স্রেফ তুম- এ কি যেন নেই, কি যেন নেই!

নব্বই দশকের শেষের দিকের এক ঈদে বরিশালের একটা সুনসান সুন্দর গ্রামের একটি বাড়ির দৃশ্য। আশে পাশের কয়েক বাড়ির লোকজন জড়ো হয়েছে এই বাড়ির একটা ঘরে; উদ্দেশ্য বাংলাদেশের টেলিভিশনে বিশেষ ঈদের ছবি দেখা। নারী- পুরুষ, শিশু, কিশোর, তরুন; আগত সকল দর্শকদের উৎসুক চোখ যখন টিভি পর্দায় তখন শুরু হয় সম্পুর্ন নতুন মুখ নিয়ে এবং অপরিচিত পরিবেশে চিত্রায়িত ছবি ” হঠাৎ বৃষ্টি”। বাংলাদেশে প্রথমবারের মত ওয়ার্ল্ড টিভি প্রিমিয়ার হতে যাওয়া এ ছবি সেদিন শুরুতেই এখানকার দর্শকদের বেশির ভাগের মুখ থেকে ঈদের খুশি ম্লান করে দিয়েছিলো।

ছবিতে শাবানা কিংবা শাবনুরের দুত্যি নেই, জসীম কিংবা মান্নার অ্যাকশান নেই। এমন ঝিমানো ছবি কি দেখা যায়! তাও আবার ইদের দিনে!

ছবির শুরুর ১০ মিনিটেই অল্প কিছু দর্শক ছাড়া কেউ আর এই ছবি দেখে ইদের আনন্দ মাটি করার সাহস দেখালো না। সেই অল্প কিছু দর্শকদের মধ্যে ১০-১১ বছরের তীব্র সিনেমাপ্রেমী এক বালক মন্ত্র মুগ্ধের মত সেদিন টেলিভিশন পর্দায় বুদ হয়েছিলো ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। ছবির নায়ক-নায়িকা এতো সহজ-সরল, এতো সুন্দর, এতো জীবন্ত হতে পারে এটি তার সিনেমা দেখার অতি অল্প দিনের অভিজ্ঞতায় নতুন এক বিস্ময় যোগ করলো। বলাই বাহুল্য সেদিনের সেই বালকটি আজকের এই ঢাকাবাসী, দেশ-বিদেশের নানান ধরনের সিনেমা দেখতে অভ্যস্থ, গুড ফর নাথিং বাট এ মুভি লাভার; আমি নিজেই ছিলাম।

hathat bristi and sirf tum

হঠাৎ বৃষ্টি এবং স্রেফ তুম ছবি দুটোর পোষ্টার

তারপর থেকে হঠাৎ বৃষ্টি ছবিটি থিয়েটারে দেখেছি, ঘরে দেখেছি; বার বার দেখেছি। আমি সিনে দর্শক হিসেবে মোটেই এতোটা উদার নয় যে এক ছবি একবারের বেশি দেখে সময় নষ্ট করবো; কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি তো আর কেবল মাত্র একটা ছবি ই নয়। ছবিটি যত দেখি এর প্রতি ভালোবাসা যেন ততোই বাড়ে। ছবির সহজ- শান্ত আবহ, হৃদয়কে ছুঁয়ে যাওয়া ভালোবাসার গল্প, ফেরদৌস- প্রিয়াঙ্কার মায়া ভরা চোখ আর তার এক্সপ্রেশন, ছবির অসাধারন কথা ও সুরের সব গান; এমনকি সাইড নায়িকা গুলোর কথাও ভোলার না (LOL) … কি সুন্দর! কি সুন্দর! আর দিপা! জীবনে এতো ভালবাসা কোন অনস্ক্রীন ক্যারেক্টারের জন্য সত্যিই বিরল। দিপা অর্থাৎ প্রিয়াঙ্কা; প্রিয়াঙ্কা অর্থাৎ দিপা ; অর্থাৎ দিপার চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদী; তার জন্য আমার একবুক ভালোবাসা সব সময়ের জন্য।

কিছু দিন আগে হঠাৎ ই ঢুকলাম হঠাৎ বৃষ্টির উইকিপেডিয়া পেজ এ আর সেখান থেকে জানতে পারলাম হঠাৎ বৃষ্টি একটা তামিল ছবির রিমেক এবং হঠাৎ বৃষ্টির সাফল্যের পর ছবির পরিচালক বসু চ্যাটার্জী একই গল্প নিয়ে নির্মান করেছেন হিন্দি মুভি স্রেফ তুম। প্যাহলি প্যাহলি বার মোহাব্বত কি হ্যায় এবং দিল বার দিল বার গান গুলোর জন্য এই ছবির নাম আমি আগেই জানতাম। কিন্তু এবার যা শুনলাম তাতে এই ছবি এখনো দেখা হইনি এই কথা মনে হতেই নিজেকে লুজার মনে হলো । মনে হলো জীবনে বিশাল কিছু মিস করলাম যেন। এরপর কলকাতার বন্ধু Subhashis Banerjee কে স্রেফ তুম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই সে জানালো যে এটা একটা ক্লাসিক। আরো জানলাম বাংলাদেশে হঠাৎ বৃষ্টি যতটা জনপ্রিয় কলকাতায় তার সিকি ভাগ জনপ্রিয়তাও ছবিটি পায়নি। সে জানালো যে স্রেফ তুম দেখেছে বলেই সে হঠাৎ বৃষ্টি আর দেখেনি। এসব শুনে ভিতরে ভিতরে আমি খুবই আহত হলাম। জিদ চাপলো যে করেই হোক স্রেফ তুম দেখতেই হবে। অনেক খোঁজা খুঁজি এবং বার বার ডাউনলোড ব্রেক হওয়ার পর অবশেষে পাইরেটস বে থেকে পেয়ে গেলাম কাঙ্খিত ছবিটি। দ্রুত দেখেও ফেললাম।

সত্যি বলতে কি একই গল্প হলেও এ ছবিটি ট্রিপিকাল হিন্দি ছবির আদলে তৈরী হওয়ায় হঠাৎ বৃষ্টির সেই অসাধারন আবহ এই ছবিতে আসেনি। রাজস্থানের পটভূমি কেরালায় নেয়ার কি দরকার ছিলো; অজিত-দিপার নাম বা কেনো পরিবর্তন হলো; ছিঃ কেরালার ঐ মেয়েটা কি বিশ্রী অথচ রাজস্থানের সেই মেয়েটা যে তার বড় বড় চোখ আর নিষ্পাপ মুখ নিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় বলেছিলো ম্যায় তুমহারে ভালবাসি! মনটা কেড়ে নেয়েছিলো যেন; আর ফেরদৌস আর প্রিয়াঙ্কার যায়গায় এ কেমন নায়ক- নায়িকা! মেয়েটা দেখতে সুন্দর কিন্তু প্রিয়াঙ্কার মধ্যে কি যেন একটা ছিলো!
এরকম খুঁতখুঁতে মন নিয়েই দেখে ফেললাম পুরো ছবি।

ছবিটি অবশ্যই খারাপ না কিন্তু আমি যদি হঠাৎ বৃষ্টি কে স্রেফ তুম এর ভিতরে খুঁজে ফিরি তাহলে হতাশ তো আমাকে হতেই হবে। জানিনা স্রেফ তুম এ কি আছে কিন্তু এতে হঠাৎ বৃষ্টি নেই। ছবিটিতে অনেক গান আছে কিন্তু এক দিন স্বপ্নের দিন, এ যেন হঠাৎ বৃষ্টি, সোনালি প্রান্তরে কিংবা ঘুম আসেনা যে নেই। ছবিতে প্রিয়া গিল, সুস্মিতা সেনরা আছে কিন্তু প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদির সেই সরল চাহনি আর নিস্পাপ হাসি কই! ফেরদৌসের মত সহজ সরল চোখের সুদর্শন নায়ক কই। আর সবচেয়ে বেশি হতাশ হয়েছি ছবির শেষ দৃশ্যে। হঠাৎ বৃষ্টির শেষ দৃশ্যের সেই ঝুম বৃষ্টি, অজিতের দেয়া নীল শাড়িতে দিপা, অজিত তার গায়ের চাদরটি সরাতেই দিপার হাতের কাজ করা সেই টি-শার্টটি আর সবশেষে বিদ্যুৎ খেলে যাওয়া দিপার মুখে সেই ছোট্ট অথচ সুগভীর ডাক- অজিত; অজিত আমি দিপা! এসব যে জীবন্ত! অথচ স্রেফ তুম কেবলি একটি বানিজ্যিক চলচ্চিত্র মাত্র।

হঠাৎ বৃষ্টি আমার কাছে শুধু মাত্র একটা ছবি নয়। অনেক জীবন্ত, অনেক সুন্দর, অনেক ভালোবাসার একটা কিছু। স্রেফ তুম-এ হঠাৎ বৃষ্টি কে খুঁজতে গিয়ে আমি কেবল হৃদয়ের হাহাকারই শুনতে পেয়েছি। বার বার মনে হয়েছে এখানে কি যেন নেই, কি যেন নেই!

বাড়তি কথাঃ কেউ কি এর তামিল অরিজিনাল ভার্সানটা দেখেছেন? নাম বোধ হয় কাধাল কোত্তাই ( Kadhal Kottai) বা এরকম কিছু। দেখে থাকলে দয়া করে পরামর্শ দিন যে ওটা আমার দেখা উচিৎ কিনা। কিংবা ছবিটার হিন্দি ডাবড ভার্সন অথবা ইংরেজী সাব টাইটেল সহ কোথায় পাওয়া যেতে পারে ?

 

— রমিজ (২০-০৭-২০১৪)

(Visited 361 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৫ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. (y) (y)…who love flowers ,,,, (y) ,,,,,,,,LIKE—– (y) —–share,,,,,, (y) ,,,the Best (y)flowers Exhibition (y) page in this FB world..(y)www.facebook.com/flowersspushpo

  2. Ramiz Raza says:

    কোনটিই কোনটির কপি না … একই পরিচালক দুই ভাষায় ছবি দুটো নির্মান করেছেন … তবে ছবি দুটো তামিল একটি ছবির রিমেক …

  3. Sujoy Das says:

    সেই তামিল কাদ্দল কতটাই ছবির নায়ক আজকের সুপারহিট নায়ক অজিত কুমার।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন