মেয়েটি এখন কোথায় যাবে একটি সুন্দর গল্প ও অভিনয় সমৃদ্ধ ছবি
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

মুভি রিভিউঃ মেয়েটি এখন কোথায় যাবে

  • রমিজ, ১২-০৩-১৭

জাজ মাল্টিমিডিয়ার নতুন ছবি মেয়েটি এখন কোথায় যাবে এর গল্প ইমদাদুল হক মিলনের একই নামের উপন্যাস থেকে নেয়া। ছবিটির চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন অভিনেতা নাদের চৌধুরী। ছবিতে অভিনয় করেছেন ফাল্গুনী রহমান জলি, ফজলুর রহমান বাবু, রাইসূল ইসলাম আসাদ, মামুনূর রশিদ, শাহ্‌ রিয়াজ সহ আরো অনেকে।

 

গল্প ও চিত্রনাট্য 

ইমদাদুল হক মিলন বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় লেখক। তার গল্প সহজ ও সাদামাটা ধরনের হলেও এর ভিতরে এক ধরনের আবেগ থাকে। সাথে তিনি একটা সামাজিক ম্যাসেজও দেয়ার চেষ্টা করেন। তার গল্পে আরেকটি বিষয় ভাল লাগে সেটি হচ্ছে যে; তার নারী চরিত্র গুলো অনেক বেশী গুরুপ্তপূর্ন থাকে। এমনিতেই বাংলা সাহিত্যে নারী চরিত্র গুলোর গুরুপ্ত সব সময়ই বেশী থাকে। এ ছবির গল্পও  একটি নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করে।

কৃষ্ণকলি গ্রামের মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারের মেয়ে। ভিন্ন গ্রামের প্রভাবশালী মুসলিম পরিবারের বখাটে ছেলে রাজা তার প্রেমে পড়ে। কৃষ্ণকলি রাজার প্রেম প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে এক মধ্য রাত্রে রাজা তাকে অপহরন করে নিয়ে যায়। কৃষ্ণকলি রাজার বাড়িতে আটকা পড়ে যখন ছটফট করছে তখন তার বাবা ”মেয়েটি ভেগে গেছে” এই ভূল ধারনা নিয়ে নিজের ভিতরে লজ্জায় ও দুঃখে সঙ্কুচিত হয়ে আছে।

গল্পটা বেশ ভাল হলেও নাদের চৌধুরীর চিত্রনাট্য আহামরি ভাল হয়নি। চিত্রনাট্যে যে সমস্যাটি সেটি হচ্ছে এর দৃশ্যগুলো অনেক বেশী দীর্ঘ্য এবং অনেক অপ্রয়োজনীয় কিংবা রিপিটিভ কথাবার্তা প্রতিটা দৃশ্যে ছিলো যা কিছুটা হলেও বিরক্তির উদ্বেগ ঘটায়। সম্ভবত বাংলা ছবির আড়াই ঘন্টা বা দুই ঘন্টার কিছু বেশী ডিউরেশন রাখার যে বাধ্যবাধকতা সেই বিষয়টির কারনে নির্মাতা দৃশ্যগুলো বড় রেখেছেন ; তবে সেটি মোটেই ছবির জন্য ভাল কোন সিদ্ধান্ত ছিলো না।

(ছবিটি নিয়ে আমার ভিডিও রিভিউ দেখুন নিচে দেয়া লিঙ্কে গিয়ে)

ডিরেকশনঃ নাদের চৌধুরীর ডিরেকশন খারাপ না। তবে বাজেট স্বল্পতার কারনে কিংবা তাড়াহুড়ো করে ছবি শেষ করার কারনে কিছু কিছু দৃষ্টিকটু ভূল ছিলো ছবিতে। বিশেষ করে একটা বিষয় না বললেই নয়। রাইসূল ইসলাম আসাদের চরিত্রটির যে অতীত সেই বিষয়টি খুব বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে দেখানো যেত। এভাবে হঠাত করে সরাসরি সেই অতীতে ছবি চলে যাওয়ায় মূল গল্প থেকে ধ্যান সরে যেতে বাধ্য। তবে এর চেয়েও ভয়ঙ্কর ভূল ছিলো একটি দৃশ্যে। রাইসূল ইসলাম আসাদকে কিশোর বয়সে যিনি আশ্রয় দিয়েছেন তার মৃত্যু দৃশ্যে আমরা দেখি কাঁচা গোফ দাড়ীর এক লোককে। অথচ রাইসূল ইসলাম আসাদের দাঁড়ী গোফ সম্পূর্নটাই সাদা। ছবিতে তাকে ৫০-৬০ বছর বয়সী এক চরিত্রে দেখা যায়। তাহলে তার বয়স যখন ১৫-১৬ তখন তার আশ্রয় দাতার বয়স ছিলো কমপক্ষে ৪০। প্রায় ৩৫-৪০ বছর পর তার বয়স হওয়া উচিত ৮০ বা তার কাছাকাছি। অথচ ছবিতে আমরা দেখি রাইসূল ইসলাম আসাদ বুড়ো হয়ে গেলেও তার সেই আশ্রয়দাতা দিব্যি সেই ৩৫-৪০ বছর আগের মতোই আছেন!! এই একটি দৃশ্যই ছবির গ্রহনযোগ্যতা অনেক খানি হ্রাস করে দিয়েছে। যে কোন একজন বৃদ্ধকে দিয়ে এই দৃশ্য করানো যেত, কিংবা তার চেহারা না দেখিয়েও দৃশ্যটি করা যেত। অথচ নির্মাতা যেটি করলেন সেটি যতটা না ভূল তার চেয়ে বেশী নির্বুদ্ধিতা।

সিনেমাটোগ্রাফী ও এডিটিংঃ ছবির লোকেশন খুব ভাল হলেও সিনেমাটোগ্রাফী সে হিসেবে অতো বেশী দৃষ্টিনন্দন হয়নি। তবে চলনসই ছিলো সিনেমাটোগ্রাফী। এডিটিং সে হিসেবে ভাল হয়নি। নির্মাতার সেই বড় বড় দৃশ্য রাখার যে সিদ্ধান্ত তার খেসারত এডিটরকে দিতে হয়েছে। দৃশ্য গুলো ছোট রাখা গেলে এডিটিং অনেক বেশী সার্প হতো; ফলে ছবিটিও উপভোগ্য হতো।

মেয়েটি এখন কোথায় যাবে

অভিনয়ঃ ছবির অন্যতম ভাল দিক এর পাত্র পাত্রীদের অভিনয়। জলি খুব ভালো অভিনয় করেছেন। এই চরিত্রে এখন জলি ছাড়া অন্য কাউকে ভাবাও সম্ভব হচ্ছে না। একজন অভিনয় শিল্পীর জন্য এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। ছবির গল্প তাকে কেন্দ্র করে হলেও ছবিতে তার স্পেস্‌ তুলনামূলক কম ছিলো। বরং সাপোর্টিং কাস্ট এর অভিনয় শিল্পীরা বেশী স্পেস পেয়েছে। চরিত্রটিই এমন ছিলো যে প্রধান চরিত্র হয়েও পর্দায় ধাপিয়ে বেড়ানোর সূযোগ নেই। সেই কম স্পেসেও জলি এক কথায় অসাধারন। শাহ্‌ রিয়াজ এন্টি হিরো চরিত্রে মোটামুটি। তার সমস্যা হচ্ছে তার লুকে। খুব লম্বা সে। অথচ আবার ততোটাই মোটা। ফলে তাকে দেখতে নায়ক বা ভিলেইন কোনটাই পারফেক্টলি লাগে না। অভিনয়েও মনে হচ্ছিলো সে জোর করে নিজেকে নায়ক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। চেষ্টাতে দোষ নেই কিন্তু সেই চেষ্টা যেন দর্শকদের চোখে ধরা না পড়ে এই বিষয়টি তার খেয়াল রাখা উচিত। তারপরও বলবো নতুন হিসেবে সে মোটামুটি ছিলো।

 

সাপোর্টিং কাস্টে ফজলুর রহমান বাবু বরাবরের মতোই অসাধারন। অজ্ঞাতনামা লেভেলের পারফরমেন্স্‌ হয়তো বার বার পাওয়া যাবে না (ওটা ছিলো অন্য লেভেলের কিছু) কিন্তু বানিজ্যিক ছবি হিসেবে এ ছবিতে মাঝি চরিত্রে তিনি দারুন।

রাইসূল ইসলাম আসাদকে নির্মাতা ভাল ভাবে ব্যাবহার করতে পারিনি। তার পর্দায় অনেক বেশী স্পেস ছিলো সে হিসেবে তার পুরো এপিসোডটিতেই অযত্নের ছাঁপ স্পষ্ট। বলতে গেলে রাইসূল ইসলাম আসাদের চরিত্রটি যে ট্রিটমেন্ট দাবী করে নির্মাতা সেটি দিতে ব্যার্থ হয়েছে। রাজার ছোট ভাই চরিত্রের শিশু শিল্পী উপভোগ্য ছিলো। বাকিরা সবাই চলন সই।

 

সবমিলিয়ে, 

মেয়েটি এখন কোথায় যাবে ভাল গল্প ও অভিনয় সমৃদ্ধ একটি ছবি। নির্মানের দিক থেকে ছবিটি মোটামুটি মানের। বাজেট স্বল্পতা এবং তাড়াহুড়ো করে বানানোর ফলে ছবিটি খুব অসাধারন কিছু হয়ে উঠতে পারেনি। নির্মানে দৃষ্টিকটু কিছু বিষয় এড়িয়েও ছবিটিকে আমি মোটামুটি ভাল ছবি হিসেবেই বিবেচনা করছি।

 

রেটিংঃ আমি ছবিটিকে দিচ্ছি ৩* অর্থাৎ ৬০% মার্কস্‌ ( গ্রেড A- )


মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন