দ্য গ্রেইট গ্যাটসবি! একজন অসাধারন মানুষ, একটা বায়োগ্রাফি এবং সত্যিকারের প্রেম…

great_gatsby_ver7

দ্য গ্রেইট গ্যাটসবি (The Great Gatsby) দেখে শেষ করলাম। এই মূহুর্তে অদ্ভুত এক ভালো লাগার মুগ্ধ আবেশে নিমজ্জিত মনে হচ্ছে নিজেকে।

মুভিটি দেখার পর শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে, প্রেম তো এমন হওয়াই উচিত। প্রেম তো এমনই হয়।

পুরো মুভিটি আদতে একটা মনোলগ। ক্যারাওয়ের স্বগোক্তি। সে ছিলো গ্যাটসবির নিকটতম প্রতিবেশী। এবং পুরো মুভিতেই আমি দেখেছি গ্যাটসবির প্রতি ক্যারাওয়ের মুগ্ধতা, ভাল লাগা আর ভালবাসা তার টাইপ রাইটারের প্রতিটি স্ট্রকে ঝরে ঝরে পড়তে।

অসামান্য বিত্তবান একজন মানুষ গ্যাটসবি। তার প্রাসাদসম বাড়ী, দামী গাড়ী, একজন স্বনামধম্য ব্যবসায়ি, অক্সফোর্ড থেকে ফেরত একজন যুদ্ধনায়ক – এসব ডাকসাইটে পরিচয় তাকে করেছে ‘গ্রেইট’। কিন্তু এসব পরিচয়কে ছাপিয়ে যায়, আসলে শুধু ছাপিয়ে যায় বল্লে ভুল হবে, বলা উচিত, এসব পরিচয় একেবারেই গৌন হয়ে যায় গ্যাটসবির অসম্ভব কোমল আর পেলব মনের একজন পুরোপুরি নিখাদ প্রেমিক পুরুষ স্বত্তার কাছে!

পার্টির উদ্দামতা, সমুদ্রতীরে প্রাসাদের মতো বাড়ী আর বাহ্যিক জাঁকজৌলুস দেখে তাকে আর ১০টা সাধারন কোটিপতি ভাবলে বিরাট ভুল হবে। কারন আতশবাজির ছটা, পার্টির উদ্দামতা, সমুদ্রতীরে প্রাসাদের মতো বাড়ী আর বাহ্যিক জাঁকজৌলুস এইসবকিছুই মূলতঃ তার প্রেমিকা ডেইজির জন্য ছিলো। কারন, গ্যাটসবি ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের একজন সন্তান অপরদিকে ডেইজি ছিলো নিউইর্য়কের অন্যতম সেরা ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান।

THE-GREAT-GATSBY-International-Poster-04-535x247

ডেইজির সাথে প্রেম করার পর নিয়তি তাদের ছাড়াছাড়ি করে দেয়। যুদ্ধে চলে যায় গ্যাটসবি। কিন্তু যুদ্ধ শেষে সে কর্পদকশূন্য হয়ে মনের মানুষকে বিয়ে করার চাইতে সে চেয়েছিলো আরেকটু গুছিয়ে টাকা পয়সা জোগাড় করে তাকে বিয়ে করতে। কিন্তু ডেইজি এই অভিমানে বিয়ে করে বসে আরেক ধনকুবেরকে। ৫ বছর পর গ্যাটসবি ফিরে আসে ডেইজির স্বামীর চাইতেও বড় ধনকুবের হয়ে, ফিরে এসে সে, সমুদ্রের অপরতীরে, ডেইজির স্বামীর প্রাসাদের মুখোমুখি একটা প্রাসাদ কিনে। আরে সে প্রতিরাতে ডেইজির স্বামীর প্রাসাদের সামনের সবুজ বাতিঘরের দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকতো।

এরপর সে প্রায়ই, খুব ঘন ঘন তার প্রাসাদে অত্যন্ত জমকালো পার্টির আয়োজন করতো, শুধুমাত্র এই আশায় যে, তার ডেইজি হয়তো কোন এক দিন কোন একটা পার্টিতে আসবে। আর সে তাকে আবার দেখতে পাবে।

এরপর যখন নিয়তি আবার তাকে এক করে দেয়, ডেইজির চাচাতো ভাই ক্যারাওয়ের সৌজন্যে, গ্যাটসবির উচ্ছাস দেখে আমি অবাক আর মুগ্ধ হয়ে যাই, আমার চোখে পানি এসে যায়। এত বড় আর প্রভাবশালী একজন মানুষ, এত্ত ব্যক্তিত্ববান একটা পুরুষ একবারে একটা টিনেজ ছেলের মতো আচরন করে। একটা টিনেজ ছেলে তার প্রেমিকাকে দেখে যেমন নার্ভাস হয়ে যায়, যেমন ইতস্তত করে, কি করে প্রেমিকার মন ভোলাবে সে ঠিক ঠাহর করতে পারে না, আমি ৩২ বছর বয়স্ক গ্যাটসবিকে সেইরকম টিনেজের মতো উদভ্রান্ত আচরন করতে দেখি। ক্যারাওয়ের বাসায় ক্যারাওয়েকে দিয়ে চায়ের আমন্ত্রন জানায় গ্যাটসবি, ক্যারাওয়েরর বৈঠকখানা গ্যাটসবি ফুল দিয়ে ভরে ফেলেছিলো, আক্ষরিক অর্থেই। সে দিন কি তুমুল বৃষ্টি, গ্যাটসবি অভিজাত পুরুষ, মেয়েদের সাথে মিশার অভিজ্ঞতা তার ঢের, অথচ সেই গ্যাটসবিকেই লাগছিলো চরমতম নার্ভাস আর সে বার বার অস্থির হয়ে ঘড়ি দেখছিলো। উফ! কি নিদারুন সেই সময়টার অভিব্যক্তি ডি ক্যাপ্রিও ফুটিয়ে তোলে তার চোখে মুখে। আমার ক্ষমতা থাকলে ডি ক্যাপ্রিওকে শুধুমাত্র সেই সময়কার চিত্রায়নের জন্যই অস্কার পুরস্কার দিতাম।

ডেইজি হয়তো আর আসবে না – এমন ধারনার বশবর্তী হয়ে অভিমান করে গ্যাটসবি যখন চলে যেতে পা বাড়িয়েছে, অমনি বাইরে গাড়ির হর্ণ। অনেক অনেক আগের এ কথা, ১৯২২ সালের, মনে হচ্ছিলো যেন আমি ঠিক সেই সময়টাতে দাড়িঁয়ে আছি, সব ঘটনা চাক্ষুষ করছি। ৫ বছর পর দেখা হচ্ছে প্রিয় মানুষটার সাথে, কেমন অনুভূতি হবার কথা তখন? ডেইজিকে অভ্যর্থনা জানাতে ঘরে বসে থাকার বদলে গ্যাটসবি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে হয়ে সামনের দরজা দিয়ে ফিরে এলো প্রেমিকার সামনে। আমার চোখ কেন যেন বার বার ভিজে যাচ্ছিলো…ইয়েস, সত্যিকারের প্রেম এমনই হয়!

THE GREAT GATSBY

ডেইজি যখন গ্যাটসবির প্রাসাদসম বাড়ীর প্রতিটা জায়গা আনন্দ উচ্ছাসে ঘুরে ঘুরে দেখছিলো, তার নরম তুলতুলে বিছানায় শুয়ে মুগ্ধ হচ্ছিলো, তখন নিশ্চয়ই গ্যাটসবির মনে হচ্ছিলো তার প্রাসাদ কেনাটা পুরোপুরি সার্থক হয়েছে। ডেইজিকে বাচাঁতে গিয়ে হাসিমুখে নিজের কাধেঁ ডেইজির ভুলের মাশুল – আস্ত একটা খুনের দায় নেয়া, সত্যিকারের প্রেমিক না হলে এটা অসম্ভব। এবং ক্যারাওয়েকে বলে, ”ডেইজি যে গাড়ী চালাচ্ছিলো, এই কথা যেন ভুলেও কেউ না জানে। সবাই জানুক যে গাড়িটা আমিই চালাচ্ছিলাম।” এমনকি ডেইজির স্বামী যেন ডেইজিকে কোন রুপ হয়রানি না করতে পারে, এই কারনে তাদের বাড়ীতে ভোর পর্যন্ত লুকিয়ে থাকা। ভোরের দিকে একবার জানালার কাছে ডেইজি এসেছিলো, তাতেই কি খুশী হয় গ্যাটসবি।

***[গত ১৪ মাসেরও যারা মুভিটি দেখার সময়-সুযোগ পান নাই , তারা এই অংশের পর আর পড়বেন না। যদি একান্তই পড়তে চান নিজ দায়িত্বে পড়বেন।]***

শেষ পর্যন্ত পরদিন সকাল বেলাতেই, তার প্রেমিকার খুনের দায় তাকে মেটাতে হয় নিজের জীবন দিয়ে। শুধু তাই নয়, মৃত্যুর পর মহান চরিত্রের অধিকারী গ্যাটসবির চরিত্রও হনন করলো স্থানীয় পত্রিকাগুলো। কিন্তু সত্য জানলো শুধুই একজন মাত্র মানুষ। ডেইজির চাচাতো ভাই ক্যারাওয়ে।

ভীষন ট্রাজেডি যে, মুভির শেষে সত্যিকার প্রেমের জয় দেখানো হয় না, বরং জয় হয় ডেইজির লম্পট আর ধুরন্ধর স্বামী টমের। [প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ডেইজির স্বামী চরিত্রে জোয়েল এডগারটন অসামান্য অভিনয় করেছেন। তার জন্মভূমি সিডনীর ব্ল্যাক টাউনে মাস কয়েক থাকা হয়েছিলো আমার। সেখানে অনেক বাঙ্গালী বাস করেন।] কিন্তু সত্যিকারের প্রেমের জন্য কতদূর পর্যন্ত যাওয়া যায়, কত সময় অপেক্ষা করা যায় আর কতখানি আত্নত্যাগ করা যায়; সেটার এক অসামান্য নির্দশন এই মুভিটি। এমনকি মৃত্যুর পূর্বক্ষনেও সে আচ্ছন্ন ছিলো তার প্রেমিকার প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসায়। গুলি খেয়ে পুলের উপর আছড়ে পড়ার সময় তার মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের হয় শুধু – ”ডেইজি।”The Notebook এর পর এত তীব্র রোমান্টিক মুভি হয়তো আর দেখা হয়নি আমার।

মুভিটি যে উপন্যাসের উপজীব্য, সেটা অনেকে পড়েছেন। কিন্তু আমি পড়িনি। আমি একেবারেই হঠাৎ এই মুভিটি দেখতে বসেছি। কারন প্রথমে Wolf of Wall St. দেখার জন্য বসেছিলাম। কিন্তু মুভি ছেড়ে দেখি প্রিন্ট ভালো না। তাই অগত্যা ঐ একই ফোল্ডারের গ্রেইট গ্যাটসবি দেখতে বসেছিলাম। এবং প্রথম ১৫ মিনিটের মধ্যেই মুভির একদম ভেতরে প্রবেশ করে ফেলেছিলাম। আমার ব্যক্তিগত একটা সমস্যা হলো, যে মুভির প্রথম ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে  ভিতরে ঢুকতে পারবো না, সে মুভি হজম করা আমার জন্য সমস্যা হয়ে দাড়াঁয়।

images

টবিকে দেখলে আমার কেন যেন শুধু স্পাইডারম্যানের কথাই মনে হয়। স্পাইডার ম্যান ছাড়া আর কোন মুভিতে ওকে মানায় না ঠিক আমার কাছে। তবে এ মুভিতে টবির অভিনয় খুব ভালো হয়েছে, তবে অসাধারন মনে হয় নি।  মুভিটা টেনে টেনে আবার দেখলাম, টবির মুখের এক্সপ্রেশানের সাথে ডায়লোগের সামঞ্জস্যতা দেখার জন। দেখলাম যে বেশীর ভাগ সংলাপেই টবির এক্সপ্রেশান ছিলো সাদামাটা। গড়পড়তা।

ডেইজির প্রতি আমার ঘৃনা হয়নি তবে অবাক হয়েছি খুব। মেয়েটা কেন স্বীকার করলো না যে, দুর্ঘটনার জন্য সে-ই এককভাবে দায়ী? কেন গ্যাটসবিকে সে তার অপরাধের দায় নিতে দিলো?! এখানে আমার তাকে পুরোপুরি ব্যক্তিত্বহীন একজন নারীই মনে হয়েছে। তাছাড়া, ডেইজি স্থানীয় পত্রিকাগুলোর খবরও বিশ্বাস করেছে বলে মনে হয়েছে, যেগুলো গেটসবির চরিত্র হনন করেছিলো আর কি!  তবে তার কান্নার অভিনয়, তার বাদামী চোখদুটো ছল ছল করে ওঠা শটগুলো প্রানবন্ত ছিলো।

মুভিটার সেট ডিজাইন আর কস্টিউম এক কথায় অসাধারন! সিনেমাটোগ্রাফিও ছিলো মারাত্নক আই ক্যাচিং! মুভিতে ভিনটেজ আবহ আনতে পরিচালকের আন্তরিকতা ও চেষ্টার কোন ক্রটি ছিলো না। বিশেষ করে, গ্যাটসবি আর টমের গাড়ী দুটোতে তো ছিলো ফ্যান্টাবুলাস!

THE-GREAT-GATSBY-International-Poster-03-535x164

 

গেটসবির সাউন্ডট্রেকগুলোও অসাধারন। প্রচন্ড ভালো লেগেছে ফার্জির গাওয়া A Little Party Never Killed Nobody আর লানা ডেল রায়ের Lana Del Rey – Young and Beautiful  গানটি।  লানা ডেল রের সাথে প্রথম পরিচয় সিংগাপুর এয়ারলাইনসে, সিডনী থেকে চাংগী এয়াপোর্টে যাবার পথে। ঢাকায় আসতে হলে সেখানে ট্রানজিট থাকে ২ ঘন্টার। লানার –  বর্ণ টু ডাই, গানটা প্রতিবারই শুনার সময় মাতাল হয়ে যাই সুরে আচ্ছন্ন হয়ে। 

আর পার্টির সিনগুলো এতটাই প্রানবন্ত ছিলো যে,  দেখার সময় মনে হয়েছে, যেন আমি স্বশরীরেই সে সব পার্টি এটেন্ড করছি। থ্রিডিতে পার্টি সিনগুলো দেখতে পারলে খুব ভালো হতো। আমার মনে হয়, মুভিতে থ্রিডিতে রিলিজের সার্থকতা এখানেই।

the_great_gatsby_0

এই মুভিটি দুটি শাখায় অস্কার পেয়েছে। কিন্তু লাভ কি? যার পাওয়ার কথা ছিলো সে তো আর অস্কার পেলো না। আমি এই জিনিসটা এখনো বুঝি না এত অসম্ভব ভালো অভিনয় করার পরও ক্যাপ্রিও অস্কার পায় না কেন! অস্কার পাওয়া দুরে থাক, এ পর্যন্ত নমিনেশনই পেয়েছে মোটে ৪টা। অথচ টাইটিানিকখ্যাত এই নায়কের আরো কমপক্ষে গোটা পাচেঁক নমিনেশন পাওয়া উচিত ছিলো। জুরি বোর্ডের ঠিক কোন সদস্যের সাথে তার বিরোধ আল্লাহই জানেন!

সবশেষে, যে দুটি শটের জন্য লিও বিশেষভাবে অস্কার ডিজার্ভ করে (আমার মতে), সেটা হচ্ছেঃ 

gatsby – মুভির এই দুই জটিল সময়গুলো লিও তার শারীরিক ও বাহ্যিক ভাব-অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, সেটা অবিস্মরনীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করি।

সবশেষে গ্যাটজবির সবচাইতে বিখ্যাত গান – লানা ডেল রে এর গাওয়া – ইয়ং এন্ড বিউটিফুল। অসাধারন এক গান!!

 

(Visited 301 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    পোস্ট টা আগেও দেখেছি মনে হচ্ছে। মুভির সেট ডিজাইন আর কস্টিয়ম অসাধারন লেগেছিল… 

  2. প্রলয় হাসান says:

    হুম, এখানে দেখেছিলেন মনে হয় https://www.facebook.com/groups/BD.Movie.Lovers/permalink/683170211736353/

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন