প্রথম হলিউড পরিচালক-কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া এক নাম
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

MV5BMTgzOTY1NzUzN15BMl5BanBnXkFtZTYwNDAxNjI2._V1_SX214_CR0,0,214,317_AL_

উপরে যে ব্যক্তির ছবি দেখতে পারছেন তাঁকে অনেকেই হয়ত চিনেন না। আমি নিজেও চিনতাম না। তবে  ব্লগার আদ্রের লেখা  ‘চলচ্চিত্রের ভাষা:সত্যজিতের বিশ্লেষনে’ নামক পোস্টটি পড়ে তাঁর নামটি জানতে পারলাম। আর অবাক হলাম এমন একজনের কথা জানতামইনা। তাঁর নাম D. W. Grifith, হলিউড চলচ্চিত্রের প্রথম পরিচালক। যার হাত ধরে নির্মিত হয়েছিল হলিউডের সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র। আজ আমার লেখা তাঁকে নিয়ে।

হলিউডে সর্বপ্রথম যে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিল তা ছিল নির্বাক। নাম ছিল  In Old California আর তা নির্মিত হয়েছিল ১৯১০ সালে। যদিও তা মুক্তি পায়নি তখনি। আর এই নির্বাক চলচ্চিত্রটি নির্মান করেছিলেন D. W. Grifith। চলচ্চিত্রটি প্রযোজিত হয়েছিল প্রথম হলিউডভিত্তিক কোম্পানি Biograph Company  এর হাত ধরে। এখানে বলে রাখা উচিৎ, অনেকের মতেই হলিউডের প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ১৯১৪ সালে Cecil B. DeMille এর পরিচলনায় The Squaw Man। কেননা তখন পর্যন্ত In Old California নামক চলচ্চিত্রটি সকলের অগোচরে ছিল। এমন একটি চলচ্চিত্রটি ৯৪ বছর নিখোঁজ থাকার পর ২০০৪ সালে আবিস্কৃত হয়েছিল। এবার আসা যাক পরিচালকের কথায়।

download

Grifith ১৮৭৫ সালের ২২শে জানুয়ারি ক্যান্টাকিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় তাঁর বড় বোনের কাছে। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারে দারিদ্রতা প্রখরভাবে দেখা দেয়। তাদের মা তাদেরকে নিয়ে Louisville এ চলে আসেন। তখন Grifith এর বয়স ১৪। সংসারের আয় তখন ছিল তাঁর মায়ের করা একটি বোর্ডিং হাউজ কিন্তু তা আর্থিক স্বচ্ছলতা আনতে ব্যর্থ হয়। Grifith তখন পরিবারের আর্তিক দায়ভার গ্রহণ করেন আর তাঁকে ছেড়ে দিতে হয় হাইস্কুল। কাজ করেন একটি বইয়ের দোকানে ।

D.W. Griffith 1

Grifith তাঁর কর্মজীবনের সূচনা করেন নাট্যকার হিসেবে যদিও তাতে সফলতা একেবারে পাননি বললেই চলে। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন তিনি অবিনেতা হিসেবে কাজ করবেন। কাজ করেছেন অনেক মঞ্চ নাটকে তবে সবগুলোই ছিল অতিরিক্ত চরিত্রের। ১৯০৭ সালে নাট্যকার হিসেবেই তিনি পাড়ি জমান নিউ ইয়র্কে। সেখানে নিজের লেখা একটি স্ক্রিপ্ট বিক্রির চেষ্টা চালান একটি প্রোডাকশন কোম্পানিতে কিন্তু ব্যর্থ হন। তবে সেই প্রযোজক তাঁকে একটি চরিত্রে অভিনয়ের আমন্ত্রন জানান। সেখানে কাজ করতে গিয়ে Grifith ব্যপারটির প্রতি আগ্রহ অনুভব করেন আর শুরু করেন চলচ্চিত্র ব্যবসা নিয়ে বিশ্লেষন। ১৯০৮ সালে Grifith প্রখ্যত কোম্পানি Biograph এর সাথে অভিনয়ের কাজে যোগদান করেন। তাঁর ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব ছিল সেখানেই কিন্তু তআ বদলে গেল যখন Biograph কোম্পানির প্রধান পরিচালক Wallace McCutcheon অসুস্থ হয়ে পড়েন আর তার ছেলে  সকল দায়িত্ব গ্রহন করেন। কিন্তু Wallace McCutcheon Jr. দায়িত্ব নেবার পর থেকেই স্টুডিও আর সফলতা পাচ্ছিলনা। তখন Biograph Company এর প্রধান Henry Marvin সকল দায়িত্ব Grifith কে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

images (2)

সে সময়ে Grifith দেখলেন যে বিশ্লেষনধর্মী চলচ্চিত্র বাণিজি্যকভাবে সফল। আর তাই ১০১৪ সালে তিনি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন Judith of Bethulia নামক ছবি। কিন্তু Biograph কোম্পানি দেখল যে এত দীর্ঘ চলচ্চিত্র তেমন একটা সফল নয়। অভিনেত্রী Lillian Gish এর মতে, Biograph ভেবেছিল দীর্ঘ চলচ্চিত্র দর্শকদের চোখের জন্য ক্ষতিকর। কোম্পানির সাথে Grifith এর মতের অমিল আর ছবি নির্মানে অতিরিক্ত ব্যয় হয়ে যাওয়াতে তিনি Biograph ছেড়ে দেন আর যোগ দেন Mutual Film Corporation এ। তাঁর সাথে ছিলেন কেবল তাঁর ছবিতে কাজ করেছেন এমন সব অভিনেতা-অভিনেত্রী।

images (1)

১৯১৫ সালে তিনি নির্মান করেন The Clansman যা পরবর্তীতে পরিচিতি পায় The Birth of a Nation। ঐতিহাসিকভাবে এই চলচ্চিত্রটি প্রথম ব্লকবাস্টার হিট হয়েছিল। মুভিটি জনপ্রিয় হয়েছিল আর ভেঙেছিল সকল বক্স অফিস রেকর্ড ঠিকই কিন্তু তৈরী করেছিল অনেক বিতর্কের গৃহযুদ্ধের নানা দিক নিয়ে।

তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্র ছিল Intolerance, ধারনা করা হয় এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে Grifith জবাব দিয়েছিলেন সকল ক্রিটিকদের। ছবিটি বক্স অফিসে ভালো করলেও আর্থিক সফলতা আনতে পারেনি।

images (4)

এরপর Grifith যোগদান করেন বিভিন্ন চলচ্চিত্র কোম্পানিতে। ১৯১৭ সালে তিনি যোগ দেন Artcraft এ যা  Paramount এর একটি অংশ ছিল। এরপর ১৯১৯-১৯২০ পর্যন্ত ছিলেন First National এ। একি সময়ে তিনি Charlie Chaplin, Mary Pickford আর Dauglas Fairbanks এর সাথে মিলিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন United Artists নামক কোম্পানি। সেখান থেকে তিনি অনেক ছবি নির্মান করলেও কোনটাই বক্স অফিসে নাম কুড়াতে পারেনি। ১৯১৫ সালে Martyrs of the Alamo নামক একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনায় করেছেন তিনি।

United Artists টিকে গেলেও তার সাথে Grifith এর সংযুক্ততা ছিল স্বল্প সময়ের। সেখান থেকে তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো ছিল ১৯১৯ সালে Broken Blossoms, ১৯২০ সালে Way Down East, ১৯২১ সালে Orphan of the Storm, Dream Street, ১৯২২ সালে One Exciting Night এবং ১৯২৪ সালে America. এরমধ্যে প্রথম ৩টি বক্স অফিসে সফলতা আনে। তবে ১৯২৪ সালে জোরপূর্বক তাঁকে ছাড়ানো হয় কোম্পানি যখন তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র Isn’t Life Beautiful বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়।

images (3)

১৯২৯ সালে D. W. Grifith আবারো পরিচালনার কাজে ফিরে আসেন। ১৯৩০ সালে নির্মান করেন Abraham Lincoln আর ১৯৩১ সালে নির্মান করেন The Struggle যার কোনটাই সফলতা বয়ে আনতে পারেনি। এই ছিল টাঁর শএষ কাজ। এরপর Grifith আর কোন চলচ্চিত্রই নির্মান করেননি।

১৯৩৬ সালে পরিচালক Woody Van Dyke যইনি Grifith এরসাথে Intolerance এ কাজ করেছিলেন, Grifith কে তার চলচ্চিত্র San Francisco এর বিখ্যাত ভূমিকম্পের দৃশ্যটি ধারনের জন্য বলেন কিন্তু সেজন্য তাঁকে কোন ক্রেডিট দেয়া হয়নি ছবিতে। তবে চলচ্চিত্রে বিভিন্ন অবদানের জন্য Grifith কে ১৯৩০ এর মধ্যবর্তী সময়ে বিশেষ অস্কার দেয়া হয়।  

images

১৯৪৬ সালে Grifith, Dual in the Sun নামক চলচ্চিত্রের শুটিং লোকেশন পরিদর্শনে যান। এত অভিনয় করছিলেন তার পুরনো অভিজ্ঞ কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রী। কিন্তু অভিনেতা-অভিনেত্রীরা তাদের পুরনো পরামর্শদাতার উপস্থিতিকে শুটিং এ বিঘ্ন ঘটাচ্ছে বললে Grifith কে তাঁর পরিদর্শন স্বল্প সময়ে শেষ করার জন্য বলা হয়।

লস এঞ্জেলেসের একটি হোটেলের লবিতে Grifith কে অচেতন অবস্থায় আবিস্কার করা হয় ১৯৪৮ সালের ২৩শে জুলাই। সেখানে তিনি একাকী বসবাস করছিলেন। পরে হাসপাতালে নেবার পথে তাঁর মৃতুয়া; ঘটে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে।

griffiths-camera

কথায় আছে, মানুষের মৃত্যুর পর তার কাজের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। Grifith এর ক্ষেত্রে তাই ঘটেছিল। জীবদ্দশায় যিনি নিজের কাজের জন্য সুনাম কুড়াতে পারেননি বা তাঁর কাজের মূল্যায়ন হয়নি তাঁর মৃত্যুর পর সেসবের মূল্যায়ন ঘটতে থাকে। অনেক বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতার তখন Grifith এর অবমূল্যয়নের জন্য মুখ খুলতে শুরু করে। তারা প্রকাশ করেন তাদের ঘৃণা।

D. W. Grifith ই প্রথম যিনি বুঝতে পেরেছিলেন একটি নির্দিষ্ট ফিল্ম কৌশল চলচ্চিত্রে একটি ভাবপূর্ণ ভাষা তৈরীতে সহায়তা করতে পারে।   

 

 

 

এই পোস্টটিতে ৭ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. শাহরিয়ার লিমু শাহরিয়ার লিমু says:

    থিওরিটিক্যাল গড অফ সিনেমা। উনার বেস্ট কাজ হলো "দ্যা বার্থ অফ এ নেশন" অলমোস্ট শোয়া তিন ঘন্টার মুভি। সেই সময়ে এই সাইজের মুভি বানাতে কেমন খরচ গেছে চিন্তা করতে পারেন? 🙁

    লেখা ভাল্লাগছে। (y)

  2. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    খরচের পরিমাণ তো ছাড়িয়ে গেছে, সে কারণেই তো Biograph ছাড়তে হয়েছিল বেচারাকে।  

  3. ENAMUL KHAN says:

    ১. ইনটলারেন্স -১৯১৬

    ২. ইজ নট লাইফ ওয়ান্ডারফুল – ১৯২৪

    ৩. আব্রাহাম লিংকন – ১৯৩০

    ৪. দি স্ট্রাগল – ১৯৩১

    এইগুলাও তাঁর মাস্টের পিস।

    ১৯৩১ সালে আরও একটা ছবিতে হাত দিয়েছিলেন কিন্তু কোন প্রযোজক খুজে পাননি। যার হাতে সফল ৫০টার বেশি ছবি সে কিনা প্রযোজক পায়না। এটা হাস্যকর ব্যাপার…।।

    গ্রিফিথ এর শেষের দিকের একাকীত্ব জীবন নিয়ে আরও একটু বিস্তারিত লিখলে ভালো হতো। তাঁর স্টেশনের হোটেলে একা থাকা, কারোর সাথে কথা না বলা, প্লাটফর্মের বেঞ্চিতে বসে ট্রেনের আসা যাওয়া দেখা ইত্যাদি ইত্যাদি।

    অনেক সুন্দর হয়েছে লেখাটা। খুব সম্ভাবত লেখাটা লিখতে আপনি খুব বেশি সময় নেননি। আদে দা পোস্টের পরেই খুব স্বল্প সময়ে পোষ্টা লিখেছেন। সুন্দর হয়ে 🙂

  4. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    তাঁর একাকীত্ব নিয়ে আসলেই আমি খুঁজতে যাইনি কোন তথ্য। আমার কাছে অবাক লেগেছে এমন এক পরিচালক আর তাঁর মূল্যয়ন কেমন করে করা হলো তা দেখে। 

  5. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    অনেক ইনফরমেটিভ পোস্ট। শেয়ার জন্য ধন্যবাদ… 🙂

  6. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    🙂 you most welcome 

  7. তানিয়া says:

    অনেক অজানা জিনিস জানলাম 🙂     

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন