১০০তম পোষ্টটি হোক হুমায়ূন স্যারের নামে 
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

 আমার ১০০তম ব্লগ এবং চলচ্চিত্রে হুমায়ূন

— রমিজ, ১৩-১১-১৬

বায়োস্কোপিয়ান হিসেবে আমার যাত্রা শুরু ১৯ এ মার্চ ২০১৫ এ। শুরুটা হয়েছিলো বাংলা মুভি ”এইতো প্রেম” এর রিভিউ দিয়ে। কিছুদিনের মধ্যেই

বায়োস্কোপ ব্লগ নামক এই ব্লগটিতে অভ্যস্থ হয়ে পড়ি। একে একে লিখে ফেলি ২০ টির মতো বাংলাদেশী ছবি এবং ১৫ টিরও বেশী বিদেশী ছবির রিভিউ। এছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের চলচ্চিত্র নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণমূলক লেখা এবং প্রিয় তারকাদের সেরা কাজ নিয়ে বিশেষ লেখা লিখতে থাকি নিয়মিত। ব্লগার হিসেবে কতটুকু জনপ্রিয়তা পেয়েছি জানিনা , তবে পেয়েছি অনেক কিছু। ছুঁয়ে দিলে মন এর প্রিমিয়ারে দাওয়াত, গ্রামীন ফোন ওয়াও বক্স এর সৌজন্যে সেরা বায়োস্কোপ ব্লগার হিসেবে মুভি টিকেট ছাড়াও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট এবং চলচ্চিত্রপ্রেমী নানাজনের উৎসাহ্‌ ও সাধুবাদ।

বায়োস্কোপ ব্লগের একজন ব্লগারের ১০০ তম পোষ্ট নানা কারনেই বিশেষ পোষ্ট। প্রথমত এই পোষ্ট দিয়ে একজন ব্লগার ৫ তারকা চিহ্ন নিয়ে অর্থাৎ ফাইভ স্টার নিয়ে মাষ্টার মুভি রিভিউয়ারের খেতাব জিতে। এই খেতাব আমার জানা মতে হাতে গোনা দু-চারজনই এখন পর্যন্ত জিতেছে। দ্বিতীয়ত একজন ব্লগারের জন্য আত্মবিশ্বাস হয়ে উঠে এ ধরনের অর্জন। লেখক বা মুভি সমালোচক হিসেবে কিছুটা হলেও নিজেকে ম্যাচিউর মনে হয় তখন।

১০০ তম পোষ্টটি অনেক দিন ধরে লিখবো লিখবো করেও লেখা হয়ে উঠছিলো না। এই বিশেষ পোষ্টটি হওয়া চাই বিশেষ কিছু। কিন্তু কিছুতেই ঠিক করতে পারছিলাম না যে কোন বিষয়ে লিখবো। আজ হঠাৎই উপলক্ষ পেয়ে গেলাম। প্রিয় লেখক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ৬৮ তম জন্মদিন আজ। আমাদের এই প্রজন্মের কাছে হুমায়ূন সাহিত্য বা হুমায়ূন চলচ্চিত্রের আবেদন যে কতখানি তা কারোর অজানা নয়। বায়োস্কোপ ব্লগে আমার ১০০তম পোষ্টটি এই অতি প্রিয় ব্যাক্তিত্যের নামে উৎসর্গ করে নিজেকে তৃপ্ত করছি।

শাওন শ্রাবন মেঘের দিন

হুমায়ূন আহমেদের ছবির নায়িকা

চলচ্চিত্রে হুমায়ূনের যত সৃষ্টি  

বাংলা চলচ্চিত্র যখন দিনে দিনে সস্তা বানিজ্যিক পন্য হয়ে উঠে এবং সত্যিকারের চলচ্চিত্র প্রেমীরা হতাশায় ডুবতে থাকে তখন যে অল্প কিছু ভালো কাজ প্রচন্ড খরায় এক পশলা বৃষ্টি নিয়ে এসেছিলো তার মধ্যে নির্মাতা হুমায়ূন কিংবা লেখক হূমায়ূনের কাজ গুলো অন্যতম। একজন উপন্যাসিক হিসেবে হূমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছেন অনেক কিছু। সে হিসেবে চলচ্চিত্রে তার কাজ আমরা পেয়েছি খুব কম। তবে যতটুকু পেয়েছি এ প্রজন্মের চলচ্চিত্র প্রেমী হিসেবে সেটুকু আমরা অমৃত হিসেবেই নিয়েছি। নির্মাতা হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ আমাদের উপহার দিয়েছিলেন আটটি চলচ্চিত্র। এছাড়া হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অন্য নির্মাতাদের দ্বারা চলচ্চিত্রে রুপদান হয়েছে  আরো বেশ কয়েকবার। আজকের ব্লগটিতে সেই সব চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে …

নির্মাতা হূমায়ূন 

আগুনের পরশমণি

১৯৯৪ সালে আগুনের পরশমণি দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ছবিটি সে সময় শিক্ষিত ও রুচিশীল দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। একই নামে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাসের চলচ্চিত্র রুপায়ন এই ছবিটিতে অভিনয় করেন আসাদুজ্জামান নূর, বিপাশা হায়াত, আবুল হায়াত, ডলি জহুর, শিলা আহমেদসহ্‌ আরো অনেকে। ছবিটি সেরা ছবি, সেরা চিত্রনাট্যসহ্‌ আটটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরুষ্কার লাভ করে।

শ্রাবন মেঘের দিন 

হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র হচ্ছে ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া তার অসাধারন সৃষ্টি শ্রাবন মেঘের দিন। ছবির গানগুলো বাংলা চলচ্চিত্রে কালজয়ী হয়ে থাকবে। হূমায়ুন আহমেদের নিজের লেখা গান একটা ছিলো শোনার কন্যা আজো মানুষের মুখে মুখে। এছাড়া ক্ল্যাসিক ফোক সূয়া চান পাখি এ ছবির মাধ্যমেই মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। এ ছবিতে কুসূম চরিত্রে শাওন, কুসূমের মতি ভাই চরিত্রে জাহিদ হাসান, তার বাগদত্তা চরিত্রে মাহফুজ আহমেদ, মায়ের চরিত্রে আনোয়ারা, ডাক্তার চরিত্রে  মুক্তিসহ্‌ সবাই অসাধারন অভিনয় দেখিয়েছেন। বাংলা চলচ্চিত্রে এই অসাধারন ছবিটি আমার সবচেয়ে প্রিয় ছবি গুলোর একটি ।

 

দুই দুয়ারী 

শ্রাবন মেঘের দিন মুক্তির পরের বছরে অর্থাৎ ২০০০ সালে মুক্তি পায় রিয়াজ, শাওন ও মাহফুজ আহমেদ অভিনীত দুই দুয়ারী ছবিটি। এ ছবিটিও হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস থেকে তৈরী। শ্রাবন মেঘের দিনে গ্রামের সরল চরিত্রগুলো এবং তাদের ভিতরকার প্রেম, ভালোবাসা অর্থাৎ মানবীয় সম্পর্কগুলোকে তুলে ধরা হয়েছিলো যেখানে দুই দুয়ারীতে এসেছে শহুরে চরিত্র এবং তাদের ভিতরকার জটিলতা। শ্রাবন মেঘের দিনের মতো এ ছবিটি অতোটা জনপ্রিয়তা না পেলেও ছবির গান ” মাথায় পড়েছি সাদা ক্যাপ ” কিংবা ” বরষার প্রথম দিনে ” ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। একজন গীতিকার হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জায়গা পেয়ে যান। জনপ্রিয় অভিনেতা রিয়াজ এ ছবির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরুষ্কার ঘরে তুলেন।

 

চন্দ্রকথা   

প্রথমবারের মতো হুমায়ূন আহমেদ তার উপন্যাসের বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্রের জন্য স্বতন্ত্র গল্প লিখেন। গ্রামের এক তরুনীর গল্প । বাল্যবন্ধুর প্রতি তার ভালোবাসা, অত্যাচারী স্বামীর প্রতি তার ঘৃনা; সবমিলিয়ে চন্দ্রকথা দারুন একটি ছবি। ছবির গান ও আমার ঊড়ালপঙ্খীরে, চান্নি পশরে দারুন জনপ্রিয়তা পায়।এ ছবির গানগুলোও হূমায়ূন আহমেদের নিজের লেখা ছিলো।

 

শ্যামল ছায়া 

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে একদল গৃহত্যাগী মানুষের গল্প ” শ্যামল ছায়া ” । ছবিটি নানা দিক থেকে হুমায়ূন আহমেদের অন্য ছবিগুলো থেকে ব্যাতিক্রম। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অন্য ছবিগুলো থেকেও এ ছবিটা ভিন্ন স্বাদের। ছবিতে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ না দেখিয়েও মুক্তিযুদ্ধের দর্শনকে সুন্দর ভাবে নিয়ে আসা হয়েছে। এ ছবিটিও হুমায়ুন আহমেদ এর উপন্যাসের চলচ্চিত্র রুপ। ছবিতে মাওলানা চরিত্রে রিয়াজ অসাধারন অভিনয় করেছেন।

 

নয় নাম্বার বিপদ সঙ্কেত 

এটি সম্ভবত হূমায়ূন আহমেদের অন্য ছবিগুলো থেকে বেশ দুর্বল। তবে ছবিটির কমেডি চরিত্রগুলো বেশ উপভোগ্য ছিলো। হুমায়ূন আহমেদের অন্য ছবি গুলোর পাশে এ ছবিটি তার নামের প্রতি খুব বেশী সুবিচার করতে পারেনি।

 

আমার আছে জল  

হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি জনপ্রিয় উপন্যাসের চলচ্চিত্র রুপ এটি। ছবিতে অভিনয় করেছেন জাহিদ হাসান, শাওন, মিম, ফেরদৌসসহ অনেকে। ছবির গানগুলো জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া গান ”যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো; এক বরষায় ” এ ছবিরই গান।

ঘেটুপত্র কমলা 

হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ চলচ্চিত্র এটি। ছবিটি এর কন্সেপ্ট এর কারনে তার অন্য ছবিগুলো থেকে সম্পূর্ন ব্যাতিক্রম। বোল্ড কন্সেপ্ট এর কারনে ছবিটি কিছুটা সমালোচিতও। তবে নির্মানশৈলীর দিক থেকে চলচ্চিত্রকার হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ এর সেরা কাজ এটি। ছবিটি সেরা ছবিসহ্‌ বেশ কয়েকটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরুষ্কার অর্জন করে।

 

চলচ্চিত্র হুমায়ূন সাহিত্য 

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস নিয়ে অন্য নির্মাতারা আরো কিছু ছবি বানিয়েছেন। তবে শঙ্খনীল কারাগার এবং দারুচিনি দ্বীপ ছাড়া বাকিগুলো খুব বেশী জনপ্রিয়তা পায়নি।

শঙ্খনীল কারাগার ছবিটি হুমায়ূন সাহিত্য নিয়ে করা প্রথম কোন চলচ্চিত্র। শহুরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সংগ্রামকে অসম্ভব সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। এ ছবিতে অভিনয় করেছেন ডলি জহুর, আসাদুজ্জামান নূর, নাজমা আনোয়ার, আবুল হায়াত, সুবর্না মোস্তফা, চম্পা, জাফর ইকবাল, আজিজুল হাকিম সহ অনেকে। মোস্তফিজুর রহমান পরিচালিত ছবিটি সেরা ছবিসহ্‌ বেশ কিছু ক্যাটেগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরুষ্কার অর্জন করে। গল্পকার হিসেবে হুমায়ূন আহমেদও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরুষ্কার পান।

তৌকির আহমেদ পরিচালিত দারুচিনি দ্বীপ ও হুমায়ুন সাহিত্য নিয়ে করা প্রশংসিত একটি চলচ্চিত্র। নির্মানের দিক থেকে এ ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সুনির্মিত ছবি। ছবিতে অভিনয় করেছেন রিয়াজ, মম, ইমন, বিন্দু, মোশাররফ করিম, আবুল হায়াত, আসাদুজ্জামান নূরসহ অনেকে। ছবিটি সেরা ছবি, সেরা অভিনেতা, সেরা অভিনেত্রীসহ্‌ আরো বেশ কিছু শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরুষ্কার অর্জন করে।

 

এগুলো ছাড়া হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প নিয়ে মোরশেদুল ইসলাম নির্মান করেন দুরত্ব । একই নির্মাতা পরবর্তীতে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস প্রিয়তমেষু কে চলচ্চিত্রে রুপদান করেন। স্যারের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস নন্দিত নরকে  কে পর্দায় নিয়ে আসেন বেলাল আহমেদ। শাহ্‌ আলম কিরন মান্না, মৌসুমী এবং নিপুনকে নিয়ে বানান সাজঘর । হুমায়ূন আহমেদ এর জনম জনম উপন্যাস থেকে আবু সাইদ নির্মান করেন ” নিরন্তর ” । এ ছবিতে জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবনূরের অভিনয় প্রশংসিত হয়।

 

হুমায়ূন স্যারের মৃত্যুর পরে তার লেখার স্বত্বাধিকার শাওনের নামে যায়। স্যারের কৃষ্ণপক্ষ নিয়ে শাওন সম্প্রতি নির্মান করেছেন একটি চলচ্চিত্র। এ ছাড়া তার আরেক  উপন্যাস নক্ষত্রের রাত নিয়েও কাজ করবেন শাওন।

 

স্যার আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে তার সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র আমাদের মাঝে আছে। তিনি বেঁচে আছেন তার সেই অসাধারন সৃষ্টিগুলোর মাঝে।

হুমায়ূন আহমেদকে চলচ্চিত্রে আমরা হয়তো আরো বেশী করে পেতে পারতাম। হুমায়ূন সাহিত্য ভান্ডার থেকে সামান্যই আমরা চলচ্চিত্রে ব্যাবহার করতে পেরেছি। সেই সামান্যই আমাদের চলচ্চিত্রকে অনেক খানি সমৃদ্ধ করেছে। আশা করি ভবিষ্যতে নির্মাতারা হুমায়ূন সাহিত্যকে স্বার্থকভাবে পর্দায় নিয়ে এসে আমাদের চলচ্চিত্রকে আরো সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবেন। এজন্য দরকার হুমায়ূন পত্নী মেহের আফরোজ শাওনের সর্বাত্মক সহযোগিতা ।

 

বেঁচে থাকুক স্রষ্টা হুমায়ূন এবং তার সৃষ্টিগুলো সকল বাঙ্গালীর হৃদয়ে …

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. শান্তনু চৌধুরী শান্তনু চৌধুরী says:

    আপনাকে অভিন্দন 🙂

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন