Bangla Movie Review|নূরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

নূরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার একটি ভিন্ন স্বাদের বাংলাদেশী মুভি

রমিজ – ০৪-০৫-১৭

নূরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার ছবির নামটা যেমন গতানুগতিক বাংলা ছবি থেকে ব্যাতিক্রম তেমনি এর কনসেপ্টটিও বেশ ব্যাতিক্রম।

নূরু মিয়া একজন ঢাকা শহরের ভিক্ষুক। তার পা দুটো কোন এক কারনে অবশ হয়ে যাওয়ায় সে পঙ্গুদের জন্য তৈরী বিশেষ ঠেলা গাড়িতে করে ভিক্ষা করে। তার অল্প বয়সী সুন্দরী স্ত্রী বিউটি তার ঠেলার ড্রাইভার। নূরু মিয়া অন্য দশ জন ভিক্ষুক থেকে সম্পূর্ন আলাদা। সে একজন সৌখিন ভিক্ষুক। ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করতেই তার সূখ। বিউটিও তার স্বামীর ড্রাইভারী করে, ঘর-কন্যা করে; দিন রাত হেসে-খেলে কাটায়। আপাত দৃষ্টিতে সুখী এই দম্পতির জীবনে আরো নানা চরিত্র আসে; কখনো বর্তমানের কোন চরিত্র তাদের জীবনকে বিষিয়ে তোলে, আবার কখনো তাদের অতীত তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়…

নূরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার

 

নুরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার ছাড়াও এ ছবিতে আরো বেশ কিছু গুরুপ্তপূর্ন চরিত্র আছে।

প্রথমে আমরা যদি নূরু মিয়ার চরিত্র বিশ্লেষন করি তাহলে দেখি- নূরু মিয়া অদ্ভূত এক চরিত্র। মধ্যবিত্ত সমাজের দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে সে স্বভাবে কিছুটা নিচ প্রকৃতির। ছোটবেলা থেকেই তার ঘুরে বেড়াতে আর ভিক্ষা বৃত্তি করতে ভাল লাগে। তার ভাষায় আল্লাহ্‌ তাকে অলস বানিয়েছেন সেটা কি তার দোষ !

অন্যদিকে তার চরিত্রে আরো যে বিষয় গুলো আছে যেমন অতীতে অর্থাৎ পঙ্গু হওয়ার আগে সে নানা জায়গায় ঘুরতো আর বিয়ে করতো। এভাবে কতটা বিয়ে সে করেছে তার নিজেরও হিসেব নেই। তাছাড়া স্ত্রী বিউটিকে সে কথায় কথায় ধমক দেয়, চড়-থাপ্পড়-লাথি দেয়; যা আমরা সমাজের নিচু তলার মানুষদের মধ্যে অহরহ দেখি।

তবে সরল দৃষ্টিতে দেখলে নূরু মিয়ার এ সব কান্ড কির্তীই নিতান্ত সারল্যে ভরা। বিউটির দিকে কেউ ভোগের দৃষ্টিতে তাকালে বা তাকে কেউ স্পর্ষ করলে সে যেমন তেড়ে আসে কিংবা রাগে জ্বলতে থাকে; অথবা সে যখন তার প্রতারক বন্ধুর বাড়ির সামনে গিয়ে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে … যে বন্ধু তার কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নিয়ে বলেছিলো যে বাড়ির অর্ধেক তার নামে লিখে দিবে ; তখন নূরু মিয়ার সারল্যই শুধু চোখে পড়ে …

অন্যদিকে বিউটি আরো বেশী সরল … তার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী পঙ্গু স্বামীকে নিয়েই সে দিব্যি সুখে ঘর কন্যা করে … নূরু মিয়া তাকে পতিতা পল্লী থেকে এনে বিয়ে করেছে; তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে … এই কৃতজ্ঞতা বোধ তার মধ্যে প্রবল …

জন্ম থেকেই ভাসমান বিউটি যে স্বামীর ঘর করছে এই আনন্দেই তার মুখ জ্বল জ্বল করে সব সময় …

নুরু মিয়া ও বিউটিকে নিয়ে প্রামান্য উপন্যাস লিখে এক তরুন লেখক। চরিত্র কে কাছ থেকে দেখার জন্য সে বস্তিতে বসবাস করে।

নুরু মিয়ার মতই আরেক বয়স্ক ভিক্ষুক – বিউটি যাকে চাচা মিয়া বলে ডাকে- সে নূরু মিয়া আর বিউটির সূখ সহ্য করতে পারে না … যে কোন মূল্যে বিউটিকে সে নিজের কাছে নিয়ে আসতে চায় … এ জন্য সে বস্তির মাস্তান নেতাকে টাকা-পয়সা দিতে থাকে …

 

ছবির আরেকটা গুরুপ্তপূর্ন চরিত্র হচ্ছে লালু মিয়া … গ্রামের সহজ সরল  যুবক লালু মিয়া গ্রামে ভ্যান চালায়।  কালো বলে সে প্রেমিকার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয় … তার জীবনে তার মা ই সব … ২৭ বছরের লালু মিয়া মায়ের পিড়াপিড়িতে তার বাবাকে খুজতে ঢাকা আসে … যে বাবা তার জন্মের পর পরই বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলো …

রিভিউটি ভিডিওতে দেখুন নিচের লিঙ্কে —

এ রকম সব সরল চরিত্র নিয়েই নূরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার ছবিটি চলতে থাকে …

ছবির কন্সেপ্ট বেশ ভাল … বিশেষ করে ছবিটি দেখে মনে হবে যেন আমরা বাংলাদেশের ছবি দেখছি … বাংলাদেশের চরিত্র, বাংলাদেশের ঘটনা; সাথে সিনেম্যাটিক আবহ্‌ …

তবে সমস্যা হচ্ছে ছবিটি অত্যন্ত কম বাজেটে বানানো হয়েছে বলে ছবির প্রডাকশন ভ্যালু বেশ লো ছিলো …

সিনেমাটোগ্রাফী, এডিটিং, আর্ট ডিরেকশন কোনটাই খুব রিচ ছিলো না। তবে টেকনোলজ্যিক্যাল লিমিটেশন নিয়েও এসব কাজে যত্নের ছাপ ছিলো।

নির্মাতা মিজানূর রহমান লাবু ব্যাতিক্রম কাজ করতে চেয়েছেন। এমন স্বল্প বাজেট নিয়েও তিনি যে চেষ্টা করেছেন ভিন্ন স্বাদের সম্পূর্ন দেশী ছবি বানানোর তার সে চেষ্টা ছবির ওপেনিং ক্রেডিটস্‌ থেকে শুরু করে শেষ দৃশ্যটি পর্যন্ত ছিলো …

এর জন্য নির্মাতাকে সাধুবাদ জানাতেই হয় …

ছবির ডায়লগ চলনসই ছিলো। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ভাল ছিলো না। তবে গান গুলো মোটামুটি । আইটেম গানটা খুবই অপ্রয়োজনীয় ও নিম্ন মানের ছিলো …

 

অভিনয়ে ফজলুর রহমান বাবু বরাবরের মতই ভাল। তবে তার অজ্ঞাতনামা পারফর্মেন্স এর রেশ এখনো মাথায়- তাই ঐ লেভেলের আরেকটা পারফর্মেন্স না দেখা পর্যন্ত সেই রেশ মাথা থেকে যাবে না।

বিউটি চরিত্রে ক্যামেলিয়া রাঙ্গা মোটামুটি ভাল করেছেন।

তবে ছবির কিছু কিছু কাস্টিং ভাল হয়নি … যেমন রওনক হাসানের যায়গায় ঐ চরিত্রে কোন সুদর্শন বা জনপ্রিয় কেউ থাকলে চরিত্রটা খুব উপভোগ্য হতে পারতো … একজন অল্প বয়স্ক লেখক লিখতে গিয়ে বস্তিতে বসবাস শুরু করে, ধনীর কন্যা তার সাথে প্রেম করে, তাকে টাকা পয়সা দেয় ; এমন এক চরিত্রে ডিসেন্ট চেহারার কেউ থাকলে চরিত্রটা উপভোগ্য হতো … কিন্তু রওনক হাসান অভিনয় ভাল করলেও তার লুক এই চরিত্রের সাথে যায় না … তেমনি তার গার্ল ফ্রেন্ড চরিত্রেও অল্প বয়সী সুন্দরী কেউ থাকলে ভাল হতো … অভিনেতাদের লুক দিয়ে জাজ করা ঠিক না সেটা যেমন সত্য একই সঙ্গে এও সত্য যে কিছু কিছু চরিত্রে সুন্দর চেহারার ছেলে-মেয়েকেই দেখতে ভাল লাগে … এই দুটো চরিত্র যতটা উপভোগ্য হওয়ার কথা; শুধু মাত্র মিস কাষ্টিং এর কারনে তার সিকি ভাগও হতে পারে নি …

তবে লালু মিয়া চরিত্রের অভিনেতা বেশ ভাল করেছে … তার সরলতা তার চোখে, মুখে, হাটা-চলায় সবকিছুতেই পাওয়া গেছে …

সবমিলিয়ে, নূরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভারের কন্সেপ্ট বেশ ভাল। নির্মাতা স্পষ্টতই চেষ্টা করেছেন দর্শকদের ব্যাতিক্রম কিছু দেয়ার। তার সে চেষ্টা চোখে পড়েছে। অন্য দশটা বাংলা ছবি থেকে কাজটা বেশ গোছানো ও উপভোগ্য কাজ হয়েছে …

শুধুমাত্র বাজেট স্বল্পতার কারনে ছবির প্রডাকশন ভ্যালু অনেক লো ছিলো। আর কাস্টিং – এ কিছু প্রবলেম ছিলো। তারপরও ব্যাতিক্রম কন্সেপ্ট এর কারনে  আমি ছবিটিকে অবশ্যই ভালো ছবির লিষ্টেই রাখবো …

নির্মাতা যে সম্পূর্ন দেশী স্টাইলে ভিন্ন স্বাদের বিনোদন মূলক ছবি উপহার দিয়েছেন তার জন্য নির্মাতাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি …

ছবিটিকে আমি দিচ্ছি ৩* অর্থাৎ ৬০% মার্কস্‌ বা A-  গ্রেড …


মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন