ডুব: Chill নয় Feel এর সিনেমা
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

যখন দুজন আপন মানুষের মাঝে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। তখন তৃতীয় কোন পক্ষের জন্যে তাদের মাঝে অনুপ্রবেশের রাস্তাটা সহজ হয়ে যায়।
আপন মানুষের বুঝতে না পারা কিংবা অবহেলার যন্ত্রণা যেকোন মানুষকে মানসিক ভাবে দূর্বল করে দেয়। তখন তৃতীয় কোন ব্যাক্তির একটু ভালোবাসাময় কথা কিংবা সামান্য কেয়ারিং সহজেই তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
যখন কাছের মানুষের দূরে সরে যাবার আশঙ্কা তৈরি হয়। তখন আপনার উচিত মানুষটিকে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখা। মিছে অভিমান করে তাকে আরো দূরে ঠেলে দেবার মানে হচ্ছে তার দূরে চলে যাবার পথটাকে আরো সুগম করে দেওয়া।
একদিকে উচিতঅনুচিত আর অন্যদিকে একাকী মনের অবুঝ আবদার দুইয়ের টানাপোড়নে একজন মানুষ যদি নিজের মনকে সায় দেয়। তবে মানুষটা কি খুব বেশী অপরাধ করে ফেলবেন? হ্যা মানুষটা যখন দুই কিশোর সন্তানের আদর্শ বাবা তখন এ সিদ্ধান্ত অবশ্যই ভুল। পুরো সিনেমায় এই ভুলেরই করুণ মাশুল দিয়ে গেছেন জাভেদ হাসান।
.
বলছিলাম মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর সিনেমা ডুবের কথা। পুরো সিনেমায় আপনি একই জিনিশ নানা রকম ভাবে পাবেন। সেটি হলো বিষণ্ণতা বিষণ্ণতা বিষণ্ণতা। কখনো বঞ্চিত সন্তানের হাহাকার আপনাকে ছুঁয়ে যাবে। কখনো অনুভব করবেন একজন ব্যার্থ পিতার অসহায়ত্ব। আর প্রত্যেকটি চরিত্রের এত্তো এত্তো বিষন্নতার ভীড়ে হতে পারে একটা সময় আপনি নিজেও বিষণ্ণ হয়ে পড়বেন।
ইরফান যখন বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে গেলো। তখন পাণির গ্লাস হাতে ছুটে আসা তিশার প্রস্থানরত বাবার দিকে চেয়ে সেকি কান্না। সিনেমা ডুব আপনার ভালো বা না লাগুক কিন্তু এমন সিন আপনাকে স্পর্শ করবেই।
পিতা মাতার মধ্যকার কলহ কিশোর সন্তানদের মস্তিষ্কে কতটা প্রভাব ফেলে তার নমুনা পাই আমরা যখন আহির বলে “আমি যদি ওদেরকে বডিং স্কুলে চলে যাওয়ার থ্রেট করি, তাহলে ওরা কি এই ফাইট বন্ধ করবে?”
অপেক্ষা করতে করতে মাথার ওপরের সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে অবশেষে খবর আসে অভিমানী কন্যা পিতার উপহার ফিরিয়ে দিয়েছে, পিতাও অবিচলের মতো সেই উপহার সযত্নে গাড়িতে রেখে দেয়, এমনটা চলে বারবার। পুত্রের সাথে যখন সাক্ষাত হলো। অপরাধবোধে জর্জরিত পিতা পুত্রকে একটু সামনে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করলেন। যাতে পুত্রকে জড়িয়ে ধরা যায়। কি অসহায়ত্ব! আপন পুত্রকে জড়িয়ে ধরার জন্যে পিতাকে অনুমতি চাইতে হয়! বারবার আকুতি প্রকাশ করেও কন্যার সাথে একটিবার কথা বলার স্বাদ পূর্ণ হয় না। একজন অধিকার হারানো ব্যার্থ পিতার করুন পরিণতি আপনার মনে চরম অস্বস্তি আর সমবেদনা জাগিয়ে তুলবে।
যতই ঝড় ঝঞ্জা প্রতিকূলতা আসুক না কেন একটা সময় মানুষ ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায়। ডিভোর্সের পর পরনির্ভরতা ছেড়ে আস্তে আস্তে আত্মনির্ভশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠা মায়া চরিত্রটি যেন সে কথাই জানান দেয়। কাশবনে সাবেরীর মায়ের জন্মদিন উদযাপনের সিকোয়েন্সটা সম্ভবত পুরো সিনেমার একমাত্র আনপ্রেডিক্টেবল সিকোয়েন্স। আর সেখানে তিশার ফোন করে মাকে অনুভূতি জানানোর মুহুর্তটা সিনেমার সবচাইতে দারুন মোমেন্ট। আসলেই একজন নারী যখন স্বয়ংসম্পূর্ণ হন তখন তিনি অসম্ভব রকমের সুন্দর ওঠেন।
পুরো সিনেমাতে বাবার জন্যে দুই সন্তান সাবেরী ও আহিরের মাঝে হাহাকার দেখা গেলেও। মায়া ছিলেন নির্লিপ্ত। কিন্তু পরবর্তীতে স্বামীর মৃত্যুর সংবাদেও যখন মায়া প্রতিক্রিয়া শূন্য থাকেন। তখন আমরা বুঝি অতি আঘাতে পাথর হয়ে যাওয়া হয়তো একেই বলে। এবং পরবর্তীতে মায়ার সেই শক্তিশালী ডায়লগ “যখন শুনলাম তুমি মারা গিয়েছ, খুশি হয়েছি। সত্যিই অনেক খুশি হয়েছি। আজকের পর থেকে তোমার প্রতি আর অন্য কারো কোন অধিকার রইলো না। আমি এখন চোখ বন্ধ করলেই তোমাকে দেখতে পাবো।” আমাদের জানিয়ে দেয় আঘাত কিংবা ক্ষতের পরিমাণ মায়ারই সবচাইতে বেশী।
.
পুরো সিনেমায় ফারুকী বলতে চেয়েছেন অনেককিছুই আবার বলে দেননি কিছুই। চরিত্রগুলোর তুলনায় নীরবতা আর ক্যামেরা বেশী কথা বলেছে। একদিকে ভাঙ্গনের পথে একটি পরিবার অন্যদিকে দেওয়ালে টাঙ্গানো ছবিতে দৃশ্যমান সেই পরিবারেরই ফেলে আসা সুন্দর অতীতের সুখস্মৃতি! নীরবে বুঝিয়ে যায় অনেককিছু। শেষের দিকে সাবেরী যখন বাবার লাশের সঙ্গে শেষবারের মতো একটু সময় কাটাতে এলেন তখন ক্যামেরায় নিতু আর জাভেদের নবাগত পুত্রকে দেখিয়ে পরিচালক বুঝিয়ে দিলেন। শুধু পুরানোরাই নয় ভুগতে হবে এই নিষ্পাপ নবাগতকেও!
সব মিলিয়ে ডুব কি? ডুব ভাঙ্গনের গল্প। ডুব হাহাকারের গল্প। ডুব কোন সিদ্ধান্তে আসেনি। শুধু খারাপ সময়ের গল্প বলে গেছে। মাঝে কিছু প্রশ্ন জাগিয়েছেন দর্শক হৃদয়ে। জীবনে অনেক ট্র্যাজেডি আসে তবুও জীবন থমকে থাকে না ক্ষত আর হাহাকার বয়ে নিয়েই জীবন এগিয়ে চলে। যেমন করে এগিয়ে চলে সমুদ্রের স্রোত।
.
পরিশেষে সিনেমা হিসেবে ডুব কেমন? যারা সিনেমাটা এখনো দেখেননি তারা নিশ্চয় একেকবার একেকজনের বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত শুনে এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের বিভ্রান্ত। কাজেই নতুন করে নিজের নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত আপনাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে অপনাদের বিভ্রান্তির পরিমাণটা না বাড়াই। একটু অন্যভাবে ব্যাখ্যা করি…
ডুব chill এর নয় feel এর মুভি। ফারুকীর অন্যান্য যেকোন মুভি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরনার মুভি ডুব। এখানে তিনি দর্শককে হাসান নাই। বিষণ্ণতা ঘেরা মুভি বলে যে ডুব কাঁদিয়েছে তাও না।
পরিচালক খুব ধীরগতিতে গল্প বলেছেন। অথবা নতুন কোন গল্পই বলেনলি। কারন গল্পটা তো আমাদের সকলেরই জানা।
ডুবে আপনি বড়জোর চরিত্র গুলোর হাহাকার অনুভব করতে পারবেন। সেটাও কঠিন হবে কেননা প্রথমত চরিত্র গুলো আপনার আমার গল্প বলেনা। আর দ্বিতীয়ত গল্পটা সবার জানা হওয়াতে আমাদের মাঝে গল্প বোঝার স্বাভাবিক চেষ্টাটা আসে না। ফলে গল্পের মধ্যে ইনভল্বড হওয়াটা সহজ হয় না।
ধীরগতিতে উপস্থানের মাধ্যমে পরিচালক সম্ভবত আমাদেরকে সিনেমা নিয়ে ভাববার সময় দিয়েছেন। কিন্তু যেই দেশের মানুষ ৫টাকা দরে ১টা পেয়াজ খায়। নিজেরাই বিষন্নতায় আক্রান্ত হয়ে থাকা সেই মানুষগুলোর অন্যের বিষন্নতা নিয়ে ভাববার আগ্রহ কোথায়? কাজেই সিনেমা দেখার ফাঁকেফাঁকে আপনি হল থেকে বের হয়ে কাকে মারবেন? কার কাছ থেকে কিভাবে পাওনা টাকা আদায় করবেন? কাকে বাঁশ দিবেন? এসব রাজ্যের চিন্তা করার কাজটা সেরে ফেলারো সুযোগ পাবেন।
সিরিয়াস ভাবে বললে ডুব খাইয়ে দেওয়া সিনেমা না। আপনাকে খেটে খেতে হবে। আর সেটা করতে অক্ষম হলে আপনি বালিশ নিয়ে হলে যেতে পারেন। কোলাহলময় এই শহরে ফাঁকা হল আর হলের সাউন্ড সিস্টেমের ঠাণ্ডা হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দেড় ঘন্টার আরামের ঘুম ঘুমিয়ে ওঠবার জন্যে মোটেও খারাপ নাহ।
.
দর্শক হিসেবে আমি একান্তই নাবালক। এখনো দেশে বিদেশের বিখ্যাত সিনেমা দেখা হয়নি। সিনেমা নিয়ে দুই লাইন আর্টিকেল পড়া হয়নি। তাই সিনেমার এক অক্ষর ঠিক বুঝলে আরেক অক্ষর ভুল বুঝি, বাকি চার অক্ষর বেশী বুঝি। কাজেই ডুবের মতো আন্তর্জাতিক ভাবে সমাদৃত মুভির ভুল ধরার দুঃসাহস আমার নেই। তবে কিছু আকাঙ্খার প্রকাশ করতেই পারি।
জাভেদ হাসান এবং মায়া প্রেম করে বিয়ে করা দুজন সুখী দম্পতির মাঝে দুরুত্বটা কি কারনে স্পষ্ট করে কিছুই জানানো হয়নি। কিসের টানেই বা নিতুর বাবার বয়সী একজন মানুষের কাছে ছুটে আসা? সাবেরীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যে যুক্তি আমরা পাই সেই যুক্তিতে কেন যেন মন সায় দেয় না। প্রশ্ন গুলোর উত্তর আসলে দেওয়া উচিত ছিলো। এই প্রশ্ন গুলোর উত্তরইতো আমাদের অজানা বাকিটা তো আমরা সবাই জানিই।
.
ডুব আদৌ হুমায়ুন আহমেদের বায়োপিক কিনা? অনেক আলোচিত একটা প্রশ্ন।
আপনি যদি হুমায়ুন আহমেদের ভক্ত হয়ে থাকেন। তবে ডুবকে ওনার বায়োপিক ভাববেন না প্লিজ। হুমায়ুন আহমেদের জীবনে কিছু কিছু ঘটনার সঙ্গে মিলে গেছে এটুকু ভাবাই ভালো। কেননা হুমায়ুন আহমেদের বায়োপিক হওয়া উচিত আরো সামগ্রিক আরো বিশাল ক্যানভাস যুক্ত। ডুবকে হুমায়ুন আহমেদের বায়োপিক বলা যেন হুমায়ুন আহমেদেরই অপমান।
তবে আপনি আপনি যদি হুমায়ুন হেটার হন তবে বলবো যান ডুব দেখে আসুন। যার ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে তামাশা করে নিজেদের ঝাল মিটান। দেখে আসুন ব্যাক্তিগত তিনি কি রকম দুরবস্থা সহ্য করে বেঁচে ছিলেন। অনুভব করুন তার দোটানা। মানুষটার ভুলটাই আপনাদের চোখে পড়েছিলো। সেই ভুলের মাশুল কি হয়েছিলো সেই ভাবনা আপনার মাথায় আসেনি। আর এই ভুলে আপনাদেরই বা কি? বড়জোর একজন শিল্পীর সৃষ্টি নিয়ে আপনি সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু তার ব্যাক্তিগত জীবনকে টানাহেঁচড়া করার অধিকার কি আপনাদের আছে?
.
পরিচালক সাহেবের বক্তব্য নিয়ে দেখলাম প্রচুর সমালোচনা হচ্ছে!
আমারো মনে হয় আপনি যদি সামালোচকদের সামালোচনা সহ্য করতে না পারেন তবে মুখ বড় করে তাদের প্রশংসা করা রিভিউ গুলো আইডিতে শেয়ার দেওয়ার অধিকারও আপনার নেই।
দর্শক হিসেবে সত্যিই হয়তো আমরা পিছিয়ে আছি। আমরা প্রথমবারের মতো আব্বাস কিয়ারোস্তামির নাম শুনে গুগলে সার্চ দিতে দিতে বলি ‘হেতে কন?’..
নুরী বিলগে জিলান ওরা ১জন না ৩ জন আমরা আলাদা করতে পারি না। তাই বলে আমাদেরকে ‘জুম্মান কসাইয়ে’র দর্শক উপাধি দিয়ে অবহেলা করবেন না। দেশের পরিস্থিতি পাল্টেছে। আরেকটা ‘টেলিভিশন’ দিয়েই দেখুন না। সিনেমা হলে ইতিহাস সৃষ্টির দায়িত্বটা আমরাই নিবো।

এই পোস্টটিতে ১১ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. মিঃ বায়োস্কোপ এডমিন, জি-টিভি আর মাছরাঙ্গা টিভি গেলো কই? খেলা দেখমু কেমনে? উত্তর দেন।

  2. KZ Juhi says:

    So review ta best.ojotha homayun biopic ble opoman na kre movie r moja ta neya valo

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন