ভূবন মাঝি একটি আধুনিক ও বুদ্ধিদীপ্ত চলচ্চিত্র
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

নবীন নির্মাতা ফকরুল আরেফিনের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ভূবন মাঝির প্লটটা ইন্টারেষ্টিং। মূলত ছবিটি ডাবল টাইম ফ্রেমের অর্থ্যাৎ একই সঙ্গে দুটো সময় চলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচার ; এই দুইটি বিষয় ছবিতে খুব সহজ ও কনভেন্সিং ভাবে লিঙ্কড্‌ হয়েছে।

ডাবল টাইম ফ্রেমিং এর ছবি নতুন কিছু না। সারা বিশ্বেই এ ধরনের চিত্রনাট্যের ছবি আমরা দেখেছি। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এই ধারাটি দর্শক আগ্রহ্‌ ধরে রাখতে ব্যার্থ হয়েছে। ভূবন মাঝির চিত্রনাট্যটি এক্ষেত্রে অবশ্য খুবই স্বার্থক হয়েছে বলা যায়। আমার মতে যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়ে ছবি বানাতে এর চেয়ে ফলপ্রসূ চিত্রনাট্য হয়তো হতে পারতো না। চিত্রনাট্যে একই সঙ্গে দর্শক দেখে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মানুবিক বিপর্যয়গুলো এবং ২০১৩ সাল বা তার সমসাময়িক সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেখানে যুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধীরা ছদ্মবেশে এখনো সমাজে প্রভাব বিস্তার করে আছে এবং বিশৃঙ্খলা তৈরী করে যাচ্ছে। আর এই দুটি বিষয় একই সাথে সিঙ্কোনাইজড্‌ হওয়ায় ছবির ইম্প্যাক্টটা দর্শকদের উপর ভাল ভাবেই পড়ে।

(ছবিটির ভিডিও রিভিউ দেখতে চাইলে নিচের ইউটিউব লিঙ্কে দেখুন)

অন্যদিকে চিত্রনাট্যটিকে আমি যেমন সহজ বলবো তেমনি বুদ্ধিদীপ্তও বলবো। কেননা মুক্তিযুদ্ধ বা যুদ্ধাপরাধের বিষয়গুলো আসলে খুব সহজ কোন বিষয় না। এখানে কোন না কোন ভাবে ধর্মকে লিঙ্ক করা হয়। ফলে বিষয়টি আরো বেশী জটিল আকার ধারন করে। এ ছবির নির্মাতা খুবই বুদ্ধির সাথে এই বিষয়টি ছবির শুরুতেই স্পস্ট করেছেন যে ধর্মের সাথে এ বিষয়গুলোর সামান্য লিঙ্ক নেই।

চিত্রনাট্যের যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করেছে সেটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের গতানুগতিক ছবিগুলোর মতো এ ছবিতে নারী নির্যাতন বা অন্য অমানবিক চিত্রগুলো বীভৎস ভাবে দৃশ্যায়ন না করে বরং সহজ ও ইম্প্যাক্টফুল সংলাপের মাধ্যমে বিষয়গুলো দেখানো হয়েছে। যা ছবির চিত্রনাট্যকে একটি আধুনিক ও বুদ্ধিদীপ্ত চিত্রনাট্যে রূপান্তর করেছে।

 

টেকনোলজিক্যাল দিক থেকে বলতে গেলে ছবিটি খুব বেশী বিশ্বমানের বা ঝমকালো হয়নি। বাজেট স্বল্পতা এক্ষেত্রে বড় কারন বলে আমি মনে করি। তারপরও শত সীমাবদ্ধতার পরও ছবির টেকনিক্যাল দিক গুলো ভালোই ছিলো।

সিনেম্যাটোগ্রাফী বেশ সহজ ও সুন্দর ছিলো। বিশেষ করে ব্রীজের দৃশ্য, ট্রেন লাইনের দৃশ্য কাব্যিক ব্যাঞ্জনার তৈরী করে।

লাইট এবং কালার টোন গল্পের টোনের সাথে মিল রেখে করা হয়েছে। তবে এ দিকটি আরো ভাল হতে পারতো।

এডিটিং টিম অবশ্য স্বার্থক হয়েছে ছবির দৈর্ঘ্য ২ ঘন্টার মধ্যে রেখে গতিশীল ও ঝরঝরে একটি ছবি উপহার দিয়ে।

ছবির মিউজিক খুব অসাধারন না হলেও চলনসই ছিলো।

ভূবন মাঝি

ভূবন মাঝি ছবির একটি দৃশ্য

পারফরমেন্স এর দিক থেকে বলতে গেলে বলবো সবাই খুব ভাল করেছে। আগেই বলেছি যে নির্মাতা খুবই সহজ একটি ছবি বানিয়েছেন ফলে চরিত্রগুলোর মধ্যে মেলোড্রামা, ওভারড্রামা একেবারেই ছিলো না। পরমব্রত খুব ভাল অভিনেতা আমরা জানি। ব্যাক্তিগত ভাবে আমার খুব পছন্দের অভিনেতা সে। এ ছবিতে তাকে নিহিরই মনে হয়েছে। নায়ক বা পরমব্রত মনে হয়নি।

অপর্না ঘোষ এর একটি ক্লাসি লুক আছে। সেই লুক অনুযায়ী এ ছবিতে সে পারফেক্ট ছিলো।

বাকিরা সবাই ভাল করেছে।

 

ছবির সবচেয়ে ভাল দিক ছিলো এর ডায়লগ। সহজ এবং বাস্তবিক সব ডায়লগ যা খুবই ইম্প্যাক্টফুল ছিলো।

যেমন ছবির নায়িকা যখন নায়ককে বলে দেশের এই অবস্থায় বীর পুরুষদের এভাবে বসে থাকলে চলে? … নায়ক বলে যে আমি মরতে ভয় পাই। কিংবা নায়ক যখন বলে যে আমি মানুষ হত্যা করতে পারবো না। অর্থাৎ এই ডায়লগ গুলো দিয়েই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের দার্শনিক দিক গুলো স্পষ্ট হয়। আমাদের দেশের সাধারন মানুষ যুদ্ধটা করেছিলো এক প্রকার বাধ্য হয়ে। না হয় যে ছেলে কবিতা নিয়ে থাকে, যার জীবন জুড়ে হয়তো তার ভালবাসার মানুষ; সেই ছেলেই হাতে অস্ত্র তুলে নেয়।আত্ম রক্ষার জন্য, মুক্তির জন্য; মরতে ভয় পাওয়া ছেলেটিকেও মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়।

পরমব্রত ভূবন মাঝি

 

 

 

সবমিলিয়ে বলবো, ভূবন মাঝি দার্শনিক দিক থেকে শক্তিশালী একটি ছবি। খুব সহজ ও বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে নির্মাতা খুব জটিল বিষয়গুলো উঠিয়ে নিয়ে এসেছেন।

ছবিটি মূলত যুদ্ধাপরাধের বিচারকে সুস্পষ্টভাবে জাস্টিফাই করেছে।

 

আপনি যদি শুধুমাত্র বিনোদনের উদ্দেশ্যে ছবি না দেখে বরং বুদ্ধিভিত্তিক চর্চার জন্য ছবি দেখে থাকেন তাহলে এ ছবি আপনার জন্য একটি ভাল অপশন।

 

শেষ পর্যন্ত ছবিটি হয়তো ক্ল্যাসিক ছবি হয়ে উঠেনি কিন্তু একটি শক্তিশালী আধুনিক ছবি হয়ে উঠেছে।

 

আমি ছবিটিকে দিচ্ছি সাড়ে তিন স্টার। অর্থাৎ ৭০% মার্কস্‌ বা এ গ্রেড।

  • রমিজ, ০৫-০৩-১৬


এই পোস্টটিতে ৬ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. Wahid Sardar says:

    till now i don’t see this movie but seams its a good move base on your judgement .

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন