ঢাকা এটাক একটি সুনির্মিত, স্টাইলিশ বানিজ্যিক ছবি
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

মুভি রিভিউঃ ঢাকা এটাক / Dhaka Attack Movie Review

– রমিজ, ০৭-১০-১৭

নানা কারনেই ঢাকা এটাক অত্যন্ত স্পেশাল একটি ছবি। গত কয়েক মাস ধরে ছবিটি নিয়ে দর্শকদের যে আগ্রহ্‌ দেখেছি তা সত্যিই মুগ্ধকর ছিলো। এরপর ছবিটি মুক্তি পেলে হল গুলোতে দর্শক উপচে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সিনেমা প্রেমীরা ছবিটির ব্যাপক প্রশংসা করছেন। বাংলাদেশের কোন ছবি নিয়ে এ ধরনের আগ্রহ্‌, উদ্দীপনা আমরা সব সময় দেখি না। সূতারং বলাই বাহুল্য যে ঢাকা এটাক একটি বিশেষ ছবি। আর এই বিশেষ ছবির রিভিউটিও তাই আমি একটু বিশেষ ভাবে করছি। সব সময় যেভাবে রিভিউ করি অর্থাৎ ছবির গল্প, তারকাদের পারফর্মেন্স, টেকনিক্যাল দিক এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করি এই রিভিউটি সেক্ষেত্রে একটু ভিন্ন ভাবে করছি।
প্রথমে আমি ছবির ভাল দিক গুলো নিয়ে বলবো। অর্থাৎ কেন ছবিটি এতো স্পেশাল সে বিষয় নিয়ে বলবো এবং শেষে ছবিটির একমাত্র দুর্বলতা কি ছিলো সে বিষয়ে বলবো।

এই রিভিউটি ভিডিও তে দেখতে চাইলে নিচের লিঙ্কে গিয়ে দেখতে পারেন —

ঢাকা এটাকের সবচেয়ে ভাল দিক হচ্ছে এর মেকিং স্টাইল। এ ছবির হিরো হচ্ছেন নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন। তিনি মুক্তির আগে দর্শকদের বলেছিলেন তিনি ছবিটা বানিয়েছেন যতটা সম্ভব রিয়েলিষ্টিক ভাবে। একই সঙ্গে ছবিতে সিনেমাটিক বিষয়ও থাকছে তবে তা যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য ভাবেই। আরো ভেঙ্গে বললে আমরা আমাদের দেশের বানিজ্যিক ছবির দিকে তাকালে যেটি দেখি- খুবই অবিশ্বাস্য সব ঘটনা আর সে সব ঘটনার হাস্যকর রকম উপস্থাপন। কিন্তু দীপঙ্কর দীপন একটি বানিজ্যিক ছবি বানাতে চেয়েছেন যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য ভাবে। আর এখানে তিনি শতভাগ সফল। ঠিক যেভাবে তিনি মুক্তির আগে ছবিটির ব্যাপারে বলেছেন পর্দায় ঠিক সেরকমটিই দেখা গেছে। আমরা জানি বাংলাদেশের ছবির বাজেট খুবই কম, টেকনিক্যাল সাপোর্ট একেবারে নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে সিনেমা বানাতে গেলে হাজারো সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে একটা ছবিকে খুব গুছিয়ে বানানো আসলে সবার দ্বারা সম্ভব হয় না। দীপঙ্কর দীপন নির্মাতা হিসেবে যে অন্য সবার থেকে আলাদা তা বুঝা যায় ঢাকা এটাক নামের বেশ গোছানো, স্টাইলিশ এই ছবিটি দেখে। ছবিটিকে বানাতে তিনি বেশ সময় নিয়েছেন কিন্তু কম্প্রোমাইজ করেন নি এতোটুকু। ছবির প্রতিটা দৃশ্য বিশ্বাসযোগ্য ভাবে উপস্থাপন করার জন্য যা যা দরকার তাই করেছেন। একটা জমজমাট বানিজ্যিক ছবি অত্যন্ত কনভিন্সিং ভাবে বানাতে যা যা আয়োজনের দরকার তার সবটুকুই দীপঙ্কর দীপন ঢাকা এটাক ছবির জন্য করেছেন। লোকেশন, সিনেমাটোগ্রাফী, এডিটিং, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, কস্টিউম থেকে শুরু করে অসম্ভব সুন্দর কাস্টিং ; কি নেই এ ছবিতে। ছবিটি দেখে মনে হবে অত্যন্ত দক্ষ হাতে বানানো একটি ছবি। সূতারং নির্মাতা হিসেবে দীপঙ্কর দীপন প্রথম ছবিতেই আমার চোখে একজন স্টার হয়ে গেছেন। বাংলাদেশে এরকম স্টার নির্মাতার এই মূহুর্তে খুব বেশী দরকার।

Dhaka Attack Movie Review
ছবির কাস্টিং অসম্ভব সুন্দর। আরেফিন শুভ আর মাহিয়া মাহি ছবির নায়ক-নায়িকা। নিঃসন্দেহে তারা দুজনেই স্টার। একসাথে তাদের জুটিটা ভালোও লাগে। তবে সত্যিকথা বলতে ঢাকা এটাকে শুধু নায়ক-নায়িকাই সব কিছু না। ছবিতে ছোট বড় বেশ কিছু চরিত্র আছে এবং সে সব চরিত্র নায়ক-নায়িকার চরিত্রের চেয়ে কোন অংশে কম গুরুপ্তপূর্ন না। এ বি এম সুমন আছেন একটি গুরুপ্তপূর্ন চরিত্রে এবং আরেফিন শুভর চেয়ে সে কোন অংশেই কম না। দেখতে যেমন স্মার্ট অভিনয়েও তেমনি পারফেক্ট। শতাব্দী ওয়াদুদ আছেন এবং তিনি বরাবরের মতোই সাবলীল। শিপন মিত্র আছেন একটা চরিত্রে এবং সত্যি কথা বলতে এ বি এম সুমন কিংবা শিপন মিত্রকে এই প্রথম আমি কোন ছবিতে দেখলাম। সত্যিই এরা প্রত্যেকে সূযোগ পেলে দারুন পারফর্মেন্স দেখাতে সক্ষম। সাঞ্জু জন আছেন একটা আইটেম সং এ এবং নাচে সে বলিউডের তারকাদের টেক্কা দিতে সক্ষম। এমনকি অতিথি চরিত্রে আফজাল হোসেন এবং আলমগিরের মতো সিনিয়র অভিনেতারা আছেন। আর আছেন ভিলেইন রুপী তাসকিন। একজন সাইকো খুনী চরিত্রে তাসকিন দেখতে যেমন ভয়ানক অভিনয়ে তেমনি উপভোগ্য। সবমিলিয়ে আমার দেখা গত কয়েক বছরের সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর কাস্ট।

ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দারুন। গানগুলোও পর্দায় বেশ লেগেছে। ডায়লগ খুবই বাস্তব সম্মত, একশন জীবন্ত। অনেকে ভি এফ এক্স নিয়ে কথা বলছেন কিন্তু সত্যিকারার্থে আমার কাছে ভি এফ এক্স খারাপ লাগেনি একেবারেই। আমাদের দেশের ছবিতে এর চেয়ে ভাল ভি এফ এক্স আশা করাও বোকামী। ভি এফ এক্স ছবিকে সামান্য অসুন্দর করেনি।
আমি আবারো বলছি মেকিং এর দিক থেকে এ ছবি মোটামুটি নিঁখুত বলা যায়।

তাহলে কি সবই ভাল ঢাকা এটাকে ? 
না। ছবির একমাত্র দুর্বলতা এর খুবই সিম্পল গল্প এবং চিত্রনাট্য। ছবিটি বাংলাদেশের প্রথম পুলিশ একশন থ্রীলার। পুলিশের বিভিন্ন সাহসী অভিযান, তাদের দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, ব্যাক্তি জীবনের স্যাক্রিফাইস; এই বিষয় গুলো নিয়েই পুরো ছবি। সাবসেক্টে সাইকো খুনী চরিত্রটি অর্থাৎ ভিলেইনের অন্তর্ভূক্তিটা একটা ইন্টারেষ্টিং বিষয়। তবে সবমিলিয়ে ছবির গল্প আদৌ কি ইন্টারেষ্টিং ছিলো ? আমার কাছে তো এই গল্প অতি সাদামাটা মনে হয়েছে। ছবিতে থ্রিল তৈরির জন্য এতো সহজ গল্প একেবারেই যথেষ্ট না। তারপরও এই গল্পের চিত্রনাট্যটিও যদি একটু ইন্টারেষ্টিং হতো তো গল্পটা উপভোগ করা যেত। কিন্তু অতি সাদামাটা চিত্রনাট্য। আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে যে সব সুনির্মিত বানিজ্যিক ছবি আমরা দেখেছি যেমন ছুঁয়ে দিলে মন, আয়নাবাজি কিংবা আজকের এই ঢাকা এটাক ; সব গুলো ছবিরই গল্প এবং চিত্রনাট্য ছবির দুর্বল পয়েন্ট। খুব সুন্দর করে বানানো ছবি কিন্তু ছবির গল্পে কোন প্রান নেই, চিত্রনাট্যে মজা নেই। আয়নাবাজি অবশ্যই এ ক্ষেত্রে মাচ বেটার। তারপরও ঠিক যেন এই দিকটা জমছে না। এসব ছবির নির্মাতারা যে অত্যন্ত মেধাবী তা তাদের মেকিং স্টাইল দেখলেই বুঝা যায় … কিন্তু কেউই খুব অসাধারন কোন গল্প বা চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করছেন না … সবাই বেছে নিচ্ছেন অতি সহজ গল্প এবং চিত্রনাট্য …সম্ভবত তাদের ধারনা আমাদের দেশের দর্শক খুব সহজ গল্প বা চিত্রনাট্য না হলে ছবি বুঝবেন না … আমি জানি না এই ধারনার পিছনে যুক্তি কতটুকু … আমার কাছে এটা খুব অযৌক্তিক ধারনা মনে হয় …
ঢাকা এটাক একটা দুর্দান্ত কিংবা এক কথায় অসাধারন একটা একশন থ্রীলার হতে পারতো যদি এর গল্প ও চিত্রনাট্য অসাধারণ হতো। কিছু দুর্দান্ত টুইষ্ট এন্ড টার্ন, কিছু সিনেম্যাটিক থ্রীল গল্পে থাকলে ঢাকা এটাক নামের থ্রীলারটা দারুন জমজমাট হতে পারতো। কিন্তু সেই বিষয়টা মিসিং ছিলো। তবে তার মানে এই না যে ছবিটা সামান্য বোরিং কোন দিক থেকে। ছবির দৃশ্যগুলো এতো সুন্দর ভাবে বানানো যে প্রত্যেকটা দৃশ্য দর্শক আগ্রহ্‌ ধরে রাখতে সক্ষম। অর্থাৎ আগেই বলেছি ছবির মেকিং স্টাইল এক দম ফার্ষ্ট ক্লাস।

সবমিলিয়ে, ঢাকা এটাক খুবই সুনির্মিত একটি ছবি। যারা বাংলা সিনেমার নামে নাক সিটান কিংবা হাসাহাসি করেন তাদের মুখে এক ধরনের চপেটাঘাত হচ্ছে এই ছবি। ছবিটি অত্যন্ত বাস্তব সম্মত ভাবে, অত্যন্ত সুন্দর ভাবে বানিয়েছেন ছবির নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন। হ্যা, অবশ্যই ছবির গল্প এবং চিত্রনাট্য একটু বেশীই সাদামাটা; তবে মেকিং এর দিক থেকে এ ছবি প্রায় নিঁখুত। যারা ভিন্ন ধারার, সুনির্মিত ছবিকে সমর্থন করছেন তাদের এ ছবি ডেফিনেটলি দেখা উচিত। এ ধরনের ভিন্ন ধারার, সুনির্মিত ছবিগুলো ব্যাবসায়িক ভাবে সফল হলেই আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
আমি ছবিটিকে দিচ্ছে ৩.৫* অর্থাৎ ৭০% মার্ক্স বা এ গ্রেড।

 

বায়োস্কোপ ব্লগে আমার আরো কিছু রিভিউ এর লিঙ্ক নিচে দেয়া হলো —

মুভি রিভিউঃ ভয়ঙ্কর সুন্দর

রাজনীতি জমজমাট গল্পের বানিজ্যিক ছবি

Bangla Movie Review|নূরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার

”ধ্যাততেরিকি” রোমান্স ও কমেডির মিশেলে বিনোদনে ভরপুর বানিজ্যিক ছবি

http://bioscopeblog.net/ramizraza/60069

এই পোস্টটিতে ৫ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. বায়াস্কোপে ছবিটি দেখতে চাই ✌

  2. a b m sumon jodi main protagonist thacto bhallagto. arefin shuvo fowl

  3. Still Kazi Maruf will claim his superiority and insult Arefin Shuvo in a C graded talk show 😂😂

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন