-ইসলাম-e1339010625200

১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর বিক্রমপুর শ্রীনগর থানার সমষপুর গ্রামে আজকের চাষী নজরুলের জন্ম। উনি ছিলেন বাবা-মায়ের জ্যেষ্ঠপুত্র। বাবা মোসলেহ উদ্দিন আহম্মদ, ভারতের বিহারে টাটা আয়রন এন্ড স্টীল কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বাবা মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ লস্করের পূর্বপুরুষেদের সমন্ধে যা জানা যায় সে অনুযায়ী প্রথম পুরুষ আমিন লস্কর, তারপর মোমেন লস্কর। এভাবে আহমেদ লস্কর, জরিপ লস্কর তারপর চাষীর দাদা হেলাল উদ্দিন আহমদ লস্কর। জানা যায়, শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক চাষীর নাম রেখেছিলেন। ওনার মামা চাষী ইমাম উদ্দিন শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সঙ্গে রাজনীতি করতেন এবং নবযুগ ও লাঙ্গল পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেই সূত্রেই একদিন ফজলুল হককে একটা নাম দিতে বলা হলে তিনি চাষী ইমাম উদ্দিনের ‘চাষী’ আর কাজী নজরুল ইসলামের ‘নজরুল ইসলাম’ মিলিয়ে একটা নাম দেন।

তিন মাস বয়সে ওনাকে নিয়ে ওনার মা স্বামীর চাকরিস্থল জামশেদপুরে গিয়েছিলেন। তারপর টানা চার বছর সেখানে ছিলেন। এরপর কিছুদিনের জন্য আবার নিজেদের গ্রাম বিক্রমপুরে ফিরে এলেন। বিক্রমপুরে চাষীদের বাড়ির সামনে বেশ খোলা জায়গা ছিল। তার কিছু অংশে পারিবারিক হাট বসতো-সবাই বলতো হাটখোলা। পাশেই ছিল একটা প্রাইমারি স্কুল। এ স্কুলটার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চাষীর মামা চাষী ইমাম উদ্দিন,বর্তমানে সমরপুর হাইস্কুল ও কলেজ। ঐ স্কুলেই ক্লাস ওয়ানে তাকে ভর্তি করানো হয়। ক্লাস টুতে ওঠার পর চাষীর বাবা আবার তাকে নিয়ে গেলেন জামশেদপুরে। ওখানে চাষীর বাবারই প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল মুসলিম স্কুলে তিনি ফাইভ পর্যন্ত পড়েন। তারপর ক্লাস সিক্স-সেভেন পড়েন গোলামুড়ি মাধ্যমিক স্কুলে। তারপর আরডি টাটা হাইস্কুলে-এখান থেকেই পরে চাষী ইলেভেন পাস করেন। ঠিক এ সময় চাষীর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবা অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তিনি চাননি সবাই বিক্রমপুরে ফিরে আসুক। মোসলেহ উদ্দিন সাহেব ভেবেছিলেন টাটা কোম্পানিতে চাষীর একটা চাকরি হবে। মূলত তিনি জামশেদপুরে স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন। চাষীর মা শায়েস্তা খানম সেরকমটি চাইলেন না। শেষমেশ ১৯৫৮ সালে সবাই বিক্রমপুর চলে এলেন।

১৯৫৮ সালে তার বাবা মারা যান। পিতার শোক ভুলে যাবার আগেই সংসারে বড় ছেলে হিসেবে সব দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। এজি অফিসে অফিসের পোস্ট-সর্টার হিসেবে ১৯৬৯ পর্যন্ত চাকরি করেছেন। এফডিসি মাত্র তখন গড়ে উঠছে। আউয়াল সাহেব বিখ্যাত সিনেমা করিয়ে ফতেহ্ লোহানীর প্রধান সহকারী। উনি চাকরির ফাঁকে ফাঁকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, একই সঙ্গে শুরু করলেন নাটক। আলী মনসুর সাহেবের কৃষ্টি সংঘের সঙ্গে কাজ করেন মঞ্চে অভিনয় করেন। এদিকে ওনার সিনেমা প্রীতিটা জানতেন তার খালাতো বোনের স্বামী সৈয়দ আওয়াল। একদিন সুযোগ এলো- ওনাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন পরিচালক অভিনেতা ফতেহ লোহানীর সঙ্গে। ফতেহ লোহানী তখন ‘আছিয়া’ করছিলেন। চাষীকে ছোট্ট একটা রোল করার জন্য নিয়েছিলেন। কিন্তু ফতেহ্’র নির্দেশে পরদিন সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৬১’র জুন মাসে উনি কাজ শুরু করলেন। এরপর ১৯৬৩-তে কাজ করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রাকার ওবায়েদ-উল-হকের সহকারী হিসাবে ‘দুইদিগন্ত’ ছবিতে। এভাবে কাজ করতে করতে এলো ১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন আর সবার মতো। তারপর যুদ্ধশেষে বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিক্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ নির্মাণ করলেন। ১৯৭২-এ এই ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে চাষী নজরুলের আত্ম প্রকাশ ঘটলো। এছাড়া নিয়মিত বেতারে, টিভিতে সান্ধ্য অভিনয় অব্যাহত ছিল।
তার পরিচালিত ছবি গুলো হচ্ছে
ওরা ১১ জন (খসরু, রাজ্জাক, শাবানা, নূতন)
সংগ্রাম
ভালো মানুষ
বাজীমাত
দেবদাস (বুলবুল আহমেদ, কবরী, আনোয়ারা, রহমান)
চন্দ্রনাথ (দোয়েল)
শুভদা (রাজ্জাক, আনোয়ারা)
লেডি স্মাগলার (ববিতা, সোহেল চৌধুরী)
মিয়া ভাই
বেহুলা লক্ষিন্দর
বিরহ ব্যথা
মহাযুদ্ধ
বাসনা
দাঙ্গা ফাসাদ
পদ্মা মেঘনা যমুনা (ফারুক, চম্পা)
আজকের প্রতিবাদ
শিল্পী (আলমগীর, রুনা লায়লা)
হাঙর নদী গ্রেনেড (সোহেল রানা, সুচরিতা, চম্পা, অরুণা বিশ্বাস, আশিক, ইমরান, সাজ্জাদ হোসেন দোদুল)
হাছন রাজা (হেলাল খান, শমী কায়সার, মুক্তি, শানু, ববিতা)
মেঘের পরে মেঘ (রিয়াজ, পূর্ণিমা, মাহফুজ আহমেদ)
শাস্তি (ইলিয়াস কাঞ্চন, চম্পা, রিয়াজ, পূর্ণিমা)
সুভা (শাকিব খান, পূর্ণিমা)
ধ্রুবতারা (ফেরদৌস, মৌসুমী, হেলাল খান)
দুই পুরুষ (সোয়েব, মৌসুমী, রিয়াজ, নিপুণ, তৌফিক, শাকিবা)
দেবদাস (শাকিব, অপু বিশ্বাস, মৌসুমী, শহীদুজ্জামান সেলিম)

তিনি যে পুরস্কার গুলো পেয়েছেন
১. বাংলাদেশ সিনে জার্নালিষ্ট এ্যসোসিয়েশন এওয়ার্ড সংগ্রাম ১৯৭৪ শ্রেষ্ঠ পরিচালক
২. জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার শুভদা ১৯৮৬ শ্রেষ্ঠ পরিচালক
৩. সিনে ডিরেক্টরাল এসোসিয়েটস সার্বিক বিবেচনায় ১৯৮৫ চলচ্চিত্র নির্মাণ
৪. শের-ই-বাংলা স্মৃতি পুরস্কার। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৮৮ শ্রেষ্ঠ পরিচালক
৫. বাংলাদেশ ফিল্ম ক্রিটিকস্। বিরহ ব্যথা ১৯৮৯ শ্রেষ্ঠ পরিচালক
৬. বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইয়ুথ অর্গানাইজেশন ফেডারেশন এওয়ার্ড। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৮৯ শ্রেষ্ঠ পরিচালক
৭. সিনে ডিরেক্টরাল সোস্যাল ওয়েলফেয়ার। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৮৯ পরিচালনায়
৮. বাংলাদেশ সোস্যাল ওয়েলফেয়ার। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৯৫ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব
৯. স্যার জগদীশচন্দ্র বসু স্বর্ণপদক। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৯৫ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব
১০. জহির রায়হাণ স্বর্ণপদক। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৯৫ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব
১১. জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ১৯৯৭ হাঙর নদী গ্রেনেড ১৯৯৭ শ্রেষ্ঠ পরিচালক
১২. একুশে পদক । ২০০৪ ।
১৩. বিনোদন বিচিত্রা অ্যাওয়ার্ড । ২০০৩ শ্রেষ্ঠ পরিচালক
১৪. জেনেসিস নজরুল সন্মামনা পদক । ২০০৩ ১৫. বি.সি. আর.এ.এ᐀৷ওয়ার্ড । ২০০৫ শ্রেষ্ঠ পরিচালক
১৬. তারকালোক অ্যাওয়ার্ড । ১৯৯৭ ।
১৭. আন্তজাতির্ক বাংলাদেশ।ইন্দোকালা মিউজিক । ২০০৩ জহির রায়হান আজীবন সন্মাননা
১৮. CJFB অ্যাওয়ার্ড । । শ্রেষ্ঠ পরিচালক
১৯. আন্তজাতির্ক কালাকার পুরস্কার । ২০০৫ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রএবং শ্রেষ্ঠ পরিচালক
২০. ট্রাব অ্যাওয়ার্ড । ২০০৩ ।

১৯৬৯ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর দেশের অন্যতম বিখ্যাত কাজী পরিবারের কে.জি.আহমেদের মেয়ে জোত্‍স্না কাজীকে বিয়ে করলেন চাষী নজরুল ইসলাম। পরবর্তীতে চাষীর দুটি মেয়ে হয় চাষী আন্নী ইসলাম ও চাষী মান্নি ইসলাম।

(Visited 37 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১৭ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. অনেক ভাল লাগার একজন পরিচালক। বেতিক্রমি এই লেখাটির জন্য ধন্যবাদ 🙂

  2. যুবায়ের says:

    ভালো লাগলো পোষ্টটা। অনেক ধন্যবাদ লিখাটার জন্য।

  3. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    ভালো লাগলো এমন একজন মানুষকে নিয়ে লেখা দেখে। তোমার এই উদ্যোগ দেখে খুশি লাগছে। বেশ আগে আমি একবার গ্রুপে বলেছিলাম যাতে একেকজন একেক পরিচালককে নিয়ে বায়োগ্রাফি লেখে তাহলে ব্লগে অনেকের বায়োগ্রাফি পাওয়া যাবে। আর আমাদের দেশের কেউ হলে তো কথাই নেই।

    • রিফাত আহমেদ রিফাত আহমেদ says:

      আসলে কি আমাদের দেশের পরিচালকদের সম্পর্কে নেট থেকে বেশি কিছু পাওয়াই যায় না। 🙁 …ওনার বেশির ভাগ ছবি সম্পর্কেই কিছুই বের করতে পারিনি

    • পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

      আসলেই, সমস্যাটা এখানেই। আমিও অনেক সময় অনেককে নিয়ে লিখতে গিয়ে কিছু খুঁজে পাইনি।

  4. ডন মাইকেল করলিয়নে says:

    চমৎকার উদ্যোগ… 😛 লেখাটা ভালো লাগলো… চালিয়ে যাও… 🙂

  5. অসাধারণ উদ্যোগ। বিদেশি ভালো পরিচালকদের বায়োগ্রাফি থাকলেও দেশিদের তেমন ছিল না। এখন থেকে নিয়মিত তাদের কথা জানতে পারবো ভীই ভালো লাগছে। অনেক অনেক সাধুবাদ জানাই।

  6. তারিক লিংকন says:

    প্রশংসনীয় একটি কাজ করেছেন। এই ব্লগে ইমো দেয়া যায় না কেন?
    আপনাকে অফুরন্ত শ্রদ্ধা… লিখতে থাকুন, জানাতে থাকুন বাঙলাকে সবার কাছে!!
    আমরা সবাই নিজেকে চিনব, জানব আর অর্জনে আগ্রহী হব… সাবাস… প্রনাম নিন!!

  7. অনিক চৌধুরী says:

    দুর্দান্ত মুনশিয়ানার একজন পরিচালক। আর অনেক ভালো একটা পোস্ট।

  8. মেগামাইন্ড says:

    ওরা ১১ জন , দেবদাস , শাস্তি, হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড মুভি গুলু অনেক পছন্দের ছিল

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন