আয়নাবাজিঃ বাংলার সম্ভাব্য প্রথম সুপার হিরো অরিজিন স্টোরি।

fhfj

সকল জল্পনা কল্পনা শেষ করে আজকে অবশেষে মুক্তি পেল ছোট পর্দার গুণী নির্মাতা এবং অ্যাডমেকার অমিতাভ রেজার প্রথম চলচ্চিত্র “আয়নাবাজি” – তাও আবার 1st day 1st show জীবনে প্রথম বলাকার বাইরে কোথাও… শ্যামলী সিনেপ্লেক্স। সাথে উপরই পাওনা – আয়নাবাজি দলকে দূর থেকে হলেও এক ঝলক দেখতে পাওয়া। কঠিন ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে যখন বাসায় ফিরলাম ততক্ষনে আরও একটা শো হয়ে গেছে ওখানে। যাই হোক, কেমন লাগলো আয়নাবাজি? মনপুরার পর সেরকম blown away হয়েছি কি?

অনেকদিন পর এমন একটা বাংলাদেশী মুভি দেখলাম যেটা দেখার সময় বিন্দুমাত্র একঘেয়েমি লাগেনি বরং মনে হয়েছে আঃ। আরও আরাম করে যদি দেখতে পারতাম। আরও বেশি সময় যদি হত মুভিটা, গান-রোমান্স যদি আরও বেশি থাকত। আমার শহরটাকে আর মানুষগুলাকে এত ইন্টারেস্টিং কখনও লাগেনি। অমিতাভ রেজা আর আয়নাবাজি দলকে অশেষ ধন্যবাদ আমাদের মত সিনেমাখোরদের এমন সিনেমাটিক কিছু উপহার দেয়ার জন্য। এমন একটা সিনেমা যেটা আসলেই একবার দেখলে মন ভরে না, শুধু অমিতাভ রেজার পরিচালনার কারণেই না, চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় দেখার জন্য হলেও মুভিটা আরেকবার দেখা যায়।

মনপুরার পর এরকম একটা মুভিই পারে আমাদের চলচ্চিত্রকে বিশ্বের দরবারের কাছে পরিচিত করতে।

vlcsnap-2016-09-26-10h48m13s937

সব ক্রেডিটের দাবীদার প্রথমত গল্পকার – সৈয়দ গাউসুল আলম শাওন – সলিড এবং মৌলিক একটা গল্পের জন্য যেটা দিয়ে সিনেমাই হয়, নাটক বানানো যায়না। অনম বিশ্বাসের চিত্রনাট্য এতটাই টাইট যে মূল গল্প থেকে মনোযোগ সরে নি বললেই চলে, বাংলাদেশী সিনেমা-নাটকে সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক যেটা আমার কাছে সেটা হচ্ছে “সংলাপ”। সংলাপ এমন একটা জিনিস যেটা বিচার করার জন্য খুব বেশি ভাবতে হয়না। ইনস্ট্যান্ট রিয়েকশান পাওয়া যায়, যেখানে বাংলা সিনেমা আর নাটকে বেশীরভাগ সময়ই গদবাধা আমি-তুমি মার্কা কথাবার্তা বা অভার-দা-টপ ফিল্মি ডায়লগ শুনে অভ্যস্ত সেখানে আয়নাবাজির ৮০ ভাগ জুড়ে সরল জীবনঘনিস্ট ডায়লগ যা একি সাথে হাস্যরস যোগায়, আবার চরিত্রের অবস্থাও আরও ভালোমতো পোক্ত করে। একটা ভালো গল্পও সংলাপের কারণে একঘেয়ে লাগে, সস্তা সংলাপের আড়ালে ভালো অভিনয়ও আড়ালেই থেকে যায়। অমিতাভ রেজার নাটকে সংলাপের ষ্ট্যাণ্ডার্ড যেমন, তার সিনেমাতেও সেটা ভালমতোই বজায় রেখেছেন। দর্শকের সিটি জয়ের জন্য ছ্যাবলামি ধরণের ওয়ান লাইনার না, সুস্থ পরিচ্ছন্ন বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ – যা অভিনেতাদের সুঅভিনয় এবং অভিব্যাক্তিতে হয়ে উঠেছে অসাধারণ। সবসময় দেখা যায় ১০ এ ১০ পাবেন অনম বিশ্বাস এবং আদনান আদীব খান। বাকি ফিল্মমেকারদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই – দেখুন এবং শিখুন।

এবার আসি পরিচালনায়। অমিতাভ রেজার কাছ থেকে এর চেয়ে কম কিছু আশা করিনি সত্যি। তার দৃশ্যপটের ডিটেইলিং বাকিদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক। তবে একেবারেই নির্ভুল ছিল না সবই। flaw টি স্পয়লার রিভিউতে ভালোমতো বলবো এখন ইঙ্গিতে বলি যারা মুভিটা দেখেছেন আশা করি বুঝতে পারবেন – সাংবাদিক পার্থর একটা বিষয় জেনে যাওয়া এবং সেটার পেছনে ধাওয়া করার ব্যাপারটা। “কিভাবে বুঝল?” ছবি দেখে বুঝলেও দৃশ্যটা ঠিকমত ধারণ করা হয়নি, আর বুঝলেও ঠিকানা জানলো কি করে – এই খটকাটা পুরা মুভি জুড়েই থেকে যায়। এখন এমনও হতে পারে সম্পাদনা টেবিলে কাটা পড়েছে। ের বাইরে স্পয়লার হয়ে যাবে বলে বলছিনা, মুভির একটা পর্যায়ে (স্পয়লারে বলবো) পার্থ বেশ কিছুক্ষণের জন্য অনুপস্থিত থাকাটার কারণ পরিষ্কার হয়নি। এগুলা ছাড়া বাকি যা হয়েছে তাতে শুধু প্রশংসাই পাবেন পরিচালক। বাংলা সিনেমায় বেশীরভাগ সময়ই সমাপ্তি জোড়াতালি দিয়ে করা হয়, এখানেই আয়নাবাজির খেল অন্য লেভেলে চলে গেছে, সম্ভবত বাংলাদেশী সিনেমায় সর্বকালের শ্রেষ্ঠ এন্ডিং দেখলাম। এর আগ পর্যন্ত শেষ ভাগে একটু টেনশানেই পড়ে গিয়েছিলাম…এতটা বুদ্ধিদীপ্ততা আর সেটার পরিচালনায় দুর্দান্ত সম্পাদনাতেই বাজিমাত হলাম ভালমতোই। সম্পাদক ইকবাল আহসানুল কবীর সাবাস!

Untitled

সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে নতুন করে বিস্মিত হইনি, সিনেমা নাটকে আজকাল এই ঘরানাটায় কাজ ভালোই হয়। তবে আরও ভালো হতে পারত কিছু কিছু জায়গায়… মূলত গল্পে, সংলাপে আর অভিনয়ে বেশি মনোযোগ দেয়ায় উল্লেখ করার মত কিছু পাইনি। তবে হ্যাঁ, ঢাকা শহরটা চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে, ল্যান্ডস্কেপ, ফটোগ্রাফি শো-অফের বাড়াবাড়ি নেই। পুরান ঢাকার অলিগলির প্রেমে পড়া যায় খুব সহজেই।

শব্দ নিয়ন্ত্রণ, প্রকৌশল বা ডিজাইন – ওয়ান অফ দা বেস্ট যতটুকু আমাদের সিনেমায় এতদিন দেখেছি। বেশ কিছু সময়ে মনে হচ্ছিল হলের সার্বক্ষণিক গুঞ্জন না থাকলে, যদি হেডফোনে শুনতে পেতাম কিছু কিছু দৃশ্য! যেমন নীরব মহল্লায় মোটর বাইকের আওয়াজ, বৃষ্টির মাঝের কিছু দৃশ্যের সাউন্ড মিক্সিং, ভোর বেলায় ঘুঘু পাখীর ডাক, পারিপার্শ্বিক নয়েজে সংলাপের হারিয়ে না যাওয়া, ইত্যাদি কতটা কঠিন কাজ বুঝতে না পারলেও বোধ করতে পারি। সাধারণত বাংলা সিনেমায় ডাবিং এর কারণে খুব মেকি লাগে সংলাপ। এখানে সেই সমস্যা হয়নি। ইন্দ্রদীপ দাস গুপ্তের আবহ সঙ্গীতের ব্যবহারের কথা না বললেই নয় – খুবই ভালো। খুবই টাইমলি খুবই উঁচু পর্যায়ের। বিশেষ করে আয়নার বাজিমাতের দৃশ্যগুলায় হারমোনিয়ামের সেই মিউজিক এত মজার এবং ক্যাচি যে মাথায় লেগে থাকে, বিরক্তি লাগেনা মোটেই।

এটা এমন একটা গল্প যেখানে গানের খুব একটা জায়গা নেই, তবু অর্ণবের “আলু পেয়াজের কাব্য” আর হাবিব–অন্বেষার “ধীরে ধীরে যাও না সময়” গান ২টা শ্রুতিমধুরতার কারণে পছন্দের লিস্টে পড়বে। এছাড়া চিরকুটের “পাপ জমাই” কারাগারের গান হিসেবে উল্লেখযোগ্য। অর্ণবের “আমার শহর” গানটির মনে হয় জায়গা হয়নি।

vlcsnap-2016-09-26-10h47m57s724আয়না

ভাবছেন কখন অভিনয়ে আসবো? – আই ওয়াজ জাস্ট সেভিং দা বেস্ট ফর দা লাস্ট। চঞ্চল চৌধুরী। প্রথম ছবি মনপুরা দিয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পাওয়ার দীর্ঘ বিরতির পর আয়নাবাজি দিয়ে আবার চলচ্চিত্রে ফিরলেন (এর মাঝে কি তার আর কোন মুভি আছে? জানা নেই)। ফেরা তো ফেরা – এইবার শুধু জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারই না, সাকিব-শুভদের হটিয়ে সবধরণের পুরষ্কারই যদি বাগিয়ে নেন অবাক হবোনা একেবারেই। কেননা বাংলা চলচ্চিত্র এত কঠিন একটা ক্যারেক্টার আগে কখনও কেউ করেছে কিনা জানা নেই। আয়নাবাজি প্রোজেক্ট চঞ্চলের মত অভিনেতা ছাড়া সহজেই মুখ থুবড়ে পড়ে যেত যদি না এত রকমের কোন আর্টিস্টের চরিত্র পানির মত সহজ করে তিনি পরিবেশন না করতেন। এই রোল করতে ১৫ কেজি ওজন কমানো, ৩ মাস ভাত না খেয়ে থাকা তো বাদই দিলাম। এখানে একজন নায়কচিত সুদর্শন অভিনেতা না, দরকার ছিল চঞ্চলেরই মত ইন্টেন্স কিন্তু সরল “everyday guy” ইমেজের অভিনেতা। ৬টি চরিত্রে অভিনয়ের সময় সীমারেখা ধরে রাখাটাই সবচেয়ে কঠিন, কারণ অভিব্যাক্তির কিঞ্চিত এদিক সেদিক হলে জিনিসটা হাস্যকর হতে পারে। এখানেই চঞ্চল সফল – বিশেষ করে মুভির দ্বিতীয়ভাগের টুইস্টে “সামনাসামনি” দৃশ্যে তার লাইভ এক চরিত্র থেকে আরেক চরিত্রে পরিবর্তন ছিল মুভির সেরা দৃশ্যগুলার একটা, বেশীরভাগ সময় গম্ভীর হয়ে থাকা আমিও আর পারলাম না হাততালি চেপে রাখতে। that was One Goosebumps Moment! তার মত অভিনেতা যেকোনো পরিচালকের জন্যই যেন উপরি পাওয়া। এমন একটা চেহারা যাকে দেখেই মনে হয় “শালা জাত অভিনেতা!”।

vlcsnap-2016-09-26-00h57m23s558

এমনই একটা অভিনেতার রোল প্লে করেছেন আয়নাবাজির আয়না – যেটা সহজ ভাষায় আসলে একজন কন-আর্টিস্ট। তবে এ মানুষ ঠকানোর মত যেই সেই কন না, আইনি ব্যবস্থার চোখে ধুলো দেয়ার মত স্মার্ট এক তরুণ, যার সাধারণ পরিচয় একজন শিক্ষক এবং জাহাজের রাঁধুনি। কন করতে তাকে প্রায়শই ৩-৪ মাসের জন্য গায়েব হয়ে যেতে হয়, যেমনটা জাহাজের চাকুরেদের জীবনে হয় – সহজ সুন্দর বুদ্ধিদীপ্ত চরিত্রাঙ্কন। নতুন মুখ নাবিলা করেছেন হৃদি চরিত্র – যে চঞ্চলের প্রতিবেশী বাপের হোটেলে থাকে, মেয়ের বিয়ে করে সংসার করার প্রতি কোন আগ্রহ নেই। মুভিতে একটা কিসিং সিন রয়েছে বলে খুব কথা হচ্ছিল জানেন নিশ্চয়ই – আদতে সিনটা সেরকম আলোড়ন করেনি। হয়ত সেন্সরবোর্ডের ভয়েই… তবে আসল কথা হচ্ছে সেটার খুব বেশি প্রয়োজন বোধ করিনি ফিল্মে। আসলে চঞ্চল-হৃদির সম্পর্কটার মাঝে লেখনীর কোন জাদু দেখিনাই। প্লট ডিভাইসই মনে হয়েছে বেশি, হয়ত লেখক মূল আয়নাবাজিতে বেশি মনোযোগ দেয়ায় দুজনের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণের কারণ সেভাবে দেখানোর প্রয়োজন বোধ করেন নি। এটা ফ্ল না ঠিক। তবে ওদের দৃশ্যগুলায় বাকি দৃশ্যের মত থ্রিল অনুভব করিনি। যে কারণে ইমোশানাল এটাচমেন্ট কম ছিল, যতই কাছের কারো ছেড়ে যাওয়া (মৃত্যু)/ আসবে বলেও না আসার মত betrayal ই দেখানো হোক।

মুভির তৃতীয় মূল চরিত্র পার্থ বড়ুয়ার সাংবাদিক চরিত্র। পারথ-চঞ্চলের দৃশ্যগুলা খুবই মনোরঞ্জন যুগিয়েছে, এই অংশটা অনেকটা ব্যাসিক ক্রাইম মুভির “smart detective vs smarter thief” এর মত। তবে clichéd ছিল বেশীরভাগ মুভির মত এখানেও cop/detective/lawyer/journalist রোলটার ব্যাকগ্রাউন্ডে ডিভোর্স/সেপারেশান আনা। কিন্তু এই মাতালগুলাই কিভাবে যেন কঠিন কঠিন কেস সল্ভ করে ফেলে – বুঝিনা। যাই হোক, শেষমেশ পার্থ আর হৃদির ভূমিকা আরও বড় হবে মূল গল্পে ভেবেছিলাম – কিন্তু সেখানেই আয়নাবাজি। 😉

vlcsnap-2016-09-25-23h50m45s984

শুরুর দিকে ছোট চরিত্রে লুতফর রহমান জর্জের দৃশ্যগুলি শেষপর্যন্ত মনে থাকে। আরেকটা জিনিস যেটা ছিল ম্যাসিভ সারপ্রাইজ, বাংলা চলচ্চিত্রের মূল ধারার এক নায়কের বেস্ট এপিয়ারেন্স। মুরাই টাস্কি! ঢালিউডে এমন প্রায়ই হতে শুনেছি যে এরকম ছোট রোলের বদৌলতেও সিনেমার পোস্টারে প্রমোশানের খাতিরে ঐ অভিনেতার ছবি/নাম ব্যবহার করা হয়। সারপ্রাইজটা থেকে ক্রিস্টোফার নোল্যানের interstellar এ Matt Damon এর আবির্ভাব মনে পড়ে যায়। তবে অনেক ছোট… ২ মিনিটও না।

অমিতাভ রেজা প্রতিটা পার্শ্ব চরিত্রে “অভিনেতা” ব্যবহার করেছেন, রাস্তার কাউকে তুলে আনেন নি। বিশেষ করে শেষের দিকে কারাগার গার্ডের ভূমিকা করা অভিনেতার অভিনয় দেখেই বোঝা গেছে মঞ্চের লোক। হৃদির বাবা চরিত্রে কে অভিনয় করেছে জানিনা তবে তার ডাবিং ছিল অভিনেতা তারিক আনামের।

সব মিলিয়ে আয়নাবাজিকে ফিল্মের ঘরানায় ফেলতে চাইলে ফেলবো – “crime, comedy, romance, thriller” এ। এতে একশন বাদে সবই আছে – উপভোগ্য বাণিজ্যিক সিনেমার জন্য পারফেক্ট একটা গল্প যেটার জন্ম কালে ভদ্রে হয় আমাদের এখানে। বাকি সব তো কপি/ অনুপ্রেরণা। সুন্দর করে আমাদের আইনি ব্যবস্থাকে একটা বৃদ্ধাঙ্গুলিও দেখানো হয়েছে। শেষে মনে হয়েছে – আরে! এটার তো সিকোয়েলও হতে পারে। আয়নাবাজি-২। চরিত্র, ক্যারেক্টার সব তৈরি – শুধু গাঁথা বাকি।

গ্রেডিংঃ B (as a movie), A- (as a bangladeshi movie)

happy-birthday-greetings-bubble-21361595

(Visited 1,516 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন