“অন্তহীন”…..কতগুলো অন্তহীন প্রতীক্ষার গল্প…..!!

 

 

পরিচালকঃ অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী
নায়কঃ অভিক চৌধুরী (রাহুল বোস)
নায়িকাঃ বৃন্দা (রাঁধিকা অপ্ত)
মুক্তির সালঃ ২০০৯
আইএমডিবি রেটিং – ৭.২/১০.০০

লিংকঃ http://www.imdb.com/title/tt1359552/)

 

 

 

 

খুব ভালো চিত্রনাট্য না হলে কলকাতার মুভি সচারচর আমি দেখি না।  প্রায় বছর তিনেক আগে  আমার ব্লগ.কম এর একটা পোষ্ট পড়ে (কার লেখা ছিলো, ভুলে গিয়েছি) মুভিটি দেখতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। পোষ্টে ডাউনলোড লিংকও দেয়া ছিলো। ডাউনলোড করে “এ আর এমন কি?” – জাতীয় মনোভাব নিয়ে মুভিটি দেখতে বসেছিলাম, কিন্তু আধ ঘন্টার মধ্যেই নড়ে চড়ে বসলাম!! তার কয়েকঘন্টা পরই এই রিভিউটি লিখেছিলাম। মুভিটা দেখে এত ভাল লেগেছিলো যে, জলজ্যান্ত একটা রিভিউ-ই নামিয়ে ফেল্লাম! উল্লেখ্য, এটা আমার লেখা প্রথম মুভি রিভিউ। আমার ব্যক্তিগত ব্লগ “স্বপ্নদুয়ারে” রিভিউটি দিয়ে রেখেছিলাম, আজ হঠাৎ মনে হলো, এটাকে আমারব্লগের পাঠকদের সাথে শেয়ার করা যেতে পারে। তাছাড়া, ব্লগে আমার লেখালেখির আর্কাইভেও নতুন একটা ক্যাটাগরি যোগ হলো!

মুভিটির চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা এক কথায় অসাধারণ। ছবিটি আজ দেখলাম। খুব ভাল ভাবেই দেখেছি। ফরওয়ার্ড করে তো নয় ই বরং কিছু কিছু সিকোয়েন্স পেছনে টেনে আবার দেখেছি। পুরো ছবিটা দেখে আমার ধারনা, অন্তহীন প্রেম দেখাবার চেয়ে পরিচালক যেন কলকাতার বর্তমান এলিট বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনই বেশী দেখাতে চেয়েছেন।

আর ইংলিশ সাব টাইটেল দেবার ব্যাপারটি রীতিমতো হাস্যকর লেগেছে। কারন ছবিটিতে ইংরেজী ডায়ালোগ এত বেশী যে আমার মনে হয়েছে ইংরেজীর বদলে বাংলা সাবটাইটেল দেয়া উচিৎ ছিলো। আর এটা যদি সত্যিই বর্তমান কলকাতার হাল হয়ে থাকে, তবে আমি মুটামুটি নিশ্চিত যে আগামী দেড়-দুযুগের ভেতর কলকাতার এলিট শ্রেনী থেকে বাংলা ভাষা বেমালুম বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

পরিচালক মুভির পাত্র-পাত্রীর মুখ দিয়ে ব্যাপক ইংরেজী সংলাপ বলিয়েছেন কিন্তু ইংরেজীতে তুবড়ি ছোটালেও তাদের একসেন্ট মোটেই শুদ্ধ ছিলো না। ক্যালকেটিয়ান টান ছিলো যথারীতি, স্পষ্ট। যার ফলে মুভির ইংলিশ সংলাপগুলোকে আপাতঃ বাংলায়ই মনে হয়েছে। তবে ভি কে মেহতা নামক চরিত্রের ইংরেজী সংলাপের উচ্চারনে আমি মুগ্ধ। ভদ্রলোক যে দীর্ঘদিন কোন ইংলিশ ভাষাভাষী দেশে ছিলেন, সেটা বলাই বাহুল্য।

কাহিনীর শুরুটা হয়েছিলো বেশ স্বাভাবিক। তবে মাঝখানে কিছু কিছু অংশ বেশ বোর লেগেছে। (যেমন: নায়ক-নায়িকার মাত্রাতিরিক্ত চ্যাট কনভারসেশন)। গল্পের মাঝটাও এগিয়ে গিয়েছে দারুন একটা রোমান্টিক উপন্যাসের মত! তবে শেষটা আশাহত করবে দর্শককে।

মুভির চরিত্রগুলো সংখ্যায় খুব বেশী নয় – সৎ আর দক্ষ পুলিশ অফিসার অভীক, নিষ্ঠাবান টিভি রিপোর্টার বৃন্দা, তারই অফিসের বস পারো, পারোর স্বামী রঞ্জন বা রনো, অভীকের খালা, মি. এবং মিসেস মেহরা – সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ন চরিত্র এরাই।

রনো তথা রন্জন (কল্যাণ রায়) আর পারোর (অপর্ণা সেন) প্রেমের ধরনটা বেশ ভাল লেগেছে। ছবির মূল নায়ক-নায়িকার বাইরে সিনিয়র এই জুটিও ছবির একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। পারো ফটোগ্রাফির শখে তিব্বতে যাবার পরে রনোর বাবা মারা যান। অজ্ঞাত কারনে রনো তার বাবা মারা যাবার দায়ভার পারোর উপর বর্তান। (এ ব্যাপারটা অর্থহীন মনে হয়েছে।) এর ফলে ওদের ছাড়াছাড়ি না হলেও সম্পর্কটা বিয়েতে গড়ায়নি। অর্থহীন অপবাদ পারোর ভেতর এমন গভীর এক অপরাধবোধের জন্ম দেয় যে সে ফটোগ্রাফিই ছেড়ে দেয়। এমনকি তার লাইফটাইমের সেরা, তিব্বতের ছবিগুলোও ২য় বার চোখ তুলেও নাকি তাকায়নি। হবু শশুড়ের মৃত্যুতে অযাচিতভাবে সম্পর্কের এই টানাপোড়েন চল্লেও, রনো-পারো এখনো সেই আগের মতই একে অপরকে ভালবাসে। তাই দুজনই চায় পাশাপাশি একই শহরে থাকতে। যার ফলে পারো যখন নতুন চাকুরী নিয়ে মুম্বাই চলে যায়, তখন রনো আর থাকতে না পেরে ফোনে ছ্যাবলাম মত বলেই বসে – “পারো, কটা দিনের জন্য আসি মুম্বাই? জাস্ট কটা দিনের জন্য!” কি আকুলতা রনোর কন্ঠে! পাশেই ছিলো আপন ছোটভাই অভিক! সে নতুন করে খুজেঁ পায় ভালবাসার আকন্ঠ আশ্রয়ের হেতু।

পারো যে কথাগুলো লিখে রনোকে একটা বই উপহার দেয়, খুব সত্য কথা! উচ্চমার্গীয় দার্শনিক তত্ত্ব। ভাল লেগেছে অভিকের পিসির ক্ষনস্থায়ী প্রেমও! অভিকের পীসির (শর্মিলা ঠাকুর) প্রথম জীবনে হঠাৎ এসে যাওয়া ক্ষণিকের প্রেমের বর্ণনার দৃশ্যটি আসলেই চমৎকার। সামান্য একটু ভয়েস শুনে একটা লোকের প্রেমে পড়ে যায় সে! অথচ সে জানে না লোকটা কে! ম্যারেড না আনম্যারেড! এত সব প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও রং নাম্বারে পরিচয় হওয়া সে লোকটির একটি ফোন কলের জন্য সে নিয়মিতভাবে অধীর আগ্রহে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করে গেছে। কতটা নির্মল ছিলো সে ভালবাসা! আর এখনকার প্রেম? পিসিই নিজ মুখে বলে অভিককে- “তোর জাগায় অন্য কেউ হলে এতদিনে কয়েকটা বান্ধবী জুটিয়ে নিতো।” এ যুগের প্রেমের প্রতি তার খেদ হয়তো এভাবেই ঝড়ে পড়েছে।

পুরো মুভিতে যদি কোন মাটির কাছাকাছি চরিত্র থাকে, তবে আমি বলবো সেটা এই পিসিমার চরিত্র। কারন ইনার ইংরেজী সংলাপ সবচেয়ে কম ছিলো। (এখানে বৃন্দার মা কে ধরবো না কারন তার বাংলা সংলাপই খুব কম ছিলো) পিসিমনির একটি দারুন বাংলা শব্দ খুব মনে ধরেছিলো কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সেটা মনে করতে পারছি না এখন। ভাবছি সময় পেলে মুভিটা আবার দেখবো।

প্রতিরাতে একটা মাতাল তাদের বাড়ির সামনে এসে টেক্সি থেকে নামতো, কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে আবার টলতে টলতে চলে যেত, …. এই লোকটির পরিচয় কি হতে পারে সেটা অনুমান করার চেষ্টা করেছিলাম। পরিচালক এর কোন ক্লু দর্শকদের দেননি। এই ছোট্ট রহস্যটুকু মুভিটিকে অন্যরকম দ্যোতনা দিয়েছে বলে মনে হয়েছে।

মুভিটির নামকরন সার্থক। প্রতিটি রিলেশনেরর শেষেই একটা করে অন্তহীন অপেক্ষা বিরাজ করেছে। নায়িকা মারা যাবার পর, নায়ক যখন আবার তার কর্মস্থলে ফিরে যায়, তখন দেখা যায় আপাত স্থির কিছু চরিত্রগুলোর সচলতা। রঞ্জনও ফিরে যায় পারোর কাছে। কিন্তু, বৃন্দার জন্য অভীকের প্রতিক্ষা ঠিকই চলতে থাকে, হয়তো এই প্রতীক্ষাও অন্তহীনের। এক কথায় বলা যায়, বৃন্দার মৃত্যুতে অভিক, পারোর জন্য রনো, পিসিমা তার সেই সুপুরুষকণ্ঠওয়ালা ভদ্রলোক, ভি কে মেহতা আর তার নতুন প্রজেক্ট; এইগুলো সবই এক একটি অন্তহীন প্রতীক্ষার গল্প!

ছবিতে ক্ল্যাসিক্যাল ব্যাপার যেমন আছে, তেমনি আছে ভিন্নস্বাদ ও ভিন্ন মাত্রার ছোয়াঁ। মুভির কনটেন্ট লাইনে প্রেমের ধরন, একাকিত্ব, মদের গ্লাস, অপেক্ষা, কফি সবমিলিয়ে মোটা একটা লাইন টানা যায়, যেটা সত্যিই কলকাতার মুভির অন্যতম রিগিউলার এলিট উপাদান। ইদানিংকার কলকাতার প্রায় সব চলিচ্চিত্রেই এসব উপাদানের উপস্থিতি থাকে। তাই পুরো ব্যাপারটি আমার কাছে খুব একটা আবেদন রাখেনি। দুঃখজনকভাবে, এই আবেদন না রাখার ব্যাপারটিই মুভিতে বারবার এসেছে। তবে মদের রিপিটিটিভ ব্যবহার আমার শুরুর কথাটাই মনে করিয়ে দেয় যে, মুভিতে পরিচালকের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো কলকাতার উচ্চবিত্ত শ্রেনী এখন কতটা আধুনিক ও ব্যস্ত জীবন যাপন করে, সেটা দেখানো। নতুবা ইউরোপ আমেরিকার লোকেরাও মদ খায়, তাদের মুভিতেও মদ থাকে, কিন্তু এইরকম মুর্হুমূহু সেটার রিপিটেশান হয় না।

রাহুল বোস যথারীতি বেশ ভালো পারফরমেন্স দেখালেও তার চরিত্রটি একটু চুপচাপ নিভৃতচারী ধরণের। রঞ্জন চরিত্রে কল্যাণ রায় এবং ভি.কে. মেহরা চরিত্রে শৌভিক কুন্ডগ্রামির অভিনয় ছিল সাবলীল এবং প্রশংসনীয়। শর্মিলা ঠাকুর অভিকের পিসী চরিত্রে বেশ দারুন করেছেন। মুভিটির সংগীত ছিল বেশ উন্নত মানের। শান্তনু মৈত্রের সুরের প্রত্যেকটি গান, বিশেষ করে শ্রেয়া ঘোষালের “যাও পাখি” গানটা অসাধারন হয়েছে! [“যাও পাখি বলো, হাওয়া ছল ছল” আমার খুব প্রিয় একটা গানে পরিণত হয়ে গেছে]।

গানটির দৃশ্যায়ন-চিত্রায়ন এমনই অভূতপূর্ব যে, এটাকে অনায়াসে ‘মিউজিক ভিডিও’ হিসাবে চালিয়ে দেয়া যাবে, দর্শকের আগে পরের কোন কাহিনী জানতে হবে না।

বেশ কিছু অংশ খানিটকা বোরিং লাগলেও, শক্তিশালী সংলাপ এবং অনবদ্য নির্দেশনার কারনে গ্রহনযোগ্যতা আর জনপ্রিয়তার মানদন্ডে সিনেমাটি বেশ ভালভাবেই উৎরে গিয়েছে। তবে ফিনিশিংটা আমার কাছে ভাল লাগেনি। পরিচলক হঠাৎ করে, বলতে গেলে যেন অনেকটা তাড়াহুড়ো করেই কাহিনী শেষ করে ফেলেছেন বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে, কোন ক্লু ছাড়া নায়িকার হঠাৎ মৃত্যু মেনে নেয়াটা দর্শকদের জন্য কঠিন হবে। মুভিটাকে ধীরে সুস্থে শেষ করলে দর্শক হয়তো আরো ভালো ফিনিশিং পেতো।

“অন্তহীন”একই সঙ্গে অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন মানুষের জীবন কাহিনী অথচ যেন এক সুরে বাঁধা একক একটি কাহিনী। ২০১০সালে “বেস্ট ফিচার ফিল্ম” ক্যাটাগরিতে ভারতের জাতীয় পুরস্কার বিজয় করে মুভিটি তার যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। পরে নাকি আরো ৩টাক্যাটাগরিতেও পেয়েছে। যেটা ডিজার্ভ করে “অন্তহীন”!

 

[এটা আমার লাইফের প্রথম এবং শেষ (এখন পর্যন্ত) মুভি রিভিউ। ]

(Visited 533 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন