অগ্নি ২: একটি সুনির্মিত অখাদ্য!!!
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

একটা সিনেমা নির্মানকে যদি মাংশ রান্না করার সাথে তুলনা করা হয়, তবে স্ক্রিপ্ট হলো সিনেমা তৈরির আসল কাঁচামাল অর্থাৎ মাংশ৷
একজন রাধুনী তেল, পেয়াজ, মশলা, আদা-রসুন বাটা, পানি ইত্যাদি উপকরনের সমন্বয়ে মাংশকে কিভাবে এবং কতটা যত্ন নিয়ে রান্না করল তার ওপর নির্ভর করবে ঐ ডিশটা কতটা সুস্বাদু হবে অথবা কতটা অখাদ্য হবে৷
ঠিক তেমনি একটি সিনেমার ক্ষেত্রে ঐ সিনেমার নির্মাতারা অভিনয়, লোকেশন, ক্যামেরার কারুকার্য, গান, পোশাক, কোরিগ্রাফি, আবহ সংগীত প্রভৃতির সমন্বয়ে একটি স্ক্রিপ্টকে সিনেমা হিসেবে পূর্ণতা দান করে, সিনেমাতে উপরের দিক গুলোর সমন্বয়ে নির্মাতারা কতটুকু মুন্সিয়ানার পরিচয় দিল তার ওপর নির্ভর করে সিনেমাটা কতটা সুনির্মিত অথবা কতটা অখাদ্য-কুখাদ্য৷
অগ্নি ২ রান্না করার ক্ষেত্রে নির্মাতারা নির্মানে তেমন কোন ত্রুটি রাখেন নাই ৷ কিন্তু গলদ ছিল কাঁচামালেই! স্ক্রিপ্টেই কোন দম ছিল না!!! মানে মাংশ পঁচা ছিল, ফলে খুব ভালো ভাবে রান্নার পরেও পুরো ডিশটাই খাওয়ার অনুপযোগী হয়েছে! এক্ষেত্রে উপকরন গুলো এক প্রকারের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়! আর নির্মাতাদের পরিশ্রমও একেবারেই বৃথা৷
.
অসাধারন লোকেশন, ভালো ক্যামেরার কাজ, বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সেরা এ্যাকশন থাকার পরেও একটি অখাদ্যের নাম অগ্নি ২!
.
অগ্নিতে মাহির প্রেমীক থাকা অরেফিন শুভ তথা শিশিরকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা৷ বয়ফ্রেন্ড হত্যার প্রতিশোধের মিশনে নামে মাহি৷ একখান চুম্মুর নেশায় মাহির সঙ্গী হয় ওম৷
.
অগ্নির গল্প ছিল কলম্বিয়ানা ছবি থেকে চুরি করা! কিন্তু অগ্নি ২ এর কাহিনী সম্পূর্ন মৌলিক৷ তবে আমার মতে এরকম নড়বড়ে, ভুলেভরা মৌলিক গল্পে সিনেমা তৈরি থেকে কপি গল্পেই সিনেমা তৈরি করা অনেক ভালো! এছাড়া বিনোদনের দিক দিয়েও কপি পেস্ট অগ্নির ধারের কাছেও যেতে পারেনি মৌলিক অগ্নি ২!
.
গল্প বেশ দ্রুত এগিয়েছে একের পর এক খুনের মধ্য দিয়ে তারই ফাঁকে ফাঁকে কিছু কমেডি কিছু রোমান্স, গান আর শেষের দিকে একটা সাধারন টুইস্ট তারপর ক্লাইমেক্স এই নিয়েই আগ্নি ২৷
.
আবারও বলছি ছবির এ্যাকশন ছিল অসাধারন৷ এতো ভালো এ্যাকশন বাংলাদেশী সিনেমায় আগে কখনও হয় নাই! এমনকি কলকাতাতেও হয় নাই!
ছবির লোকেশনও ছিল অন্তর্জাতিক মানের৷ কিছু লোকেশন দেখে মনে হচ্ছিল হলিউড/বলিউডের কোন সিনেমা দেখছি৷
এছাড়া ছবির ক্যামেরার কাজ, এডিটিং, কালার, সাউন্ড, প্রিন্ট ইত্যাদি প্রশংসার দাবীদার৷
.
ছবির কমেডি গুলো ছিল মোটামুটি৷ তবে অগ্নির কমেডির তুলনায় হাজার গুন বাজে ও সস্তা৷ বেশীরভাগ জায়গাতেই জোর করে হাসানোর চেষ্টা করা হয়েছে! এছাড়া শুরুর দিকের কিছু কমেডি একটু বেশীই এডাল্ট হয়ে যাচ্ছিল! যা অনেকের বিরক্তির কারন হতে পারে!
এছাড়া ওম-মাহীর রোমান্সও অগ্নির মাহী-শুভর মতো জমেনি!
.
এবার আসি অভিনয়ে৷
মাহীর লুক, অভিনয়, গ্ল্যামার ইত্যাদি ছিল চোখে পড়ার মতো৷ তবে বরাবরের মতো মাহী সংলাপ বলায় দুর্বলতা প্রকট ভাবে চোখে পড়েছে কিছু কিছু জায়গায়! আমার মতে মাহীর সংলাপ গুলো অন্য কাউকে দিয়ে ডাবিং করালে ভালো হতো!
.
ওম ডান্সে যতটা ভালো অভিনয়ে ততটা না৷ কোন রকমে চালিয়ে নেওয়ার মতো অভিনয় করেছে ওম! বলতে গেলে ওমের অভিনয়, সংলাপ বলা, কন্ঠস্বর অনেকটাই আমাদের দেশের বাপ্পী, সায়মন ও জায়েদ খানদের মতো নড়বড়ে! তাই ওমের জায়গায় এদের চান্স দেওয়াই যেতো!
.
ছবিতে ঢালিউডের নতুন প্রজন্মের ভিলেন রবিউল ইসলামকে খুব কম সময়ের জন্য দেখা গেছে! অভিনয়ের কোন সুযোগই পাননি তিনি! সুযোগ পেলে নির্ঘাত ফাঁটিয়ে দিতেন!
ওমের পাতানো ভাই এর চরিত্রে কলকাতার বানিজ্যিক সিনেমার জনপ্রিয় কমেডিয়ান খরাজ মুখার্জির কমেডি ছিল কোনরকমে জোর করে হাঁসানোর মতো৷ অগ্নিতে কাবীলার কমেডির ধারের কাছেও যেতে পারে নাই ওনার কমেডি৷
এছাড়া ইন্টারপোল অফিসারের চরিত্রে অমিত হাসানের লুক ছিল চমৎকার৷ তবে অভিনয় ছিল সাধারন মানের!
প্রধান ভিলেন পাইথনের চরিত্রে আশীষ বিদ্যার্থীর অভিনয়ে বিশেষ কিছু ছিল না!
এছাড়া সুপ্রিয় দত্তের চরিত্রটি ছিল পুরোই বিরক্তিকর এবং প্রভাবহীন! ওনার তামিল উচ্চারনে বলা বাংলা সংলাপ গুলোর কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না!
এছাড়া কলকাতার নাম না জানা একজন ভিলেন এবং আরও তিনজন বিদেশী ভিলেন ছিল ছবিতে৷ এদের মধ্যে নারী চরিত্রটি ছাড়া অন্যদের তেমন কোন প্রভাবই ছিল না ছবিতে৷ দেখে মনে হচ্ছিল শুধুমাত্র মাহীর হাতে খুন হবার জন্যই যেন ছবিতে রাখা হয়ে হয়েছে এদেরকে৷
.
ভুল ধরতে চাইলে এ ছবি থেকে অনেক ভুল ও ফাঁক-ফোকর খুজে বের করা সম্ভব৷ তবে কয়েকটা ভুল একটু বেশীই দৃষ্টিকটু ছিল৷
যেমন: বালিতে মোবাইল চার্জ করা৷ এই উদ্ভট কান্ড দেখে পুরো সিনেমা হল অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল৷
এছাড়া অরেকটি সিন ছিল যেটায় কমেডিয়ান খরাজ মুখার্জি ঘটনাক্রমে তার বউকে চ্যালেঞ্জ করে, যে উনি ওনার bar ভর্তি কাস্টমার এনে দেখাবে৷ কিন্তু পরে এ নিয়ে পর্দায় আর কিছুই দেখায় নাই!!! অন্তত এই ভুলটা নির্মাতাদের চোখে পড়া উচিত ছিল৷
.
ছবির গান গুলো নিয়ে নতুন করো কিছুই বলার নেই৷ এটা যেমন সত্যি কলকাতার বানিজ্যিক সিনেমার গানের প্যাটার্নের এই গান গুলোতে তেমন কোন শিল্প নেই৷ ঠিক তেমনি এটাও সত্য এধরনের গান গুলোই বেশ কয়েক বছর ধরে এদেশে সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় হয়ে আসছে! গান গুলোর চিত্রায়ন, লোকেশন, কোরিওগ্রাফি অবশ্যই ভালো ছিল৷ এরমধ্যে ‘এক খান চম্মু গানের কোরিগ্রাফি ও ওমের ডান্স আলাদা করে প্রশংসার দাবীদার৷
.
সব মিলিয়ে আপনি অগ্নি ২ দেখতে পারেন৷ শুধুমাত্র কিছু সময় বিনোদন পাবার জন্য৷ তবে ভালো কিছুর প্রত্যাশা নিয়ে দেখতে গেলে আমার মতো আপনিও হতাশ হবেন৷

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন