রোমন্থন আয়নাবাজি

অভাব আর প্রাচুর্যের নেশা সাধারণত একজন মানুষকে অপরাধী করে তোলে। কিন্তু একজন অপরাধী সবচাইতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে তখনই যখন তার নিজের কোন কিছু হারাবার থাকে না। সেই পরিস্থিতিতে অপরাধীর না থাকে অভাব না থাকে প্রাচুর্যের নেশা বরং অপরাধটা যেন হয়ে ওঠে অপরাধীর প্যাশন। আয়নাবাজি ঠিক তেমনই একজন অপরাধীর গল্প।
সাধারণ কোন অপরাধী নয় আয়না তাই বলে যে খুব ভয়ঙ্কর তা কিন্তু নয় মোটেও। যদিও সমাজের সবচাইতে ভয়ঙ্কর অপরাধী গুলোর জন্যে আইন নিয়ে ছেলে খেলা করবার পথটুকু আরো খানিকটা মসৃন হয় এই আয়নার কারনেই। শারাফাত করীম আয়না একজন বদলী কয়েদী অন্যের হয়ে জেল খাটেন। শুধু বদলী কয়েদী হয়েই ক্ষান্ত হন না তিনি এ সময় টুকুতে আয়না হয়ে ওঠেন মূল কয়েদীরই প্রতিবিম্ব। মূল কয়েদীর মতো কথা বলেন, হাটেন, চলাফেরা করেন এমনকি ভাবেনও। বাস্তবজীবন তো অবশ্যই এমনকি সেলুলয়েড এর ফিতায়ও এ ধরনের আর কোন চরিত্রে খোঁজ পাওয়া অসম্ভব। তাইতো আয়না অনন্য, তাইতো আয়না একজনই।
.
সব কেস পছন্দ নয় আয়নার যে কেসের আসামীর ক্যারেক্টারে খেলা দেখাবার জায়গা বেশী শুধুমাত্র সেই কেসের প্রতিই আগ্রহ তার। নিজেকে থমকে দিয়ে নিজের মাঝে অন্য আরেকজনকে জীবিত করে তোলেন আয়না। তারপর কাজ হয়ে গেলে নিজের চরিত্রে ফিরে গিয়ে বেমালুম ভুলে যান সব তারপর আবারো ঢুকে পড়েন নতুন কোন চরিত্রে। এ পর্যায়ে এসে সম্ভবত আমরা আয়নার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুটা ধারনা পাই । কোন না কোন করানে নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতে চান আয়না। তাইতো নিজেকে থমকে রাখতে এতো চরিত্র বদল!
নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতে সক্ষম হলেও। কৌতহলী প্রতিবেশী ঋদ্ধির কাছ থেকে পালানো হয় না তার। একটু ভালো থাকবার ইচ্ছে পেয়ে বসে আয়নাকে। আয়না যেন সন্ধান পায় বেঁচে থাকবার খুঁটির। তাইতো নিজেকে আর থমকে না রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সে। জীবনে হঠাৎ চলে আসা ভালো সময়টুকুকে আর হারিয়ে যেতে দিতে চায় না আয়না।
.
কর্মাশিয়াল সিনেমার বিশেষ একটি দিক হলো হিরোইজম। বাস্তব জীবনের যেকোন সংকট থেকে আমরা উত্তরণ লাভ করতে পারি আবার নাও পারি। কিন্তু সিনেমার হিরোদেরকে জীবনের সকল সংকট থেকে উত্তরণ লাভ করতে হয়। হিরো হলো অতিমানবীয় কিছু একটা। তাই জিততে হিরোকে হবেই। সেই সাথে দাম্ভিক সংলাপের মাধ্যমে সে বিজয় জাহিরও করতে হবে।
আয়না চরিত্রেও নির্মাতারা জাগিয়ে তুলেছেন চমৎকার হিরোইজম। “আমি আয়না, একজনই” “আমি শারাফাত করীম আয়না, এই পৃথিবী আমার মঞ্চ, আর আমি, একজন অভিনেতা” এমন দাম্ভিক সংলাপ সেই হিরোইজম এর শোভা বৃদ্ধি করছে সেই সাথে দর্শক মনে হিরো হিসেবে আয়নার গ্রহণযোগ্যতাও এনেছে।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন সংকট দক্ষতার সঙ্গে প্রতিরোধ করেছেন আয়না। সাদামাটা সিনেমার মতো মানুষ কিংবা গাড়ি উড়াবার মতো অযৌক্তিক পন্থায় নয়। বরং দারুণ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। এমনকি নির্মাতারা শেষাংশের জেল পালানোর অংশটুকুকেও যৌক্তিক করার মতো যথেষ্ট উপদান রেখেছেন সিনেমায়। যা নির্মাতাদের মুন্সিয়ানার পরিচায়ক।
.
একটি আসধারন চরিত্র আর অসাধারণ একটি প্লটকে দারুন উত্তেজনার আমেজে দর্শকদেরকে উপহার দিয়েই ক্ষান্ত হননি নির্মাতারা। গল্পের ফাঁকে কখনো কখনো সামজিক অসংগতির চিত্র রেখে ভাবিয়েছেন দর্শককে। কোথাও কোথাও রেখেছেন দর্শন ও মনস্তত্ত্বের ছাপও। আবার কখনো কখনো এক করে দিয়েছেন কল্পনা আর বাস্তবতার জগতকে।
শুরুতেই এই শহর গানের মাধ্যমে প্রিয় শহরের মুগ্ধ চিত্র তুলে ধরে যেমন বাধ্য করছেন প্রিয় শহরকে ভালোবাসতে ঠিক তেমনি শেষাংশে যানজটের চিত্র তুলে এনে দেখিয়েছেন মুদ্রার ভয়ংকর পিঠটুকুও।
সব মিলিয়ে দারুন বিনোদনের পাশাপাশি আয়নাবাজিতে যেন উঠে এসেছে আমাদের দেশের চিত্র, দেশের মানুষের চিত্র, দেশের কিছু ভোগান্তি আর অসংগতির চিত্র। সব সিনেমাই দেশে নির্মান করা হয় কিন্তু প্রত্যেকটা সিনেমা দেশের সিনেমা হয়ে ওঠে না। কিন্তু আয়নাবাজি হয়ে ওঠেছিলো দেশেরই সিনেমা।
.
-আব্বু ক্ষ্যত কথা বলবা না, চুল কাটা আবার কি? আমি কি ছেলে নাকি?
আধুনিকার নামে সমাজের বিকাশমান সংস্কৃতি শিশুর চিন্তা চেতনায় কেমন পরিবর্তন আনছে তার একটি বাস্তবচিত্র আমরা দেখতে পাই এখানে।
-আমি আমার মেয়ের কষ্টের কথা বলবো। আর আপনারা সেটা নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে নিউজ করবেন? ঝামেলা পাকাবেন আমাদের নিয়ে?
সত্যি বলতে এটাই বাস্তবতা। এমনটাই হয়ে আসছে মিডিয়ায় দিনে পর দিন। এর দায়ভার যেমন মিডিয়া সংশ্লিষ্টদের ঠিক সমানভাবে আমাদেরো।
-কি একটা নায়িকার নাকি একটা ফুলক্লিপ বের হয়েছে, ঐটা দেখেনতো কে বের করলো?
এমন সংলাপ একদিকে যেমন বাণিজ্যলোভী মিডিয়ার নগ্নরুপ তুলে আনে ঠিক তেমনি…
-বাদ দিন তোহ, ২৭ তারিখ গিয়ে দেখবেন বেকসুর খালাস হয়ে গেছে।
-এই দেশে টাকা আর পাওয়ার হাতে থাকলে কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না।
একজন সম্পাদকে মুখে এমন আপোষ ভরা সংলাপ আমাদেরকে ভাবায়। কতটুকু সত্য ঘটে? আর তার কতটুকুইবা আমাদের নাগালের মাঝে আসতে দেওয়া হয়…?
-ওই শালা চায় রসের খবর। আর বউ? সেও চায় একজন ভালো জামাই। “আর আমি কি চাই? আমি?”
প্রত্যেকটা বিষন্ন মানুষের হৃদয় নিংড়ানো কথা এটা। খুঁজলে এ সংলাপের তাৎপর্য অনেক গভীর।
– আমার দুধের বাচ্চাটা। ও কি জেল খাটতে পারবে? জেলখানায় কি এসি আছে?
এমন সংলাপ যেমন হাসির খোরাক যোগায় ঠিক তেমনিভাবে জাগায় একধরণের অন্ধকারাচ্ছন্ন অনুভূতি।
আজ ভুক্তভোগী সামর্থ্যহীন অর্থহীন দূর্বল ড্রাইভার বলে। সন্তানহারা মানুষটার জন্যে তাদের সামান্য সমবেদনা কিংবা অনুশোচনা বোধটুকুও নেই। নেই স্বাভাবিক অপরাধ বোধটুকুও বরং তারা নিজেদের অপরাধী পুত্রের সামান্য গরমলাগা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত! একটি সামান্য সংলাপ বলে যায় একসাথে অনেক কিছু। বাড়িয়ে তোলে মনের অস্থিরতা।
এছাড়া লাড্ডু চরিত্রটি থেকে আমরা প্রযুক্তির থাবায় মানুষের শারীরিক ও মানসিক পঙ্গুত্বকে দেখতে পাই যা আমাদের সেই অস্থিরতাকে বাড়িয়ে তোলে আরো অনেকগুনে।
.
– বাবা চোখটা বন্ধ করো। দেখো তোমার শৈশবের সেই শহরের শব্দ তুমি শুনতে পাচ্ছো। সেই স্টিমারের আওয়াজ, বুড়িগঙ্গার শব্দ আর ইলেক্ট্রিসিটি আসলে সব হাওয়া।
এমন দৃশ্য আবার আমাদেরকে মানসিক প্রশান্তির যোগান দেয় । মনকে যান্ত্রিকতা থেকে অবসর খোঁজাতে বাধ্য করে।
-তোমার বাসাটা অদ্ভুত সুন্দর জায়গায়। নদী পার হতে হয়, রিক্সা ঢোকে না।
-অদ্ভুত জায়গা আমার খুব ভালো লাগে। চিন্তা ভাবনা বদলে দেয়। যেমন বান্দরবন। আমি উপরে মেঘ নিচে।
-আর সিলেট?
-যাইনি
-তুমি চা বাগান দেখোনি?
-উহু
-সকালে কখন উঠো?
-তুমি আগে না সূর্য?
-আমি
এমন নান্দনিক কথোপকথন সিনেমায় আলাদা আমেজ সৃষ্টি করে। যা কারুকার্যের মতো সিনেমার শোভা বাড়িয়ে দেয়।
.
সিনেমার প্রতিটা ফ্রেম যেমন গোছানো। তেমনিভাবে গানগুলোও স্থাপন করা হয়েছে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায়। যখনই দর্শক কিছুটা ক্লান্ত হয়েছে চোখের আরাম হিসেবে এসেছে এসব গান।
চিরকুটের “দুনিয়া” গানটি একদিকে যেমন চোখ আর মনের আরাম। তেমনি এর মাঝে লুকিয়ে আছে অফুরান ভাবনার খোরাক।
“আলু পিয়াজের কাব্য” বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য একদমই আলাদা কিছু। গানটির লিরিক ও সুরের নান্দনিকতার মাঝে রয়েছে যে কাউকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা।
“ধীরে ধীরে যাওনা সময়” গানটি কথা ও সূরে সিনেমার পরিস্থিতির সঙ্গে খাপে খাপ এর মতো মিশে গিয়েছিল।
আর এমন উত্তেজনাকর একটি সিনেমার জন্যে ‘লাগ ভেলকি লাগ’ এর মতো ধুন্ধুমার সাউন্ড ট্র্যাকের বিকল্প ছিল না।
.
চঞ্চল চৌধুরীকে এক মুহুর্তের জন্যেও চঞ্চল চৌধুরী মনে হয়নি। চরিত্র এতোটাই ভিন্নধর্মী আর চরিত্রে তিনি এতোটাই নিখুঁত ছিলেন যে প্রতি মুহুর্তে আয়নাকে আয়নাই মনে হয়েছিল। এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল নাবিলা। তাই বলে নাবিলার অভিনয় যে খারাপ হয়েছে তা কিন্তু নয় বরং বলা চলে যথাযথই ছিল। মূলত চিত্রনাট্যেই আয়না আর নাবিলার রসায়ন জমিয়ে তোলা হয়নি। তারচেয়ে একজন সত্যান্বেষী সাংবাদিক পার্থ বড়ুয়া আর বাকপটু-ধুরন্ধর আয়নার ইঁদুর বেড়াল দৌড়ের রসায়ন অনেক বেশী জমজমাট ছিলো। আয়না এবং সাবের আহমেদ এর কথোপকথনে হিউমারের প্রয়োগ ছিল চমৎকার। যে কারনে প্রায় প্রতিটি সংলাপই প্রচণ্ড আনন্দ দিয়েছে। তবে ‘ভ্রোঅঅ’ ‘পোঅ’ শব্দ করে জাহাজ কি বোঝাতে চাওয়া, হাওয়ার হোন্ডা চালানোর অঙ্গভঙ্গি, গলার স্বর বৃদ্ধির ব্যায়াম(ই এ আ ও ইউ), কিংবা হাসপাতালে নিষিদ্ধ বায়ু নিক্ষেপের মতো ছোটাখাটো সংযোজন গুলো বাড়তি প্রশংসার দাবি রাখে।
.
– জনগণ চায় আমি আমি বাইরে থাকি তাহলে ভেতরে যাবে কে?
– পলিটিকাল কেইস। ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট সবাই কেন যে এত্তো বড় করে দেখে?
-আমার বাইরে থাকাটা জাতির জন্য খুবই জরুরী।
শেষাংশে ছিল এ ধরনের স্যাটায়ার ছোঁয়ানো সংলাপও।
উল্লেখ্য পুরো সিনেমা নিখুঁত এবং গোছানো হলেও শেষাংশের কিছু বিভ্রান্তি থেকেই যায়।
প্রশ্ন ওঠে নিজাম সাঈদ চৌধুরী কি আগে থেকেই জানতো আদালতে ওনার ফাঁসির রায় হবে? ওনার (মানে আয়নার) ফাঁসি হয়ে যাওয়া মানে তো বেঁচে থেকেও ওনার দেশে এসে রাজনীতি করার পথই বন্ধ হয়ে যাওয়া। তাহলে ফোনে উনি কেনো বললেন ফাঁসি দিয়ে দাও।
অবশ্য বাজারে গুঞ্জন আছে পরিচালক নাকি নিজাম সাঈদ চৌধুরী নামটিকে যুদ্ধাপরাধী নিজামী, সাঈদী আর সাকা চৌধুরীর রূপক অর্থে ব্যাবহার করেছেন। এমন জল্পনাকে সত্য ধরে নিয়ে দুয়ে দুয়ে চার মিলালে অবশ্য একটা সমাধান পাওয়া যায়। ধরে নেওয়াই যায় পরিচালক সাহেব শেষাংশে হয়তো অন্যকিছু দেখাতে চেয়েছিলেন কিন্তু দেশের প্রেক্ষাপটে বিবেচনায় সেই বক্তব্য কিছুটা ঘুরিয়ে উপস্থাপন করেছেন। বিশেষত…
-সব প্ল্যান মতোই হচ্ছে স্যার।
– ফাঁসি আয়নাদেরই হয়।
– অনেকের চোখে এটা খুন মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এটা আদর্শ রক্ষার লড়াই।
এহেন সংলাপের তাৎপর্য খুঁজলে এই ধারনাকে আরো জোরালো করা যায়।
.
সিনেমায় আয়না যেমন একটাই। ঠিক তেমনি বাংলা চলচ্চিত্রেও আয়নাবাজির মতো একই সাথে রোমাঞ্চকর, উপভোগ্য, মজাদার, মুগ্ধতাপূর্ণ সেই সাথে ভাবনার খোরাক যুক্ত সিনেমাও অনন্য।
কিছুদিন আগেই আয়নাবাজির ১ বছর পূর্ণ হল। সেই উপলক্ষেই কিছুটা রোমন্থন করার প্রচেষ্টা। সাহস, ধৈর্য্য আর শক্তি সঞ্চয় করতে গিয়ে বেশ খাটতে হয়েছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক নয়কি? কেননা বিষয়টা যে আয়নাবাজি। ঐতিহাসিক সেই আয়নাবাজি। বাংলা চলচ্চিত্রে যেই আয়নাবাজির নাম উচ্চারিত হতে থাকবে এমন দ্বিতীয় আর কোন চলচ্চিত্র মুক্তির আগ পর্যন্ত।
নিন্দুকরা অনেক কথাই বলে। কারো কারো মতে আয়নাবাজি নাকি ওভাররেটেড। আবার অনেকে নাকি আয়নাবাজি থেকে পার্থ বড়ুয়ার হোন্ডা নিয়ে ছোটাছুটি ব্যাতীত অন্য কিছুই পায়নি। জানিনা ওনাদের কাছে সিনেমার সংজ্ঞা কি? তবে আমি এতটকু বলতে পারি আমার কাছে আয়নাবাজি অনন্য। আয়নাবাজি একটাই। শোরগোল তো প্রাপ্যই।

(Visited 276 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন