আমির দ্যা হিরো

Aamir-Khan- (4)

অনেকদিন পর আজ বায়োগ্রাফি লিখতে বসলাম। অনেক আগেই ইচ্ছে ছিল এই বায়োগ্রাফি লিখার কিন্তু সময় করে উঠতে পারছিলাম না। আজ ভাবলাম লিখেই ফেলি। লিখতে যাচ্ছি আমার প্রিয় একজন বলিউড অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক আর সম্প্রতি উপস্থাপককে নিয়ে। আমি জানি তার নাম বলার সাথে সাথে অনেকেই বলবেন তিনি আপনাদের ও অনেক প্রিয়। তিনি এমনি এক শক্তিমান অভিনেতা যে তাকে কেউ পছন্দ না করেই পারেন না। বলছি হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি ছবিতে কাজ করা অভিনেতা আমির খানের কথা।

বলিউডের যত অভিনেতা রয়েছেন তার মধ্যে আমির খান কাজ করেছেন সবচাইতে কম কিন্তু সুনাম কুড়িয়েছেন তার কিছু সংখ্যাক কাজের মাধ্যমে। সাফল্যমন্ডিত এই শিল্পীর জীবন কেমন ছিল কিভাবে ছিল তার শুরু আসুন জেনে নেয়া যাক।

208414_1242043883605_432_325

আমির খানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ১৪ই মার্চ, মুম্বাইয়ে। বাবা তাহির হোসেন ছিলেন একজন চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক। যদিও তাহির হোসেন চলচ্চিত্র জগতে সাফল্যের দেখা পাননি কিন্তু তার ছেলে অর্জন করেছেন সর্বোচ্চ সাফল্য। আমিরের শৈশব আর কৈশোর কেটেছে আর্থিক অস্বচ্ছলতা দেখে। স্কুলের সময় কেটেছে অনেকটা আশংকা নিয়ে যে সঠিকভাবে বেতন পরিশোধ না করার ফলে কবে জানি নাম কাটা পড়ে। আমিরের অবশ্য লেখাপড়ার চাইতে খেলাধুলায় বেশি মন ছিল। ভালবাসতেন টেনিস খেলতে আর খেলেছেনও স্টেট লেভেল চ্যাম্পিয়নশীপে।

অভিনয়ে প্রথম পা রাখেন ৮ বছর বয়সে। অবশ্য একে অভিনয় বলা চলেনা। ১৯৭৩ সালের চলচ্চিত্র ‘ইয়াদো কি বারাত’ ছবির একটি গানে আমিরকে প্রথম দেখা যায়। এরপর ১৯৭৪ সালে তার বাবার প্রযোজিত ছবি ‘মাদহোশ’ এ অভিনয় করেন। এরপর ১৬ বছর বয়সে হাইস্কুলে পড়ার সময় তার স্কুল বন্ধু আদিত্য ভট্টাচার্যের পরিচালনায় Paranoia নামক ৪০ মিনিটের একটি নির্বাক ছবিতে অভিনয় করেন। খানের চলচ্চিত্রে কাজ করাকে তার পরিবার সমর্থন করেননি। স্বাভাবিকভাবেই তাদের বাজে অভিজ্ঞতা আর ব্যর্থতাই এর পেছনে কারণ ছিল। তারা চেয়েছিলেন খান ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গরে উঠুন। Paranoia তে কাজ করে অভিনয়ের প্রতি আমির খানের আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। তিনি যোগ দেন ‘আবান্তর’ নামক একটি থিয়েটার গ্রুপে। দেড় বছর খান সেই গ্রুপের মঞ্চের পেছনে কাজ করেছেন। এরপর অতি ছোট একটি চরিত্রের মাধ্যমে মঞ্চে অভিষেক করেন। হাইস্কুল শেষ করার পর আমির সিদ্ধান্ত নেন তিনি লেখাপড়া ছেড়ে দিবেন। বাবা-মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করে খান নাসির হোসেনের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন ‘মাঞ্জিল মাঞ্জিল’ (১৯৮৪) ও ‘জাবারদাস্ত’ (১৯৮৫) নামক চলচ্চিত্রতে।

images

সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময় আমির Film and Television Institute of India এর ছাত্রদের নির্মিত একটি ডকুমেন্টারিতে কাজ করেন। এই ডকুমেন্টারিতে তার কাজ দেখেন পরিচালক কেতন মেহতা। তিনি আমিরকে নিজে তৈরী করেন চলচ্চিত্র ‘হোলি’ (১৯৮৪)। চলচ্চিত্রটি দর্শক জনপ্রিয়তা পেতে ব্যর্থ হলেও আমিরের অভিনয় নজর কাড়ে পরিচালক নাসির হোসেন ও তার পুত্র মানসুরের। মানসুর তার চলচ্চিত্র ‘কেয়ামাত সে কেয়ামাত তাক’ (১৯৮৮) এর জন্য আমিরকে কাস্ট করেন জুহি চাওলার বিপরীতে। ছবিটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে আমির সবার নজরে চ্লে আসেন। চলচ্চিত্রটি অর্জন করে সাফল্য। আর সেই সাথে ছিনিয়ে নেয় ৭টি ফিল্মফেয়ার এ্যাওয়ার্ড এর মধ্যে একটি ছিল সেরা নতুন অভিনেতার পুরস্কার। ১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় আদিত্য ভাট্টাচার্যের চলচ্চিত্র ‘রাখ’। একি সালে আমির অর্জন ন্যাশনাল চলচ্চিত্র পুরস্কার-স্পেশাল জুড়ি পুরস্কার অর্জন করেন ‘কেয়ামাত সে কেয়ামাত তাক’ ও ‘রাখ’ এ দুটি ছবিতে তার অনবদ্য অভিনয়ের জন্য। পরবর্তীতে একি সালে আমির আবারো জুহি চাওলার বিপরীতে অভিনয় করেন ‘লাভ,লাভ,লাভ’ ছবিতে। যদিও ছবিটি সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়।

Amir-Khan-Wallpapers-14

১৯৯০ সালে আমির খানের ৫টি মুভি মুক্তি পায়। এগুলো হলো ‘আওয়াল নাম্বার’, ‘তুম মেরে হো’, ‘দিওয়ানা মুজসা নেহি’, ‘জাওয়ানি জিন্দাবাদ’ এবং ‘দিল’। এর মধ্যে সাফল্যের মুখ দেখে কেবলমাত্র ‘দিল’। তখনকার তরুণসমাজে এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে প্রকোটভাবে আর বছরের সর্বোক্চ আয়ের মুভি হিসেবে সাফল্য অর্জন করে। আমিরের সফল্য বজার থাকে পরবর্তী বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র পূজা ভাটের সাথের কমেডি রোমান্টিক চলচ্চিত্র ‘দিল হ্যায় কে মানতা নেহি’। যদিও ছবিটি ছিল হলিউড চলচ্চিত্র ‘It Happened One Night এর পুরোপুরি কার্বন কপি।

১৯৮০ আর ১৯৯০ এর দিকে বেশ কিছু চলচ্চিত্রে আমির খান অভিনয় করেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘জো জিতা ওহি সিকান্দার’ (১৯৯২), ‘হাম হ্যয় রাহি পেয়ার কে’ (১৯৯৩), ‘রাঙ্গিলা’ (১৯৯৫) আর ‘আন্দাজ আপনা আপনা’। প্রায় প্রতিটি ছবিই দেখা পেয়েছে সাফল্যের।

aamir-khan

এরপর আমির বছরে একটি বা দুটি ছবিতে কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন। ১৯৯৬ সালে মুক্তি পায় পরিচালক ধার্মেশ দর্শনের চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র ‘রাজা হিন্দুস্থানি’। কারিশমা কাপুরের বিপরীতে অভিনিত এই চলচ্চিত্রটি বয়ে আনে আমিরের জন্য প্রথমবারের মত সেরা অভিনেতার ফিল্মফেয়ার এ্যাওয়ার্ড। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পায় অপর সাফল্যমন্ডিত চলচ্চিত্র ‘ইশ্ক’ এতে তার সহকারী অভিনয় শিল্পীরা ছিলেন জুহি চাওলা, কাজল আর অজয় দেবগান। ১৯৯৮ সালে মুক্তি পায় মাঝারি ধরনের সাফল্য অর্জিত চলচ্চিত্র ‘গুলাম’ এতে সহ অভিনেত্রী ছিলেন রানী মূখার্জি। চলচ্চিত্রটিতে আমির প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবেও অভিষেক করেন। ১৯৯৯ সালে অপর মাঝারি সাফল্যের চলচ্চিত্র ‘সারফারোশ’ যদিও ছবিটি আমার অন্যতম প্রিয় একটি চলচ্চিত্র। একি সালে মুক্তি পায় তার অভিনিত দিপা দত্তের আর্ট ফিল্ম Earth। এরপর নতুন সহস্রাব্দে মুক্তি পায় তার মুভি ‘মেলা’। ছবিটিতে টুইঙ্কেল খান্নার পাসাপাশি তার সহ অভিনেতা ছিলেন তারই আপন ভাই ফয়সাল খান।

images (1)

২০০১ সালে মুক্তি পায় ‘লাগান’ যা প্রধান সমালোচনামূলক ও বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করে। আর নির্বাচিত হয় ৭৪তম একাডেমি এ্যাওয়ার্ডে সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে। চলচ্চিত্রটি অর্জন করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আর আমির অর্জন করেন দ্বিতীয় ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেতা পুরস্কার। ‘লাগান’ এর সাফল্য চলতে থাকে পরবর্তী ছবি একি সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিল চাহতা হ্যায়’ চলচ্চিত্রেও। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন তখনকার নতুন পরিচালক ফারহান আকতার।

চার বছর বিরতির পর আমির খান আবারো বড় পর্দায় প্রত্যাবর্তন করেন ২০০৫ সালে ‘Mangal Pandey: The Rising’ ছবির মাধ্যমে। ২০০৬ সালে মুক্তি পায় ‘রং দে বাসান্তি’। ছবিটি বছরের সর্বোচ্চ আয় অর্জন করে আর ভারতীয় কোন চলচ্চিত্র হিসেবে প্রথমবারের মত প্রবেশ করে অস্কারে। যদিও তা শর্ট লিস্টেড হতে পারেনি অস্কার নমিনেশনের জন্য কিন্তু BAFTA এ্যাওয়ার্ডের জন্য সেরা বেদিশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে নমিনেশন পায়। ২০০৬ সালে মুক্তি পায় অপর চলচ্চিত্র ‘ফানা’ যাতে আমির অভিনয় করেন কাজলের বিপরীতে। এই ছবিটিও সাফল্য অর্জন করে নেয়।

60324

আমির খান পরিচালক হিসেবে ইভিষেক করেন নিজের প্রযোজনায় চলচ্চিত্র ২০০৭ সালে ‘তারে যামিন পার’। এই ছবির সাফল্যের কথা তো আর বলার মত কিছু নয়। ২০০৮ সালে মুক্তি পায় ‘গাজিনী’ চলচ্চিত্র। এটিও ছিল বাণিজ্যিক সাফল্যমন্ডিত আর অর্জন করে বেশ কিছু চলচ্চিত্র পুরস্কার। আর কেনই বা নয় তা অসাধারন অভিনয় দক্ষতা তাই প্রমাণ করে। ২০০৯ সালে আমির আবার আসেন পর্দায় 3 Idiots চলচ্চিত্রে। এর সাফল্য ভেঙ্গে ফেলে গাজিনীর সকল রেকর্ড। ২০১১ সালে মুক্তি পায় অপর একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র আমিরের নিজস্ব প্রোডাকশন হাউজের Dhobi Ghat।

২০১২ সালের মার্চ মাসে আমির খান উপস্থাপক হিসেবে অভিষেক করেন বহুল অপেক্ষিত ও জনপ্রিয় টিভি শো Satyamev Jayate। শোটির বিষয় হচ্ছে সমাজের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা। একি সালে মুক্তি পায় তার অপর চলচ্চিত্র ‘তালাশ’। এই ছবিটিও জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

131584090527690

২০১৩ সালে মুক্তি পায় Dhoom 3। ছবিটি যদিও অনেক জনপ্রিয়তা ও সাফল্য অর্জন করে কিন্তু আমার কাছে এক্বারেই ভালো লাগেনি। বার বার মনে হয়েছে আমির কেন এই ধরনের একটা ছবিতে কাজ করলো। এতা একান্তই নিজস্ব মতামত। আর সর্বশেষ এই বছর মুক্তির অপেক্ষায় আছে চলচ্চিত রাজকুমার হিরানি পরিচালিত PK। অপেক্ষায় আছি আরেকটি আমিরের সেরা মুভি দেখার।

ব্যক্তিগত জীবনে আমির খান ২০০২ সালে রিনা দত্তের সাথে ১৫ বছরের বিবাহিত জীবনের সমাপ্তি করেন। তাদের একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। ২০০৫ সালে তিনি আবারো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন কিরণ রাওয়ের সাথে। তাদের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে।

(Visited 396 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৮ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. বেশ রিসোর্সফুল লেখা। ধন্যবাদ, ভাল লাগল!

  2. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    অনেক তথ্য সমৃদ্ধ পোস্ট। শেয়ার করার জন্য অনেক ধন্যবাদ… 🙂

  3. ফরেস্ট গাম্প says:

    প্রিয় মানুষকে নিয়ে এরকম লিখা পেলে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলি, ধন্যবাদ লিখাটার জন্য।

  4. শাতিল আফিন্দি says:

    ভালো গবেষণা করসেন দেখা যাচ্ছে! আমির কে ভালো লাগে, তবে ইদানিং তিনিও শুধু ব্যবসার দিকে মনোযোগ দিয়ে মুভি করছেন।

  5. পাঁজর পাঁজর says:

    সারফারোশ – এ আমিরের বাস্তবধর্মী অভিনয় বলিউডে খুব কমই দেখা মেলে। লেখাটা পড়ে ছবিটার কথা আবার মনে পড়ে গেল।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন